সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কুর্চির টানে


কুর্চির টানে ------

একসময় এই গ্রামটার নাম এক ডাকে সবাই চিনে গেছিলো। শুধু মাত্র বললেই হতো অনাহার এর গ্রাম। অমনি চোখের সামনে ভেসে উঠতো আমলাশোলের নাম জ্বল জ্বল করে। যে নামটা সবাই কে নাড়িয়ে দিয়েছিলো আমাদের সেই সময়। গ্রামের ছবি দেখে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে মিডিয়ার সামনে আওয়াজ তুলে ছিল। এসব কি হচ্ছে কি। মানুষ কেউ এইভাবে বাঁচে, বাঁচতে পারে। এত খিদে নিয়ে বাঁচা যায়। কিন্তু অনাহার যাদের নিত্য সঙ্গী ছিল তারা কি করে বাঁচবে কে জানে।

 মৃত্যুর অভিশপ্ত সেই দিনগুলোর গুজরান করেই তো তারা বেঁচে ছিল কষ্ট করে। দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে, লড়াই করে বাঁচতে চেয়েছিল জীবনে। কিন্তু পারেনি বাঁচতে ওরা। তাই আমরা জানতে পেরেছিলাম তাদের জীবনের গভীর গোপন কথা। যা ফাঁস হয়ে গেছিলো একদিন সংবাদ মাধ্যমে। আর তাতেই হৈ চৈ পড়ে যায় গোটা রাজ্যজুড়ে।

আজ এতদিন পরে আমলাশোল কেমন আছে সেটাই মনে হলো আমার। নিজের চাকরি জীবনে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে হয়েছে অনেক। সরকারি চাকরির সুবাদে সেই সব জেলায় ঘোরা কিন্তু খুব যে সুখকর হয়েছে সেটা নয়। এই জেলাতেও কাজ করতে হয়েছে, কিন্তু সেই দিনের কথা ভুলে যাই কি করে।

 সেই সময় এই আমলাশোলের ঘটনায় নড়ে ওঠে গোটা রাজ্য। একি অবস্থা হলো না খেতে পেয়ে গ্রামের মানুষরা অভুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে থাকতে মারা যাচ্ছে। কেউ দেখার নেই। কেউ খোঁজ নেবার নেই। ২০০৪ সালের ঘটনা এটা। সেই ঘটনার কালো দাগ এখনও লেগে আছ, যার দাগ তোলা কঠিন। 

চাকরি জীবন কাটিয়ে অবসর দিন যাপন চলছে আমার কিছু দিন হল। একেবারেই অবসর যাপন যাকে বলে। সরকারি চাকরির সুবাদে বাম আমলের আমলাশোল এই আমলে কেমন আছে সেটা জানতে মন চায় আমার। একবার ঘুরে দেখে এলে কেমন হয় তাকে। এই ভেবেই খোঁজ খবর নিতে শুরু করলাম আমি। এদিক ওদিক খুঁজে জানতে পারলাম সেই আমলাশোলে রয়েছে সুন্দর হোম-স্টে। আর সেই খবর পেয়ে মনটা কেমন যেন খুশিতে ভরে গেল আমার। আরো ভালো লাগলো যখন সেই হোম স্টের নাম জানলাম কুর্চি। নামটা শুনেই মনটা বড়ো ভালো হয়ে গেলো। সত্যিই বলতে কি আমলাশোলে কুর্চি কে পাবো এতটা আশা করিনি আমি। 

ব্যাগপত্তর নিয়ে গুটি গুটি পায়ে হাজির হবো বলে ঠিক করলাম সেখানেই। সত্যিই বলতে কি কিছু কিছু নাম-এর মধ্যে যেনো একটা অদ্ভুত মায়া লুকিয়ে থাকে। কুর্চিও সেই গোত্রে পরে আমার মনে হয়। কুর্চি ফুল খুব সুন্দর। ঠিক একদম রঙ্গন ফুলের মত।বেশ সুন্দর গন্ধ ওর। পেটের রোগে এই গাছ খুব ভালো কাজ করে বলে জানা যায়। এর আদি বাসস্থান মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারতীয় উপ মহাদেশ ও চীনের কিছু অংশে। সারা বর্ষা ধরেই কুর্চির ফুল ফোটে। আর সেই গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যায় গোটা বাগান। সেই প্রিয় কুর্চি নামের ভালোবাসার ঘর পাবো এই অনাহারের গ্রামে আমি সত্যিই এতটা ভাবিনি, আশা করিনি। 

