বুড়ো হলেও ছোটো বেলায় ফিরতে কে না চায় বলুন তো। আসলে এই জীবনের উলট পুরান আর জীবনের এই ছোটবেলার দিনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা আর সেটা নিয়ে স্বপ্ন দেখা একটা রোগ বটে আমাদের সবারই। আর স্মৃতির রাস্তায় হাঁটা চলা করার উপায় নেই যে একদমই আমার এই প্রাচীন শহর শ্রীরামপুরে এই ফ্রেডরিক নগরে। রাস্তায় যা ভীড় এই বিপিদে স্ট্রীট এর রাস্তায় হাঁটতে নামলেই টোটোর ধাক্কায় আপনি কুপোকাত হবেন নিশ্চিত। ফুটপাথ অনেক কমে গেছে পথচারীদের জন্য না হয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বটে সেটা বেশী প্রয়োজনের। আর তাই রাস্তায় নামলেই কেউ বলবেন দাদু দেখে রাস্তায় হাঁটুন আপনি । কেন যে রাস্তায় বের হন কে জানে। কিছুটা কানে লাগলেও উপায় কি চুলে পাক ধরেছে যে কবেই আমার।
তবুও এই মাঘের হাল্কা শীতে হাঁটতে হাঁটতে আমার সন্ধ্যায় শৈশবে ফেরার বাই চাপে প্রতি বছর এই বসন্তে। এটা একটা রোগ বটে। যা গুটি বসন্তের মতই বেরিয়ে পড়ে প্রতি বছর সজনে ফুলের গন্ধ নাকে এলেই। জীবনের ক্যামেরার চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে একবার ঠিক রিওয়াইন্ড করে দেখে নেওয়া সব কিছু ঠিক আছে তো, মরচে পড়ে যায়নি তো স্মৃতির গলিপথের সেই আবছা রাস্তা। সেই শৈশব আর দুরন্ত কৈশোর এর ফেলে আসা স্মৃতিকে ফিরে পেতে কে না চায় বলুন তো। এই শিবরাত্রি থেকেই যে শহরের মধ্যভাগে সেই ক্ষেত্রমোহন শাদের সেই বিখ্যাত মেলা বসে যায় বিরাট এই আজকের ভগ্নপ্রায় মেলা বাড়ীতে। যে মেলার মূল আকর্ষণ কিন্তু সেই মাটির পুতনা রাক্ষসী, যা দেখতে আমাদের সেই ছোটো বেলায় বাড়ীর লোকদের সাথে ভীড় করে আসা। আর কেমন ভয় পেয়ে মায়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা। যদি ধরে আমায়। মায়ের গায়ের মিস্টি গন্ধ, শাড়ির গন্ধ আজও যে নাকে লেগে আছে আমার এই এতদিন পরেও। আজ যদিও সেটা আর নেই দেখলাম সেই বিখ্যাত মূর্তিও উধাও হয়েছে কবেই।
আর সেই বিখ্যাত সব মাটির পুতুলকে সাজিয়ে রাখা নানা স্থানে একদম পুরোনো দিনের মহাভারতের আর রামায়ণের ইতিহাসকে তুলে ধরা মেলার প্রাঙ্গণে। সেই কৃষি, বিজ্ঞান, কলা আর রকমারী ফুলের প্রদর্শনী তো ছিলো একটা সময় বিশেষ ঐতিহ্য। এইসব তো আছেই আর সেই শ্রী শ্রী শিবশঙ্কর জিউর মন্দির। যে মন্দিরে এখনও পূজো হয় নিয়ম মেনেই তিনবেলা। আসলে ইতিহাস এর পাতায় একশো ত্রিশ বছর ধরেই হয়ে আসছে এই ক্ষেত্র শা বাড়ীর মেলা। যে মেলায় আসতাম আমরা মামার বা মায়ের হাত ধরেই। সেই আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেও। মেলা তো মিলিয়ে দেয় শৈশবের সাথে কৈশোরকে। আর কৈশোর এর সাথে যৌবন কে মিলিয়ে দেয় নিজেদের অজান্তেই যা আমরা বুঝতেই পারিনা কিছুতেই। আজ তো এই মেলায় ডিজে আর হিন্দী গানের দাপট। আর গুগল পে আর ফোন পে করেই দাম মেটানো যায় যে।
