সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তিন চাকার টোটো

এই তিন চাকার টোটো নিয়ে আমার দুর্বলতা অনেক দিনের। খোলা মেলা এই যানটি বেশ পরিবেশ বান্ধব। সব দিক থেকেই এই গাড়ি চড়তে বেশ ভালো লাগে আমার। টোটোতে বসে নিজেকে কেমন যেন পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়া রাজামশাই মনে হয় আমায় নিজেকে।

পকেট গড়ের মাঠ হলেও নিজের ভিতরে যে 
বাবুয়ানি ভাব, সেটা কেমন করে যেন ফুরফুরে মেজাজে ঠাণ্ডা হাওয়া লেগে বেরিয়ে পড়ে আচমকাই। ফুর ফুর করে তারা উড়ে যায় যেনো ডানা মেলে এদিক ওদিক ঠিক লাল নীল প্রজাপতির মতো। সত্যিই আমি খুব উপভোগ করি টোটো করে ঘুরে বেড়ানোকে। যার অন্য কোনো কারণ আছে কি না জানিনা আমি। যাই হোক ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত রচনা করা আমার উচিৎ নয়।

যে কোন জায়গায় এখন পা টানা রিকশ চালকদের পেছনে ফেলে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে টোটো রাস্তা ঘাটে সর্বত্র। পাড়ার দাদাদের কল্যাণে তারা এখন মিষ্টি বাহন শহরে আর গ্রামে। সত্যিই বলতে কি অনেকে এই যানকে পছন্দ করলেও কেনো যে টোটো চালক এর কাজ কে পছন্দ করে না, নাক সিঁটকোয় কে জানে। অনেককেই আমি বলতে শুনেছি ও বাবা টো টো চালায় ও, এতে নাক সিটকানোর কি আছে কে জানে। কাজ করে তো টাকা রোজগার করে ওরা। খারাপ উপায়ে তো টাকা আয় করছে না ওরা। তাহলে ওদের নিয়ে এত হাসাহাসির কি আছে কে জানে।

 এই তো আমি নিজেই, কিছুদিন আগেও বেশ একটা ভালো সর্বভারতীয় মিডিয়াতে কাজ করতাম। আমার আশপাশে সব দাপুটে সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের ভীড় দেখতে পেতাম সব সময়। সব স্বপ্নের মত বিরাজ করতেন তাঁরা আমার চোখের সামনে এদিক ওদিক। যেমন তাঁদের দাপট, তেমন তাঁদের রূপ। সেই রূপের ছটায় মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্হা।

 এদের কোনোদিন নিজের চোখে দেখতে পাবো তা স্বপ্নেও ভাবিনি আমি। ওদের দেখে আমি তো অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি শুধু। যেনো এঁদের কোনো দিন এইভাবে দেখতে পাবো ভাবিনি আমি। একদম গা ছম ছম করা পরিবেশে কাজ করতাম। খালি মনে হতো এই বোধহয় সবার সামনে ভুল ধরে অপদস্থ হতে হবে আমায়। আচমকা একদিন আমার মনে হলো, না এই কাজটা আর করা যাবে না। যেমন ভাবা আর তেমন কাজ। আগু পিছু না ভেবে দুম করে ছেড়ে দিলাম সংবাদ মাধ্যমের চাকরিটা। 

কত কাঠ খড় পুড়িয়ে এই কাজ জোগাড় করতে হয়েছিল আমায় একদিন। যদিও এই কাজটি আমায় ডেকে দেন কলকাতার একজন বিখ্যাত সাংবাদিক সেই অনির্বাণ চৌধুরী। তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো সারাজীবন। এই সুযোগ করে দেবার জন্য। না হলে কি আর দাপটের এমন হরেক। কিসিমের রূপ দেখতে পেতাম কোনোদিন আমি। ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের দাপট দেখার সৌভাগ্য হলো আমার এই জীবনে। 

