সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তিন চাকার টোটো

এই তিন চাকার টোটো নিয়ে আমার দুর্বলতা অনেক দিনের। খোলা মেলা এই যানটি বেশ পরিবেশ বান্ধব। সব দিক থেকেই এই গাড়ি চড়তে বেশ ভালো লাগে আমার। টোটোতে বসে নিজেকে কেমন যেন পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়া রাজামশাই মনে হয় আমায় নিজেকে।

পকেট গড়ের মাঠ হলেও নিজের ভিতরে যে 
বাবুয়ানি ভাব, সেটা কেমন করে যেন ফুরফুরে মেজাজে ঠাণ্ডা হাওয়া লেগে বেরিয়ে পড়ে আচমকাই। ফুর ফুর করে তারা উড়ে যায় যেনো ডানা মেলে এদিক ওদিক ঠিক লাল নীল প্রজাপতির মতো। সত্যিই আমি খুব উপভোগ করি টোটো করে ঘুরে বেড়ানোকে। যার অন্য কোনো কারণ আছে কি না জানিনা আমি। যাই হোক ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত রচনা করা আমার উচিৎ নয়।

যে কোন জায়গায় এখন পা টানা রিকশ চালকদের পেছনে ফেলে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে টোটো রাস্তা ঘাটে সর্বত্র। পাড়ার দাদাদের কল্যাণে তারা এখন মিষ্টি বাহন শহরে আর গ্রামে। সত্যিই বলতে কি অনেকে এই যানকে পছন্দ করলেও কেনো যে টোটো চালক এর কাজ কে পছন্দ করে না, নাক সিঁটকোয় কে জানে। অনেককেই আমি বলতে শুনেছি ও বাবা টো টো চালায় ও, এতে নাক সিটকানোর কি আছে কে জানে। কাজ করে তো টাকা রোজগার করে ওরা। খারাপ উপায়ে তো টাকা আয় করছে না ওরা। তাহলে ওদের নিয়ে এত হাসাহাসির কি আছে কে জানে।

 এই তো আমি নিজেই, কিছুদিন আগেও বেশ একটা ভালো সর্বভারতীয় মিডিয়াতে কাজ করতাম। আমার আশপাশে সব দাপুটে সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের ভীড় দেখতে পেতাম সব সময়। সব স্বপ্নের মত বিরাজ করতেন তাঁরা আমার চোখের সামনে এদিক ওদিক। যেমন তাঁদের দাপট, তেমন তাঁদের রূপ। সেই রূপের ছটায় মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্হা।

 এদের কোনোদিন নিজের চোখে দেখতে পাবো তা স্বপ্নেও ভাবিনি আমি। ওদের দেখে আমি তো অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি শুধু। যেনো এঁদের কোনো দিন এইভাবে দেখতে পাবো ভাবিনি আমি। একদম গা ছম ছম করা পরিবেশে কাজ করতাম। খালি মনে হতো এই বোধহয় সবার সামনে ভুল ধরে অপদস্থ হতে হবে আমায়। আচমকা একদিন আমার মনে হলো, না এই কাজটা আর করা যাবে না। যেমন ভাবা আর তেমন কাজ। আগু পিছু না ভেবে দুম করে ছেড়ে দিলাম সংবাদ মাধ্যমের চাকরিটা। 

কত কাঠ খড় পুড়িয়ে এই কাজ জোগাড় করতে হয়েছিল আমায় একদিন। যদিও এই কাজটি আমায় ডেকে দেন কলকাতার একজন বিখ্যাত সাংবাদিক সেই অনির্বাণ চৌধুরী। তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো সারাজীবন। এই সুযোগ করে দেবার জন্য। না হলে কি আর দাপটের এমন হরেক। কিসিমের রূপ দেখতে পেতাম কোনোদিন আমি। ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের দাপট দেখার সৌভাগ্য হলো আমার এই জীবনে। 

