সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সেলফির স্মৃতি

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ শুধু সেলফি তোলার কথা। এই সেলফির এখন খুব চল হয়েছে। আজ সেলফি তোলা এক গল্পের দুই বন্ধুর বন্ধুত্বের নানা অজানা কথা। আসলে এই সেলফি তো শুধু মাত্র একটা নিজের উপস্থিতির প্রমাণ করা নয়। এই সেলফি একদম চুপ চাপ দুজনে দুজনকে আশ্লেষে জড়িয়ে ধরে নিগূঢ় বন্ধনে বাঁধা থেকে সেলফি তুলে ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখার কথা। যার জন্য আমিও একটু অবাক হয়েছিলাম দুর থেকে ওদের দুজনকে দেখে।

ভরা হাটে একজন অপর জনকে ডেকে নিয়ে ছবি তুলছে আপন মনে হাসিমুখে। কেমন যেনো কোনো দিকে নজর নেই ওদের দুজনেরই। যেনো কত দিনের পুরোনো চেনা সম্পর্ক ওদের। সত্যিই তো জীবনের এই সব ছোটো ছোটো ঘটনা ঘটে যায় আমাদের সবার চোখের সামনে। কিন্তু সেই সব ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকে হাসি, কান্না, সঙ্কোচ, বেদনা আর বিহ্বলতা। সেই রকম ভাবেই ওরা ছবি তুলে ধরে রাখলো দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে। 

আজকাল তো পটাপট মোবাইল ফোনে আনলিমিটেড ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে কেমন যেন একটা ছবি তোলার হিড়িক পড়েছে সর্বত্র। সে পাহাড় থেকে হোক, ট্রেনের দরজা থেকে ঝুলতে ঝুলতে হোক, কিম্বা জঙ্গলের গহন বনে চাঁদনী রাতে হাঁটতে হাঁটতে হোক, পাহাড়ী ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে দু হাত তুলে ধরে হোক, বিপদসঙ্কুল সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে পা ভিজিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে ভেজা বালিতে পড়ে যেতে যেতে হোক এমন কি প্রিয়জনকে হারিয়ে তাঁকে শেষ বিদায় বেলায় হোক সেলফি কিন্তু মাস্ট। চাই চাই, আর সেটা না হলে সেই কবিতার লাইন এর মত বিদ্যে বোঝাই বাবু মশাই এর জীবনের মত ষোলো আনাই বৃথা এ পোড়া জীবন। 
জীবনের সুখে, দুঃখে, যন্ত্রণায়,আবেগে ভেসে যেতে যেতেও সেলফি কিন্তু চাই চাই। আসলে এটা যে এখন জীবনের অন্যতম অঙ্গ হয়ে গেছে সেটা ভুলে গেলে চলবে কি করে আমাদের। জীবনের সাথে এর সম্পর্ক এখন যে কত গভীর। তাই আজ সেলফি কথা লিখবো বলেই আমি ঠিক করলাম আমার এই সাদা জীবনের কালো কথায় আঁকাবাঁকা অক্ষরে আঁকিবুঁকি ব্লগে। 

সত্যিই বলতে কি জানেন তো আমিও আপনাদের মতই সেলফি তুলে রাখার অনেক সুযোগ পেয়েছিলাম একসময়। সেই সময় আমি কলকাতায় আকাশবাণীতে সাংবাদিকতার কাজের সুত্রে এই সব সুযোগ পেয়ে ছিলাম একসময়। আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর বা তার আগে এই সেলফি তোলার সুযোগ পেলে যার সাথে একটিবার সেলফি তুলে রাখতাম তিনি অবশ্যই সেই যে বিশ্ব সুন্দরী সুস্মিতা সেন। 

মিস ইউনিভার্স হয়ে প্রথম কলকাতায় এলেন যেদিন গড়িয়াহাটে তাঁর আত্মীয়ের বাড়িতে। আকাশবাণীর তরফে সেদিন সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে অত কাছ থেকে বিশ্ব সুন্দরীকে দেখে ওই তার পেলব সুন্দর ঠোঁট, টানা টানা চোখ আর মাখনের মত গায়ের রং দেখেও যে সেলফি তোলা হয়নি আমার সেদিন। আসলে সেই সময় কি আর এসবের চল ছিল। না কোথায় সেলফি জোন আর কোথায় মোবাইলের এত দাপট ছিল সেই সময়। তাই আমার সেই দুঃখ আজও রয়ে গেছে সেই আমার স্বপ্নকন্যা বিশ্ব সুন্দরীর সাথে যদি একটা সেলফি তুলে রাখতে পারতাম। তাহলে বোধহয় আমার এই পাঁশুটে জীবনটা একটু এই বুড়ো বয়সে এসে বেশ ভালো লাগতো। 

