সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঝুড়ি

কুমোর-পাড়ার গরুর গাড়ি-
বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি।
গাড়ি চালায় বংশীবদন,
সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন।
হাট বসেছে শুক্রবারে
বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে।
জিনিসপত্র জুটিয়ে এনে
গ্রামের মানুষ বেচে কেনে।
উচ্ছে বেগুন পটল মুলো,
বেতের বোনা ধামা কুলো,
সর্ষে ছোলা ময়দা আটা,
শীতের র‌্যাপার নক্সাকাটা।
ঝাঁঝরি করা বেড়ি হাতা,
শহর থেকে সস্তা ছাতা।
কলসি-ভরা এখো গুড়ে
মাছি যত বেড়ায় উড়ে।
খড়ের আঁটি নৌকো বেয়ে
আনলো ঘাটে চাষির মেয়ে।
অন্ধ কানাই পথের ‘পরে
গান শুনিয়ে ভিক্ষে করে।
পাড়ার ছেলে স্নানের ঘাটে
জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শুক্রবারের হাটে যাবার সৌভাগ্য আমার হয়নি কোনো দিন। কবির লেখায় বেতের বোনা ধামা কুলোও কিনতে পারিনি আমি কোনো দিন। আসলে ঝুড়ি নিয়ে কি করবো আমি সেটাই ভাবার সময় হয়নি কখনো।রান্না ঘরের কোণে অযত্নে পড়ে থাকা ঝুড়িকে উল্টে পাল্টে দেখিনি কোনোদিন আমরা কেউই মনে হয়।

আচ্ছা সেই বংশী বদনের মত যদি হওয়া যেত বেশ মজা হতো তাই না। গুড়ের হাঁড়ি কলসী নিয়ে লাঠি উঁচিয়ে হাট হাট করে এগিয়ে চলা যেত। গ্রামের মেঠো রাস্তা ধরে। ঝুড়ি ভরে বাজার নিয়ে ঘরে ফিরে বাড়ির উঠোনে সব কিছু একসাথে ঢেলে দিয়ে, সুখের সংসারে সবাইকে ডেকে বলা যেত, দেখো দেখো তোমরা সবাই কেমন বাজার এনেছি আমি আজ। 


আর বাড়ির কাকিমা, জেঠিমারা, সব যে যার কাজ ফেলে হাসি মুখে ,ঘর থেকে বেরিয়ে আসতো সবাই। তারপর দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে বলতো বাহ সত্যিই তো বাড়ির ছোটো ছেলেটা বেশ বড় হয়ে গেছে গো আমাদের। আর তারপর নিকানো উঠোনে গড়া গড়ি খেত লাল টুকটুকে টমেটো, যার রং একদম নতুন বিয়ে করা ন কাকিমার ঠোঁটের মতই সুন্দর ছিল।আর সবুজ কামরাঙ্গা আর মেথির সুন্দর গোছা। 

আসলে এই সব ভাবতে বেশ ভালোই লাগে আজকাল আমার। ছোটো ছোটো ঘর, পাশাপাশি গা ঘেঁসে থাকা। একসাথে বাস করা। এক হয়ে মিশে গিয়ে সবাই মিলে সংসারের হাল ধরা। কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাওয়া মাঝ নদীতে ঠিক একা একা নৌকা চালানো নয়। দাঁড় বাওয়া নয়। সবাই মিলে দাঁড় টানা। 


 আসলে এই জড়িয়ে ধরে বেঁচে থাকার মধ্য একটা বেশ আমোদ ফুর্তি টান ছিল একে ওপরের মধ্যে। সেই যে বছর প্রবল জ্বর হলো ছোটো কাকার, সেই বার জেঠিমা তো সারা রাত জেগে কত জল পটি দিলো ছোটো কাকার কপালে। বললো ছোটো তুই একটু ঘুমও আমি জেগে আছি। আর পাশের ঘরের নতুন বিয়ে হওয়া ন কাকিমা তো নতুন কেনা বার্লি গুলে এনে কাকাকে খাইয়ে দিল পরম যত্নে ভালোবেসে। নতুন পড়া কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিল। যে, ন কাকা অফিস যাবার সময় নতুন বউকে না দেখে অফিস বের হতো না কোনো দিন। সেই ন কাকাও কেমন দরজায় মুখ বাড়িয়ে বলে গেলো ছোটো তাড়া তাড়ি খেয়ে নে। সুস্থ হতে হবে তোকে।না হলে এসব সামলাবে কে।

 উঠোনে ছড়িয়ে পড়া বাজারের মতই ভালোবাসা জড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা ছিল সবার মধ্যে। এঘরের বিবাদ,বিপদে পাশের ঘরের মানুষ গুলো কেমন ঝাঁপিয়ে পড়ে তার সমাধান করার চেষ্টা করতো। কি করে যে সব,বদলে গেলো কে জানে। পরম মমতায় যত্নে ঝুড়ি ভরে রাখা হতো সেই সব বাজার। সেই সব দিন গুলো সত্যিই আলাদা ছিল একদম।