সত্যিই বলতে কি একদম চুপ চাপ কটা দিন কাটাবো এই আশা নিয়ে ব্যাগ গোছালাম আমি। বেরিয়ে পড়লাম একাই। শহুরে জীবনে অভ্যস্ত আমি ফিরতে চাইলাম কুর্চির আশ্রয়ে, শান্তির আশ্রয়ে কিছুদিনের জন্য আশ্রিত হতে। ওর কাছে নিরালা, নির্জনে একদম চুপ করে ওকে উপভোগ করবো বলে বেরিয়ে পড়লাম।
 কিন্তু তখনও আমি ভাবিনি যে কুর্চির শরীরে বিকাশ ছড়িয়ে গেছে বেশি করে। যাকে কাছ থেকে পাবো বলে গেলাম সে অনেক দূরে সরে গেছে আমাদের জীবন থেকে। এটা যখন দেখতে পেলাম ভালো লাগলো না আমার সত্যিই মনে হলো এত বদল না এলেও হতো বোধহয়।

আমি পৌঁছে গেলাম ওর কাছে ব্যাগপত্তর নিয়ে। কিন্তু সেই গ্রামকে কি পেলাম আমি।সত্যিই বলতে কি কিছুটা আশাহত হলাম। অনাহার যাদের নিত্য সঙ্গী ছিল তারা এখন অনেক বদলে গেছে যেনো। গ্রামের মেঠো পথে এখন কলকাতার বাবু বিবিরা আসছেন ঘন ঘন। গাড়ির আওয়াজ, লাল মাটির ধুলোয় চাপা পড়ে গেছে ওদের জীবনের সহজপাঠ। পেটের ক্ষিধে মেটাতে এখন আর ঘরের শিশুরা নাকি মুড়ি খায় না। কুরকুরে খায় গ্রামের দোকান থেকে কিনে। গ্রামের মেঠো দোকানের পাশে এদিক ওদিক কুরকুরের প্যাকেট পড়ে আছে। যা একদম বিসদৃশ লাগে।তবুও বিকাশের ছোঁয়া পেয়ে কেমন যেনো বদলে গেছে এই অনাহারের গ্রাম।

এই ভাবে ওদের কাছ থেকে দেখবো আমি ভাবিনি। এই সব শুনে অবাক হলাম আমি। তাহলে একদিন যারা ক্ষিদের জ্বালা মেটাতে পিঁপড়ের ডিম ভাজা খেত বলে শুনেছি সেটা কি তাহলে অভিনয় ছিল ওদের। না, বললেন গ্রামের শিক্ষক মধু মান্ডি। গ্রামের এই মানুষটি যিনি নিজেই একটা স্কুল চালান অন্যর কাছে সাহায্য নিয়ে। তিনি বলেন কি আর বলবো আপনাকে বলুন। এত আলোচনা ,এত বড় বড় খবর হয়েছে এই গ্রাম নিয়ে। কিন্তু তারপর এত বিকাশ না হলেও হতো বুঝলেন। এই বিকাশের মাধ্যমে আমাদের যে টুকু নিজস্বতা ছিল সেটা হারিয়ে যেতে বসেছে প্রায়।

আমি তো অবাক ওর কথা শুনে বলেন কি মশাই। বিকাশের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে গোটা দেশ। গোটা রাজ্য আর আপনি অবলীলায় মুখে হাসি নিয়ে বলছেন ওটা একটু কম হলেও ক্ষতি ছিল না। বলতে কি এই কথা শুনে আমি নিজেও একটু অবাক হলাম। কী গভীর সত্য কথা এক লহমায় বলে দিলো এই ছোট্ট মানুষটি নিজের মুখে অবলীলায়।