নোনতা স্বাদহীন‌ জীবনে কেমন একটা সুন্দর স্বাদ পেতাম আজ আমিও। সবাইকে বেশ হাসি হাসি মুখে বলতে পারতাম যে আমিও এদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি এক সময়, দেখো দেখো তোমরা সবাই। কিন্তু কই কোনো সাবুদ নেই যে আমার কাছে। তাহলে কি করে বলব। 

আর সেই যে যেদিন সানন্দার অফিসে সাক্ষাৎকার নেবো বলে দরজা ঠেলে ঠাণ্ডা ঘরে ঢুকলাম যখন বুকটা কেঁপে উঠেছিল একটু। ঘরে ঢুকে দেখলাম চোখে কালো রোদ চশমা পরে বসেছিলেন সেই বিখ্যাত অভিনেত্রী সুন্দরী অপর্ণা সেন। যে সেই সিনেমায় যেমন করে অপেক্ষা করেছিলেন, ট্রেন ধরে চলে যাবার সময় যে দৌড়ে এসে ছিলেন রিক্সা করে হন্তদন্ত হয়ে সৌমিত্রের জন্যে প্ল্যাটফর্মে। তারপর ট্রেন ছেড়ে চলে যাবার পর টলটলে দু চোখের কোল ভেসে যাচ্ছিল তার। সৌমিত্রর ডাকে যার সম্বিৎ ফেরে। সেই ডাক সাইটে অভিনেত্রী একমনে আমায় দেখে বুঝলেন, না এর জন্য এত চড়া লিপস্টিক আর এত সাজ না করলেই হতো বোধহয়। সেই বিখ্যাত অপর্ণা সেনের সাথেও যে একটাও সেলফি তোলা হয়নি আমার সেদিনও ওই সাদা বাড়ির ওই ঠাণ্ডা ঘরে বসে সাক্ষাৎকার নেবার পর। 

আসলে সেই আমলে তো আর এমন কলি যুগের মত সেলফি যুগ হাজির হয়নি খুব একটা। যে যুগে একদিন সকাল বেলায় অসুস্থ অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়কে দেখতে এলেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ গাড়ি নিয়ে সেই টালিগঞ্জের বাড়িতে। একটা সোফায় বসে জিজ্ঞাসা করলেন কেমন আছেন অনিল জেঠু। সেই সকালে তো আমিও হাজির ছিলাম সেদিন ওই বাড়িতেই। চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখলাম সেই ছায়াছবির সেই দুই নায়কের মিলন দৃশ্যও কিন্তু ছবিতে ধরে রাখতে পারিনি সেই মুহূর্তও। আজ এসব ভাবলে বড়ো আফশোষ হয় আমার। 

আসলে কি করবো আমাদের সেই সব দিনগুলোতে যে এমন করে সেলফির ঝড় ঝাপটা আসেনি আমাদের জীবনে এখনকার মত। তাহলে কি আর হাতের সামনে সেই ডিস্কো ড্যান্সার এর জন্যে বিখ্যাত মিঠুন চক্রবর্তীকে হাতের নাগালে পেয়েও কেউ একসাথে হাসি মুখে ছবি না তুলে ছেড়ে দেয় পার্ক হোটেলের ঘরে বসে একা একা শুধু নতুন বছরের শুভেচ্ছা বার্তা নিয়ে অফিস ফিরে আসে। কি করবো বলুন তো সেই সুযোগ ছিল না যে সেদিন। 

বহু পড়ে যখন আমি কাজের সূত্রে নানা চ্যানেলে কর্মরত হলাম হাতে মোবাইল পেলাম, ছবি তোলার সুযোগ পেলাম। না, সেদিনও তো সেই নানা বিখ্যাত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে হাসি হাসি মুখ করে সেলফি তুলে নিজেকে কেউকেটা মাতব্বর ভাবতে পারিনি আমি। উল্টে কিছুটা যেনো সঙ্কোচ আর কিছুটা নিজের কাছে নিজের জড়তা কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পারিনি হাল আমলের দেব, জিৎ বা ঋতুপর্ণার কাছে। এমনকি মহাকরণে লাইন দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে হাতে রাখী পড়ে তার ছবি তুলে ধরে রাখার দিনেও কেমন যেনো গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে গেছিলাম আমি। আসলে কেমন যেনো লজ্জা পেয়ে ছিলাম আমি সেদিনও কিছুটা দ্বিধাও ছিল। 