কত পুরুষের দাপট আর নারীর দাপট, বসের দাপট, প্রোডিউসার এর দাপট, ডেস্ক এর কলম পেশা ছাপোষা সহকর্মীর দাপট, ক্যামেরা চালানো ক্যামেরাম্যান এর দাপট, সেই ইনপুট আর আউটপুট হেড এর দাপট, সেই বিখ্যাত পুরুষ এক অ্যাঙ্কর এর দাপট যে আমায় নিউজরুমে কলার ধরে মাটিতে মেরে ফেলে দিয়ে বলেছিল কত মালকে যে এইভাবে পিটিয়ে সোজা করেছে সে তার বর্ণময় কর্ম জীবনে। কিন্তু সেই চোখে চোখ রাখা বিখ্যাত সেই সাংবাদিক বোধহয় জানেনা এই মালকে মেরে সিধা করা যায়না। না, কোনো অভিযোগ করিনি আমি সেদিন কোথাও না পুলিশ না অফিসে। 

বিখ্যাত সেই সিনেমার ডায়লগ মনে পড়ত আমার বোধহয় রবি ঘোষ বলেছিলেন, বাবা কি দাপট...।
 যা দেখে কিছুটা হলেও থমকে গেল আমার মন। আর কিছুটা তার জেরেই কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে এলাম আমি। সত্যিই বলতে কি কম বেশি ক্ষমতা পেলেই এরা সব বাঘ এর মত হয়ে যায়। হাতে চাবুক ঘুরিয়ে নিজেকে কেউ সম্রাট আকবর, কেউ নিজেকে ঝাঁসির রানী লক্ষীবাই ভাবেন। আসলে এরা বোধহয় সেটাই হতে চেয়েছিল জীবনে। কিন্তু ভুল করে তা না হতে পেরে এই অন্য এক পেশায় এসে গেছেন।

 কী আর করবেন তাই কিছুটা বাধ্য হয়ে আমরাও যারা কাজ করতে যেতাম এই ভাবেই প্রতিদিন নানা ধরনের হালুম এর পাল্লায় পড়ে রক্তাক্ত হতাম। আবার পরদিন ওষুধ সেবন করে অফিস যেতাম মাথা নিচু করে মুখ বুজে। কিন্তু একদিন মনে হলো এইভাবে প্রতিদিন হালুম এর পাল্লায় পড়লে মরে যাবো আমি। আসলে এরা সত্যিই হালুম না অন্য কিছু সেটা নিয়ে আমার কিছু বলার আছে। পরে সেটা নিয়ে বলা যাবে কোনো এক দিন। শুধু এটুকু বলতে পারি এরা নিজেরা, সত্যিই খুব ভীতু প্রকৃতির জীব। 

যাই হোক একদিন কাজ ছেড়ে চলে এলাম আমি। কাজ ছেড়ে চলে আসার পর অনেকেই বলেন এই ভাবে কাজ ছাড়লে বিপদ হবে তোমার ভবিষ্যতে। কারণ রিলিজ লেটার না নিলে অন্য কোথাও কাজে যোগ দেওয়া যাবে না আর কোনোদিনই। কিন্তু আমার তখন কিছুই মাথায় নেই। শুধু মুখে হাসি নিয়ে বলে ছিলাম টোটো চালাতে কি আর রিলিজ লেটার লাগবে আমার কোনোদিন। আর সেটাই বিপদ বাড়িয়ে দিল আমার জীবনে। সত্যিই তো কি হবে যেখানে নিজের কাজের জায়গায় অপদস্থ হবার আতঙ্কে কেউ কাজ করবো না বলে কাজ ছেড়ে দেয়। সেখানে কাজ ছাড়ার মুক্তির চিঠি,ঘরের আলমারিতে ফাইল বন্দী করে না রাখলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে কে জানে। তাই আমি এই কথাই বলেছি, যে টোটো চালাতে আমার রিলিজ লেটার লাগবে না। আর এটাই আমার গায়ে সেঁটে দেওয়া হলো যে আমি টোটো চালক হয়ে বেঁচে আছি মিডিয়া ছেড়ে।