যে মেলার মূল আকর্ষণ কিন্তু ছিলো সেই আমাদের এই ছোটবেলায় ছোট্ট গামলায় জলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে টিনের সেই নৌকা। আর বিস্ফারিত নয়নে আমার তাকিয়ে থাকা সেই গামলার দিকে। কতদিন তো বড়ো হয়েও বুড়ো হয়েও সেই টিনের ভুটভুটির টানেই আমার মেয়েকে নিয়ে এই মেলায় আসা এই দু এক বছর আগেও। পুকুর পাড়ে বসে থাকা সেই কালো মত লোকটাকে দেখে নিজে নিজেই দাঁড়িয়ে যাওয়া আমার। কেন কে জানে এইবার মেলায় ঘুরলাম। দেখলাম নতুন নতুন কিছু দোকান পাট এসেছে। মেলার জায়গা একটু বেড়েছে আকারে ও আয়তনে অনেকটাই। জবর দখলের জায়গা উদ্ধার করে এই চেস্টা করা হয়েছে শুনলাম। কিন্তু সেই নৌকো ওলা কই।
সেই মন্দিরের আঙিনায় সাদা রঙের চুনের প্রলেপ পড়েছে। আর তার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে নানা ধরনের সব মাটির মূর্তি দেওয়ালে স্থির হয়ে। আর সেই ভেঙে পড়া ঠাকুর দালানের থামের আড়ালে একমনে বকবকম করছে পায়রার দল। এইবার মেলার উদ্বোধন করলেন হরিয়ানার রাজ্যপাল অধ্যাপক অসীম কুমার ঘোষ। ক্ষেত্রমোহন শা এর মূর্তি স্থাপন করা হয় কিছুদিন আগেই। মেলার মাঠের একপ্রান্তে দেখা হলো উত্তম শা এর সাথে। কথায় কথায় তিনি বললেন যে চেষ্টা করছেন এই শহরের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে আর কী তারপর কি হবে কে জানে। এই বাড়ীর একটা ইতিহাস তো আছে। সেটা ভুলে গেলে চলবে কী করে। পকেট থেকে কার্ড বের করে দিলেন আমায়। যদিও আমি খবরের লোক নই তবুও সেই কার্ড নিলাম আমি সাগ্রহে।
আসলে সেই মেলার ভীড় এড়িয়ে আমার মন্দিরের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো। সেই মেয়ের হাত ধরে পঞ্চাশ এর মায়ের ছোটো বেলার স্মৃতি রোমন্থন করা ঘুরতে ঘুরতে কানে এলো আমার। কেমন করে এইখানে কত আনন্দ করতেন এক সময়ে তাঁরা তাঁদের ছোটবেলার সময়ে সেটা বোঝাতে গিয়ে মায়ের সেই ছোটো বেলায় বা কৈশোরে ফিরে যাওয়া। এক বৃদ্ধ মাথায় কম ঠান্ডায় টুপি পড়ে আনমনে মেলার মাঠে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে খুঁজছেন কি কিছু কে জানে হয়তো আমার মতোই। জিজ্ঞাসা করবার সাহস হয় নি আমার তাঁকে আর যদি কিছু ভেবে বসেন তিনি। হয়তো তিনিও আমার মতোই শৈশবের খোঁজে মেলায় এসেছেন এই জায়গায় এই সত্তর বছর বয়সেও এই বসন্তের সন্ধ্যায়।
