সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রামমোহনের মামার বাড়ির পুজো

হুগলী জেলার শ্রীরামপুরের প্রায় পাঁচশ বছরের পুরোনো পুজো চাতরার দেশগুরু ভট্টাচার্য্য বাড়ির দুর্গাপুজো জেলার অন্যতম আকর্ষণ। দুরদুরান্ত থেকে অনেকেই এই বাড়ির পুজো দেখতে বহু লোক আসেন। এই বাড়ির পুজোকে কেন্দ্র করে রয়েছে নানা ইতিহাস। ইংরেজ শাসনকালের আগে থাকতেই এই বাড়ির যে বাড়িতে পুজো হতো তার স্থান পরিবর্তন করে বর্তমান বাড়িতে এই পুজো হয় প্রায় তিনশ বছর ধরে। সব প্রাচীন রীতিনীতি মেনে হয় মা দুর্গার আরাধনা।

উত্তর চব্বিশ পরগনার আমডাঙার আদাহাটায় জমিদারি ছিল শ্রীরামপুর চাতরার ভট্টাচার্যদের। গ্রামের সিংহভাগ প্রজা ছিল মুসলমান।তারাই পুজোর একটা বড় খরচ বহন করতেন। ঐতিহ্য ও পরম্পরা মেনেই প্রায় পাঁচশো বছরের বেশি সময় ধরে এখনো এই পূজো হয়ে আসছে। আলী,আফজল ও রাকিনেরা এখনো পুজোর ফল,মূল নিয়ে হাজির হন পঞ্চমীর দিন এই গুরুবাড়িতে। তারা সবাই হাজির হন ভারত পথিক রামমোহন রায়ের শ্রীরামপুরের মামারবাড়িতে। 

বর্তমানে যখন দেশে ও বিদেশে জাতি ও বিদ্বেষের আগুন জ্বলছে চারিদিকে। তখন এই ভট্টাচার্য বাড়ির এক চালার এই দুর্গা প্রতিমা ঠিক যেন বর্ণ, ধর্ম ও নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে একাত্ব ও ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক হয়ে জ্বল জ্বল করছে এই গুরু বাড়ির দুর্গা প্রতিমা। প্রতি বছর প্রতিমার বিসর্জন হলেও মূল কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়না। কেবল সংস্কার হয় মাত্র।


শ্রীরামপুর রেল লাইন লাগোয়া এই চাতরা দেশগুরু ভট্টাচার্যের বাড়ি। রামমোহন রায়ের বাবা রামকান্ত রায়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল পরিবারের কন্যা তারিণী দেবীর। ছেলেবেলায় মায়ের সঙ্গে শ্রীরামপুরের এই মাতুলালয়ে বেশ কয়েকবার এসেছেন রামমোহন রায়। সেই স্মৃতি এখনো রয়েছে ভট্টাচার্য বাড়ির আনাচে কানাচেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বাড়ির ঠাকুর দালানে রাখা বংশ তালিকা দেখলে সেই কথার উল্লেখ দেখা যায়। বাড়ির বংশধর শুভপ্রসাদ ভট্টাচার্য বলেন,আমার বাবা প্রয়াত পিনাকী প্রসাদ ভট্টাচার্য বাড়ির পরম্পরা মেনেই দুর্গা দালানে মায়ের পুজো করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে। বাবার অকাল প্রয়ানের পর আমরা সেই ধারা আজও বজায় রেখেছি। রথ যাত্রার দিন কাঠামো পুজো দিয়ে বাড়ির পুজো শুরু হয়।আমডাঙা থেকে মুসলিম প্রজারা পুজোর সামগ্রী নিয়ে হাজির হতেই পুজোর ষোলোকলা পূর্ণ হয়। 