কত পুরুষের দাপট আর নারীর দাপট, বসের দাপট, প্রোডিউসার এর দাপট, ডেস্ক এর কলম পেশা ছাপোষা সহকর্মীর দাপট, ক্যামেরা চালানো ক্যামেরাম্যান এর দাপট, সেই ইনপুট আর আউটপুট হেড এর দাপট, সেই বিখ্যাত পুরুষ এক অ্যাঙ্কর এর দাপট যে আমায় নিউজরুমে কলার ধরে মাটিতে মেরে ফেলে দিয়ে বলেছিল কত মালকে যে এইভাবে পিটিয়ে সোজা করেছে সে তার বর্ণময় কর্ম জীবনে। কিন্তু সেই চোখে চোখ রাখা বিখ্যাত সেই সাংবাদিক বোধহয় জানেনা এই মালকে মেরে সিধা করা যায়না। না, কোনো অভিযোগ করিনি আমি সেদিন কোথাও না পুলিশ না অফিসে। 

বিখ্যাত সেই সিনেমার ডায়লগ মনে পড়ত আমার বোধহয় রবি ঘোষ বলেছিলেন, বাবা কি দাপট...।
 যা দেখে কিছুটা হলেও থমকে গেল আমার মন। আর কিছুটা তার জেরেই কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে এলাম আমি। সত্যিই বলতে কি কম বেশি ক্ষমতা পেলেই এরা সব বাঘ এর মত হয়ে যায়। হাতে চাবুক ঘুরিয়ে নিজেকে কেউ সম্রাট আকবর, কেউ নিজেকে ঝাঁসির রানী লক্ষীবাই ভাবেন। আসলে এরা বোধহয় সেটাই হতে চেয়েছিল জীবনে। কিন্তু ভুল করে তা না হতে পেরে এই অন্য এক পেশায় এসে গেছেন।

 কী আর করবেন তাই কিছুটা বাধ্য হয়ে আমরাও যারা কাজ করতে যেতাম এই ভাবেই প্রতিদিন নানা ধরনের হালুম এর পাল্লায় পড়ে রক্তাক্ত হতাম। আবার পরদিন ওষুধ সেবন করে অফিস যেতাম মাথা নিচু করে মুখ বুজে। কিন্তু একদিন মনে হলো এইভাবে প্রতিদিন হালুম এর পাল্লায় পড়লে মরে যাবো আমি। আসলে এরা সত্যিই হালুম না অন্য কিছু সেটা নিয়ে আমার কিছু বলার আছে। পরে সেটা নিয়ে বলা যাবে কোনো এক দিন। শুধু এটুকু বলতে পারি এরা নিজেরা, সত্যিই খুব ভীতু প্রকৃতির জীব। 

যাই হোক একদিন কাজ ছেড়ে চলে এলাম আমি। কাজ ছেড়ে চলে আসার পর অনেকেই বলেন এই ভাবে কাজ ছাড়লে বিপদ হবে তোমার ভবিষ্যতে। কারণ রিলিজ লেটার না নিলে অন্য কোথাও কাজে যোগ দেওয়া যাবে না আর কোনোদিনই। কিন্তু আমার তখন কিছুই মাথায় নেই। শুধু মুখে হাসি নিয়ে বলে ছিলাম টোটো চালাতে কি আর রিলিজ লেটার লাগবে আমার কোনোদিন। আর সেটাই বিপদ বাড়িয়ে দিল আমার জীবনে। সত্যিই তো কি হবে যেখানে নিজের কাজের জায়গায় অপদস্থ হবার আতঙ্কে কেউ কাজ করবো না বলে কাজ ছেড়ে দেয়। সেখানে কাজ ছাড়ার মুক্তির চিঠি,ঘরের আলমারিতে ফাইল বন্দী করে না রাখলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে কে জানে। তাই আমি এই কথাই বলেছি, যে টোটো চালাতে আমার রিলিজ লেটার লাগবে না। আর এটাই আমার গায়ে সেঁটে দেওয়া হলো যে আমি টোটো চালক হয়ে বেঁচে আছি মিডিয়া ছেড়ে।

 সত্যিই বলতে কি খারাপ লাগেনি এসব শুনে বরং আমার ভালো লেগেছে সেই সময় এটা শুনে। যাই হোক চোর পকেটমার তো বলেনি এরা কেউ এটাই ভাগ্য ভালো আমার। আমার আজও মনে আছে সাধারণত মিডিয়ার কাজ ছাড়লে কেউ আর যোগাযোগ রাখে না। কারণ তারা অন্য গ্রহের যাত্রী, আমি আলাদা গ্রহের মানুষ হয়ে গেছি যেনো। যদিও এদের মধ্য হাতে গোনা কয়েকজন আলাদা। যারা আমায় সাহস ও সাহায্য দুটোই একসাথে দিয়েছেন এখনও দিয়ে যাচ্ছেন এতদিন ধরেই। 

