সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বসন্তের সন্ধ্যায় আমি

শহরের রাস্তায় বেশ ভীড়। হাঁটছিলাম চেনা পথ দিয়ে। বড়ো রাস্তার পাশে কাঠের লম্বা টেবিলে দুজনের বসে কথা বলা দুজনের। একজন ষাট ঊর্ধ্ব অন্যজন পঞ্চান্ন হবে হয়তো। কেউ বার্ধক্য ভাতার আওতায় এলো আর কেউ সেই দড়ি ছোঁবে বলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কাঠের টেবিলে বসে বসে। কানে এলো আমার দু একটি কথা সকালে রক্ত পরীক্ষা হয়েছে নিমাই বাবুর। একদম পরীক্ষায় পাশ করেছে সে হাসতে হাসতেই। এই বয়সে যে পাশ করে কী আনন্দ তাঁর। আসলে সেই সুগার, কোলেস্টেরল সব একদম ঠিক থাকে যেনো শরীরে যেন ছোবল না মারে কিছুতেই। জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে রেখে সবকিছুকে কন্ট্রোলে রেখে নিমাই বাবুর মুখের যে উজ্জ্বল আলো দেখলাম আমি এই বসন্তের সন্ধ্যার ঝকঝকে আলো মাখা রাস্তায় তার জন্য মনটা বেশ ভালো হয়ে গেলো আমার। জীবনের জন্য কত ভালোবাসা। 

আমি যাচ্ছিলাম গরম তেলে পাঁচ টাকার ফুলুড়ি খেতে সন্ধ্যা হলেই আমার চেনা পথে পা এগিয়ে চলে কেমন করে। সেই নিশির ডাক দেয় কেউ যেনো আমায় প্রতি সন্ধ্যায়। আর আমি বসন্ত এসে গেছে সেই গান গাইতে গাইতে পাঁচ টাকার ফুলুড়ি খেতে হাজির হই গঙ্গার ধারের দোকানে। একসময়ে আমি আর সমীর আসতাম দুজন বন্ধু মিলে এখানে। আজকাল আর সমীর আর আমার ফুলুড়ির জন্য হাঁটা হয়না বহুদিন। বসন্ত এলেও ফেরা হয়না একসাথে আমাদের। সেই একটু দূরেই ওপারে ব্যারাকপুর শিল্পের জন্য আজ আর হাতছানি দেয় না বিশেষ। তবে অর্জুন সিং আর পার্থ ভৌমিকের লড়াই এর গর্জন শোনা যায় ওপার থেকে এপারে। গঙ্গা পেরিয়ে চলে আসে সেই হুংকার দিনে আর রাতে গঙ্গার জলে ভেসে আসা কচুরি পানার মতই।

রাত নটা বাজে প্রায় সেই বারো ঘণ্টার ডিউটি করে আবাসনে সেই ৭০ বছরের বৃদ্ধ রুটি কিনে ঘরে ফিরছেন ধীর পায়ে। তাঁর বোধ হয় রক্তের সুগার আর হৃদয়ের কোলেস্টেরল অনেকটাই চাপ দেয় সংসারের চাপ এর থেকেও বেশি, কিন্তু হাসি মুখে সে চাপ চেপে রেখেই তাঁর রুটি কিনে ঘরে ফেরা। ঘরে অসুস্থ স্ত্রী আছেন তাঁর। রুটি করার অবস্হা নেই তাই হয়তো এই ভাবেই হাসিমুখে বেঁচে থাকা তাঁর। মাঝে মাঝেই আমার সাথে সেই সিকিউরিটি গার্ড এর কাজ করা বৃদ্ধর দেখা হলে একটা সাদা ফ্যাকাসে হাসি হেসে জিজ্ঞাসা করেন ভালো আছেন তো। ফ্ল্যাটটি কি বিক্রি করে দেবেন নাকি জানাবেন কিন্তু লোক আছে নেবার। এমন সব নানা জন এর সাথেই আমার দেখা হয় শহরের এই রাস্তায়।