 সত্যিই বলতে কি খারাপ লাগেনি এসব শুনে বরং আমার ভালো লেগেছে সেই সময় এটা শুনে। যাই হোক চোর পকেটমার তো বলেনি এরা কেউ এটাই ভাগ্য ভালো আমার। আমার আজও মনে আছে সাধারণত মিডিয়ার কাজ ছাড়লে কেউ আর যোগাযোগ রাখে না। কারণ তারা অন্য গ্রহের যাত্রী, আমি আলাদা গ্রহের মানুষ হয়ে গেছি যেনো। যদিও এদের মধ্য হাতে গোনা কয়েকজন আলাদা। যারা আমায় সাহস ও সাহায্য দুটোই একসাথে দিয়েছেন এখনও দিয়ে যাচ্ছেন এতদিন ধরেই। 

যাই হোক কলকাতার এক রিপোর্টার আমায় ফোন করে বলেছিলেন, দাদা আমি শুনলাম তুমি বোলপুরে টোটো চালাও। আমায় তুমি টোটো চালক এই ছবিটা একটু দেবে আমি একটা খবর করবো তোমায় নিয়ে। সেই রিপোর্টার এর কথা শুনে আমি হাসতে হাসতে তাকে বললাম ভাই নিশ্চয়ই দেবো। সেই ছবি পেলে সে খবর করবে আমায় নিয়ে। সত্যিই কি অদ্ভুত আবদার তার। এমন আর একজন বোলপুরের দাপট ওলা রিপোর্টার বললো, আচ্ছা দাদা বোলপুরের কোন রুটে তুমি টোটো চালাও বলতো। একটু রুটটা আমায় বলো তুমি,দেখতে পাইনা আমি তোমায়। এটা শুনেও একটু হাসি পেলো আমার। যিনি বলছেন বাংলা মিডিয়ার চ্যানেলে তার সুনাম এর থেকে বদনাম বেশি রটেছে। যাক এসব আর বেশী না বলাই ভালো। 

এই প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলি চোখে চোখ রেখে কথা বলা বাংলার এক দাপুটে সাংবাদিক আমায় শীতের রাত দুটো অবধি বসিয়ে রেখে ইন্টারভিউ না নিয়ে বলেছিল তোমার ইন্টারভিউ হয়ে গেছে দাদা। সত্যিই কি অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল সেদিন আমার। আবার সেই বিখ্যাত সাংবাদিক আমায় বলেছিল গঙ্গা পেরিয়ে এসে কাজ করতে পারবো কি না। হাঁ বলাতে বলেছিল কম টাকার কাজ। কমতে কমতে সেই টাকার পরিমাণ পাঁচ হাজার এর নিচে নামলেও আমি রাজি হলেও পরে সে জানায় না এত টাকা দেওয়া যাবে না কিছুতেই। আমি বলি কত দু হাজার টাকা সে বলে দেখি ভেবে বলবো। না আর সেই চোখে চোখ রাখা সাংবাদিক ভেবে আর বলতে পারে নি আজও। 

সেই তো একদিন সেক্টর ফাইভ এর রাস্তায় আমায় কিছুদিন আগেই একদিন হাত নেড়ে নাম ধরে ডেকেছিল সেই বিখ্যাত সাংবাদিক। আমি একটা চ্যানেলে কাজ করছি বলে সে জানতে পারে,কিন্তু আমি তাকে না চিনে চলে এলাম পাশ কাটিয়ে। যদি তার চোখের উত্তাপে আমি পুড়ে যাই এই ভয় পেয়ে আর গলে যাই এই ভয়ে। সত্যিই জীবন বড়ই বিচিত্র।

