সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একটি স্বপ্ন দেখা মানুষের মৃত্যু

খবরটা পেলাম একটু আগে মাঝরাতেই। একটা প্রেস রিলিজ লেটার মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজে এসে পড়েছিল অনেকক্ষণ আগেই। আমি দেখলাম ফেসবুকের দেওয়ালে তখনও পূজোর ভীড় উপচে পড়েছে চারিদিকে। হঠাৎ তার মাঝেই একটা দুটো করে আলোর উৎসব তার আলো ছেড়ে অন্ধকার করা একটি দুঃসংবাদ ভেসে এলো আমার কাছে ফেসবুকের উজ্জ্বল দেওয়ালে। হ্যাঁ, দেশের শিল্প জগতে আজ এক কালো দিন, অন্ধকার এর দিন। সেই রতন টাটা আজ আর নেই। সাদা জীবনের কালো কথায় আজ একটি স্বপ্ন দেখা মানুষের কথা। যে মানুষটির স্বপ্ন পূরণ হয়নি শুধু মাত্র রাজনীতির জন্য।

সেই যিনি বহুদিন আগে একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। যে স্বপ্নের কথা বোধহয় গল্প করতে করতে চা খেতে খেতে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে বলেছিলেন তিনি। যে সিঙ্গুরে টাটা কোম্পানি কারখানা করবে একটা ছোটো ন্যানো গাড়ির। যে গাড়ি হবে মধ্যবিত্তের একটা স্বপ্নের গাড়ি। কারণ টাটার এই ছোটো গাড়ি মিলবে মাত্র এক লাখ টাকায়। সত্যিই তো লাখ টাকায় গাড়ি, সেই গাড়ির কারখানা হবে আমার নিজের জেলা হুগলীর সিঙ্গুরে তৈরি হবে এই গাড়ির কারখানা। খবরটা শুনে বেশ ভালো লেগেছিল আমার।

 
শিল্পাঞ্চল হুগলী জেলার দিকে দিকে নানা কারখানার গেট বন্ধ। কারখানার ভিতর ঘন বন জঙ্গল আর সাপেদের বসবাস। কারখানার চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায় না কোনোদিনই। আর তার মাঝে মাঝে কারখানার গেটে লাল পার্টির ঝান্ডা আর সবুজ পার্টির ঝান্ডা দেখা যায়। ইউনিয়ন অফিসগুলো সব ভেঙে পড়ছে চারিদিকে। কিন্তু নেতাদের দেখা মেলেনা যে আর সেই দলীয় কার্যালয়ে। এই হলো শিল্প মানচিত্রে এক সময়ের উজ্জ্বল আজকের সেই ক্ষয়িষ্ণু এই হুগলী জেলার চিত্র।আর এর মাঝেই খবর এলো যে এই জেলায় গাড়ি কারখানা তৈরি করতে চান দেশের অন্যতম শিল্পপতি রতন টাটা। যে কারখানা হলে সারা দেশের কাছে উদাহরণ হয়ে যাবে লাখ টাকার গাড়ি তৈরির কারখানা হলো আমার নিজের হুগলী জেলায়। 

বিশ্বাস করুন হুগলী জেলার বাসিন্দা হিসেবে সত্যিই মনটা বেশ ভরে গেলো আমার। ভালো হয়ে গেলো আমার মন জেলার বাসিন্দা হিসেবে। টাটার কারখানার জন্য জমি দেখা হলো। সেই প্রথম দিন টাটার কর্তা রবিকান্ত এলেন জমি দর্শন করতে সিঙ্গুরের বাজেমেলিয়া গ্রামে। কিন্তু প্রথম দিনেই সেই সিঙ্গুরের বাজেমেলিয়াতে মাটিতে শুয়ে পড়ে মহিলারা টাটার লোকদের মনে ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো যাতে একটা প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ তৈরি করা যায় প্রথম থেকেই। বলা যায় যে কোনোভাবেই তারা এই তিন চার ফসলি জমি ছাড়বে না। নশো সাতানব্বই একর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে শুরু হলো জোর রাজনৈতিক লড়াই আর তরজা দুপক্ষের মধ্যে। সরকার আর বিরোধী পক্ষ।

