সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আলুর দাম বৃদ্ধিতে রাস্তায় মন্ত্রী বেচারাম মান্না

শীত পড়লেই মাঠে আলু ওঠার সময় হয়ে যায়। সেই ছোটো ছোট নতুন আলুর আলুর দম আর মুড়ি‌ বেশ ভালো খাওয়া। আর অন্যদিকে বড়ো বড়ো নতুন আলুর সেই কষা ঝাল ঝাল শুধু আলুর দম এর ফিস্ট হওয়া। সেই সন্ধ্যা থেকেই শ্রীরামপুরে মামার বাড়ির পাশের এঁদোপুকুরের পাশে সেই জাম্বুল গাছের নিচে এই ডিসেম্বর মাসেই ফিস্ট হতো। কাঠের জ্বাল এর রান্না। সেই পাড়ার বড়োরা কানু মামা, ভোদা মামা, ভিজে মামারা থাকতেন। জানিনা আজ হয়তো কানু মামা বেঁচে নেই আর। সেদিন লাহিড়ী পাড়ায় সমীরদের বাড়ী যাওয়ার সময় দেখলাম কানু মামার ছেলে দেবাশীষকে দেখলাম, গম ভাঙ্গানোর মেসিন চালাচ্ছে ও। ওকেই প্রাইভেট টিউশনি পড়াতাম আমি। 


বড়ো রান্নার কড়াইতে রান্না হচ্ছে জোর কদমে। তার সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। রাতের অন্ধকারে সেই শিশির পড়ে ভিজে যাওয়া জাম্বুল গাছের পাতায় লেগে যাচ্ছে ঝাল ঝাল আলুর দমের মন ভালো করা গন্ধ। এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ছে সেই গন্ধ।
আর বড়রা কোমরে হাত দিয়ে সবাই তদারকি করতে ব্যস্ত। আর আমরা যারা ছোটো সেই সময় তখন শাল পাতা জোগাড় করে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। যদি একটু টেস্ট করা যায়, একটুকরো গরম আলু পাওয়া যায় এই আশায়। কপাল ভালো থাকলে গরম ধোঁয়া ওঠা আলুর একটা টুকরো আর একটু গরম লাল ঝোল মিলে যেতো আমাদের ছোটদের। 

ছোটো হাতে শাল পাতা ধরে কেমন গরম ধোঁয়া বের হওয়া দেখতাম একমনে আমরা অপলক নয়নে। দূরে রান্নার টগবগ আওয়াজ আর মন মাতানো গন্ধ ছড়াচ্ছে চারিদিকে। আর আমরা সেই শুধু আলুর দম এর গন্ধ মেখে আনন্দে বুঁদ হয়ে যেতাম। তখন বোধহয় এত সমাজে বড়লোক আর গরীব লোক এর মতো আলুর সংসারেও ভাগাভাগি হয়নি। সেই জ্যোতি আর চন্দ্রমুখীর মত। 

একটাই আলু সেই হাটে মাঠে ঘাটে বাজারে দেখা যেতো সেই জ্যোতি আলু। যে আলুর ঘরে ঘরে তার কদর ছিল বেশ সেই সময়। এক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চল্লিশ বা পঁয়তাল্লিশ টাকার চন্দ্রমুখী আলু কেনা বাবুর ব্যাগে একটা একটা করে আলু বেছে দিয়ে আলু ওলার মুখে কেমন একটা স্মিত গর্বের হাসি। ভাবটা এমন উনি যেন অন্য গ্রহ থেকে আলু কিনতে এসেছেন। 

আর আমার মত ছাপোষা একজন রোজগারহীন কর্মহীন মানুষ যারা যমালয়ে জীবন্ত মানুষের মতো বেঁচে আছে। কম দামের সস্তার জিনিস কিনে যাঁরা দিনাতিপাত করেন বেশ কষ্টে। করুন আর বেজার মুখে বাজার বিক্রেতারা তাদের ব্যাগে পঁয়ত্রিশ টাকার বিনিময়ে এক কেজি আলু বিক্রি করছে বিরস বদনে। পাঁচ কেজি আলু কিনতে গেলে কড়কড়ে দুশো টাকার বিনিময়ে মাত্র পঁচিশ টাকা ফেরত মিলছে আলু বিক্রেতার কাছ থেকে। সারা সপ্তাহের আলু কিনতেই যদি দুশো টাকা চলে যায় তাহলে আর বাজারে আনাজ সবজি কিনব কি করে। মাথায় হাত পড়েছে সাধারণ ক্রেতার। এমনকি যাঁরা জ্যোতি আলু কি সেটা নজর করেন না বাজারে এসে তাঁরাও বলতে শুরু করেছেন হচ্ছেটা কি। 