আবার যে চ্যানেল ছেড়ে টোটো চালাবো বলে রাস্তায় নেমে পড়লাম সেই চ্যানেল থেকে আচমকাই একদিন আমায় ডাকা হলো। ভাবলাম হয়তো আবার আমি ফিরে পাবো আগের জীবন, ফিরবো সংবাদ মাধ্যমে। বেশ আনন্দ নিয়ে গেলাম সেখানে আমার ছেড়ে আসা পুরোনো অফিসে। ঝাঁ চকচকে অফিসে এসে কেমন যেনো নিজেকে বেমানান মনে হলো। চুপ করে বসে রইলাম আমি। অনেক পরে অবশেষে আমার ঠাণ্ডা কাঁচের ঘরে ডাক পড়ল। 

একবারে দৌপ্রদীর স্বয়ম্বর সভার মত ডাক পড়লো আমার। আমায় গোল করে ঘিরে আছে সব ডাক সাইটে দুঁদে সাংবাদিক এর দল। একমনে জরিপ করছেন তারা আমায়। অন্য গ্রহের জীব আবার ফিরে আসতে চায় তাদের দলে, তাদের নিজস্ব গ্রহে। তাকে কি ফিরিয়ে নেওয়া উচিত না, তাকে নেওয়া হবে না সেই নিয়েই জরুরী সভা। অবশেষে সেই পুরোনো কথা উঠলো আবার তুমি তো টোটো চালাবো বলে চলে গেলে। দাপুটে সাংবাদিক এর শ্লেষ পূর্ণ উক্তি। আমি চুপ করে শুনলাম সেই কথা।

আসলে আমার জীবনে টোটো শব্দটা একদম যেনো সম্পৃক্ত হয়ে গেছে অজান্তেই। তাকে আমি হাজার চেষ্টা করেও ঝেড়ে ফেলতে পারিনি। সেই ঠান্ডা হিমশীতল ঘর থেকে বেরিয়ে এসে একটু স্বস্তি পেলাম আমি। দম বন্ধ করা পরিবেশ ছেড়ে নিশ্বাস নিলাম প্রাণ ভরে।
 রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, খারাপ কি খুব টোটো চালক হয়ে বেঁচে থাকায়। এর মধ্যে কোনো লজ্জা লুকিয়ে আছে কি কোথাও। কে জানে জানিনা আমি। নিচু হয়ে, ছোটো কাজ করে বেঁচে থাকার মধ্যে কি কোনো। গ্লানি লুকিয়ে থাকে।

খবরের দুনিয়া ছেড়ে অন্য গ্রহ ছেড়ে, হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম আমি এটাই। সত্যিই বলতে কি আমি কোনো দিন এখনও টোটো চালক হইনি। পেটের ক্ষিধে মেটাতে, যদি তাই হতে হয় সেটায় লজ্জার কিছুই নেই। অন্তত সম্মান রক্ষা করে বাঁচবো আমি। কোনো দিন রাজনীতির কারবারির কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করে বাঁচবো না আমি। বলবো না আমি তাকে, যে কিছু খবর করেছি আমি তোমায় নিয়ে আমায় খাবারের টাকা দাও। এটা তো আরও‌ লজ্জার আর অপমানের ব্যাপার। যদিও এই অপমান গায়ে মেখেই অনেকে বেঁচে আছেন আজ কাল এই সমাজে বুক ফুলিয়ে। 

যাকগে বাদ দি এই সব নানা হাবিজাবি প্রসঙ্গ। টোটো তে ফিরে আসি আমি। টোটোতে উঠেই আমার পছন্দের আসন হলো ড্রাইভার এর পাশের আসন। সেদিন আমি তাই করলাম বসে পড়লাম ওর পাশে। গল্প জুড়লাম ওর সাথে। জানলাম ও বোলপুরে থাকে না। একটু দূরে থাকে ইলমবাজারের দিক থেকে আসে সে বোলপুরে টোটো চালাতে। নিজের টোটো কিনেছে সে বাবার এক বিঘা জমি বিক্রি করে। সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে চলে যায় তার কোনো রকমে। কারণ তাকে টোটো ভাড়া দিতে হয় না কাউকে। সারাদিন পাঁচশো টাকা রোজগার না হলে পাঁচটা পেট চলা দায় এই বাজারে ,তবু যা আয় হয় কষ্টে সৃষ্টে দিন চলে যায় তার নিজের টোটো বলে। কথায় কথায় সে আরও জানালো বোলপুর শহরে এমন প্রায় পনেরো হাজার কার্ড ওলা টোটো চলে। আর কার্ড ছাড়া টোটো চলে প্রায় পাঁচ হাজার। আমি শুনে অবাক এই ছোটো শহরে প্রায় কুড়ি হাজার টোটো চলে।