সেই এক বৃদ্ধার বসে পড়া সেই রং চটা বারান্দায় নাতনীর হাত ধরে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখা আর মাথার ওপর বক বকম করা পায়রার দলের কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা বৃদ্ধার দিকে দূর থেকে। নাতনীকে এই বাড়ীর ইতিহাস বলছেন বৃদ্ধা। আর আমি সেই মজে যাওয়া পুকুর এর ধারে খুঁজে বেড়ালাম সেই টিনের নৌকো বা ভুটভুটি বিক্রি করতে আসা সেই কালো লোকটাকে। কোথায় সে কে জানে। কথায় কথায় বললেন আমায় এই বাড়ীর সদস্য মেলার কনভেনর সেই উত্তম শা তাঁর নাম, গালে দাড়ি ভর্তি পান্ডুয়ায় মেলা হচ্ছে তো অনেকেই আসতে পারেনি আরও অনেক স্টল বসবে বুঝলেন। আমি আর ওনাকে কিছুই বলতে পারলাম না চুপ করে শুনলাম ওনার কথা।
ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে চলে এলাম রাস্তায়। সেই চেনা বাড়ীর সামনে টুনি বাল্বের আলো ঝুলছে এই সময়ে সেজে ওঠে এই বিখ্যাত বাড়ী প্রতি বছরই। সেই পুরোনো মেলা আজ অনেক বদলে গেছে। বদলে গেছে আমার ভালবাসার এই শহর শ্রীরামপুর যে ফ্রেডরিক নগর। প্রোমোটার এর দল চারিদিকে গ্রাস করেছে শহরের নানা পুরোনো বাড়ী। আর সব ভেঙে সংসার ভেঙে গড়ে উঠেছে শুধুই বহুতল। এই শহরের গলি পথে আর রাজপথে এখন তো শুধুই বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীর আরাধনা চলছে যে জাঁকজমক করেই। তবু যে মেলায় আমাদের শৈশব দুরন্ত কৈশোর কেটেছে সেই স্মৃতির আবছা আবছা ছবিকে ধরতেই তো এখানে এই বসন্তের সন্ধ্যায় ফিরে আসা আমাদের মতো বুড়ো আর বুড়ীদের।
সেই টিনের নৌকোর আলো জ্বেলে ঘুরে বেড়ানো গামলার জলে। সেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। আর সেই নৌকো কিনে যুদ্ধ জয় করে ঘরে ফেরা আমার। সেই একটা ছবি যে হারিয়ে গেলো এইবার এই মেলা থেকে আমার এই এলোমেলো এলেবেলে জীবন থেকে। সত্যিই তো টিনের নৌকোর টানে যে আসা আমার এই মেলায় প্রতিবছর সেই টান কেমন যেনো উবে গেলো এই বছর।
মনটা খারাপ নিয়েই রাস্তায় নেমে পড়লাম আমি মেলার ভীড় এড়িয়ে। ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে দেখে শুনে রাস্তা পার হলাম। কিছুটা সেই ছোটবেলার স্মৃতিকে হারিয়ে আমি যে আজ সত্যিই ভারাক্রান্ত। টিনের নৌকোর টান যে এতো কে জানে আগে তো কখনও বুঝিনি সেটা আমিও কিছুতেই। হারিয়ে গেছে মায়ের সেই শাড়ীর আঁচলের গন্ধ, হারিয়ে গেছে পুতনা রাক্ষসী আর আজ হারিয়ে গেল আমার প্রিয় সেই টিনের নৌকোও। শুধু ইতিহাসকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ক্ষেত্রমোহন শা এর ভগ্নপ্রায় বাড়ীটি।
টিনের নৌকো আর সেই ক্ষেত্রমোহন শা এর মেলা - অভিজিৎ বসু।
আঠারো ফেব্রুয়ারি দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য উত্তম শা ও নিজের মোবাইল ক্যামেরা।
অনেকদিন পর ব্লগের লেখা পড়লাম। ভাল লাগল বেশ।
উত্তরমুছুন