সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তারাদের দেশে অরুণ দা

শ্রীরামপুর থেকে খবরের কাজের সূত্রে চুঁচুড়া স্টেশনে নামতেই দেখতাম তিনি বসে আছেন শংকরের চায়ের দোকানে। আশপাশে ভীড় করে আছে সব নানা মানুষ জন। দাঁড়িয়ে পড়তাম আমিও। সেই সময় রোজ চুঁচুড়া স্টেশনের কাছে শংকরের চায়ের দোকানে আড্ডা চলত। রিকশায় চড়ে আসতেন অরুণদা। চায়ের টেবিলে মুগ্ধ হয়ে থাকতাম তাঁর কবিতায়। কাগজ, পেন বাড়িয়ে দিলেই নতুন কবিতার জন্ম হতো তাঁর হাতে। আমাদের আবদারে ''লাল পাহাড়ির দেশে যা, রাঙামাটির দেশে যা ' তিনি প্রায় দিনই পাঠ করে শোনাতেন তিনি। চুঁচুড়ার ময়নাডাঙ্গার ভাড়া বাড়িতেও সন্ধ্যার দিকে মাঝেমধ্যেই বসত কবিতার আসর। যে কবিতার জগতের মাঝেই তিনি হারিয়ে গেলেন আজ।

লাল পাহাড়ির দেশে যা,
রাঙা মাটির দেশে যা,
ইতাক তোকে মানাইছেনা রে,
ইক্কেবারে মানাইছেনা রে।

একটা অধ্যায় এর শেষ হলো আজ। কেউ আর রাস্তায় দেখা হলে স্মিতমুখে হেসে লজেন্স দেবে না ব্যাগ থেকে বের করে। বহু বছর আগে শ্রীরামপুর স্টেশনের পাশে এক মহুয়া গাছ দেখে অরুণদার মনে হয়েছিল এটা এখানে বেমানান। এখানে এক্কেবারেই মানাইছে না। তাই তিনি লিখেছিলেন, লালপাহাড়ির দেশে যা 
রাঙামাটির দেশে যা'। পরে সেই কবিতা গান হয়ে বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে যায়। আজ অরুণদাও পাড়ি দিলেন সেই এক অজানা দেশে যে দেশের কথা তিনি বহু বছর আগেই তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন। আপনার মতন মানুষ সত্যিই বিরল। অজানা অচেনা কাউকে আপন করে নেওয়ার মতো ক্ষমতা আপনার মত খুব কমজনের আছে । ভালোবেসে কি ভাবে মন জয় করা যায় সেটা আপনি দেখিয়েছেন। ভালো থাকবেন দাদা।

না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন 'লাল পাহাড়ি দেশে'র শিল্পী অরুণ চক্রবর্তী। 'লাল পাহাড়ির দেশে যা, রাঙামাটির দেশে যা'– এই গান শোনেননি বাংলায় এমন মানুষ খুব কমই আছেন! এই গানের গীতিকার-সুরকার দের নাম অবশ্য অনেকেই জানেন না। এই মর-পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন 'লাল পাহাড়ি দেশে'র শিল্পী অরুণ চক্রবর্তী। সূত্রের খবর, দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন শিল্পী। এদিন সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

অরুণ চক্রবর্তী ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে শ্রীরামপুর স্টেশনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মহুয়া ফুলের গাছ ও ফুল দেখতে পান। শ্রীরামপুরে মহুয়া গাছ ও ফুলকে দেখে বড্ড বেমানান মনে হয়েছিল। তাঁর মনে হয়েছিল বাংলার ধান, আলু উৎপাদনের অঞ্চলে মহুয়া ফুলের গাছ কেন থাকবে, মহুয়া তো লাল পাহাড়ের রানি, এই গাছকে সেখানেই মানায়। মহুয়া তো লাল মাটির গাছ। তার পর তিনি 'লাল পাহাড়ির দেশে যা, রাঙামাটির দেশে যা' গান রচনা করেন।