সত্যিই তো দুই পাশে জঙ্গল, মাঝে পিচঢালা মসৃণ কালো চকচকে, ঝক ঝকে রাস্তা হয়েছে। সত্যিই তো বিকাশ ছড়িয়ে পড়েছে এই রাস্তা ধরে দূরে, অনেক দূরে। আর সেই বিকাশের ছোঁয়া পেয়ে কেমন যেনো একটু অবাক হয়েছে আমলাশোল গ্রাম নিজেই।
যাওয়ার পথে গ্রামের রাস্তায় নজরে পড়ল অ্যাসবেসটসের ছাউনি দেওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। তার পাশে আর একটা পাকা বাড়ি আইসিডিএস সেন্টার। যেখানে ভাত খেয়ে পেট ভরায় গ্রামের শিশুরা।যে ভাতের অভাব ছিল বলেই গ্রামের লোকদের এই ভাবে বেঁচে থাকতে হয়েছে এক সময়।

গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মধু মান্ডি স্মৃতি হাতড়ালেন, এখনকার চেহারা দেখে তখনকার গ্রাম কি আর বুঝতে পারবেন আপনি। তখন এই কাঁকড়াঝোড়ে গাড়ি যাতায়াতের কোনও পাকা রাস্তাও ছিল না। এখন বেলপাহাড়ি হয়ে চমৎকার রাস্তা। সত্যিই তো বলছে সে।অনেক বদলে গেছে এই গ্রাম। হোম স্টে-তে বসে শীতসন্ধ্যার নিঝুম হিমেল অন্ধকারে শুনতে পেলাম দুর রাস্তায় গাড়ির হর্নের আওয়াজ। অন্ধকারের বুক চিরে সাদা আলোর রোশনাই ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে।কারা যেনো শহর থেকে এলো এই কুর্চিতে। সত্যিই তো বিকাশ ছড়িয়ে গেছে গোটা গ্রামেই। চারদিকে ঝিঁঝি পোকার কলতান, তার মাঝে সন্ধ্যায় এসে পৌঁছল নতুন অতিথি। গমগম করে উঠলো এই হোম স্টে। সুন্দরীদের কলতানে মুখরিত হলো চারিদিক। সত্যিই তো এদের দেখে কি মনে হয় এরা উপভোগ করতে এসেছে ছোট্ট গ্রামকে। তাহলে এত মেকি রং বদলে কেনো এসেছে এরা, জানি না আমি।

কিছুটা বিরক্ত হলাম আমি। এইভাবে জানলে সত্যিই আসতাম না আমি। নতুন অতিথিদের কথা কানে এলো, একি এখানে ওয়াই ফাই নেই চলবে কি করে। তাহলে কি অদ্ভূত জায়গা রে বাবা। তার মানে বিকাশ সঠিক ভাবে ছড়িয়ে না পড়লে আমরা সবাই বাঁচতে পারবো না। এই নিঝুম রাতে মনে হলো আমার। সত্যিই কথা বলেছেন ঐ মাস্টার মশাই এত বিকাশ না হলেও হতো হয়তো। তাহলে হয়তো রাতে ঘরে শুয়ে কুর্চির গন্ধ পেতাম আমিও। যে মাস্টারমশাই একদিন এই জঙ্গল মহলের মানুষদের নিয়ে অন্যভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখতেন। বিকাশ এসে তার স্বপ্নকে সফল হতে দেয়নি। তাই তিনিও আজ কোনো ভাবে গা এলিয়ে বেঁচে থাকতে চান এই বদলে যাওয়া নিজের আস্তানায়।

