সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

চোদ্দ অক্টোবর ভোর বেলার সেই ফোন।

নোবেল কমিটি আজকে তাদের টুইটারে এই সেই বিখ্যাত ছবিটা তুলে ধরেছে আবার। হ্যাঁ, সাইকেল নিয়ে লাল মাটির রাস্তা ধরে আপনমনে ছুটে চলেছেন সেই নোবেল জয়ী বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। এই  আজকের মত সেদিনও এক ১৪ অক্টোবর ১৯৯৮ সালে কাকভোরে বেজে উঠেছিল অমর্ত্য সেনের ফোন। তিনি এই ফোনটা ধরার আগে ভেবে নিয়ে ছিলেন নির্ঘাত একটা খারাপ খবর অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। হয় পরিচিত কেউ অসুস্থ হয়েছেন তাই ফোন এসেছে তাঁর কাছে,অথবা কিছু একটা খারাপ ঘটনা ঘটেছে বলে এত ভোরে তাঁর কাছে ফোনটা এসেছে৷ এই কথা ভাবতে ভাবতেই সেই ভোরবেলার ফোনটা তিনি ধরে ফেলেন। কিন্তু না, কোনো খারাপ খবর আসেনি সেদিন সেই ভোরবেলায় তাঁর কাছে৷ তিনি জানতে পারলেন অ্যাকাডেমি অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে৷ সেই দিনটা হলো আজকের সেই চোদ্দ অক্টোবর। 

যে তাঁর এই বিখ্যাত ছবিটা আজ এতদিন পরেও নোবেল কমিটি তাদের সেই টুইটারে তুলে ধরেছে। সেই বিখ্যাত মানুষ যিনি শান্তিনিকেতনে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন লাল মাটির রাস্তা দিয়ে তার সেই দু চাকার প্রিয় সাইকেল করে। যে ছবিতে লেখা আছে যে তাঁর এক সহকারীকে যখন গ্রামের কোনো শিশু কামড়ে দেয় তাদের ওজন নেওয়ার সময়। সেই সময় তাঁর সহকারী অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি নিজেই সাইকেল করে সেই শিশুদের ছেলে ও মেয়ে তাদের সঠিক পুষ্টি তারা পায় কি না। তাদের সঠিক পুষ্টি পেয়ে ওজন ঠিক মত তাদের হচ্ছে কি না বয়স অনুপাতে সেটা মাপতে তিনি বেরিয়ে পড়েন এই দু চাকার সাইকেল যান করে।

 
ঘুরে বেড়ান এদিক থেকে ওদিক এই গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। আর সেই গ্রাম ঘুরে বেড়ানো, গ্রামের মেঠো রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে গ্রামের প্রান্তিক মানুষের সাথে দেখা হওয়া, তাদের জীবনের সুখ আর দুঃখের কথা জানা, তাদের ঘরের ভাতের অভাবের কথা জানা সেটাই বোধ হয় তাঁকে এই একসময় নোবেল পুরষ্কার এনে দিলো। যিনি মাত্র নয় বছর বয়সে ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর দেখেছিলেন। যে দুর্ভিক্ষে মারা গেছিল প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ। যা সেই ছোটবেলায় তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। পড়ে বড়ো হয়েও সেই ছোট বেলার দুর্ভিক্ষের স্মৃতি ভুলতে পারেননি তিনি।

যিনি বুঝেছিলেন এই দেশে ভারতবর্ষে যে দুর্ভিক্ষ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন সেটা দেখে তাঁর এই গবেষণার সূত্রপাত হয়। তিনি সাইকেল করে ঘুরে ঘুরে শান্তিনিকেতনের আশেপাশে বাস করা মানুষদের জীবনযাত্রা আর নানা তথ্য সংগ্রহ করতেন। সেই সব মানুষদের আয় কত, চালের দাম কত, এইসব জানতেন তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে। 

এই জনকল্যাণকর অর্থনীতি এবং গণদরিদ্রের অন্তর্নিহিত এই কার্যকারণ বিষয়ে তাঁর এই গবেষণা। এই গবেষণার জন্যই তাঁর নোবেল পুরষ্কার পাওয়া। যে পুরস্কার পেলেন তিনি তাঁর এই দু চাকার সাইকেল করে গ্রাম আর গ্রামের অর্থনীতির সরেজমিন পরিদর্শন করে। এই একটা ছোট দু চাকার সাইকেল তাঁর নোবেল জয়ের অন্যতম বড় ব্যাপার হয়ে ওঠে একদিন। সেই চির পরিচিত ছবিটা আজ আবার নোবেল কমিটি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে এই আজকের দিনে। যে দিন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। 