অরুণ চক্রবর্তী এই গানের গীতিকার। এরপর ঝুমুর গায়ক সুভাষ চক্রবর্তী এই রচনাটিতে সুরোরোপ করেন এবং ১৯৭৯ সালে প্রচলিত সুরে ভি বালসারার ব্যবস্থাপনায় সুভাষ চক্রবর্তী রেকর্ড করেন। সুভাষ চক্রবর্তী বাঁকুড়ার লোকগান ঝুমুর,টুসু,ভাদু গানকে জনপ্রিয় করেছিলেন। গত বছররে ২৬ ফেব্রুিয়ারি প্রয়াত হয়েছিলেন সঙ্গীত শিল্পী সুভাষ চক্রবর্তী। এবার সেই একই পথের যাত্রী হলেন কবি অরুণবাবু।

সুভাষ চক্রবর্তী বাঁকুড়ার লোকগানের স্রষ্টা হলেও মূলধারার গানে তিনি কোনও ভাবেই প্রচারের আলো পাননি। তাঁর গান বিখ্যাত, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে নয়। 'লাল পাহাড়ির দ্যাশে যা' গানটি বাংলা ব্যান্ড 'ভূমি' র অ্যালবামে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা পায়। 'ভূমি'র লাইভ ফাংশানে দীর্ঘ দশক জনপ্রিয় ছিল এই গান। অথচ শ্রোতাদের কাছে পৌঁছয়নি পূর্বের শিল্পী সুভাষ চক্রবর্তীর নাম। এমনকী গীতিকার অরুণ চক্রবর্তী ও রয়ে গেছেন আড়ালে। প্রচলিত কথা-সুর লেখা ছিল ভূমির অ্যালবামে।

‘ভূমি’ এই গানটি রেকর্ড করলেও গীতিকার-সুরকারের নাম উল্লেখ না করায় শুরু হয় বিতর্ক। গান নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে ভূমির গায়ক সৌমিত্র রায় পরে জানান, ‘‘গীতিকারের নাম জানতাম না। তাই উল্লেখ করিনি। প্রচলিত লেখা ছিল অ্যালবামে। ভুল করেছিলাম। পরে ক্ষমাও চেয়ে নিই আমরা। 

একটা লোকগান সমান জনপ্রিয় হয়ে ৫০ বছর পথ হেঁটে এল, এটা খুব সহজ কথা নয় কিন্তু। আমাদের জীবন আমাদের অস্তিত্ব প্রতি মুহূর্তে হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বেমানান হয়ে পড়ে, আমরা যে যার আপাত স্বস্থানে যেমন অত্যন্ত বেমানান। সেসব বিভ্রান্তির মুহূর্তগুলোয় জীবন যেন প্রশ্ন করে বসে, ‘তুই ইখানে কেনে, হেথাক তুকে মানাইছে নাই গো, ইক্কেবারেই…’।

কবি অরুণ চক্রবর্তী আপনভোলা। স্বভাব বাউল। বরাবরই স্কুলে প্রথম। পেশায় উঁচু পদমর্যাদার ইঞ্জিয়ার ছিলেন। তাঁর বন্ধুরা ফুলওয়ালা, ফলওয়ালা, টিটি, কুলি, পুলিশ অফিসার, জি আর পি, মাস্টারমশাই, মদওয়ালা, আশ্রমিক, বাউল, চাষি, কবি, মাছওয়ালা, সন্ন্যাসী, মাতাল, চোর, আপাত পাগলের দল আর সাংবাদিক এর দল তাঁর বন্ধু ছিলেন। চাকরির ফাঁকে ফাঁকে বেড়িয়ে পড়তেন এদিক-ওদিক। বিভিন্ন বাউলের আখড়ায়, লাল মাটির দেশে অথবা অজানা কোনও স্টেশনে। ১৯৭২ সালে শিবপুর বিই কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে অরুণবাবু তখন চাকরীপ্রার্থী। ট্রেকিংও চলছে পাহাড়ে, সমুদ্র সৈকতে আর জঙ্গলে। 