অনেক কিছুই এখনও বাকি রয়েছে কাজের এই গ্রামে। আমলাশোলের প্রাথমিক শিক্ষক মধু জানালেন, অষ্টম শ্রেণি অবধি পড়ার ব্যবস্থাটুকুই রয়েছে। তারপর ওদলচুয়া বা বাঁশপাহাড়ির স্কুল থেকে মাধ্যমিক। অতঃপর শিলদায় কলেজ। দূরের কলেজে যেতে হবে কিন্তু তার আগের পড়া তো করতে হবে।সেই স্কুলটাই তো নেই কাছে। তাহলে কলেজে পড়তে যাবে কি করে।
শিলদা নামটা আজও আমাদের মনে আছে। মাওবাদী বিশৃঙ্খলার সময় সেখানে থানা থেকে বন্দুক লুঠ হয়ে ছিল। সেই বিখ্যাত শিলদায় কলেজ গড়ে উঠেছে।এটাও তো বড়ো বিকাশ একটা। জঙ্গল এখন শুধু একটি বিষয়ের নীরব প্রস্তুতিতে।শুধু ইকো টুরিজ়ম! বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হচ্ছে আরও চার-পাঁচটি রিসর্ট। কাঠ চেরাই ও ড্রিলিং মেশিনের আর্তনাদ,ছেনি হাতুড়ির ঠকাঠক শব্দ। এই নিয়েই এখন বেঁচে আছে আমলাশোল। ঠাণ্ডার মরশুমে পর্যটকের ঢল নেমেছে এই জায়গায়।

অনাহারের দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে আমলাশোল এখন সেই ভালর জন্য দিন গোনে। যে ভালোর জন্য সেখানে আর কুর্চি তার নিজের মতো করে হাসে না। হাসি পেলেও থমকে যায় সে। জঙ্গলের নিঃস্তব্ধ রূপ দেখে মনে হয় সে নিজেও বোধ হয় এই বিকাশের চাপে, কিছুটা হলেও নুজ্ব্য হয়ে গেছে। বিকাশের দাপটে খিদে পেটে নিয়ে স্কুলে আসা পড়ুয়ারা আকাশ পানে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে, তারা ভাবে বড়ো হয়ে এই সব রিসর্টে নিশ্চয়ই তারা একদিন কাজ পাবে। কিছু রোজগার করবে তারা। মোবাইলের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে তারাও। 

আর আমলাশোলে ভোর হয়, রাত হয় নির্দিষ্ট নিয়মে,বিকাশের ঠক ঠক শব্দে। আমি দ্রুত ফিরে আসি কুর্চিকে ছেড়ে। জঙ্গলের নিঃস্তব্ধ রূপকে ছেড়ে ফিরে আসি নিজের ঘরে। বিকাশের আরও কাছে একদম গহ্বরে। দেখি লাল রাস্তার পাশে জঙ্গলের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে বৃদ্ধ মধু মান্ডি। যে বিড় বিড় করে বলে চলেছে এত বিকাশ না হলেও হতো বোধহয়। বেশ তো ছিল আমার এই ভালোবাসার গ্রাম আমলাশোল এক পেট ক্ষিদে নিয়ে।

আমরা তো বদল চেয়ে ছিলাম এক দিন, কিন্তু সেই বদল হয় নি, করতে পারি নি আমরা। আজ কেনো যে বিকাশের দোহাই দিয়ে গ্রামটা এত দ্রুত দলে গেলো কে জানে। স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মধু মাস্টার দূরে জঙ্গলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। কিছুটা আত্মগ্লানি আর এক রাশ অভিমান নিয়ে। কুর্চি দুর থেকে মাথা নিচু করে তা দেখে আর মনে মনে কষ্ট পায়।


কুর্চির টানে - অভিজিৎ বসু।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক।
ডিসেম্বর, দু হাজার তেইশ।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ওই খানে মা পুকুর পাড়ে

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হবে বনবাসী,           কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে           থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে           থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি           ধনুক নিয়ে হাতে। .......রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টুপ টুপ বৃষ্টির দুপুরে এই কবিতার লাইন গুলো দেখে। মনে পড়ে গেলো মার কথা। বাইরে একটানা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কখনো কখনো বেশ জোরে, কোনো সময় একটু কম। মাথার মধ্যে কেমন ঝিম ঝিম করছে এই বৃষ্টির টানা আওয়াজ শুনে।  একটানা আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে একদম চুপ চুপে হয়ে গেছে। পাতার ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে নিচে।গাছের পাতাগুলোর অসময়ে স্নান করে ওদের আবার শরীর খারাপ না হয়।  জানলার ধারে সারাদিন ধরে যে পায়রা গুলো বসে থাকতো আর বক বকম করতো।...