আসলে আলুর দাম বৃদ্ধি নিয়ে বছরভর এই এক নাটক প্রতিবার হয়ে আসছে। আলুর দাম চল্লিশ এর ঘর পেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে তারা যতই মাটির নিচে তৈরি হওয়া একটি শ্বেতসার সমৃদ্ধ ভূনিম্নস্থ পরিবর্তিত কাণ্ড হোক সেটি কিন্তু আমাদের একমাত্র জীবন। ঠিক যেনো আলু ছাড়া জীবন যেনো আলুনি লাগে আমাদের। তাই এই আলুর দামকে বেঁধে রাখার নিরন্তর প্রয়াস সরকার এর। আর আমাদের জ্বর হলে ডাক্তারবাবুর যেমন এন্টিবায়োটিক দিয়ে জ্বর কমানোর চেষ্টা করেন। আর সরকার প্রতিবছর সেটাই করে আলুর দামকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুতেই বাগে আনতে পারে না সরকার। থার্মোমিটার এর পারা মতো সে দ্রুত ঊর্ধ্বগামী। 

আর তাই সেই চাষী ঘরের ছেলে, মাটির গন্ধ যাঁর গায়ে এখনও লেগে আছে। সেই হুগলীর সিঙ্গুরের রতন পুরের আলুর আড়ত এর পাশেই যাঁর বাড়ী। সেই সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের সময় যাঁর হাত ধরে সিঙ্গুর কৃষিজমি রক্ষা কমিটি তৈরি হয়। যে কৃষিজমি রক্ষা কমিটি চাষের জমিকে শিল্পের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে একটা অনন্য নজির স্থাপন করে। যার ফলশ্রুতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর সিঙ্গুরের কৃষি জমি বাঁচাও আন্দোলন সারা দেশ জুড়ে হৈ হুল্লোড় ফেলে দেয়।

 সেই বিখ্যাত সিঙ্গুর কৃষি জমি রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী বেচারাম মান্নাকে দেখলাম রাতের অন্ধকারে তিনি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনে রাস্তার ওপর। সেখানে পুলিশ সহ দাঁড়িয়ে আছেন মন্ত্রী বেচারাম মান্না স্বয়ং। উদ্যেশ্য একটাই যে করে হোক আলুর লরিকে ভিন রাজ্যে যেতে দেওয়া হবে না। সে বিহার হোক, উড়িষ্যা হোক, কিম্বা অন্য যে কোনো রাজ্যে। আলু বাংলা থেকে রাতের অন্ধকারে পার হয়ে যাবে না কিছুতেই। আগে বাংলার মানুষ ঠিক দামে আলু পাবে তারপর না হয় একটু ভিন্ন চিন্তা করা যাবে। 

এই হুগলী জেলা আলুর জন্য বিখ্যাত। এরপর আছে বর্ধমান, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, বেশ কিছু জেলা যেখানে আলুর ফলন হয় বেশ বেশি পরিমাণে হয়। যে আলু রাজ্যে উৎপাদিত হয় প্রচুর। সেখানে কেনো যে রাতের অন্ধকারে আচমকা মন্ত্রীকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে পাহারা দিতে হয় কে জানে। হয়ত এটা মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ। তাই তিনি নিজেই রাস্তায় নেমে পড়েছেন মন্ত্রী স্বয়ং। কিছুটা পরিস্থিতিকে নিজেদের বাগে আনার জন্য এমন কাজ করছেন রাতে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাতে কিছুতেই না যায় সেদিকেও তাঁর কড়া দৃষ্টি রেখেছেন। যে দৃষ্টি দিয়ে তিনি রাতের বেলাতে আলুর বেআইনি লরিকে ধরতে চাইছেন। 