সেবছরই এপ্রিলের শেষাশেষি নাগাদ একদিন ভরদুপুরে নেমে পড়েছিলেন শ্রীরামপুর স্টেশনে। স্টেশন চত্বরে একটি গাছ দেখে থমকে গেলেন। গাছটির নাম মহুয়া। ইংরেজিতে Madhuka Latifolia—যা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা বা মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলে পর্যাপ্ত দেখা যায়। এই গাছের সঙ্গে বনবাসী মানুষদের কোথায় যেন একটা আন্তরিক যোগাযোগ আছে। এর পাতার আগুনে ওরা শীত আড়াল করে। ফুলের গন্ধে ভেঙে পড়ে সাগরের ঢেউ, গানে গানে কল্লোলিত হয় অরণ্যনির্জন। এ গাছ ওদের বড়ো আদরের। ওর ফলও ওরা খায়। এই মহুয়া গাছই অরুণবাবুর মননে জন্ম দেয় একটি মাটির কবিতা, পরবর্তীতে যা ৫০ বছর ধরে লোকগান হিসেবে থেকে যাবে বাংলা-বাঙালির হৃদয়জুড়ে বোধহয় কবি নিজেও বুঝতে পারেননি।

তাঁর কথায় “এই রকম একটি গাছ শ্রীরামপুর স্টেশনে ঠায় দাঁড়িয়ে দেখেছি। যেখানে শব্দের অসহ্য দামামা। লক্ষ লক্ষ মানুষের তাৎক্ষণিক দাপট নিয়ত। ট্রেনের হাঁসফাঁস। হকারের দাপাদাপি, দূষিত ধুলোর থাবা। অসহ্য দুপুর। টোপা টোপা মহুয়া ফুলের ভারে অলংকৃত দেখে মুহূর্তের মধ্যে আমার অরণ্যের কথা মনে হল। অরণ্যবাসীদের কথা মনে পড়ে গেল।” বলেন অরুণবাবু। শ্রীরামপুর স্টেশনে মহুয়া গাছটি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল গাছটি এখানে ‘মিসফিট’। মনে হয়েছিল ইঁট, কাঠ, পাথরের এ শহরে লাল মাটির গাছ বড়োই বেমানান। সেই ভাবনাই যে একদিন আপামার বাঙালির মন ‘লাল পাহাড়ির দেশে’ টেনে নিয়ে যাবে এমনকি লোকসংগীত ঘরানার চিরকালীন উদাহরণ হিসেবে থেকে যাবে, তা তিনি টের পাননি।

মাথায় লাল ফেট্টি, পকেটে লজেন্স আর মুখে ‘জয় গুরু’। এটাই তো আমাদের চেনা কবি অরুণ চক্রবর্তী। তিনি মানুষের জন্য কবিতা লেখেন। মনে করেন, কবিতার মধ্যে এমন একটা শক্তি আর সততা আছে যা পৃথিবীর মঙ্গল করে। “আদিবাসী আঞ্চলিক মানুষের মুখ মনে করে, তাদের গান, নাচ, পায়ে পায়ে ভেঙে যাওয়া হাজার ঢেউ, তাদের সহজিয়া জীবন যাপন…সব মিলিয়ে একটা উচ্চারণ ‘হাই দ্যাখো গো…তুই এখানে কেনে, লাল পাহাড়ির দ্যেশে যা, রাঙা মাটির দ্যেশে যা’।” বলেন লালপাহাড়ি গানের গীতিকার-কবি।

অরুণবাবুর কথায় “মানুষের জন্য লিখি। মানুষ ভালোবেসেছে ৫০ বছর ধরে। আরও বাসবে কারণ এর মধ্যে একটা কথা লুকিয়ে আছে—হেথাক তোকে মানাইছে নাই রে। যেখানে তোমার জায়গা নেই, সেই জায়গাটা তোমার জন্য নয়। সারা পৃথিবী জুড়ে এত অশান্তি, আতঙ্কবাদ, মারামারি, খুনোখুনি, অহংকার। যদি সত্যি সত্যিই মানবিকতার অধিকারি হতো মানুষ, সব মানুষের ভিতর যদি মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হতো তাহলে এসবের কোনও জায়গাই থাকতো না। তাই ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষের থাকাটা প্রয়োজন। মহাশ্বেতা দেবী কবিতা পড়তেন না কিন্তু আমার লাল পাহাড়ির দ্যেশে যা খুব পছন্দ করতেন। গুনগুন করে গাইতেনও।” সেই কথাই বলতেন কবি হাসতে হাসতে।