সুসমীর ও আমি

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ আমার কলেজের বন্ধু সুসমীর এর কথা। ওর ভালো নাম সমীর ঘোষ। ওর বাড়ী শ্রীরামপুরে। আমার সাথে ওর আলাপ শ্রীরামপুর কলেজে পড়ার সময়। সেটা আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা হবে। আসলে কলেজের বেঞ্চিতে বসে ওর গলার গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি আমরা সবাই। ছেলে মেয়ে সবাই ওর গানের ভক্ত হয়ে গেলাম একদিন ওর গান শুনেই। মেয়েরা তো ওর ফ্যান হয়ে গেলো ওর গানের জন্য।  পরে আমাদের কলেজ জীবন শেষ করে আমরা এদিক ওদিক টুকটাক কাগজে লেখার জগতে দুজনেই প্রবেশ করেছি আমরা। একদিন খুব সম্ভবত বর্তমান কাগজে বিজ্ঞানের পাতায় দেখলাম সুসমীর দাস নামে এক জনের লেখা বেরিয়েছে।সেই সময় বিজ্ঞানের পাতা দেখতেন বর্তমানের রূপকুমার বসু। আমার সাথেও পড়ে রূপদার আলাপ হয়েছিল এই লেখার সূত্রেই।  মনে পড়ে প্রতি লেখায় পঞ্চাশ টাকা দিত বর্তমান‌ কাগজ সেই সময়। সমীর তখন বিজ্ঞান নিয়ে লিখছে, আকাশবাণী তে নানা অনুষ্ঠান করছে। এরপর তারা নিউজ ডেস্ক এর কাজে যোগদান করে সে। দীর্ঘ দিন তারা নিউজ এর কাজ করেছে সে। এই হলো সুসমীর এর জীবনের রেখাচিত্র।  কিন্তু আমার সাদা জীবনের এমন এক সাদা মানুষের ...

ভূত চতুর্দশীর সেই রাত

জীবনে আলো নেই, এদিকে ঘরে টুনি লাইট লাগাচ্ছি আর স্টাইল করে ছবি তুলছি। সত্যিই কত বিচিত্র আয়োজন আর বিচিত্র জীবন। ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যার আলোকজ্বল এই অমলিন, ঝাপসা, ম্রিয়মান এই ছবিটা ধরা থাকলো আমার জীবনের টাইমলাইনের ফেসবুকের পাতায় আলতো করে।  ঘরের দুয়ারে বাতি দিয়ে অন্ধকারের রাজ্যে চলে যাওয়া। আর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া আমার আত্মীয়দের পথ দেখালাম আমি। হ্যাঁ, যে পথ ধরে আমাদের ছেড়ে যাওয়া মানুষজন এসেছিলেন তাঁরা সেই মহালয়ার পুণ্য প্রভাতে। তাঁদের তর্পণ করে স্বাগত জানিছিলাম আমরা সবাই। এতদিন ধরে এই উৎসবের আনন্দে আলোকমালায় কেমন ঘুরে বেড়ালেন তাঁরা খুশি মনে। আজকের রাত তাঁদের আবার সেই ফিরে যাওয়ার রাত। যে রাতে ঘুম আসেনা কিছুতেই। যে রাতের অন্ধকারে কত কিছুই যে ঘটে যায়।   যাঁরা এতদিন এই পৃথিবীর টানে, আপনজনদের টানে পৃথিবীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই তাঁরাই আজ আমাদের ছেড়ে প্রিয়জনদের সবাইকে ছেড়ে ধীরে ধীরে চলে যাবেন দূরে,অনেক দূরে। আর আমরা তখন ঘরের দুয়ারে, উঠোনে তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে সেই তাঁদের যাত্রাপথকে সুগম করবো আলোক সজ্জা দিয়ে। এটাই হলো ভূত চতুর্দশীর সেই আল...

