সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

চেনা শহরে অচেনার ভীড়ে আমি


তিন চাকার টোটো ছেড়ে, পৌষ মেলার পূর্বপল্লীর সেই কুয়াশা মাখা আমার প্রিয় মাঠ ছেড়ে, আমার প্রিয় বোলপুর শহর ছেড়ে, শান্তিনিকেতনের মেলা মাঠ ছেড়ে, আমি চলে এলাম ভীড়ে ঠাসা নিজের শহর পার্ক স্ট্রিটকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করা শহর শ্রীরামপুরে প্রভু যীশুর কাছে। উজ্জ্বল আলোয় ভেসে যাওয়া ঝকঝক করা সেই শ্রীরামপুর শহরে। যে শহর আমার নিজের জন্ম শহর, যে শহর আমার খুব প্রিয় শহর। যে শহর আমার প্রাণের শহর, যে শহর আমার প্রেমের শহর, সেই পুরোনো ইতিহাসে ঘেরা শ্রীরামপুর এর কংক্রিটের জঙ্গল ঘেরা শহরে। যে শহরে হাঁটতে গেলে ধাক্কা খেতে হয় ফ্ল্যাট বাড়ির দেওয়ালে। যে শহরের আকাশের মুখ ঢেকেছে শুধুই হাই রাইজের বিজ্ঞাপনে।


সত্যিই বছর শেষে এই উৎসবের আয়োজন, উৎসবের এই প্রকাশ, উৎসবের এই আতিশয্য বেশ মুগ্ধ করলো আমায়। তাহলে এতদিন এমন অনুষ্ঠান তো হয়নি আগে কখনো কোনোদিন। কেউ তো ভাবেইনি প্রভু যীশুকে নিয়ে এইভাবে। সত্যিই যীশুকে নিয়ে এই ভাবনা, প্রভু যীশুকে এই ভাবে সুন্দর মোড়কে মুড়ে হাসি মুখে তাঁকে বেচে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বেশ মুগ্ধ করলো আমায়। সত্যিই এই আমলে বোধহয় সবকিছুই বেচা যায়। চাকরি থেকে শুরু করে প্রভু যীশুকেও। শহরের ছোটো ছোটো অন্ধকার গলি পথ ছেড়ে প্রধান সড়কে শুধুই প্রভু যীশুকে স্মরণ করে আলোয় মোড়া চেনা পথঘাট যেনো বড়ো বেশি অচেনা হয়ে গেছে আমার কাছে।

 আর হাজার হাজার মানুষের ভীড়। সেই পথ ঘাট পেরিয়ে শুধুই জনস্রোতে মিশে যাওয়া, ভেসে যাওয়া, গা এলিয়ে দেওয়া যে যার মতো করেই। আর নিজের মুঠো ফোনে একটু নিজেকে হাসিমুখে বন্দী করা বুকের মাঝের কষ্টকে, যন্ত্রণাকে লুকিয়ে রেখে চুপটি করে। ঠিক যেভাবে প্রভু যীশুও বন্দী হয়েছিলেন হাসিমুখেই কারাগারে। সত্যিই যীশুর প্রেমে মেতে ওঠা। যেনো কৃষ্ণ প্রেমের চাইতেও বেশি প্রেমের পরশ পাওয়া। বাঙালির এই সদ্য গজিয়ে ওঠা বছর শেষের যীশু প্রেম দেখে বেশ অবাক হলাম আমিও। প্রায় পাঁচশো বছর আগের নিমাই এর প্রেমও কেমন যেনো অনুজ্বল হয়ে গেছে এই যীশু প্রেমের কাছেও। আসলে বোধহয় আমরা হুজুগে মেতে উঠতে বড়ই ভালবাসি। 

এই গঙ্গার তীরের সেই কবেকার আপনমনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন সেন্ট ওলাফ গির্জা, যে গীর্জার বন্ধ ঘড়ি নিয়ে কম হৈচৈ হয়নি কদিন আগেই। সেই গির্জার শহরে তার উপস্থিতি নিয়ে এত মাতামাতি হয়নি আগে কখনও। সেই পোস্ট অফিসের অপরিসর রাস্তা, সেই শ্রীরামপুর স্টেশন এর নিচের গলাপোল এর ভীড়ে ঠাসা করিডোর পার হয়ে পশ্চিম রেলপাড় থেকে স্টেশন পার হয়ে ওপারে পৌঁছবার স্বল্প পরিসরে একটা ভয়ঙ্কর পরিকল্পনাহীন রাস্তায় শুধুই ভীড় আর ভীড় আর ধাক্কাধাক্কি, যানজট, আর প্রভু যীশুর কাছে যাওয়ার, একটু তাঁকে কাছে পাওয়ার, একটু তাঁকে দেখার অদম্য বাসনা সাধারন মানুষের। যে জনস্রোতের ধাক্কায় বেসামাল হয়েও আমিও নেমে পড়লাম সেই চেনা পথে অচেনা মানুষের ভীড়ে আপন মনে আপন ছন্দে।