অমর্ত্য সেনের মা অমিতা সেন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অত্যন্ত স্নেহধন্য। অমর্ত্য'র নামকরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। তাই ঠাকুর বাড়ীর সাথে তাঁর ছোট কাল থেকেই একটা গভীর সম্পর্ক ছিল। তাঁর সেই ছোটবেলায় এই আশ্রমে পড়াশোনার শুরু। তারপর ধীরে ধীরে একের পর এক হার্ডেল টপকে তাঁর এগিয়ে চলা।  ভারতবর্ষের ইতিহাসে সম্ভবত তিনি সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি যিনি মাত্র ২৩ বছর বয়সে যাদবপুর বিশ্ব বিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান হওয়ার বিরল সম্মান অর্জন করেছেন। যা সত্যিই খুব গর্বের বিষয়। 

এরপর তিনি ট্রিনিট্রিতে ফেলোশিপ অর্জন করায় চার বছরের জন্য নিজের পছন্দসই যে-কোনও বিষয় নিয়ে পড়াশুনোর সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। অমর্ত্য সেন যে বিষয় বেছেছিলেন সেটা হলো দর্শন। এই বিষয় পরে তাঁর গবেষণার কাজে অনেক সাহায্য করেছে এই দর্শন শাস্ত্র৷ অবশ্য প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় থেকেই দর্শনের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল৷ সেখানে নিয়মিত দর্শন চর্চা এবং বিতর্কে অংশগ্রহণ করতেন তিনি। তর্কে তুখোড় দক্ষতা ছিল তাঁর। আর এই দর্শন শাস্ত্র তাঁকে আরও নানা ভাবে তাঁর এই দুর্ভিক্ষ আর মানুষের ক্ষুধা নিয়ে কাজ করতে সাহায্য করে। 

অমর্ত্য সেন  এর জন্ম 3 নভেম্বর, 1933 সালে শান্তিনিকেতনে। তিনি হলেন একজন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ যিনি কল্যাণ অর্থনীতি এবং সামাজিক পছন্দ তত্ত্বে অবদানের জন্য এবং সমাজের দরিদ্রতম সদস্যদের সমস্যায় তাঁর আগ্রহের জন্য অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সেন দুর্ভিক্ষের কারণগুলির উপর তার কাজের জন্য সর্বাধিক পরিচিত, যা খাদ্যের বাস্তব বা অনুভূত ঘাটতির প্রভাব প্রতিরোধ বা সীমিত করার জন্য ব্যবহারিক সমাধান গুলির বিকাশের দিকে পরিচালিত করেছিল তাঁকে।

কল্যাণ অর্থনীতি সম্প্রদায়ের কল্যাণে তাদের প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক নীতিগুলি মূল্যায়ন করতে চায়। অমর্ত্য সেন, যিনি তার কর্মজীবনকে এই ধরনের বিষয়গুলিতে উৎসর্গ করেছিলেন, তাকে "তাঁর পেশার বিবেক" বলা হয়। তাঁর প্রভাবশালী মনোগ্রাফ কালেক্টিভ চয়েস অ্যান্ড সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার (1970)-যা ব্যক্তি অধিকার, সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসন এবং স্বতন্ত্র অবস্থার তথ্যের প্রাপ্যতার মতো সমস্যাগুলিকে সম্বোধন করে- গবেষকদের মৌলিক কল্যাণের বিষয়ে তাদের মনোযোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

তিনি দারিদ্র্য পরিমাপের একটা পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন যা দরিদ্রদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্য দরকারী তথ্য দেয়। উদাহরণস্বরূপ, অসমতার উপর তার তাত্ত্বিক কাজ একটি ব্যাখ্যা প্রদান করে যে কেন কিছু দরিদ্র দেশে পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা কম, যদিও পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি জন্মগ্রহণ করে এবং পুরুষদের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার বেশি। তিনি দাবি করেছেন যে এই তির্যক অনুপাতটি সেইসব দেশের ছেলেদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্য চিকিত্সা এবং শৈশবকালীন সুযোগের ফলে।