অতীত কালে এই দেশগুরু ভট্টাচার্য্যদের বাড়ি হিন্দুদের টোল হিসেবে পরিচিত ছিল। এই বাড়িতেই দীক্ষা দেওয়া হতো।সেই জন্যে এই বাড়ির নাম হয় গুরু বাড়ী। তবে এখন আর দিন বদলে গেছে সেই টোল আর নেই। বন্ধ হয়ে গেছে টোল প্রথা। কিন্তু গুরু বাড়ির সদস্যরা আজও চালিয়ে আসছেন এই গুরু বাড়ির পূজো। হয়তো সময়ের সাথে অনেকটাই কমেছে পূজোর জৌলুস। কিন্তু এই গুরু বাড়ির পূজোর যে পরম্পরা সেটা আজও একভাবে রয়ে গেছে। এখনো পর্যন্ত দশমীর দিন এই শহরে সবার আগে গুরু বাড়ির পূজোর প্রতিমা গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়ার পর তারপর অন্যান্য ঠাকুর গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়। এই রীতি অনুযায়ী আজও এই ভাবেই বিসর্জন দেওয়া হয় গুরু বাড়ির ঠাকুর। 

আগে একসময় এই পূজো শুরু হয়ে যেতো মহালয় থেকেই কিন্তু বর্তমানে পূজো হয় ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত।  আজ হয়তো সেই গুরু বাড়ির টোল বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক ভক্তরা এই পূজোর সময়  ছুটে আসেন গুরু বাড়ির পূজো দেখতে। একসময় রেললাইনের ওপর প্রান্তে পূজো হলেও পরে এই পূজো বর্তমানে এই বাড়িতে চলে আসে। মাটির আসনে এই পূজো হয়। এই পুরোনো স্মৃতি আর নানা ইতিহাসকে সাক্ষী করে আজও শ্রীরামপুরের এই শতাব্দী প্রাচীন গুরুবাড়ির পূজো হয়ে আসছে। যে পূজোর ইতিহাসে জড়িয়ে আছে ভারত পথিক রামমোহন রায়ের নাম।

 তবে এই শ্রীরামপুর এর শহরের বাসিন্দাদের আক্ষেপ একটাই যে এই শহরে যদি একটা রামমোহন রায় এর মুর্তি বসত সেটা বেশ ভালো লাগতো তাদের। শহরের প্রবীণ এক নাগরিক প্রসন্ন কোলে জানান, যে শহরে রাজা রামমোহন রায়ের মামারবাড়ী। যে শহরে ছোটবেলায় তিনি এসেছিলেন।সেই শহরে একটা তাঁর মুর্তি স্থাপন করা গেলে খুব ভালো হতো। এই বিষয়ে তিনি শ্রীরামপুর পৌরসভার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বলে জানান। তাঁর মতে এমন একটা উদ্যোগ গ্রহণ করলে বেশ ভালো লাগতো শহরের বাসিন্দা হিসেবে। যাই হোক নানা পূজোর ভীড়ে আজও শহরের এক প্রান্তে নিরিবিলিতে দাঁড়িয়ে আছে গুরুবাড়ি পুরোনো দিনের ইতিহাসকে বুকে আগলে। আর সেই বাড়ির পুজো হয়ে আসছে বংশ পরম্পরায়।

এত গেলো গুরু বাড়ির পূজোর ইতিহাস গল্প আর নানা কাহিনী। কিন্তু আমার ছোটবেলা তো কেটেছে এই গুরুবাড়ির আশপাশেই বাস করে। গুরু বাড়ীর ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে আমার সেই পাঁচ নম্বর এঁদো পুকুরের সেই মামার বাড়ি। যে বাড়িতেই কেটেছে আমার শৈশব। সেই ছোটবেলার নানা ঘটনার স্মৃতি অনেকটাই ফিকে আজ। তবু সেই পাঁচিল ঘেরা ঝোপ জঙ্গলে ভরা পালদের বাগান, সেই রেল লাইনের পাশে বসে বসে একে ট্রেন গোনা, সেই রাস্তার পাশে ভজাদের বাড়ির গায়ে দিনুদার মিষ্টির দোকান থেকে গরম রসগোল্লা আর গরম বোদে এনে  রুটি খাওয়া, সেই বিরাট এঁদো পুকুরের কালো জল কচুরিপানা ভর্তি, সেই জলে ইট ছুঁড়ে পানকৌড়ি তাড়ানো আর এসবের মাঝেই যে ওই রেল লাইনের ধারে সেই রং চটা ইঁটের ওই বাড়ির দেওয়ালে যে এত ইতিহাস জড়িয়ে আছে সেটা বোঝার বয়স হয়নি তখন আমার একদম।
 