আসলে এক ছোটো অতি ক্ষুদ্র জীবন এর সাথে এক বৃহৎ অতি বৃহৎ জীবনের এই ভাবে ছবি তুলে ধরে রাখা কেমন যেন বেমানান লাগে আমার। আজকাল অবশ্য এটাই নিয়ম। তোমার কার সাথে পরিচয় আছে সেটা নির্ণয় হয় তার সাথে কটা ছবি তোলা আছে তোমার মোবাইলে সেটার ওপর নির্ভর করে সেই ব্যক্তির গুরুত্ব কতখানি সমাজে তার কি স্ট্যাটাস সেটার ওপর। তোমার মোবাইলের পর্দায় সেই সব বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি জ্বল জ্বল করছে। এটাই তো হল আসল কথা। কিন্তু সেসব কিছুই করা হয় নি যে আমার এই জীবনে। তাই বোধহয় আমি পিছিয়ে পড়েছি এই আধুনিক সেলফির যুগে। সে যাকগে পিছিয়ে পড়ি তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই।

 কিন্তু যে জন্য এত কথা বললাম সেই দুজনের দুই মহিলার দিনে দুপুরে হাটের মাঝে সেলফি তোলার হিড়িক দেখে চমকে গেলাম একটু। আমি হয়তো তাদের সেই দুজন মহিলার কোনো ছবি তোলার চেষ্টা করিনি কিছুটা ভয় আর সঙ্কোচে। কিন্তু অনেক পরে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমার পাশে বসা সেই মহিলাকে ছবি তুললেন কেনো অমন করে দুজনে মিলে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে। একদম আদি অকৃত্রিম হাসি হেসে সোজা সাপটা জবাব তাঁর। ও আমার বহু পুরোনো দিনের বন্ধু। বহু দিনের বন্ধু ও জানেন। সেই কবেকার বন্ধুত্ব আমাদের দুজনের। কিন্তু জানেন তো ওর হার্টের রোগ ধরা পড়েছে। কানেরও সমস্যা আছে। অপারেশন করতে হবে। ডাক্তার বলেছে খুব ভালো নেই ও। তাই আজ হাটে এসে আমায় দেখতে পেয়ে বলল চল দুজন মিলে মজা করে এই খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে অর্জুন গাছকে সাক্ষী রেখে আমরা দুজন একটা সেলফি তুলি। আমি যখন থাকবো না তখন তুই এই ছবিটা দেখবি। আর আমার কথা মনে করবি, ভাববি। মনে পড়বে তোর আমার কথা। 

আমি এই সব কথাগুলো শুনে কেমন যেনো চুপ করে স্থবির হয়ে গেলাম একটু । সত্যিই তো কেমন অকপটে সেলফি তোলার আসল উদ্দেশ্য কি সেটা বলে দিলো আমায় ওই হাটে বসা গ্রাম্য মহিলা। যে হাসতে হাসতে বলে দিলো জীবনের ডাক কার কখন আসে কে জানে। তাই তো দুজন মিলে একসাথে ছবি তুলে রেখে দেওয়া। আমি কি আর বলব চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম সেই নাম না জানা ওই গ্রাম্য মহিলার সামনে। যে আমায় বলে দিলো কত অবলীলায় কার ডাক কখন আসে কে জানে। তাই তো একটু ছবি তুলে রাখা দুজনের। ডাক্তার তো আমার বন্ধুকে বলে দিয়েছে ওর শরীর ভালো নেই তাই একটু ছবি তুলে রাখা।
এই অবস্থায় সেলফি তুলে দুজন দুজনকে হারিয়ে ফেলে একে অপরের সাথে থেকে যাওয়া ওই মোবাইলের মাধ্যমে। আর যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে এত বছরে সেই সম্পর্ককে জাগিয়ে রাখা এই বুকের মাঝে। এই বলে কেমন যেন একটা মায়াময় দৃষ্টি দিয়ে আমায় বলল কি করবো বলুন ডাক্তার যে ওকে বলে দিয়েছে ওর শরীর ভালো নেই অবস্থা ভালো নয় ওর। এমন কেউ বলে বলুন আপনি। 

আমার মুখ থেকে কোনো কথা নেই। চুপ করে মাথা নিচু করে সেই মহিলার কথা শুনলাম আমি। দুই ছেলে, বড় ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে সামনের বছর। স্বামী কলকাতায় রান্নার কাজ করে অল্প টাকা আয় করে। সংসারের খরচ চালানোর প্রয়োজনে সে এই হাটে এসে বসেছে কঙ্কালীতলায়। ছেলে দুটোকে তো মানুষ করতে হবে বলুন। আমি চুপ করে শুনছিলাম ওর কথা। 