দুর্ভিক্ষের প্রতি তাঁর আগ্রহ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। একটি নয় বছর বয়সী বালক হিসাবে, তিনি 1943 সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি। যেখানে ত্রিশ লক্ষ লোক মারা গিয়েছিল। এই বিস্ময়কর জীবনহানি অপ্রয়োজনীয় ছিল বলেই তাঁর মনে হয়েছিল এক সময়ে।  তিনি বিশ্বাস করতেন যে সেই সময়ে ভারতে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ ছিল কিন্তু এর বন্টন বাধাগ্রস্ত হয়েছিল কারণ বিশেষ গোষ্ঠীর লোক - এই ক্ষেত্রে গ্রামীণ শ্রমিকরা - তাদের চাকরি হারিয়েছিল এবং তাই তাদের খাদ্য ক্রয়ের ক্ষমতা কমে গেছিলো।

 তার দারিদ্র্য এবং দুর্ভিক্ষ: এনটাইটেলমেন্ট অ্যান্ড ডিপ্রাইভেশন (1981) বইতে , তিনি প্রকাশ করেছেন যে দুর্ভিক্ষের অনেক ক্ষেত্রে খাদ্য সরবরাহ উল্লেখ যোগ্যভাবে হ্রাস পায়নি। পরিবর্তে, মজুরি হ্রাস, বেকারত্ব, ক্রমবর্ধমান খাদ্য মূল্য এবং দুর্বল খাদ্য-বন্টন ব্যবস্থার মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলির একটি সংখ্যা সমাজের নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে অনাহারের দিকে পরিচালিত করে। আর যে কারণে দেশে শুরু হয় দুর্ভিক্ষ।

খাদ্য সংকট পরিচালনাকারী সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি তাঁর এই কাজের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। তার মতামত নীতিনির্ধারকদের শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক দুর্ভোগ কমানোর জন্য নয় বরং দরিদ্রদের হারানো আয় প্রতিস্থাপনের উপায় খুঁজে বের করার জন্য-উদাহরণস্বরূপ, পাবলিক-কাজ প্রকল্পের মাধ্যমে-এবং খাদ্যের জন্য স্থিতিশীল মূল্য বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করেছিল।

রাজনৈতিক স্বাধীনতার একজন জোরালো রক্ষক, তিনি বিশ্বাস করতেন যে কার্যকর গণতন্ত্রে দুর্ভিক্ষ ঘটে না কারণ তাদের নেতাদের অবশ্যই নাগরিকদের দাবির প্রতি আরও প্রতিক্রিয়াশীল হতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য , তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, সামাজিক সংস্কার - যেমন শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতি - অবশ্যই অর্থনৈতিক সংস্কারের আগে হওয়া উচিত এটাই ছিল তাঁর অভিমত।

 
সহজ কথায়, দীর্ঘস্থায়ী অনুমান যে কোনো প্রদত্ত আয় বৃদ্ধির ফলে একজন দরিদ্র ব্যক্তি ধনী ব্যক্তির চেয়ে বেশি অতিরিক্ত সন্তুষ্টি অর্জন করবে। সামাজিক নীতির স্তরে, এর অর্থ হল ধনী থেকে দরিদ্রে সম্পদ পুনঃবণ্টনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু সেটা আজ হচ্ছে কোথায়। ধনী আরও ধনবান হচ্ছে। গরীব আরও দরিদ্র হচ্ছে। যেমন প্রগতিশীল আয়করের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির যোগফলকে বাড়ানো যায় না। 

অর্থনৈতিক নীতি বিচার করার জন্য তখন একটি নতুন এবং আরও সীমিত মাপকাঠি তৈরি করা হয়েছিল: একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে অন্যের চেয়ে উচ্চতর বিচার করা হয়েছিল শুধুমাত্র যদি অন্তত একজন ব্যক্তিকে অন্য কাউকে খারাপ না করে উন্নত করা হয়। বিকল্পভাবে, একটি অর্থনৈতিক অবস্থা পূর্ববর্তী একটি থেকে উচ্চতর বিচার করা যেতে পারে যদিও কিছু ভোক্তাদের খারাপ করা হয়েছিল যদি লাভকারীরা ক্ষতিপূরণ দিতে পারে এবং এখনও আগের চেয়ে ভাল হতে পারে। 