যে ভীড়ে ঠাসা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ধাক্কা খেতে হয়, মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে হয় তিন চাকার টোটোর সাথে, দু চাকার মোটর সাইকেল এর সাথে, যে যার মতো করেই এগিয়ে যেতে চায় দ্রুত গতিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। রাস্তার দুপাশে ছড়িয়ে পড়েছে নানা দোকানপাট, আর শুধুই ভীড় আর ভীড়। যে যেদিকে পারছে যেভাবে পারছে এগিয়ে চলা। আমিও এগিয়ে যাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। ট্র্যাফিক জ্যামে, দিশাহীনভাবে পুলিশের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে কেমন হাবুডুবু খেলাম আমিও। কোনোভাবেই প্রভু যীশুর সামনে যেতে পারলাম না আমিও। এই ভীড়ের মাঝে লক্ষ্য করা গেলো না শহরের কোনো শান্তি রক্ষাকারী বাহিনীকেও। লক্ষ্য করা গেলোনা সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা করে এই হুজুগে মেতে ওঠা ভীড়কে চার্চের কাছে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা করা পুলিশের ভূমিকা। আসলে মা মাটি মানুষের আমলে পুলিশ বড়ো বেশি ব্যস্ত হয়ে আছেন যীশু খ্রীষ্টের প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে। বন্দুকের নল তো আর ক্ষমতার উৎস নয়। ক্ষমতার উৎস শুধুই প্রেম আর ভালোবাসা আর হরিনাম সংকীর্তন। 

কোনও ভাবে আমি গুঁতো খেয়ে, টোটো আর দু চাকার আর মোটর সাইকেলের দাপটে ত্রস্ত শহরে ভয়ে ভয়ে হেঁটে চলার চেষ্টা করলাম আমিও একটু একটু করে সামনের দিকে। সত্যিই অসাধারণ এই যীশুময় শহরে প্রেমের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে আমার মনে হলো ভাগ্যিস আমিও এসেছিলাম এই চেনা শহরে নিজের চাষাভুসো পোষাক ছেড়ে একটু সাহেবসুবোর বেশ ধরে যীশুকে দেখতে। 

 এই ঘাস ফুলের গন্ধ মাখা শহরে, পঞ্চানন কর্মকারের সেই ছাপার অক্ষর, আর হরফ তৈরীর এই ইতিহাসের খটখট চেনা শব্দের শহরে, সেই শহীদ গোপীনাথ এর শহরে, সেই উইলিয়াম কেরির প্রাণের শহরে, সেই শ্রীরামপুরের গোস্বামীদের রাজবাড়ীর ইতিহাসের গন্ধমাখা শহরে, সেই মহেশের জগন্নাথ দেবের প্রেমের শহরে, সেই রামমোহনের শহরে, যে শহরে আজ বড়ো বেশি আলো, যে শহরে আজ বড়ো বেশি উজ্জ্বলতা, যে শহরে আজ বড়ো বেশি হৈ হুল্লোড়, চিৎকার আর গানের জলসার সুরে বেসামাল সেই শহর। যে শহরের নানা জাতের, নানা ধরনের মানুষ আজ বড়ো বেশি যেনো যীশুময় হয়ে গেছে।

 সত্যিই বেশ অবাক হলাম আমিও। এমন যীশু খ্রীষ্টের প্রতি প্রেম ভালোবাসা তো আগে কখনও চোখে পড়ে নি আমার। ভীড় ঠেলে, উজ্জ্বল আলোর স্পর্শ গায়ে মেখে আনন্দে বেঁচে থাকার চেষ্টা করলাম আমিও। হারিয়ে গেলাম আমার চেনা শহরের অচেনা উজ্জ্বল আলোর পথে। যে পথের ধারে অপেক্ষা করছেন প্রভু যীশু স্বয়ং হাসিমুখে। সবাইকে ভালোবেসে হাজার দোষ অপরাধকে হাসি মুখে ক্ষমা করে দেবার বার্তা নিয়ে। 

চেনা শহরে অচেনার ভীড়ে আমি - অভিজিৎ বসু।
পঁচিশে ডিসেম্বর, দু হাজার চব্বিশ।
ছবি নিজস্ব সংগ্রহ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যা দেখি…প্রতিদিন মনে পড়ে কত… স্মৃতির পথ ধরে হাঁটি… লিখি…

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...