যাই হোক কলকাতার এক রিপোর্টার আমায় ফোন করে বলেছিলেন, দাদা আমি শুনলাম তুমি বোলপুরে টোটো চালাও। আমায় তুমি টোটো চালক এই ছবিটা একটু দেবে আমি একটা খবর করবো তোমায় নিয়ে। সেই রিপোর্টার এর কথা শুনে আমি হাসতে হাসতে তাকে বললাম ভাই নিশ্চয়ই দেবো। সেই ছবি পেলে সে খবর করবে আমায় নিয়ে। সত্যিই কি অদ্ভুত আবদার তার। এমন আর একজন বোলপুরের দাপট ওলা রিপোর্টার বললো, আচ্ছা দাদা বোলপুরের কোন রুটে তুমি টোটো চালাও বলতো। একটু রুটটা আমায় বলো তুমি,দেখতে পাইনা আমি তোমায়। এটা শুনেও একটু হাসি পেলো আমার। যিনি বলছেন বাংলা মিডিয়ার চ্যানেলে তার সুনাম এর থেকে বদনাম বেশি রটেছে। যাক এসব আর বেশী না বলাই ভালো। 

এই প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলি চোখে চোখ রেখে কথা বলা বাংলার এক দাপুটে সাংবাদিক আমায় শীতের রাত দুটো অবধি বসিয়ে রেখে ইন্টারভিউ না নিয়ে বলেছিল তোমার ইন্টারভিউ হয়ে গেছে দাদা। সত্যিই কি অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল সেদিন আমার। আবার সেই বিখ্যাত সাংবাদিক আমায় বলেছিল গঙ্গা পেরিয়ে এসে কাজ করতে পারবো কি না। হাঁ বলাতে বলেছিল কম টাকার কাজ। কমতে কমতে সেই টাকার পরিমাণ পাঁচ হাজার এর নিচে নামলেও আমি রাজি হলেও পরে সে জানায় না এত টাকা দেওয়া যাবে না কিছুতেই। আমি বলি কত দু হাজার টাকা সে বলে দেখি ভেবে বলবো। না আর সেই চোখে চোখ রাখা সাংবাদিক ভেবে আর বলতে পারে নি আজও। 

সেই তো একদিন সেক্টর ফাইভ এর রাস্তায় আমায় কিছুদিন আগেই একদিন হাত নেড়ে নাম ধরে ডেকেছিল সেই বিখ্যাত সাংবাদিক। আমি একটা চ্যানেলে কাজ করছি বলে সে জানতে পারে,কিন্তু আমি তাকে না চিনে চলে এলাম পাশ কাটিয়ে। যদি তার চোখের উত্তাপে আমি পুড়ে যাই এই ভয় পেয়ে আর গলে যাই এই ভয়ে। সত্যিই জীবন বড়ই বিচিত্র।

আবার যে চ্যানেল ছেড়ে টোটো চালাবো বলে রাস্তায় নেমে পড়লাম সেই চ্যানেল থেকে আচমকাই একদিন আমায় ডাকা হলো। ভাবলাম হয়তো আবার আমি ফিরে পাবো আগের জীবন, ফিরবো সংবাদ মাধ্যমে। বেশ আনন্দ নিয়ে গেলাম সেখানে আমার ছেড়ে আসা পুরোনো অফিসে। ঝাঁ চকচকে অফিসে এসে কেমন যেনো নিজেকে বেমানান মনে হলো। চুপ করে বসে রইলাম আমি। অনেক পরে অবশেষে আমার ঠাণ্ডা কাঁচের ঘরে ডাক পড়ল। 

একবারে দৌপ্রদীর স্বয়ম্বর সভার মত ডাক পড়লো আমার। আমায় গোল করে ঘিরে আছে সব ডাক সাইটে দুঁদে সাংবাদিক এর দল। একমনে জরিপ করছেন তারা আমায়। অন্য গ্রহের জীব আবার ফিরে আসতে চায় তাদের দলে, তাদের নিজস্ব গ্রহে। তাকে কি ফিরিয়ে নেওয়া উচিত না, তাকে নেওয়া হবে না সেই নিয়েই জরুরী সভা। অবশেষে সেই পুরোনো কথা উঠলো আবার তুমি তো টোটো চালাবো বলে চলে গেলে। দাপুটে সাংবাদিক এর শ্লেষ পূর্ণ উক্তি। আমি চুপ করে শুনলাম সেই কথা।