বোলপুরে ঘুরলে টোটো চালক জার্মান শেখ আর নৌসাদ শেখ এর সাথে দেখা হয়। আর শহরে এলে অন্য ঝাঁ চকচকে জীবন আর সেই পাড়ার কম আলোর মাঠে সেই সরকার এর প্রচারের বিনে পয়সার সিনেমা চলে। সবুজ চেয়ার পাতা। সেই সুন্দর ব্যবস্থা দেড় হাজারের ভাতা নেওয়া মা কাকীমা সব হাজির হন সবাই সেজে গুজে এই সিনেমা দেখতে সন্ধ্যা হলেই। পাড়ার কাউন্সিলর এর সামনে এসে না দাঁড়ালে যদি দিদির ঘরের টাকা আসা বন্ধ হয়ে যায় নিজের অ্যাকাউন্টে। তাহলে যে কি হবে তাই তো হাজির দেওয়া এই সন্ধ্যার শো তে পাড়ার মাঠে একটু স্নো পাউডার মেখে হাসি মুখে। 

আজকাল আমিও বুড়ো হচ্ছি যে জানিনা আমার রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে কী না। এইসব উল্টোপাল্টা ভাজা খেয়ে জীবন যাপন করা ঠিক না বেঠিক। তবু তো এই বসন্তের ছোঁয়া লাগলো যে শহরে আর গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে সেই বিজুর সাইকেল গ্যারেজ পার হয়ে পল্টুর আলুর দোকানে মাসের শেষে ভীড় কম। কিন্তু রাস্তার ফুটপাথে ফুলের মালা কিনতে কি লাইন পড়েছে যে। আসলে দিনদিন দেবতার প্রতি ভক্তি বাড়ছে যে আমাদের। ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে সেই মা লক্ষ্মীর ভান্ডার আর বৃহস্পতি বার এলেই যে সেই মায়ের আরাধনা করে ঘরে ডাকা তাঁকে। আর ফুল বিক্রেতা জগার ঘাড় নিচু করে ফুল বেল পাতা আর জবার মালা প্যাকেটে পুরলেই তো কমপক্ষে পঞ্চাশ বা একশো টাকা। আমি বেশ অবাক হলাম এতো ফুল কেনার লাইন। আর তার মাঝে বাপিদার দোকানে মকবুল ফিদা হোসেনের স্টাইলে বসে থাকা আমাদের মৃণাল দার। ছেলের সুরের মূর্ছনায় ভেসে গিয়ে তাঁর নতুন করে স্বপ্ন দেখা আবার। 

একদিকে যেমন রক্তে সুগার কে চেপে রেখে হাসিমুখে আড্ডা মারা নিমাই বাবু আর পাঁচু বাবুর। ঠিক তেমনি করেই অফিস ফেরত কর্পোরেট চাকরী করা আমার পাশের ফ্ল্যাটের প্রসেনজিৎ বাবুর ফুল কিনে ঘরে ফেরা বিধ্বস্ত হয়ে। যদিও এক সিঁড়িতে উঠতে গিয়েও কেমন অবহেলা করে আমার দিকে না তাকিয়েই চলে যাওয়া। যদিও যখন মিডিয়ার কাজ করতাম তখন সে তো দেশের আর রাজ্যের কী খবর জান্টারেই সিঁড়িতেই ভাব জমাতেন। আজকাল দিন যে বদলে গেছে অনেক। অফিস এর চাপ নানা প্যাঁচ পয়জার সামলে সামনে মার্চের পর যেনো প্রমোশন আর ইনক্রিমেন্ট হয় তাই মায়ের পায়ে দশ টাকার লাল পদ্ম দেওয়া প্রতি সপ্তাহে তাঁর। এই সব দেখতে দেখতে গরম গরম চা আর ফুলুড়ি খেয়ে টিফিন করা আমার রাস্তায় হেঁটে। 