 ফেরার পথে সন্ধ্যা হয়েছে আর একজনের সাথে ফিরতে ফিরতে শুনলাম তার টোটো চালকের গল্প। তার নিজের টোটো নয়। মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া টোটো তার। সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে যা আয় হয় তার মধ্যে আড়াইশো টাকা মালিককে দিয়ে দিতে হয় তাকে। ভাড়ার গাড়িটা মালিকের বাড়ীতেই থাকে। সেখানেই চার্জ দেওয়া হয়।তারপর যা আয় হয় সেটা নিয়ে ঘরে ফিরতে হয় তাকে প্রতিদিন। লাভ এটাই বাবা বিশ্বকর্মা কোনো দিন তাকে খালি হাতে ফেরায় না কোনদিন। হয়তো কোনো দিন নিজের পকেট হাতড়ে আড়াইশো টাকা গাড়ি রাখার সময় মালিককে দিয়ে আস্তে হয়। তবু অন্য কোনো দিন ঠিক বাবা বিশ্বকর্মা সেটা পুষিয়ে দেন এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি কি বলেন। আচমকা ওর মুখে এই কথা শুনে আমি হাসতে গিয়েও পারি না। জীবনের পরতে পরতে কি গভীর বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে জানে এরা। কই আমরা তো পারি না, এই বিশ্বাসের জোরে বাঁচতে শুধু বাবা বিশ্বকর্মা কে ভরসা করে।
 
দ্রুত সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে টোটোটা এগিয়ে চলে। আমি বসে থাকি চালকের পাশে চুপটি করে। আকাশের তারাগুলি, পূর্ণিমার চাঁদটা সরে সরে যায় দ্রুত আমার চোখের সামনে থেকে। তবু অদ্ভুত মায়াবী চাঁদের আলোয় আলোকিত হতে হতে ইসমাইল টোটোর হাতলে চাপ দেয়। আরো জোরে দৌড় করে তার ভাড়া নেওয়া স্বপ্নের যানটি। আমি শুধু ওকে দেখি আর ভাবি যারা আমায় এত কিছু বলেছিল তারা কি কোনোদিন এই ইসমাইল কে আমার মত এত কথা বলতে পারবে। ভাঙতে পারবে তার বিশ্বাসকে। যে বিশ্বাস নিয়ে সে প্রতিদিন হালুমদের এড়িয়ে রাস্তায় নামে নির্ভয়ে বুক ফুলিয়ে। 

সে জানে তাকে এই রাস্তায় কেউ ক্ষত বিক্ষত করবে না। সন্ধ্যায় সে আকাশের তারা দেখে। চাঁদ মামাকে দেখে আর মনে মনে ভাবে আড়াইশো টাকার গন্ডি পেরিয়ে গেলেই তো তার নিজের আয় হবে। যে টাকা আয় করে তার ঘরের চাঁদকে একটু ভালো রাখতে পারবে সে খুশী মনে। এই আশা আর ভরসা নিয়েই তো ইসমাইলরা বেঁচে থাকে প্রতিদিন। কোনও লজ্জা শরম নিয়ে নয়, লুকিয়ে নয়, একদম বিন্দাস জীবন নিয়ে ওরা জীবনকে বাজি রেখে ছিনিমিনি খেলে ওরা দাঁতে দাঁত চেপে নীরবে, নিভৃতে, নির্ভয়ে কারণ ওরা জানে বাবা বিশ্বকর্মা ওকে খালি হাতে ফেরাবেন না। 