যাইহোক, বেশ কয়েকটি বিকল্পের মধ্যে বিচার করার কোন উপায় থাকবে না যার মধ্যে সবাই এই শর্তটি পূরণ করেছে। তাঁর এই দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন তত্ত্ব,জনকল্যাণ অর্থনীতি ও গণ দারিদ্রের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ বিষয়ে গবেষণা এবং উদারনৈতিক রাজনীতিতে অবদান সারা বিশ্ব মনে রাখবে। যিনি শুধু নোবেল পুরস্কার নয় তিনি ভারতরত্ন পান। কিন্তু তিনি বিশ্বনাগরিক হয়েও নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি তিনি। তাই মাঝে মাঝেই তিনি ছুটে আসেন তাঁর সেই প্রিয় শান্তিনিকেতনে, সেই প্রিয় তাঁর বাড়ী প্রতীচিতে। হয়তো সেই বাড়ির বারান্দায় বসে ভাবেন তিনি, লালমাটির এই রাস্তা ধরে দু চাকার সাইকেল নিয়ে যদি আবার বেরিয়ে পড়া যেতো গ্রাম দেখতে, গ্রামের মানুষদের জীবন বদলেছে কিনা দেখতে। 

চোদ্দ অক্টোবর ভোর বেলার সেই ফোন - অভিজিৎ বসু।

ছবি সৌজন্য ফেসবুক।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

ভোরের গন্ধ

ভেঙে ফেলা আস্ত একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চোখের আঙিনায়, কেমন দাঁত মুখ বের করে ছন্নছাড়া হয়ে, অতীতকে সযত্নে জড়িয়ে, আঁকড়ে। বাড়ির গাড়ি বারান্দার নিচে জমে থাকা সাইকেলের চাকায়, সুতো জড়িয়ে থাকার মতো কত মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, এই পুরোনো বাড়িতে। বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে সেই জীবনের সোঁদা গন্ধ, ঘাম এর দাগ এখনো লেগে আছে এদিক ওদিক। খুঁজলে হয়তো মিলবে আরও দু চার আনার স্মৃতির অকেজো সব তামাটে পরশ পাথর। আসলে মাটি উপড়ে,স্মৃতির উত্তাপ কে মুছে দিয়ে নতুন করে বিচিত্র সব রোজগারির, অপচেষ্টা আর কি। যে লাভের, লোভের, চেষ্টার গলায় লাগাম আর পরাবে কে। দুর থেকে জানলা দিয়ে দেখি শুকনো কলাপাতার ওই ম্রিয়মান নিষ্ফলা হাসি। বট ফলের আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা, যজ্ঞি ডুমুর গাছের পাতায় পিছলে পড়া স্মৃতির নরম উত্তাপ। যে উত্তাপে আজও জারিত হই আমি অনায়াসেই প্রতিদিন সকাল হলেই। ভোরের বেলায় পাখির ডাক শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ওদের মন কেমন করা কথা শুনতে পাই না আর। বোধহয় ওরাও বুঝে গেছে তাদের গলায় লাগাম পড়েছে এবার আচমকাই। তাই পথ ভুলে তারাও আসেনা আর কিছুতেই  এদিক পানে। পশ্চিমী হাওয়া ঠেল...

ইটিভির বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

কত দিন ধরেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি। সেই কেমন হাসিখুশি জীবন নিয়েও হাজারও বড়ো অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েও কত কুল থাকা যায় সেটা আমি বিশ্বজিৎদাকে দেখে শিখলাম আর কী। সেটা সেই জঙ্গলে মাওবাদী নেতাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হোক বা তাঁদের কোনোও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক। কিম্বা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট এর অফিসে গিয়ে বিমান বসুর সাথে একান্তে কথা বলা হোক। কিম্বা অনিল বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে কথা বলা হোক। কিম্বা সেই মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বন্যাদুর্গত এলাকা আরামবাগ মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাজির হয়েছেন। খুব সম্ভবত বিশ্বজিৎ দা হাজির আকাশ বাংলা চ্যানেল থেকে সেই সময়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কথা বলছেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একটু দূরে। রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। যাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কেউ যেতে না পারি। আমি উত্তেজিত কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে একদম নির্বিকার হাসিমুখ বিশ্বজিৎদার কথা ছাড় তো, আমাদের যেতে না দিলে আমরা কি করবো। প্রচার হবে না ওদেরই। একটু পরেই সেটা বুঝত...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...