ভি বালসারার হাত ধরে গান হয়েছিল কবি অরুণ চক্রবর্তীর লালপাহাড়ি কবিতা। সুর করেছিলেন সুভাষ চক্রবর্তী। ১৯৭৩-৭৪ সালেই সুরারোপণের কাজ হয়ে যায়। তা মঞ্চে মঞ্চে গেয়ে বেড়ান সুভাষবাবু। খনি অঞ্চলে, সাঁওতাল পাড়ায়। ভি বালসারাজি তখন ইনরেকো (কলকাতার অক্রুর দত্ত লেন) কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। সুভাষবাবুর মুখে গান শুনে বেশ চমকে গিয়েছিলেন। নতুনত্বের স্বাদ পেয়েছিলেন তিনি সেই গানে। 

ফোকগানের একটা বাজার আছে, মানুষ শুনতে চায় তার উপর কোম্পানির খুব একটা ক্ষতি হবে না মনে করে তিনি রাজি হয়ে যান। সারা বাংলা, আসাম, ত্রিপুরায় হইচই পড়ে যায়। হু হু করে বিক্রি হতে থাকে রেকর্ড। দেশ-এ, আনন্দবাজারে, অমৃত পত্রিকায়, যুগান্তরে ভূয়সী প্রশংসা ছাপা হয়। আখড়ায়, সভায়, সমিতিতে, মাউন্টেনিয়ারিং ক্যাম্পে ক্যাম্পে, কবিতার আড্ডায় শোনা যেত এই গান।

লোকাল ট্রেন থেকে বাংলা ব্যান্ড এখনও এই সুরে মাতোয়ারা। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হতে চলেছে লালপাহাড়ি কবিতা। অনেক সময় দেখা যায় কোনও লোকগান তুমুল জনপ্রিয় কিন্তু তার গীতিকারের নাম আমরা জানি না। লাল পাহাড়ি গানের সঙ্গেও এরকমটা ঘটেছিল। আমরা জানি বাংলা ব্যান্ড ‘ভূমি’ এই গানটি রেকর্ড করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গীতিকারের নাম উল্লেখ না করায় শুরু হয়েছিল বিতর্ক। ‘‘এক অনুষ্ঠানে বাসুদেব বাউল গাইছিলেন ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা’। আমরা ‘ভূমি’-র সবাই ওই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। গানটা এত ভালো লেগেছিল, রেকর্ড করে নিই। এর পর কোচবিহার যাচ্ছিলাম অনুষ্ঠান করতে, ট্রেনে একজন বাউল উঠলেন। উনিও সে দিন 'লাল পাহাড়ি' গাইছিলেন, সঙ্গে ছিল ‘ও নাগর’। সে দিনই আমরা ঠিক করি, গানটা রেকর্ড করব। কিন্তু, তখন গীতিকারের নাম জানতাম না। তাই উল্লেখ করিনি। ভুল করেছিলাম। পরে অরুণদার কাছে ক্ষমাও চেয়েছি’’ গান নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে এক সংবাদপত্রে একথা জানিয়েছিলেন ‘ভূমি’র সৌমিত্র।

লোকাল ট্রেন থেকে বাংলা ব্যান্ড এখনও এই সুরে মাতোয়ারা। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হতে চলেছে লালপাহাড়ি কবিতা। ‘সহজিয়া ফাউন্ডেশন’ গত ৮ জুলাই রবীন্দ্র সদনে সম্মান জানায় ‘লালপাহাড়ি’র স্রষ্টাকে। সেই লাল পাহাড়ের দেশেই হাসি মুখে চলে গেলেন আমাদের সবার প্রিয় অরুন দা। ভালো থাকবেন দাদা। আর চুঁচুড়া স্টেশনে শংকরের চায়ের দোকানে গেলে আপনার দেখা পাবো না। আপনাকে ঘিরে ভীড় করে থাকবে না সেই সাধারণ নানা ধরনের নানা রকমের সব মানুষজন। আর আপনি তাদের হাসি মুখে আবদার মিটিয়ে বলছেন, 