সেই তো এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম মেনে জীবন যাপন করা। সেই ষ্টেশনের সামনে চায়ের দোকানে পিলপিল করছে ভীড়। জল গরম করেই ওর সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রোজগার। ফুলের মালা দিয়ে সন্ধ্যায় কত রোজগার। পল্টুর বাজার দর করে আর বাজারে জিনিসের দাম বেড়েছে বলে রোজগার। খালি রোজগারহীন একমাত্র আমি দেখলাম এই ভিড়ের মাঝে ঘুরে বেড়াই যে একা একদম একা বসন্তের সন্ধ্যায়। 
দেখা হলো রাস্তায় সমীর এর সাথে এক সময়ের দাপুটে জনপ্রিয় সাংবাদিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুব কাছের লোক বলে কথা। সাংবাদিক থেকে তাঁর সমাজকর্মী আন্না হাজারে না হলেও অন্য কিছু হয়ে যাওয়া তাঁর। আজ ফাল্গুনে ভাষার জন্য দিবস পালনের জন্য আহবান জানিয়ে আমায় বলা এসো কিন্তু তুমি ওইদিন। আমি মনে মনে ভাবি যাবো কী করে আমি এই এলেবেলে রোজগারহীন এই শহরের একজন মানুষ যে ভাতাহীন বার্ধক্য নিয়ে জীবন কাটায় সে কী আর বসন্তের ডাকে সাড়া দিতে পারে সে। প্রেম যে আমার কবেই উড়ে গেছে গঙ্গা পেরিয়ে সেই আমার চেনা পথে। সেই ব্যারাকপুরের রাস্তায়। সেই নাম না জানা ফুলের রাস্তায় আলগোছে পড়ে থাকা। আর আমার তাকে এক জায়গায় রেখে আসা যত্ন করে। যদি কোনোদিন ফিরে পাই তাকে। না আর সেই বসন্তের সন্ধ্যায় ফেলে আসা পলাশ ফুলের জায়গায় আমার আর ফেরা হয়নি যে আর এতদিন পরেও। সবকিছুই যে হারিয়ে গেছে আমার। 

বসন্তের সন্ধ্যায় আমি - অভিজিৎ বসু।
উনিশ ফেব্রুয়ারি দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শ্রীরামপুর এস ডি পি ও অফিসের প্রসেনজিৎ বাবু

ফেসবুকের পর্দায় তাঁর সাথে যোগাযোগ হওয়া আমাদের দুজনের বেশ কিছুদিন আগে। একজন পুলিশ আর অন্যজন সাংবাদিক। বেশ ভালোই জুটি বলা যায় একদম রাজযোটক বলা যায় আর কি। একজনের বাড়ী মগরায় আর অন্যজনের বাড়ী শ্রীরামপুরে। আমার পুরোনো লেখা পড়ে তাঁর সঙ্গে আমার কথা হওয়া তাঁর একদিন। ফেসবুক থেকে ফোনের আলাপ তাঁর সঙ্গে আমার।  সেই তাঁর পুরোনো ছবির অ্যালবাম দেখে আমার বেশ মনে পড়ে যাওয়া। সেই বিখ্যাত এস ডি পি ও ভরতলাল মীনা। যাঁর সাথে ভোটের কাউন্টিং এর দিন আমার বিরাট ঝামেলা হওয়া সেই গঙ্গার ধারের টেক্সটাইল কলেজে। সেই মোবাইল ফোন নিয়ে সংবাদিকদের প্রবেশ নিষেধ করে দেওয়া তাঁর। পরে অবশ্য এই অফিসার এর সাথেই আমার ঘনিষ্ঠতা আর বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়া অনেকদিন পরে। সেই গঙ্গার ধারের এস ডি পি ও অফিস। সেই তাঁর বাংলো। সেই সবুজ লন। সেই কত সব বিখ্যাত পুলিশ অফিসার এর কাজের জীবনের শুরুর সময় এস ডি পি ও হয়ে।  আর সেই অফিসে কাজ করতেন এই প্রসেনজিৎ চৌধুরী। ভালো করে সেই পুরোনো ছবি দেখে মনে পড়ে গেলো তাঁর মুখটি আজ। সেই কত কথা যে হলো তাঁর সাথে। এই সব নানা বিষয়ে। রঘুকে চেনেন তিনি ভালো করেই সেই মগরাতে তাঁর বাড়ীর সুব...

ক্যামেরাম্যান দয়াল এর কথা

দয়ালকে আমরা ভুলেই গেছি প্রায় অনেকেই। সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো দয়াল। সেই বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান দয়াল। একদম দিদির খুব কাছের লোক সে। একদম নানা সময়ের নানা মুডের ছবি ধরে রেখেছে সে তাঁর ক্যামেরায়। দিদির ঘরের লোক দয়াল। সেই কলকাতা টিভির আর চ্যানেল টেন এ কাজ করেছে সে মনে হয়। সেই পুরোনো দিনের নানা ঘটনার আর রাজনীতির সাক্ষী সে। সেই দয়াল যাঁর সাথে আমিও কাজ করেছি একসাথে এক চ্যানেলে না হলেও। কত যে গতিময় ছিলো সেই জীবন আর কি বলি আমি।  তবুও বহুদিন হলো এই দয়াল এর কথা মনে পড়ে গেলো আজ। সেই কালীঘাট এর বাড়ীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বসে আছেন দয়াল। সেই মহাকরণে মন্ত্রীর ঘরে প্রেস কনফারেন্স এর রুমে দয়াল। সেই বারন্দায় দাঁড়িয়ে মমতার ছবি আঁকা। আর দয়াল এর মুগ্ধ হয়ে দেখা সেই দৃশ্য আর তাকে ধরে রাখা তার সেই সব ছবি। সেই ক্যামেরায় লেন্সে চোখ লাগিয়ে তার ছবি তুলে নানা মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখা। একদম নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এগিয়ে চলা তাঁর এই চিত্র সাংবাদিকের পেশায়। খুব যে আমার সাথে ওর আলাপ, স্মৃতি, গল্প করা সেই সব না হলেও আমাদের সেই মহাকরণ...