এইভাবেই তো টাটার ন্যানো প্রকল্পের জন্য ঘেরা জমিকে রাতের বেলায়, দিনের বেলায় কড়া নজরদারি করে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তিনি। যাতে কোনও ভাবেই হাতছাড়া না হয় চাষের জমির। আর আজ সেই জমি অন্দোলন করা বিখ্যাত নেতা বর্তমানের মন্ত্রী বেচারাম মান্না আজ আলুর দাম বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। দেখা যাক মন্ত্রী রাস্তায় নেমে পড়ায় কতটা কাজ হয়। বাজারে গিয়ে তার কতটা সুফল পায় ক্রেতারা। সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও বুঝতে পারে কি না যে আলুর বাম্পার ফলন হলেও এই লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বৃদ্ধি তাহলে কেনো। 

তাহলে কি সবটাই একটা নিয়ম অনুযায়ী ঘটে যাওয়া ঘটনা মাত্র। লোক দেখানো নিয়ম অনুযায়ী সব কিছু ঘটে যায়। প্রতি বছর আলুর দাম ওঠে, আবার দাম নামে। চাষী, ফড়ে, হিমঘর মালিক, আড়তদার, আলু বাছাই করে যারা তারা, যাঁরা মাঠে খেটে চাষ করে তারা সবাই তো এই আলুর দাম এর মাধ্যমে নির্ভর করে তাদের জীবন। ভোট এর বছরে শোনা যায় বাজার তো এই বছর চড়া মূল্য হবেই। যতই সে মাটির নিচের ফসল হোক। তবু কেনো যে এই আলুকে কিছুতেই ফি বছর তার দামকে বেঁধে রাখা যায়না কে জানে। 

সে মাটির নিচের ফসল সাত থেকে দশ হাজার বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ অঞ্চলে প্রথম চাষ করা হয় বলে জানা যায়। পরে এই আলুকে ১৬শ‌ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনীয়রা আমেরিকা থেকে ইউরোপে নিয়ে আসে চাষ শুরু করে। ভুট্টা, গম, ধানের পর আলু বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম খাদ্য শস্য। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫০০০ টি প্রজাতির আলুর জাত দেখা যায়।

বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫,০০০ আলুর জাত রয়েছে। তাদের মধ্যে তিন হাজার শুধুমাত্র আন্দিজ অঞ্চলে পাওয়া যায়, প্রধানত পেরু, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, চিলি এবং কলম্বিয়াতে। শ্রেণিবিন্যাসগত গোষ্ঠীর উপর নির্ভর করে তারা আট বা নয়টি প্রজাতির অন্তর্গত। ৫,০০০টি চাষ করা জাত ছাড়াও, প্রায় ২০০টি বন্য প্রজাতি এবং উপ-প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলিই চাষ করা জাতের সাথে আন্তঃ-প্রজনন করানো যেতে পারে। বন্য প্রজাতির জিন পুল থেকে চাষকৃত আলু প্রজাতির জিন পুলে নির্দিষ্ট কীটপতঙ্গ এবং রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থানান্তর করার জন্য বারবার আন্তঃ-প্রজনন করা হয়েছে।


 ইংরেজি শব্দ potato এসেছে স্পেনীয় patata (স্পেনে ব্যবহৃত নাম) থেকে। "আলু" এর জন্য একটি শব্দ ব্যবহার করার জন্য পরিচিত যা মোটামুটিভাবে ইংরেজিতে "আর্থ অ্যাপেল" বা "গ্রাউন্ড অ্যাপল" হিসাবে অনুবাদ করা যায়। বাংলা ভাষায় "আলু" শব্দের উৎপত্তি বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয় যে আলু চাষের প্রাথমিক সময়ে পেরুর আন্দীয় সভ্যতায় চাষের জমিকে আলু বলা হতো এবং সেখান থেকেই বাংলায় আলু শব্দটি এসেছে। সাধারণত লাল আলু, হলুদ আলু, সাদা আলু আর বেগুনি আলুর সন্ধান পাই আমরা। 