লাল পাহাড়ির দেশে যা,
রাঙা মাটির দেশে যা,
ইতাক তোকে মানাইছেনা রে,
ইক্কেবারে মানাইছেনা রে।

সত্যিই আপনাকে বোধহয় এখানে আর মানাচ্ছিল না দাদা। এই স্বার্থ সঙ্কুল পৃথিবীতে। তাই বোধহয় হাসি মুখে সবাইকে ছেড়ে আপনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। কেউ আর রাস্তায় দেখা হলে লজেন্স দেবে না। হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করবে না কেমন আছো ভাই তুমি। ভালো থাকবেন আপনি দাদা।

তারাদের দেশে অরুণ দা - অভিজিৎ বসু।
তেইশ নভেম্বর, দু হাজার চব্বিশ।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

ভোরের গন্ধ

ভেঙে ফেলা আস্ত একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চোখের আঙিনায়, কেমন দাঁত মুখ বের করে ছন্নছাড়া হয়ে, অতীতকে সযত্নে জড়িয়ে, আঁকড়ে। বাড়ির গাড়ি বারান্দার নিচে জমে থাকা সাইকেলের চাকায়, সুতো জড়িয়ে থাকার মতো কত মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, এই পুরোনো বাড়িতে। বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে সেই জীবনের সোঁদা গন্ধ, ঘাম এর দাগ এখনো লেগে আছে এদিক ওদিক। খুঁজলে হয়তো মিলবে আরও দু চার আনার স্মৃতির অকেজো সব তামাটে পরশ পাথর। আসলে মাটি উপড়ে,স্মৃতির উত্তাপ কে মুছে দিয়ে নতুন করে বিচিত্র সব রোজগারির, অপচেষ্টা আর কি। যে লাভের, লোভের, চেষ্টার গলায় লাগাম আর পরাবে কে। দুর থেকে জানলা দিয়ে দেখি শুকনো কলাপাতার ওই ম্রিয়মান নিষ্ফলা হাসি। বট ফলের আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা, যজ্ঞি ডুমুর গাছের পাতায় পিছলে পড়া স্মৃতির নরম উত্তাপ। যে উত্তাপে আজও জারিত হই আমি অনায়াসেই প্রতিদিন সকাল হলেই। ভোরের বেলায় পাখির ডাক শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ওদের মন কেমন করা কথা শুনতে পাই না আর। বোধহয় ওরাও বুঝে গেছে তাদের গলায় লাগাম পড়েছে এবার আচমকাই। তাই পথ ভুলে তারাও আসেনা আর কিছুতেই  এদিক পানে। পশ্চিমী হাওয়া ঠেল...

ইটিভির বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

কত দিন ধরেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি। সেই কেমন হাসিখুশি জীবন নিয়েও হাজারও বড়ো অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েও কত কুল থাকা যায় সেটা আমি বিশ্বজিৎদাকে দেখে শিখলাম আর কী। সেটা সেই জঙ্গলে মাওবাদী নেতাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হোক বা তাঁদের কোনোও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক। কিম্বা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট এর অফিসে গিয়ে বিমান বসুর সাথে একান্তে কথা বলা হোক। কিম্বা অনিল বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে কথা বলা হোক। কিম্বা সেই মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বন্যাদুর্গত এলাকা আরামবাগ মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাজির হয়েছেন। খুব সম্ভবত বিশ্বজিৎ দা হাজির আকাশ বাংলা চ্যানেল থেকে সেই সময়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কথা বলছেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একটু দূরে। রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। যাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কেউ যেতে না পারি। আমি উত্তেজিত কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে একদম নির্বিকার হাসিমুখ বিশ্বজিৎদার কথা ছাড় তো, আমাদের যেতে না দিলে আমরা কি করবো। প্রচার হবে না ওদেরই। একটু পরেই সেটা বুঝত...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...