জয় মা মঙ্গলচন্ডী

মা মঙ্গলচণ্ডী, যাঁহার নাম মধুর ও মনোহর, যাঁহার হস্তে বর ও অভয় মুদ্রা, যিনি দ্বিভুজা ও গৌরবর্ণা, যিনি রক্তপদ্মাসনে উপবিষ্টা ও মুকুট দ্বারা উজ্জ্বলরূপে ভূষিতা, যিনি রক্তবর্ণ কৌষেয় (চেলির) বস্ত্র পরিধান করিয়া আছেন, যিনি সহাস্যবদনা, সুন্দরাননা ও নবযৌবনা, যিনি সুন্দরাঙ্গী ও মধুর লাবণ্যযুক্তা, তিনিই হলেন দেবী মঙ্গলচণ্ডী। বিশ্বের মূল স্বরূপা প্রকৃতিদেবীর মুখ হ’তে মঙ্গলচণ্ডী দেবী উৎপন্না হয়েছেন। তিনি সৃষ্টিকার্য্যে মঙ্গলরূপা এবং সংহারকার্য্যে কোপরূপিণী, এইজন্য পণ্ডিতগণ তাঁকে মঙ্গলচণ্ডী বলিয়া অভিহিত করেন।” “দক্ষ অর্থে চণ্ডী এবং কল্যাণ অর্থে মঙ্গল। মঙ্গলকর বস্তুর মধ্যে দক্ষ বলে তিনি মঙ্গলচণ্ডী নামে প্রসিদ্ধ। প্রতি মঙ্গলবারে তাঁহার পূজা বিধেয়। মনু বংশীয় মঙ্গল রাজা নিরন্তর তাঁহার পূজা করিতেন।” জৈষ্ঠ্যমাসের প্রতি মঙ্গলবারে মা চণ্ডীর আরাধনা করা হয় বলে এই ব্রতের নাম মঙ্গলচণ্ডী ব্রত। জীবনে শ্রেষ্ঠ মাঙ্গল্যের প্রতিষ্ঠার জন্যই এ ব্রতের অনুষ্ঠান। মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের নানা রূপ আছে। কুমারীরা যে মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের আচরণ করে, তা অতি সহজ ও সংক্ষিপ্ত। দেবী অপ্রাকৃত মহিমার প্রশস্তিগীতি ব্রতের ছড়ায় এস...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আজ মায়ের দিন

আজ মায়ের দিন। দেখতে দেখতে দেয়ালের এই ছবিটা কেমন যেনো ধূসর হয়ে যাচ্ছে। সেই ছবিতে মা আমার আটকে আছে তিন বছর পার। মা বলে ডাকা হয়নি কতদিন আমার। মায়ের সাথে দেখাও হয় না আর আমার বহুদিন। আর কোনোদিন হবার সম্ভাবনা নেই। তবু এই ভোরবেলায় মায়ের দিন যাপন এর দিনে চারিদিকে শুধুই মায়ের সাথে ছবি দেখে আমার খুব কষ্ট হয় যে। সেই ছোটো বেলার লাঠির মার খেতাম আমি। ভাড়া বাড়ীর সামনে উঠোনে বাঁশে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে মার সেই লাল দাগ হয়ে যাওয়া আজ কিছুই নেই এই জীবনে আমার সব দাগ উবে গেছে কবেই। শুধুই সেই টালির ঘরে সেই কত বছর আগের দেওয়ালে টাঙানো একটি ছবি আছে আর কিছু ধূসর স্মৃতি। যাকে এই রাতদুপুরে কুলুঙ্গি থেকে বের করলেই দু চোখ বেয়ে জল আসে আমার এই বুড়ো বয়সেও।  কেন যে মা আমায় ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি চলে গেলো কে জানে। যে মাকে ২৪ ঘণ্টার কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে এসে চিকিৎসা করতে পারলাম না ওষুধ কিনে দিতে পারলাম না শেষকৃত্যর টাকা জোগাড় করে লোকে দিয়েছে তারপর সেই কাজ করেছি আমি। আর আজ কেন যে এমন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে আমার হৃদয় কে জানে। এতো কান্না জমে ছিল এত দিন পরেও আমার হারিয়ে যাওয়া মায়ের জন্য। যেটা ...