কুণাল ঘোষের বার্তা ও টোটো চালকের কিছু কথা

কুণাল দার সাথে কাজ করিনি আমি কোনোদিন। বাংলা সংবাদের জগতে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত সাংবাদিক আছেন। যাঁদের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে এই বাংলার মিডিয়ায়। আজ সেই কুণাল ঘোষ সংবাদ প্রতিদিন কাগজ থেকে কনসাল্টিং এডিটর পোস্ট থেকে সরে গেলেন। একদিকে তাঁর বিধায়ক হয়ে যাওয়া সরকার এর বদল হয়ে যাওয়া। আর তাই তিনি প্রতিদিন কাগজের দায়িত্ব থেকে সরে গেলেন তেমন এক বার্তা দিলেন তিনি নিজেই।  কুণাল ঘোষ এর সাথে আমার আলাপ বিশেষ নেই। সেই মহাকরণে করিডর দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের দিকে। তাঁর আগে পিছে সংবাদ মাধ্যমের কাজ করা রিপোর্টারদের ভীড় তাঁকে ঘিরে ভীড় করে আছেন আমিও দূরে আছি দাঁড়িয়ে। সেই বহু বছর আগে হাফ শার্ট পরে বিকেলের দিকে মদন মিত্রের অফিসে আসতেন। ২৪ চৌরঙ্গী রোড এর অফিসে ধর্মতলার কাছে। সান্ধ্য প্রতিদিন কাগজ পকেটে নিয়ে। রণজিৎ থাকতো সেই সময়। সেই সব দিন এর কথা মনে পড়ে যায় আজ আমার। সেই কঠিন বাম আমলে তাঁকে কাজ ছেড়ে চলে যেতে হয়নি একদমই। আর আজ সরকার বদলের সাথে সাথেই দিকে দিকে কাজ ছাড়ার হিড়িক পড়ে গেছে যে চারিদিক জুড়েই এই বাংলার মিডিয়ায়।  ইটিভির কাজের স...

রক্তাক্ত আমি

অর্থহীন, শব্দহীন,জীবনের অপমান বড়ই যন্ত্রণার। জীবনের অনুরণনে অপমানের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, শুনতে শুনতে ধীর পায়ে এগিয়ে চলা। ছিপখান ডিঙ্গি নৌকা বেয়ে নিজের মত করে অন্তরীণ হয়ে ভেসে বেড়ানো, এদিক থেকে ওদিক পানে। শঙ্খচিলের ডানায় তখন, রামধনুর সাত রঙ এর স্বপ্নের ঘুম জড়ানো ভোরের আস্তরণ। শালিকের ভেজা পায়ে, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের বাঙময় অব্যক্ত ধাক্কা। যে ধাক্কায় দ্বিখণ্ডিত হয় জীবনের অর্থ, অনর্থ, সৃষ্টি, অনাসৃষ্টি, সুখ, অসুখ,ভালোবাসা, ঘৃণা আরও কত কি।  চোখ খুলে দেখি বদলে গেছে, জীবনের উপল উপত্যকার ঢেউ খেলানো রাস্তার, সোজাসাপ্টা সেই বহু চেনা গলিপথ। যে গলিপথের চেনা রাস্তায় হাঁটতে নেমে রক্তাক্ত হই আমি বার বার। তবু রাতের আঁধার গায়ে মেখে রক্তাক্ত আমি ঘুরে, বেড়াই এদিক থেকে ওদিক। হাতড়ে খুঁজে বেড়াই রামধনুর রং মাখা ভোর। রক্তাক্ত আমি - অভিজিৎ বসু। ষোলো জুন, দু হাজার চব্বিশ।