আসলে আমার জীবনে টোটো শব্দটা একদম যেনো সম্পৃক্ত হয়ে গেছে অজান্তেই। তাকে আমি হাজার চেষ্টা করেও ঝেড়ে ফেলতে পারিনি। সেই ঠান্ডা হিমশীতল ঘর থেকে বেরিয়ে এসে একটু স্বস্তি পেলাম আমি। দম বন্ধ করা পরিবেশ ছেড়ে নিশ্বাস নিলাম প্রাণ ভরে।
 রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, খারাপ কি খুব টোটো চালক হয়ে বেঁচে থাকায়। এর মধ্যে কোনো লজ্জা লুকিয়ে আছে কি কোথাও। কে জানে জানিনা আমি। নিচু হয়ে, ছোটো কাজ করে বেঁচে থাকার মধ্যে কি কোনো। গ্লানি লুকিয়ে থাকে।

খবরের দুনিয়া ছেড়ে অন্য গ্রহ ছেড়ে, হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম আমি এটাই। সত্যিই বলতে কি আমি কোনো দিন এখনও টোটো চালক হইনি। পেটের ক্ষিধে মেটাতে, যদি তাই হতে হয় সেটায় লজ্জার কিছুই নেই। অন্তত সম্মান রক্ষা করে বাঁচবো আমি। কোনো দিন রাজনীতির কারবারির কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করে বাঁচবো না আমি। বলবো না আমি তাকে, যে কিছু খবর করেছি আমি তোমায় নিয়ে আমায় খাবারের টাকা দাও। এটা তো আরও‌ লজ্জার আর অপমানের ব্যাপার। যদিও এই অপমান গায়ে মেখেই অনেকে বেঁচে আছেন আজ কাল এই সমাজে বুক ফুলিয়ে। 

যাকগে বাদ দি এই সব নানা হাবিজাবি প্রসঙ্গ। টোটো তে ফিরে আসি আমি। টোটোতে উঠেই আমার পছন্দের আসন হলো ড্রাইভার এর পাশের আসন। সেদিন আমি তাই করলাম বসে পড়লাম ওর পাশে। গল্প জুড়লাম ওর সাথে। জানলাম ও বোলপুরে থাকে না। একটু দূরে থাকে ইলমবাজারের দিক থেকে আসে সে বোলপুরে টোটো চালাতে। নিজের টোটো কিনেছে সে বাবার এক বিঘা জমি বিক্রি করে। সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে চলে যায় তার কোনো রকমে। কারণ তাকে টোটো ভাড়া দিতে হয় না কাউকে। সারাদিন পাঁচশো টাকা রোজগার না হলে পাঁচটা পেট চলা দায় এই বাজারে ,তবু যা আয় হয় কষ্টে সৃষ্টে দিন চলে যায় তার নিজের টোটো বলে। কথায় কথায় সে আরও জানালো বোলপুর শহরে এমন প্রায় পনেরো হাজার কার্ড ওলা টোটো চলে। আর কার্ড ছাড়া টোটো চলে প্রায় পাঁচ হাজার। আমি শুনে অবাক এই ছোটো শহরে প্রায় কুড়ি হাজার টোটো চলে।

 ফেরার পথে সন্ধ্যা হয়েছে আর একজনের সাথে ফিরতে ফিরতে শুনলাম তার টোটো চালকের গল্প। তার নিজের টোটো নয়। মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া টোটো তার। সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে যা আয় হয় তার মধ্যে আড়াইশো টাকা মালিককে দিয়ে দিতে হয় তাকে। ভাড়ার গাড়িটা মালিকের বাড়ীতেই থাকে। সেখানেই চার্জ দেওয়া হয়।তারপর যা আয় হয় সেটা নিয়ে ঘরে ফিরতে হয় তাকে প্রতিদিন। লাভ এটাই বাবা বিশ্বকর্মা কোনো দিন তাকে খালি হাতে ফেরায় না কোনদিন। হয়তো কোনো দিন নিজের পকেট হাতড়ে আড়াইশো টাকা গাড়ি রাখার সময় মালিককে দিয়ে আস্তে হয়। তবু অন্য কোনো দিন ঠিক বাবা বিশ্বকর্মা সেটা পুষিয়ে দেন এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি কি বলেন। আচমকা ওর মুখে এই কথা শুনে আমি হাসতে গিয়েও পারি না। জীবনের পরতে পরতে কি গভীর বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে জানে এরা। কই আমরা তো পারি না, এই বিশ্বাসের জোরে বাঁচতে শুধু বাবা বিশ্বকর্মা কে ভরসা করে।
 