শুধু এটা জানতাম এই সাদা ঠাকুর দালান আর বাড়িটা অন্য সব বাড়ির থেকে একটু আলাদা ধরনের। তাই আজও মনে পড়ে আমার এই সাদা বাড়ির সামনে উঠোনে মাকে লুকিয়ে লুকিয়ে গুরু পূর্ণিমার দিন সিন্নি প্রসাদ পেতে লাইন দিতাম অন্য সব বাচ্চাদের সঙ্গে। হাফ প্যান্ট আর খালি গায়ে। শাল পাতায় প্রসাদ সিন্নি আর একটা করে লাল বাতাসা পাওয়ার আশায় যেতাম সবার সঙ্গে আমিও। হাতে প্রসাদ নিয়ে এক দৌড়ে মামাবাড়ির কাছে সেই রাস্তার ধারে চলে আসা। লুকিয়ে লুকিয়ে প্রসাদ খেয়ে কলে পেট ভরে জল খেয়ে খেলার মাঠে চলে যাওয়া বল খেলতে সেই  রাজবাড়ীর মাঠ বা অন্য কোনো মাঠে। সেই অচেনা গুরুবাড়ীতে প্রবেশ আমার সেই ছোট বেলায়। আর পূজোর সময় মার হাত ধরে সেই গুরুবাড়ীর চৌকাঠ পেরিয়ে ঠাকুর দেখতে গিয়ে অনেকক্ষণ সবার মার ভক্তিভরে প্রনাম করা দেখে কেমন যেনো অধৈর্য্য হয়ে পড়তাম আমি। বুঝতাম না আমি এত বেশি ভক্তি আর শ্রদ্ধা কেনো এই বাড়ির পূজোর জন্য রাখা আছে কে জানে। সবাই বলতেন গম্ভীর মুখে এটা গুরুবাড়ির পূজো।

 ধীরে ছোটো বেলা কেটে গেলো আমার। বড়ো হলাম গুরু বাড়ির পূজোর স্মৃতি রয়ে গেলো একভাবেই আমার কাছে। আজ আর সেই মামার বাড়ি পাঁচ নম্বর এঁদোপুকুরের বাড়ী থেকেও আর সেই বাড়িতে যাবার অধিকার নেই কোনো ভাবেই। তবে গুরুবাড়ী মানেই তো আমাদের সেই গুণ্ডাদা। সেই পিনাকী ভট্টাচার্য । যাকে একসময় বেশ ভয় পেতাম সমীহ করতাম আমি। পরে সেই আমি সাংবাদিক হবার পর গুণ্ডাদা আমায় ভাগনা বলেই ডাকতো বরাবর। এই তো রিপোর্টার কি খবর সব। পূজোর সময় ফোন করে বলতাম যাবো ঠাকুর এর ছবি তুলতে সকাল থেকে বসে থাকতেন গুণ্ডাদা ঠাকুর দালানে সেদিনের খবরের কাগজ নিয়ে। সেই পরিচিত সাদা ধুতি আর ফতুয়া পড়ে। তারপর ছবি তুলে চলে আসার পর কবে টিভিতে দেখাবে সেটা নিয়ে বেশ অনেক বার ফোন করে জানতেন তিনি আমাদের কাছে। এতে আমি বা অন্য কোনো রিপোর্টার কেউ মনে হয় না যে কেউ বিরক্ত হতেন না। কবে কোন কাগজে লেখা হয়েছে তাঁর গুরুবাড়ীর পূজোর ইতিহাস সেটা তাঁর সব মুখস্থ থাকতো। আমি যখন প্রতিদিন পত্রিকায় কাজ করি যেদিন সেই পত্রিকায় লেখা বের হলো খুব খুশি হলেন তিনি। আমায় বললেন হ্যাঁ রে বেশ বড় করে বেরিয়েছে গুরু বাড়ীর পূজোর লেখা। এই বাড়ী নিয়ে তাঁর একটা গর্ব ছিল বরাবর। রামমোহন রায়ের মামারবাড়ী বলে কথা।