আর আমরা ওদের দুর থেকে দেখি বলি, ছি ছি তুমি টোটো চালাও। কিন্তু অস্ফুটে বলি আহারে আমিও যদি ওর মতো জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারতাম অমন করে বিন্দাস জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম। সন্ধ্যায় চাঁদ মামাকে দেখে দৌড়তে পারতাম আলো আঁধারি রাস্তা দিয়ে। আড়াইশো টাকার গন্ডি ছাড়িয়ে গেলেই উৎফুল্ল হয়ে ভাবতে পারতাম বিশ্বাস করতে পারতাম বাবা বিশ্বকর্মা ঠিক আছেন, তিনি সব সময় রক্ষা করেন। তাহলে বোধহয় আমার জীবনটাও বদলে যেত। কিন্তু পারলাম কই ইসমাইল -এর মত বিশ্বাস নিয়ে জীবনে বাঁচতে। এই জীবনে বোধহয় আর ইসমাইল এর মত বিশ্বাস নিয়ে বাঁচা হলো না আমার।

তিন চাকার টোটো - অভিজিৎ বসু।
উন ত্রিশ নভেম্বর দু হাজার তেইশ।
ছবি নিজের।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যা দেখি…প্রতিদিন মনে পড়ে কত… স্মৃতির পথ ধরে হাঁটি… লিখি…

তারকেশ্বর এর সুভাষ

সেই তারকেশ্বরের সুভাষ।‌ সেই তারকেশ্বর বার্তার সুভাষ। সেই একদা বিখ্যাত সাংবাদিক ফাল্গুনীদার দক্ষিণহস্ত সুভাষ। সাংবাদিক হতে চেয়ে বারবার কোনোও সাংবাদিক তারকেশ্বর মন্দিরে পূজো দিতে গেলেই ওর সাথে দেখা হলেই ও বলতো দাদা একটু দেখো দাদা ভাইকে। যদি কিছু করা যায়। সেই সুভাষের তারকেশ্বর বার্তাকে দেখে আমার বেশ ভালো লাগলো। সেই ওর চ্যানেলে নানাজনের শুভেচ্ছার বার্তা দেখে মনে পড়ে গেলো পুরোনো দিনের কথা। সেই ওর হাতে চ্যানেলের বুম দেখে বেশ ভালই লাগলো আমার। সুভাষ আজ টিভির সাংবাদিক। সুভাষ ওর নিজের চ্যানেলের মালিক অনেক চড়াই আর উৎরাই পার করে।  আগে মাঝে মাঝেই কথা হতো ওর সাথে দরকারে বা অদরকারে। বিখ্যাত সাংবাদিক ফাল্গুনীদার একদম ন্যাওটা বলা যায়। সেই কবে কতবছর আগে যে তারকেশ্বর মন্দিরে পূজো দিতে গিয়ে ওর সব ব্যবস্থা করে দেওয়া। একদম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। তখন ও প্রায় কিছুই করে না। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায় সে। মনে ইচ্ছা একটাই সাংবাদিক হবে সে। তবু মন্দিরের পান্ডাদের হাত থেকে ওর আমার পরিবারকে সামলে দেওয়া। সেই সুভাষের কথা আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় আমার আঁকিবুঁকি ব্লগের পাতায়। যে সুভ...