দ্রুত সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে টোটোটা এগিয়ে চলে। আমি বসে থাকি চালকের পাশে চুপটি করে। আকাশের তারাগুলি, পূর্ণিমার চাঁদটা সরে সরে যায় দ্রুত আমার চোখের সামনে থেকে। তবু অদ্ভুত মায়াবী চাঁদের আলোয় আলোকিত হতে হতে ইসমাইল টোটোর হাতলে চাপ দেয়। আরো জোরে দৌড় করে তার ভাড়া নেওয়া স্বপ্নের যানটি। আমি শুধু ওকে দেখি আর ভাবি যারা আমায় এত কিছু বলেছিল তারা কি কোনোদিন এই ইসমাইল কে আমার মত এত কথা বলতে পারবে। ভাঙতে পারবে তার বিশ্বাসকে। যে বিশ্বাস নিয়ে সে প্রতিদিন হালুমদের এড়িয়ে রাস্তায় নামে নির্ভয়ে বুক ফুলিয়ে। 

সে জানে তাকে এই রাস্তায় কেউ ক্ষত বিক্ষত করবে না। সন্ধ্যায় সে আকাশের তারা দেখে। চাঁদ মামাকে দেখে আর মনে মনে ভাবে আড়াইশো টাকার গন্ডি পেরিয়ে গেলেই তো তার নিজের আয় হবে। যে টাকা আয় করে তার ঘরের চাঁদকে একটু ভালো রাখতে পারবে সে খুশী মনে। এই আশা আর ভরসা নিয়েই তো ইসমাইলরা বেঁচে থাকে প্রতিদিন। কোনও লজ্জা শরম নিয়ে নয়, লুকিয়ে নয়, একদম বিন্দাস জীবন নিয়ে ওরা জীবনকে বাজি রেখে ছিনিমিনি খেলে ওরা দাঁতে দাঁত চেপে নীরবে, নিভৃতে, নির্ভয়ে কারণ ওরা জানে বাবা বিশ্বকর্মা ওকে খালি হাতে ফেরাবেন না। 

আর আমরা ওদের দুর থেকে দেখি বলি, ছি ছি তুমি টোটো চালাও। কিন্তু অস্ফুটে বলি আহারে আমিও যদি ওর মতো জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারতাম অমন করে বিন্দাস জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম। সন্ধ্যায় চাঁদ মামাকে দেখে দৌড়তে পারতাম আলো আঁধারি রাস্তা দিয়ে। আড়াইশো টাকার গন্ডি ছাড়িয়ে গেলেই উৎফুল্ল হয়ে ভাবতে পারতাম বিশ্বাস করতে পারতাম বাবা বিশ্বকর্মা ঠিক আছেন, তিনি সব সময় রক্ষা করেন। তাহলে বোধহয় আমার জীবনটাও বদলে যেত। কিন্তু পারলাম কই ইসমাইল -এর মত বিশ্বাস নিয়ে জীবনে বাঁচতে। এই জীবনে বোধহয় আর ইসমাইল এর মত বিশ্বাস নিয়ে বাঁচা হলো না আমার।

তিন চাকার টোটো - অভিজিৎ বসু।
উন ত্রিশ নভেম্বর দু হাজার তেইশ।
ছবি নিজের।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হ্যাপি বার্থডে রনজিৎ দা