সিঙ্গুরে তৈরি হলো জমিদাতা ইচ্ছুক চাষী আর জমি না দেওয়া অনিচ্ছুক চাষীর দুটো দল। একপক্ষে দাঁড়িয়ে পড়লেন সেই সময়ের বিরোধী নেত্রী অগ্নিকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি যে কোনো বিষয়ে রাজ্য সরকারের বিরোধিতা করে তাঁর নিজের টিআরপি পাওয়া আর রাজ্যের ক্ষমতা দখল করা যার রাজনৈতিক জীবনের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য সেই কবে থেকে। অন্যদিকে লাল পার্টির সিপিএম দল যে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করতে করতে গায়ে গতরে মোটা হয়ে গেছে যারা এই দীর্ঘ তিন দশক ক্ষমতায় থেকে। 

আর সেই কারণে তাদের সেই দলের প্রবল জোর আর আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়ে গেছে সেই লাল পার্টির মনের মধ্যে। আর তাই স্থানীয় কৃষক সভার কোনো গোপন রিপোর্ট না দেখেই এই তিন ফসলি জমির সবুজ মাঠে কারখানা তৈরির উদ্যোগ নিলেন বামেদের সেই সময়ের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কেমন নিজের মেজাজ আর মর্জিতে। আর স্থানীয় সিপিএমের নেতারা বললেন কোনো অসুবিধা নেই আমরা সব সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে আছি তো। সেই বিখ্যাত দাপুটে নেতা সুহৃদ দত্ত। যিনি বোধহয় ভেবেছিলেন এই তাঁর নিজের দাপটেই কারখানার জমি তাঁরা জোর করে নিয়ে নিতে পারবেন চাষীদের থেকে কোনো ওজর আপত্তি ছাড়াই। 

আর সেটা বোধহয় কিছুটা ভরসা করেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য স্থানীয় প্রশাসনের কথায় ও নেতাদের কথায় যে জমি তারা পেয়ে যাবেন বেশ অনায়াসেই। কারণ ইচ্ছুক চাষীর সংখ্যা যে বেশি অনিচ্ছুক চাষীদের থেকে। আর তাদের সাথে আছে পুলিশ এর দল। সেই সব দাপুটে নেতাদের ভরসা দেখে বোধহয় সেই স্বপ্ন দেখা মানুষটাও সেই রতন টাটাও ভেবেছিলেন তাহলে হয়তো সত্যিই তার একলাখি ন্যানো প্রকল্প সফল হবেই এইবার এই সিঙ্গুরের জমিতে। এই রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গে তিনি কারখানা গড়তে পারবেন অনেক কষ্টে যে স্বপ্ন তাঁর অনেক দিনের। সেই আশা পূরণ হবে তাঁর নিশ্চয়ই। 

কিন্তু বিধি যে বাম তাঁর এক্ষেত্রে। সব হিসেব নিকেষ উল্টে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর জোরদার আন্দোলন, অনশন কর্মসূচি, ধর্মঘট, রাস্তা আটকে জাতীয় সড়কের ওপর রাস্তার ওপর বসে পড়ে জোর করে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে সব মানুষকে কেমন এককাট্টা করে ফেললেন তিনি কেমন খুব সহজেই। তিনি শুধু এটা বুঝিয়ে দিতে সমর্থ হলেন সবাইকেই যে জোর করে ভিটে মাটি মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে এই লালপার্টির সরকার। শুধু সিঙ্গুরেই নয়, নন্দীগ্রামেও একই কায়দায় জোর করে জমি নেবার নোটিশ পড়লো। ব্যাস গোটা রাজ্য জুড়ে হুলুস্থুল। গরীব পার্টির সরকার জোর করে জমি নিয়ে নিচ্ছে। গরীবের জমি নিয়ে নিচ্ছে। আর তাতেই তৃণমূল বুঝিয়ে দিলো যে এটা ঠিক কাজ করছে না সরকার। আর তাতেই তাদের বাজিমাত হলো কেমন সহজেই। আর সেই নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়ে গেলো বোধহয় সেইদিন। 

অনেক চেষ্টা হলো, অনেক দু পক্ষের বাদানুবাদ হলো, লাঠি চার্জ হলো, মাথা ফাটল, তাপসী মালিকের মৃত্যু হলো, সিঙ্গুরের জমিতে সিবিআই এর পা পড়লো, সেই টাটার কুশপুতুল দাহ করার জন্য আজকের মন্ত্রী বেচারাম মান্না চাষীদের নিয়ে রতন টাটার সাদা কাপড় জড়ানো মুর্তি তৈরি করলো। তারপর সেই মুর্তি কাঁধে করে নিয়ে প্রতীকী ভাবে ঘোরানো হলো। তারপর সেই মুর্তি পোড়ানো হলো ঘেরা জমির বাইরে। আজকের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর সামনে। 