আমি যেনো সাদা জীবনের কালো কথা লিখতে হবে বলে এমন কথা আমায় লিখতে হবে বলে ভাবিনি কোনো দিন আমি। এমন একটা চরম সত্য, নির্মম সত্য কথা জেনেও হাসি মাখা মুখে কেমন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সেলফি তুলে রাখা। একজন অন্য জনকে ছেড়ে চলে গেলে, হারিয়ে গেলে এক বন্ধু যেনো দেখতে পায় অন্য বন্ধুকে। সত্যিই এমন সেলফিও হয় তাহলে। কে জানে হয়তো হয়। আমার জানা ছিলো না।

 জীবনকে গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরে রাখার সেলফি। যে জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা,যন্ত্রণা, বন্ধুত্বের নানা অজানা অচেনা সম্পর্কের হাজারো গভীর গোপন কথা। যেগুলোকে ধরে রাখতেই এই বন্ধুত্বের সেলফি। যে সেলফির স্মৃতি, তার স্বাদ একদম আলাদা। যে সেলফির মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর নিখাদ ভালোবাসা।

সেলফির স্মৃতি - অভিজিৎ বসু।
ঊনত্রিশ জুলাই, দু হাজার চব্বিশ

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

ভোরের গন্ধ

ভেঙে ফেলা আস্ত একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চোখের আঙিনায়, কেমন দাঁত মুখ বের করে ছন্নছাড়া হয়ে, অতীতকে সযত্নে জড়িয়ে, আঁকড়ে। বাড়ির গাড়ি বারান্দার নিচে জমে থাকা সাইকেলের চাকায়, সুতো জড়িয়ে থাকার মতো কত মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, এই পুরোনো বাড়িতে। বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে সেই জীবনের সোঁদা গন্ধ, ঘাম এর দাগ এখনো লেগে আছে এদিক ওদিক। খুঁজলে হয়তো মিলবে আরও দু চার আনার স্মৃতির অকেজো সব তামাটে পরশ পাথর। আসলে মাটি উপড়ে,স্মৃতির উত্তাপ কে মুছে দিয়ে নতুন করে বিচিত্র সব রোজগারির, অপচেষ্টা আর কি। যে লাভের, লোভের, চেষ্টার গলায় লাগাম আর পরাবে কে। দুর থেকে জানলা দিয়ে দেখি শুকনো কলাপাতার ওই ম্রিয়মান নিষ্ফলা হাসি। বট ফলের আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা, যজ্ঞি ডুমুর গাছের পাতায় পিছলে পড়া স্মৃতির নরম উত্তাপ। যে উত্তাপে আজও জারিত হই আমি অনায়াসেই প্রতিদিন সকাল হলেই। ভোরের বেলায় পাখির ডাক শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ওদের মন কেমন করা কথা শুনতে পাই না আর। বোধহয় ওরাও বুঝে গেছে তাদের গলায় লাগাম পড়েছে এবার আচমকাই। তাই পথ ভুলে তারাও আসেনা আর কিছুতেই  এদিক পানে। পশ্চিমী হাওয়া ঠেল...

ইটিভির বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

কত দিন ধরেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি। সেই কেমন হাসিখুশি জীবন নিয়েও হাজারও বড়ো অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েও কত কুল থাকা যায় সেটা আমি বিশ্বজিৎদাকে দেখে শিখলাম আর কী। সেটা সেই জঙ্গলে মাওবাদী নেতাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হোক বা তাঁদের কোনোও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক। কিম্বা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট এর অফিসে গিয়ে বিমান বসুর সাথে একান্তে কথা বলা হোক। কিম্বা অনিল বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে কথা বলা হোক। কিম্বা সেই মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বন্যাদুর্গত এলাকা আরামবাগ মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাজির হয়েছেন। খুব সম্ভবত বিশ্বজিৎ দা হাজির আকাশ বাংলা চ্যানেল থেকে সেই সময়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কথা বলছেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একটু দূরে। রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। যাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কেউ যেতে না পারি। আমি উত্তেজিত কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে একদম নির্বিকার হাসিমুখ বিশ্বজিৎদার কথা ছাড় তো, আমাদের যেতে না দিলে আমরা কি করবো। প্রচার হবে না ওদেরই। একটু পরেই সেটা বুঝত...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...