শুধু তাই নয় ভ্যান গগের তুলিতে এই আলুকে নিয়ে ছবি এঁকেছেন তিনি। ১৮৮৫ সালের চিত্রকর্ম দ্য পটেটো ইটারস একটি পরিবারের আলু খাওয়ার দৃশ্যকে চিত্রিত করেছে। ভ্যান গগ বলেছিলেন যে তিনি কৃষকদের তারা যেমন ছিল তেমন চিত্রিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মোটা এবং কুৎসিত মডেলদের বেছে নিয়েছিলেন, এই ভেবে যে তারা তার সমাপ্ত কাজে স্বাভাবিক এবং অস্পষ্ট হবে। 
আর যে আলুর এই সুদীর্ঘ হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। যাকে ছাড়া আমরা বাঁচতেই পারিনা। সেই আলু আজ কেমন করে যেন দুর্মূল্য হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। তাকে আটকাতে তাই পথে নেমেছেন রাজ্যের মন্ত্রী। তবে এতসব ঘটনার মাঝে আমার সেই আলুর দম এর পিকনিক এর কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে আমরা সবাই বেশ কত ভালোভাবেই তো মাটির নিচের এই ফসলকে পেতাম। তাহলে আজ কেনো যে এত টানাটানি কে জানে। সব হয়তো রাজনীতির মারপ্যাঁচ আর কিছুটা হলেও কৃত্রিম উপায়ে দাম বৃদ্ধি করে বাজারে চাহিদার বৃদ্ধি করা। যা হলে লাভ বিক্রেতার, আড়তদারের, কিছুটা চাষীদের। ক্ষতি শুধু আমার আপনার মতো সাধারণ মানুষের ক্রেতাদের। তারা যে সত্যিই বড়ো ভালো নেই। 

আলুর দাম বৃদ্ধিতে রাস্তায় মন্ত্রী বেচারাম মান্না - অভিজিৎ বসু।
চৌঠা ডিসেম্বর, দু হাজার চব্বিশ।
ছবি সৌজন্যে ফেসবুক বেচারাম মান্না।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

ভোরের গন্ধ

ভেঙে ফেলা আস্ত একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চোখের আঙিনায়, কেমন দাঁত মুখ বের করে ছন্নছাড়া হয়ে, অতীতকে সযত্নে জড়িয়ে, আঁকড়ে। বাড়ির গাড়ি বারান্দার নিচে জমে থাকা সাইকেলের চাকায়, সুতো জড়িয়ে থাকার মতো কত মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, এই পুরোনো বাড়িতে। বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে সেই জীবনের সোঁদা গন্ধ, ঘাম এর দাগ এখনো লেগে আছে এদিক ওদিক। খুঁজলে হয়তো মিলবে আরও দু চার আনার স্মৃতির অকেজো সব তামাটে পরশ পাথর। আসলে মাটি উপড়ে,স্মৃতির উত্তাপ কে মুছে দিয়ে নতুন করে বিচিত্র সব রোজগারির, অপচেষ্টা আর কি। যে লাভের, লোভের, চেষ্টার গলায় লাগাম আর পরাবে কে। দুর থেকে জানলা দিয়ে দেখি শুকনো কলাপাতার ওই ম্রিয়মান নিষ্ফলা হাসি। বট ফলের আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা, যজ্ঞি ডুমুর গাছের পাতায় পিছলে পড়া স্মৃতির নরম উত্তাপ। যে উত্তাপে আজও জারিত হই আমি অনায়াসেই প্রতিদিন সকাল হলেই। ভোরের বেলায় পাখির ডাক শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ওদের মন কেমন করা কথা শুনতে পাই না আর। বোধহয় ওরাও বুঝে গেছে তাদের গলায় লাগাম পড়েছে এবার আচমকাই। তাই পথ ভুলে তারাও আসেনা আর কিছুতেই  এদিক পানে। পশ্চিমী হাওয়া ঠেল...

ইটিভির বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

কত দিন ধরেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি। সেই কেমন হাসিখুশি জীবন নিয়েও হাজারও বড়ো অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েও কত কুল থাকা যায় সেটা আমি বিশ্বজিৎদাকে দেখে শিখলাম আর কী। সেটা সেই জঙ্গলে মাওবাদী নেতাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হোক বা তাঁদের কোনোও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক। কিম্বা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট এর অফিসে গিয়ে বিমান বসুর সাথে একান্তে কথা বলা হোক। কিম্বা অনিল বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে কথা বলা হোক। কিম্বা সেই মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বন্যাদুর্গত এলাকা আরামবাগ মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাজির হয়েছেন। খুব সম্ভবত বিশ্বজিৎ দা হাজির আকাশ বাংলা চ্যানেল থেকে সেই সময়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কথা বলছেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একটু দূরে। রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। যাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কেউ যেতে না পারি। আমি উত্তেজিত কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে একদম নির্বিকার হাসিমুখ বিশ্বজিৎদার কথা ছাড় তো, আমাদের যেতে না দিলে আমরা কি করবো। প্রচার হবে না ওদেরই। একটু পরেই সেটা বুঝত...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...