সেদিন আমি আর বিতনু চট্টোপাধ্যায় এবিপি আনন্দ চ্যানেলের বিখ্যাত সাংবাদিক সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলাম সিঙ্গুরের মাঠের ধারে পড়ন্ত এক বিকেল বেলায়। সেই সাদা কম দামের সুতির শাড়ি আর পায়ে সাদা সস্তার চটি পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বসে আছেন সিঙ্গুরে জমির আলের ওপরে সবুজ ঘাসের ওপর। কেমন চোখে মুখে একটা তৃপ্তির মিষ্টি হাসি। আর সেই ভারতরত্ন দেশের গর্ব রতন টাটার দেহকে প্রতীকী ভাবে শব সাজিয়ে ঘোরানো হচ্ছে জমির চারপাশে সিঙ্গুরের টাটা কারখানার মাঠের ধারে এদিক থেকে ওদিক। যাতে তিনি কোনোভাবেই সিঙ্গুরে কারখানা গড়তে না পারেন তার জন্যে এই প্রতীকী অন্দোলন কুশপুতুল জ্বালিয়ে। আর চাষীদের স্লোগান টাটা তুমি দুর হঠো।সিঙ্গুর থেকে দুর হঠো।

যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই সিঙ্গুর কৃষিজমি রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক আজকের রাজনীতির হুগলীর সেই সোনার ছেলে আমার এক সময়ের পরিচিত বেচারাম মান্না। দিদির খুব প্রিয় বেচা। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই সেই গোটা ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে বসে আছেন মাটির গন্ধ মেখে মাটির আল এর সবুজ ঘাস এর ওপর একা একা। পড়ন্ত বিকেলে রোদের লাল আলো তাঁর মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। আর তিনি উপভোগ করছেন সেই টাটার কুশপুতুল দাহ করার এই দৃশ্য।  এই জোরদার আন্দোলনকে উপভোগ করছেন তিনি।

আজ সেই মানুষটা সত্যিই আর নেই। কুশপুতুল নয়। কাপড়ে মোড়া টাটার কুশপুতুল নয়। আজ সেই সারা দেশের গর্ব,ভারতরত্ন পাওয়া সেই ছোট্টো স্বপ্ন দেখা মানুষটাই আজ আর নেই‌ যে। টাটা গ্রুপের তরফে সেই কথা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বদলে গেলো রাজনীতির পাশা খেলা। এই পূজোর সময় একদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর আন্দোলন এর সময় রতন টাটা সিঙ্গুর ছেড়ে চলে যাবার কথা ঘোষণা করেছিলেন নিজেই। বলেছিলেন আমি আর সিঙ্গুরে কারখানা করবো না। 

কারণ তখন টাটা কারখানায় কাজ করতে আসা কর্মীদের তৃণমুল এর আন্দোলনকারীরা আক্রমণ করছে। তাদের ভয় দেখিয়ে কাজে আসতে বাধা দিচ্ছে জেলার বিভিন্ন জায়গায়। পুলিশকে বলেও পাহারা দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। ধীরে ধীরেই বন্ধ হয়ে গেলো সিঙ্গুরে কারখানার কাজ। কারণ ভয় পেয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হয় তাদের কর্মীদের। যাঁদের সেই সময় নানা এলাকা থেকে বৈদ্যবাটী থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।আর এই ভয় দেখানোর যিনি নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন সেই এক হুগলী জেলার এক পৌরসভার বর্তমান চেয়ারম্যান। সেকথা আজও স্বীকার করেন তিনি সেকথা। দল যদিও তাঁকে দলের সুখের সময় খুব বেশি তাঁকে দেখেনি, সেই সময়ের আন্দোলন করা সেই পুরোনো ডাকাবুকো নেতাকে। কিন্তু তারজন্য তাঁর কোনো আফশোষ নেই যে আজও। সেটাও সেই নেতা বলেন আমায়। যে নেতা আমায় বেশ ভালোবাসেন আজও। জেলায় একমাত্র নেতা যে কেউ খুব বিপদে পড়েছে এমন খবর পেলেই তিনি তাঁর সাহায্যের দুহাত বাড়িয়ে দেন। সে কারুর চিকিৎসা হোক বা পড়াশোনা হোক। 
সেই একবুক ভর্তি স্বপ্ন দেখা মানুষটি ফিরে গেলেন বিফল মনোরথ হয়ে রাজ্য ছেড়ে সিঙ্গুর ছেড়ে একা একাই গোপনে। আর তাঁর সাথে সিঙ্গুরের হাজার হাজার ছেলে মেয়ে যারা নানা ভাবে ছোটো, বড়ো, মেজো, সেজো নানা ধরনের নানা মাপের স্বপ্ন দেখেছিল একদিন। সেই একটা কাজ পাবার স্বপ্ন দেখেছিল।কাজ পেলে ঘরে ভাত খেতে পাবে তার বৃদ্ধ বাবা মা এই স্বপ্ন দেখেছিল যাঁরা। তারাও যে সব কেমন যেন নির্বাক হয়ে গেলো। আজ রাতের এই ছোট্ট এক প্রেস রিলিজ দেওয়া শোক বার্তায়। রতন টাটা আর নেই। 