আমিও তাই কদিন ধরেই ভাবছিলাম,সেই ঝুড়ি নিয়ে যদি সত্যিই কোনো ভাবে এই ছোটো ঘরে ফিরতে পারি আমি একা একা‌ কেমন হয় তাহলে। যে ঘরে কাকিমা, জেঠিমা, দিদা, মামী আজ কেউই আর নেই আমার। যে ঘর ছেড়ে সবাই দূরে, বহু দূরে চলে গেছে অনেক দিন আগেই। যে ঘর বড়ো ছোটো। যে ঘরে বড়ো উঠোন নেই, দালান নেই, লাল মেঝে নেই। শ্যাওলা পড়া বাথরুম নেই।


যে ঘরের ইঞ্চি মাপা ড্রয়িং রুম , ইঞ্চি মাপা ঘর আর এক চিলতে বারান্দা আছে। মুখ বাড়িয়ে অনেক কষ্টে দুপুর বেলায় একটু রোদ এসে উঁকি মরে সেই বারা- ন্দায়। যে রোদকে গায়ে জোর করে মেখে কেমন আহা কী সুন্দর বলে আমরা তিন জন এ ওর মুখের দিকে তাকাই অপলক নয়নে। আমাদের বোবা দৃষ্টি ঘরের সুন্দর রং করা পাঁচিলের ওপর ধাক্কা মারে আচমকা। আমরা সবাই কেমন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি ইঞ্চি মাপা ঘরে একে অপরের কাছে খুব কাছে। 


যাই হোক যেমন ভাবা তেমনি কাজ। অনেক খুঁজে ঝুড়ি কিনতে বের হলাম আমি। আসলে এই ঝুড়ির মধ্যে থেকে আমি অনেক কিছু ফিরে পেতে চাইলাম। দর দাম করে ঝুড়িও পেলাম ঠিক মনের মতই। ঠিক সেই পুরোনো দালান ওলা একান্নবর্তী পরিবারের সেই ঝুড়ির মতই। মনটা বড়ো ভালো হয়ে গেলো আমার শীতের সন্ধ্যায়।আসলে পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা হলে যেমন ভালো লাগে তেমনি ভাবেই ভালো লাগলো বেশ এই ঝুড়ি কিনতে পেরে।


 সত্যিই তো ঘর ছোটো হোক, ইঞ্চি মাপা ড্রয়িং রুম হোক,আর এক চিলতে বারান্দা হোক।ঝুড়ি তো বড়ো হয়েছে আমার। আর কি চাই। বেশ দরদাম করে মনের আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঝুড়ি মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরলাম আমি শীতের সন্ধ্যায়।

বেশ ভালো মনে আনন্দে ফুর ফুরে মেজাজে ঘরে ফিরছি সস্তার ঝুড়ি কিনে মাথায় করে। আরে রাস্তায় তো মহা বিপদ ঝুড়ি মাথায় লোক দেখে রাস্তার চার পেয়েগুলো কেমন হৈ হৈ করে তেড়ে উঠলো আমায় দেখে। ওদের কথায়, আরে এ আবার কে এলো রে পাড়াতে। কেমন চেনা লোকটা কে, ওদের অচেনা লাগলো মনে হয় তাই এমন চিল চিৎকার জুড়ল ওরা। একদম রাস্তার ধারে চুপ চাপ বসে থাকা সারমেয় গুলো একযোগে দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার ওপর। আমি তো মাথায় ঝুড়ি নিয়ে বেশ ফুর ফুরে মেজাজে ফিরে আসছিলাম। সবটাই কেমন গেলো চটকে। 


একটা পুরনো দিনের টাটকা স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ফিরছিলাম আমি। সেই ভোর বেলায় মামার বাড়িতে, বজরা মামা এই ভাবে ঝুড়ি মাথায় করে ক্ষেতের ফসল তুলে এনে উঠোনে ঢেলে দিয়ে বলতো কর্তা আরো মাঠে তোলা আছে ওগুলো নিয়ে আসি মাঠ থেকে। কর্তা চুপ করে খড়ম পরে কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকতেন সাদা চাদর গায়ে দিয়ে। আর দিদা ছোটো সাদা প্লেট করে লাল সেদ্ধ আগুনে পোড়া বেল মাখা দিয়ে যেত চিনি দিয়ে। কর্তা বসে খেতেন সেটা চামচ দিয়ে একটু একটু করে। শীতের রোদ লুটো পুটি খেত উঠোনে কর্তার পয়ের সামনে। আর সেই রোদে শুয়ে লালু আড় মোড়া ভাঙতো।