ইটিভি ও অম্বরীষ‌ দা।

সাদা জীবনের কালো কথায় এমন একজনের কথা লিখবো আজ যার কথা অনেক আগেই লেখা উচিত ছিল আমার। ইটিভির কর্ণধার রামোজি রাও এর মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতির কথা লেখার সময় যার কথা আমার এক লাইন হলেও লেখা উচিত ছিল বলে আমি মনে করি। যা আমায় মনে করিয়ে দিলেন একজন প্রাক্তন ইটিভির সহকর্মী। তার কথা শুনে মনে হলো ঠিক তো চেয়ারম্যান স্যার কে হারিয়ে আমরা সবাই ইটিভির কর্মীরা মিলিত হলাম এক নিমেষে এক ছাতার তলায়। কিন্তু যার জন্য আমরা সবাই তাঁর কাছে এই ইটিভির কোম্পানি তে কাজ এর সুযোগ পাই তাঁর কথা উল্লেখ করা দরকার ছিল বোধ হয়। কিন্তু আমি লিখি নি বা হয়তো ভুলে গেছিলাম সেই মানুষটার কথা বলতে। সেই ব্যক্তির কথাই আজ বলবো কিছুটা। না হলে সেটা ঠিক কাজ হবে না কিছুতেই।  যে মানুষটার জন্য আমরা প্রায় সবাই এই ভাবে সব একসাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। কেউ পশ্চিমবাংলায় কাজ করেছি আবার কেউ কেউ হায়দরাবাদ এর সেই পাঁচিল ঘেরা রামোজি রাও এর সাম্রাজ্যে কাজ করেছি। কিন্তু বাংলা মিডিয়ার সেই ছোট্টো চারা গাছের যে বীজ রামোজি রাও বপন করেছিলেন সেই সময় আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে। এই মানুষটার হাত ধরেই লোক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল স...

ওই খানে মা পুকুর পাড়ে

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হবে বনবাসী,           কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে           থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে           থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি           ধনুক নিয়ে হাতে। .......রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টুপ টুপ বৃষ্টির দুপুরে এই কবিতার লাইন গুলো দেখে। মনে পড়ে গেলো মার কথা। বাইরে একটানা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কখনো কখনো বেশ জোরে, কোনো সময় একটু কম। মাথার মধ্যে কেমন ঝিম ঝিম করছে এই বৃষ্টির টানা আওয়াজ শুনে।  একটানা আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে একদম চুপ চুপে হয়ে গেছে। পাতার ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে নিচে।গাছের পাতাগুলোর অসময়ে স্নান করে ওদের আবার শরীর খারাপ না হয়।  জানলার ধারে সারাদিন ধরে যে পায়রা গুলো বসে থাকতো আর বক বকম করতো।...

হলুদ বসন্তের দাগ

অন্তহীন নৈঃশব্দ্যের অপেক্ষায় আছি আমি।  আঁধার মাখা রাতে মাখা মাখি হয়ে আছে, দ্বিতীয়ার চাঁদের নরম আলো। পশ্চিম আকাশের কোল ঘেঁষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, নক্ষত্রের ঝাড়বাতির নুয়ে পড়া আলো। যে আলোর দীপশিখায় তোমার কোলে ঘুমিয়ে থাকা, ছোট্ট শিশু স্বপ্ন দেখে বার বার।  চাঁদ দেখার স্বপ্নে যে বিভোর হয়ে মুখ লুকোয়, তোমার কোলে সংগোপনে। চাঁদের পেলব দুধে আলতা রঙের আভা, তোমার মুখের ওপর পিছলে পিছলে পরে। তুমি কেমন যেনো থমকে দাঁড়িয়ে যাও, চাঁদের নরম আলোর আভা গায়ে মেখে, রাতের অন্ধকারে। সেই অন্তহীন আঁধার পথ পেরিয়ে, সপ্তর্ষি মন্ডল পেরিয়ে। তুমি কালপুরুষের সন্ধানে ঘুরে বেড়াও, রাতের রাতচরা পাখির ডানায় ভর করে একা একা। রাতের পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজে খান খান হয় নৈঃশব্দ্যের অপেক্ষা। অপেক্ষার প্রহর শেষে ঘুম জড়ানো চোখে ছোট্ট শিশু আড়মোড়া ভাঙ্গে তোমার কোলে। ভোরের আলোয় হাঁটি হাঁটি করে আলোকিত হয়  ছোট্ট আঁধারময় জীবন। আঁধার মাখা পথের মাঝে পড়ে থাকে রাতচরা পাখির ডানার পালক। হলুদ বসন্তের ছোপ ছোপ দাগ বুকে নিয়ে উড়ে যায় পাখির পালক। মাথার ওপর ঘুরে বেড়ায় কাক চিলের দল। আলোর রোশনাই গা...