 সিঙ্গুরের সেই মাঠের ঘেরা জমির ভেতর কেমন এই রাতের অন্ধকারে শ্মশানের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে আজ চারিদিকে। শুধু একটাই কথা আজ সেই সিঙ্গুরের ইচ্ছুক আর অনিচ্ছুক চাষীরা বলছে, যে টাটার কুশপুতুল পুড়িয়ে মৃত্যু কামনা করেছিল একদিন তারা সবাই সেই আজ থেকে আঠারো বছর আগে। আজ সেই স্বপ্ন দেখা রতন টাটা সত্যিই আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন দূরে অনেক দূরে। আকাশের তারা হয়ে চলে গেলেন তিনি। সেই স্বপ্নকে বুকে জড়িয়ে। 

একটি স্বপ্ন দেখা মানুষের মৃত্যু - অভিজিৎ বসু।
দশ অক্টোবর, দু হাজার চব্বিশ।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

ভোরের গন্ধ

ভেঙে ফেলা আস্ত একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চোখের আঙিনায়, কেমন দাঁত মুখ বের করে ছন্নছাড়া হয়ে, অতীতকে সযত্নে জড়িয়ে, আঁকড়ে। বাড়ির গাড়ি বারান্দার নিচে জমে থাকা সাইকেলের চাকায়, সুতো জড়িয়ে থাকার মতো কত মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, এই পুরোনো বাড়িতে। বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে সেই জীবনের সোঁদা গন্ধ, ঘাম এর দাগ এখনো লেগে আছে এদিক ওদিক। খুঁজলে হয়তো মিলবে আরও দু চার আনার স্মৃতির অকেজো সব তামাটে পরশ পাথর। আসলে মাটি উপড়ে,স্মৃতির উত্তাপ কে মুছে দিয়ে নতুন করে বিচিত্র সব রোজগারির, অপচেষ্টা আর কি। যে লাভের, লোভের, চেষ্টার গলায় লাগাম আর পরাবে কে। দুর থেকে জানলা দিয়ে দেখি শুকনো কলাপাতার ওই ম্রিয়মান নিষ্ফলা হাসি। বট ফলের আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা, যজ্ঞি ডুমুর গাছের পাতায় পিছলে পড়া স্মৃতির নরম উত্তাপ। যে উত্তাপে আজও জারিত হই আমি অনায়াসেই প্রতিদিন সকাল হলেই। ভোরের বেলায় পাখির ডাক শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ওদের মন কেমন করা কথা শুনতে পাই না আর। বোধহয় ওরাও বুঝে গেছে তাদের গলায় লাগাম পড়েছে এবার আচমকাই। তাই পথ ভুলে তারাও আসেনা আর কিছুতেই  এদিক পানে। পশ্চিমী হাওয়া ঠেল...

ইটিভির বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

কত দিন ধরেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি। সেই কেমন হাসিখুশি জীবন নিয়েও হাজারও বড়ো অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েও কত কুল থাকা যায় সেটা আমি বিশ্বজিৎদাকে দেখে শিখলাম আর কী। সেটা সেই জঙ্গলে মাওবাদী নেতাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হোক বা তাঁদের কোনোও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক। কিম্বা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট এর অফিসে গিয়ে বিমান বসুর সাথে একান্তে কথা বলা হোক। কিম্বা অনিল বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে কথা বলা হোক। কিম্বা সেই মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বন্যাদুর্গত এলাকা আরামবাগ মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাজির হয়েছেন। খুব সম্ভবত বিশ্বজিৎ দা হাজির আকাশ বাংলা চ্যানেল থেকে সেই সময়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কথা বলছেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একটু দূরে। রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। যাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কেউ যেতে না পারি। আমি উত্তেজিত কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে একদম নির্বিকার হাসিমুখ বিশ্বজিৎদার কথা ছাড় তো, আমাদের যেতে না দিলে আমরা কি করবো। প্রচার হবে না ওদেরই। একটু পরেই সেটা বুঝত...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...