 কংগ্রেস এর রাজনীতি করা সেই প্রিয়রঞ্জন 
দাসমুন্সীর ঘরানার লোক ছিলেন তিনি। বরাবর কংগ্রেস করে এসেছিলেন। পরে তৃণমূল কংগ্রেস দলে যোগ দিয়ে কাউন্সিলর হন তিনি। সেই সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন গুণ্ডাদা এদিক ওদিক মোটর সাইকেল করে। আমার ফ্ল্যাট বাড়ির পাশের পার্টি অফিসে রাস্তার ধারে বসে আছেন হাসি মুখে। রাস্তা দিয়ে যেতে দেখলেই বলতেন ওই যে রিপোর্টার আসছে অনেক খবর নিয়ে। রাজনীতির খবরের সব বিষয় সমূহ সব একদম তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে ধরা দিত। শ্রীরামপুর এর সিল্ক শিল্পের কাজের যে কারখানা আছে তাঁর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন তিনি বহুদিন। 

আজ এই পূজোর মরশুমে দিন কয়েক আগেই সেই গুরুবাড়ীর দরজা পেরিয়ে, সেই চেনা গলাপোল পার হয়ে লাহিড়ী পাড়ায় যাচ্ছিলাম আমি একা একা। সেই জোড়া শিব মন্দির, সেই বেলগাছ পার করে সন্ধ্যার পর। ছোটো বেলায় কত যে এই বেল গাছে ব্রহ্মদৈত্যের গল্প শুনে ভয় পেতাম তার কোনো হিসেব নেই। আসলে সেই ছোটোবেলার পথ ঘাট প্রান্তর তো আর নেই। তবু রয়ে গেছে সেই নেড়া বেলগাছ, রয়ে গেছে পুরোনো শিব মন্দির, রয়ে গেছে গুরু বাড়ীর পূজো। শুধু নেই আমাদের সেই গুণ্ডা দা। পিনাকী ভট্টাচার্য দা। যাকে বিপদে পড়লে যখন যে কোনো সময় ফোন করে বলতাম দাদা এই কাজটা আপনার সইটা একটু করে দেবেন গরীব মানুষ খুব দরকার ওর। সেই সবজি বিক্রি করা পল্টুকে পাঠিয়ে যে কত উপকার করে দিয়েছেন কাজ করে দিয়েছেন ওর তার ঠিক নেই। আসলে পুরোনো কংগ্রেসী ঘরানার মানুষ যে। এই হাল আমলের তৃণমূল নেতাদের মত নয় আর কি। 

আজ এই গুরু বাড়ীর কথা লিখতে বসে তাই সেই গুণ্ডাদার মুখ, কথা, হাসির কথা মনে পড়ে গেলো আমার। রাজনীতির ময়দানে সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া একজন মানুষ হয়তো রাজনীতির জীবনে আরো বেশি কিছু লাভ করতে পারতেন। আরও উঁচুতে উঠে অবস্থিত হয়ে আরও বড় কিছু হতে পারতেন নিজের রাজনৈতিক জীবনে যেটা তাঁর হওয়া প্রাপ্য ছিল। সেটা হয়তো পারেননি তিনি, পাননি সেটা কোনোদিন। তবু গুণ্ডা দা আজও আমাদের হৃদয় জুড়ে আছেন। তবে গুরুবাড়ীর কথা মনে পড়লে। লিখতে বসলেই মনে হবে গুণ্ডাদার কথা। যাকে আমরা করোনার সময়ে হারলাম আজও সন্ধ্যায় ওই রাস্তা দিয়ে গেলে মনে হয় ওই বুঝি লাল মেঝেতে ঠাকুর দালানে হাসি মুখে বসে আছেন আমাদের সবার সেই প্রিয় গুণ্ডাদা। যে আর পূজো এলে কোনোদিন ফোন করে জিজ্ঞাসা করবে না কবে আমাদের গুরুবাড়ীর পূজো দেখানো হবে রে, কবে তোর কাগজে এই বাড়ির পূজোর লেখা বের হবে জানাস আমায়। সত্যিই আজ বড়ো মিস করি আমি এই পূজোর মরশুমে গুণ্ডাদাকে। খুব মিস করি। 