আমার মোবাইলে নম্বরটা আজও সেভ করা আছে রনজিৎ মদন দা নামেই। কবে, কোথায় ওর সাথে দেখা হয়েছিল আজ আর সেটা স্মরণে নেই আমার। হয়তো সেই ২৪ চৌরঙ্গী রোডের অফিসে বা ভবানীপুরের সেই বিখ্যাত অফিসে দেখা হয়েছিল একদিন। ডাকাবুকো কংগ্রেস নেতা মদন মিত্র তখন প্রিয়রঞ্জন‌ দাসমুন্সীর লোক। একদম ফর্সা গায়ের রং। চোখে রোদ চশমা, সাদা প্যান্ট সাদা জুতো পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এদিক আর ওদিক। আর সেই কিছু দরকার পড়লেই রনজিৎ রনজিৎ বলে ডাক দিচ্ছেন তিনি দরকারে আর অদরকারে।  রনজিৎ হলো মদনদার সেই পুরোনো দিনের একমাত্র সঙ্গী আর ছিল সেই স্বপন মাইতি বর্তমানে তিনি আর বেঁচে নেই। এস এস কে এম এ গেলেই স্বপনদা কে দেখতাম আমরা। কিন্তু সেই জাদুঘর এর ফুটপাথ ধরে বিকেলের কাগজ বের হলে পট পরিবর্তন আর অন্যদিকে প্রতিদিন নিয়ে চলে যেতাম আমরা দুজন। বর্তমানে একজন তৃণমূলের মুখপাত্র অনেক বড় মাপের সাংবাদিক ও রাজনীতির লোক। দলের অন্দরে অনেক দূর অবধি তাঁর হাত বিস্তৃত। অন্যদিকে আর একজন ৩৫ বছর এই বাংলা মিডিয়াতে কাজ করে এখন বাতিলের দলে টোটো চালক হয়ে গেছে আর কি।  যাক সেই রনজিৎ এর আজ জন্মদিন। মনে পড়ে গেলো আমার...

ইটিভি ও অম্বরীষ‌ দা।

সাদা জীবনের কালো কথায় এমন একজনের কথা লিখবো আজ যার কথা অনেক আগেই লেখা উচিত ছিল আমার। ইটিভির কর্ণধার রামোজি রাও এর মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতির কথা লেখার সময় যার কথা আমার এক লাইন হলেও লেখা উচিত ছিল বলে আমি মনে করি। যা আমায় মনে করিয়ে দিলেন একজন প্রাক্তন ইটিভির সহকর্মী। তার কথা শুনে মনে হলো ঠিক তো চেয়ারম্যান স্যার কে হারিয়ে আমরা সবাই ইটিভির কর্মীরা মিলিত হলাম এক নিমেষে এক ছাতার তলায়। কিন্তু যার জন্য আমরা সবাই তাঁর কাছে এই ইটিভির কোম্পানি তে কাজ এর সুযোগ পাই তাঁর কথা উল্লেখ করা দরকার ছিল বোধ হয়। কিন্তু আমি লিখি নি বা হয়তো ভুলে গেছিলাম সেই মানুষটার কথা বলতে। সেই ব্যক্তির কথাই আজ বলবো কিছুটা। না হলে সেটা ঠিক কাজ হবে না কিছুতেই।  যে মানুষটার জন্য আমরা প্রায় সবাই এই ভাবে সব একসাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। কেউ পশ্চিমবাংলায় কাজ করেছি আবার কেউ কেউ হায়দরাবাদ এর সেই পাঁচিল ঘেরা রামোজি রাও এর সাম্রাজ্যে কাজ করেছি। কিন্তু বাংলা মিডিয়ার সেই ছোট্টো চারা গাছের যে বীজ রামোজি রাও বপন করেছিলেন সেই সময় আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে। এই মানুষটার হাত ধরেই লোক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল স...