ঝড়, অভিজিৎ বসু।

ভালোবাসার ভীড়ে ভরে উঠবে শহর থেকে গ্রাম। থিক থিকে ভীড়ে উড়বে ধুলোর কনা চারিদিকে। ধুলোর ঝড়ে ঢেকে যাবে শরীর, মন, প্রাণ। ধুলোর ঝড়ে হারিয়ে যাবে মনের মানুষ। হারিয়ে যায় গোটা জীবন।  জীবনের ছায়া মায়া মাখা পথে একা ঘুরে বেড়াই আমি। ভালোবাসার ভীড়ে আত্মাদের সাথে গা ঢাকা দিয়ে,  লুকিয়ে হাঁটি একা, একা। দেখি অন্ধকারের পথ জুড়ে শুধুই, ভালবাসার অভিনয় করা মানুষের ভীড়। মসৃণ রাস্তায় সরীসৃপের মত এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়ায় তারা সন্তর্পনে। পায়ে পা মেলাই ধুলোর ঝড় গায়ে মেখে আনমনে,  ধুলি ধুসরিত হয়ে।  ঠিক যেনো ছাতিমের ডালে বসা ছাতারের মত। ঘোলা চোখের ধুলো মাখা দৃষ্টিতে, দুর পানে তাকিয়ে দেখি।  সূর্যের মিঠে আলোয়, ধুলোর কনা গায়ে মেখে  গোপন অভিসারে মত্ত প্রজাপতির দল। অভিনয়ের অভিসার নয়,  সত্যিই কারের ভালোবাসার অভিসার। ধুলোর ঝড়ে ঢেকে যায় আমার শরীর,মন, প্রাণ। ঝড় - অভিজিৎ বসু।

টিনের নৌকো আর সেই ক্ষেত্র মোহন শা এর মেলা

বুড়ো হলেও ছোটো বেলায় ফিরতে কে না চায় বলুন তো। আসলে এই জীবনের উলট পুরান আর জীবনের এই ছোটবেলার দিনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা আর সেটা নিয়ে স্বপ্ন দেখা একটা রোগ বটে আমাদের সবারই। আর স্মৃতির রাস্তায় হাঁটা চলা করার উপায় নেই যে একদমই আমার এই প্রাচীন শহর শ্রীরামপুরে এই ফ্রেডরিক নগরে। রাস্তায় যা ভীড় এই বিপিদে স্ট্রীট এর রাস্তায় হাঁটতে নামলেই টোটোর ধাক্কায় আপনি কুপোকাত হবেন নিশ্চিত। ফুটপাথ অনেক কমে গেছে পথচারীদের জন্য না হয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বটে সেটা বেশী প্রয়োজনের। আর তাই রাস্তায় নামলেই কেউ বলবেন দাদু দেখে রাস্তায় হাঁটুন আপনি । কেন যে রাস্তায় বের হন কে জানে। কিছুটা কানে লাগলেও উপায় কি চুলে পাক ধরেছে যে কবেই আমার।  তবুও এই মাঘের হাল্কা শীতে হাঁটতে হাঁটতে আমার সন্ধ্যায় শৈশবে ফেরার বাই চাপে প্রতি বছর এই বসন্তে। এটা একটা রোগ বটে। যা গুটি বসন্তের মতই বেরিয়ে পড়ে প্রতি বছর সজনে ফুলের গন্ধ নাকে এলেই। জীবনের ক্যামেরার চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে একবার ঠিক রিওয়াইন্ড করে দেখে নেওয়া সব কিছু ঠিক আছে তো, মরচে পড়ে যায়নি তো স্মৃতির গলিপথের সেই আবছা রাস্তা...