রামমোহনের মামার বাড়ির পুজো 
অভিজিৎ বসু, শ্রীরামপুর, হুগলী।
তেসরা অক্টোবর দু হাজার চব্বিশ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

ভোরের গন্ধ

ভেঙে ফেলা আস্ত একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চোখের আঙিনায়, কেমন দাঁত মুখ বের করে ছন্নছাড়া হয়ে, অতীতকে সযত্নে জড়িয়ে, আঁকড়ে। বাড়ির গাড়ি বারান্দার নিচে জমে থাকা সাইকেলের চাকায়, সুতো জড়িয়ে থাকার মতো কত মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, এই পুরোনো বাড়িতে। বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে সেই জীবনের সোঁদা গন্ধ, ঘাম এর দাগ এখনো লেগে আছে এদিক ওদিক। খুঁজলে হয়তো মিলবে আরও দু চার আনার স্মৃতির অকেজো সব তামাটে পরশ পাথর। আসলে মাটি উপড়ে,স্মৃতির উত্তাপ কে মুছে দিয়ে নতুন করে বিচিত্র সব রোজগারির, অপচেষ্টা আর কি। যে লাভের, লোভের, চেষ্টার গলায় লাগাম আর পরাবে কে। দুর থেকে জানলা দিয়ে দেখি শুকনো কলাপাতার ওই ম্রিয়মান নিষ্ফলা হাসি। বট ফলের আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা, যজ্ঞি ডুমুর গাছের পাতায় পিছলে পড়া স্মৃতির নরম উত্তাপ। যে উত্তাপে আজও জারিত হই আমি অনায়াসেই প্রতিদিন সকাল হলেই। ভোরের বেলায় পাখির ডাক শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ওদের মন কেমন করা কথা শুনতে পাই না আর। বোধহয় ওরাও বুঝে গেছে তাদের গলায় লাগাম পড়েছে এবার আচমকাই। তাই পথ ভুলে তারাও আসেনা আর কিছুতেই  এদিক পানে। পশ্চিমী হাওয়া ঠেল...

ইটিভির বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

কত দিন ধরেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি। সেই কেমন হাসিখুশি জীবন নিয়েও হাজারও বড়ো অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েও কত কুল থাকা যায় সেটা আমি বিশ্বজিৎদাকে দেখে শিখলাম আর কী। সেটা সেই জঙ্গলে মাওবাদী নেতাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হোক বা তাঁদের কোনোও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক। কিম্বা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট এর অফিসে গিয়ে বিমান বসুর সাথে একান্তে কথা বলা হোক। কিম্বা অনিল বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে কথা বলা হোক। কিম্বা সেই মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বন্যাদুর্গত এলাকা আরামবাগ মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাজির হয়েছেন। খুব সম্ভবত বিশ্বজিৎ দা হাজির আকাশ বাংলা চ্যানেল থেকে সেই সময়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কথা বলছেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একটু দূরে। রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। যাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কেউ যেতে না পারি। আমি উত্তেজিত কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে একদম নির্বিকার হাসিমুখ বিশ্বজিৎদার কথা ছাড় তো, আমাদের যেতে না দিলে আমরা কি করবো। প্রচার হবে না ওদেরই। একটু পরেই সেটা বুঝত...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...