বিশ্ব সাইকেল দিবস

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ বিশ্ব সাইকেল দিবস এর কথা। এই দু চাকার যানকে নিয়ে যে কত অম্ল মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে সবার জীবনেই তা বলে শেষ করা যাবে না বোধ হয়। আর আজ সেই সাইকেল উদযাপনের একটি আন্তর্জাতিক দিন। এই বিশ্ব সাইকেল দিবস প্রতিবছর জুন মাসের ৩ তারিখে সমগ্র বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় এই দিনটি।  ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রসংঘর সাধারণ সভায় ৩ জুন বিশ্ব সাইকেল দিবস হিসেবে উদ্‌যাপন করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবে সাইকেলের দীর্ঘ জীবনকাল এবং বহু কাজে ব্যবহৃত হওয়ার প্রশংসা করা হয়। সঙ্গে প্রায় দুই শতক কাল এর সাধারণ,কম খরচ, বিশ্বাসযোগ্যতা, এবং পরিবেশের জন্য উপযুক্ত যানবাহনের মাধ্যম হিসাবে সাইকেলের উল্লেখ করা হয়েছিল। সাইকেল ব্যবহারের সুফলের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্য মূলতঃ এই দিবস উদ্‌যাপন করা হয় সারা বিশ্ব জুড়েই। বিশ্ব সাইকেল দিবস আজ তাই সবার কাছেই জানা একটা বিষয়। কিন্তু যে সাইকেল নিয়ে এত কথা সেই লাল টুকটুকে সাইকেল পেয়েছিলাম আমি স্কুল জীবনে ক্লাস এইট থেকে নাইনে উঠে। সময়টা যত দুর মনে পরে শীতকাল ডিসেম্বর মাস। মেজমামা আমায়...

দিদির নিদান

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ চুরি না করার নিদান। সেই ছোটো বেলায় পড়েছিলাম বইতে মাসীর সাবধান বাণী। চুরি করে কি অবস্থা হলো। শেষে মাসীর কান কামড়ে দিল বালক। মাসীর সাবধান বাণী না শুনে। আজ এই এক ঘণ্টার মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে আমার সেই গল্পের কথা মনে পড়ে গেলো হঠাৎ করেই। আচ্ছা সত্যিই কি এই কড়া নিদান দিয়ে চুরি রোখা যায়। কথায় বলে চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। মুখ্যমন্ত্রীর একদম সোজা সাপটা এই বর্জ নির্ঘোষ কথা শুনে আমার এমন মনে হলো আজ। যে কথার উত্তর দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই কারুর।  সে দলের যে নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক, বা পুরসভার চেয়ারম্যান হোক। চুপ করে বসে হজম করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ উত্তর দিলেই বিপদ বাড়বে বই কমবে না। একদম সোজা সাপটা তীরবিদ্ধ আক্রমন এর সামনে মাথা নিচু করে বসে থাকা। করে খাবার জায়গা নয় তৃণমূল দল। মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। নিজের পেট ভর্তি করার জন্য রাজনীতি আর নয়, অনেক হয়েছে।  সত্যিই তো রাজনীতির আঙিনায় এই সব কিছুকে আর প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত হবে না। কত কষ্ট করে মাটি তৈরি করে, জল দিয়ে এই ছোটো দুটি জোড়...

আমাদের চেনা বিখ্যাত ঝিলম

বাংলা মিডিয়ার নানাজনের সাথে দীর্ঘ সময়ে আমার কাজে অকাজে নানা সাংবাদিকের সাথে আলাপ থাকলেও। এই সাংবাদিকের সাথে ঠিক যেনো রোদ আর বৃষ্টির টক ঝাল মিষ্টি সম্পর্ক। এই হাসিঠাট্টা মশকরা করা দুজনের, আবার এই সিরিয়াস হয়ে গিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে যাওয়া একে অপরের সাথে। এই নানা বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁর সাথে আলোচনা হওয়া দুই সহজ পুরোনো বন্ধুর মতো। আবার যেনো খুব ক্ষুদ্র কোনো কারনেই মতান্তর আর মনান্তর হয়ে যাওয়া কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই ব্লগ লেখার কথা আমায় বহুদিন আগেই ও বলেছিল একদিন। আজ সেই ব্লগ লেখার পাগলামো কিছুটা তো তাঁর অনুপ্রেরণায় এটা অস্বীকার করা যায় না আজও কিন্তু । যেটা নিয়ে তাঁর সাথে আমার কথাও হয়েছে বহুবার।  বাংলা মিডিয়ার এই শিক্ষিত পড়াশোনা করে সাংবাদিক হতে আসা, এই রিপোর্টার ইন্টারভিউ বোর্ডে পরীক্ষকের জ্ঞান অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হতেও পিছপা হয় না কিছুতেই। কোনও পরোয়া না করে আর ভয় না পেয়ে। সে হায়দরাবাদ এর বিখ্যাত বিরিয়ানী এলাকার বস হোক, কিম্বা কাগজের দাপুটে দাড়িওলা বস হোক। বা যে কেউ বস হোক। আসলে এটাই ওর চিরকালের নেচার। যার থেকে আজও বোধহয় বের ...