 আমরা সব ভীড় করতাম বজরা মামা আর কি আনে দেখার জন্য উঠোনের মাঝে ভীড় করে দাঁড়াতাম সবাই। পুকুর থেকে জাল ফেলে বড়ো মাছ তুলে উঠোনে ঢেলে দিয়ে যেত সোনা চাচা। জ্যান্ত বড়ো মাছটা তখন শীতের নরম রোদে আছাড়ি পিছাড়ি খেত ল্যাজ ঝাপটে। কর্তা সব কিছু আসার পর দিদাকে বলতেন ওদেরকে সব দিয়ে দিও একটু করে। দিদা বলতেন এই তোরা দাঁড়িয়ে যাস সব চলে যাস না। মুড়ি তরকারি খেয়ে টিফিন করে তারপর যাস তোরা আর বাজার নিয়ে যাস ঘরের জন্য।

 কী আষ্টেপৃষ্টে, জড়িয়ে ধরে রাখা জীবন ছিল সব সেই সময়। একদম অন্যরকম ভালোবাসা লুকিয়ে রেখে, সবাই মিলে বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা ছিল। আসলে বোধ হয় জীবনের এই বড়ো-ছোটো, ধনী- দরিদ্র, উঁচু- নিচু, স্ট্যাটাস আপডেট ওলা আর স্ট্যাটাস হীন, ধান্দাবাজ স্বার্থপর আর পরোপকারী আত্ম স্বার্থহীন , শুধুই নিজের জন্য বেঁচে থাকার চেষ্টা করা আর নীরবে নিভৃতে চুপ করে দাঁড়িয়ে অন্যের কথা ভেবে আকুলি বিকুলি করা এসবের মধ্য বেশ একটা ফারাক থাকলেও গভীর গোপন ভালোবাসা লুকিয়ে আছে যে। 

যে ভালবাসা ওই কঠিন কঠোর মানুষটার কাছে আমরা দেখতাম সবাই। দাদুভাই কে প্রতিদিন দুধের বাটির শেষ সরটা আমায় দাদু দিতে ভুলতেন না তিনি কোনো দিনই। ঠিক যেমন করে বজরা মামাদের বাজার দেবার কথা মনে করিয়ে দিতেন তিনি। এটাই বোধ হয় স্বাভাবিক জীবনের নিয়ম। যে নিয়মকে ভেঙে চুরে আমরা নিজেরাই সব ইঞ্চি মাপা জীবনে ঢুকে গেছি একে একে নিজের ইচ্ছায়। 

নিজেদেরকে বদলাতে বদলাতে, ছোটো বারান্দায় এক কোণে চুপ করে একা একা চায়ের কাপ নিয়ে বসে থেকেছি আনমনে মাথার ওপর এক চিলতে আকাশকে বুকে আগলে নিয়ে। আর ভেবেছি সত্যিই কি অসাধারণ অনুভূতি আমাদের, একদম ঠিক ফিতে মাপা অনুভূতি আর ভালোবাসা যার কোনো অংশীদার নেই। শুধু একা আমি তার অংশীদার আর কেউ নয় এর ভাগীদার। 


যে অংশীদারিত্ব নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। বন্ধু মহলে, অফিস মহলে ইঞ্চি মাপা নয়, একদম ফুট,গজ মাপা গর্ব আমাদের। যে গর্বের প্রতিযোগীতায় অংশ নিয়ে একে অপরের সঙ্গে অজানা অচেনা মানুষ হয়ে লড়াই করার বৃথা চেষ্টা করা। সে বন্ধু, শত্রু, সহকর্মী, সহমর্মী যেই হোক না কেনো। 


আসলে এটাই বোধ হয় আমরা। সত্যিই তো এই ভাবেই বেঁচে থাকা কি খুব দরকার। ঝুড়ি মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরছি আমি। কনকনে ঠাণ্ডা গায়ে নিয়ে আমি হাঁটছি ঝুড়ি মাথায় করে একা একা। আশে পাশে কেউ নেই। আমার ফাঁকা ঝুড়ি যেনো ভরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পনে। ফিরে আসছে আমার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা, বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকা মায়া, মমতা আর সহমর্মিতা আর সহানুভূতির ঢেউ ধাক্কা মারছে ঝুড়ির ধারে। ঠিক সমুদ্রের তীরে নোনা ঢেউ এর মত।

একটু একটু করে ভারী হয়ে যাচ্ছে আমার খালি ঝুড়িটা। আমি হাঁটছি, আর হাঁটছি। এক দম একা একা হেঁটে চলেছি টল মল পায়ে। চিৎকার করা কুকুর গুলো কেমন করে যেনো চুপ করে গেল হঠাৎ। তাহলে ওরাও কি চিনতে পারলো অবশেষে আমায়, কে জানে, হয়তো তাই পেরেছে তাই অমন চুপ মেরে গেছে ওরা।

ওরা বোধ হয় বুঝতে পারলো আমি শুধু দু পেয়ে আত্মসর্বস্ব একটা জীবমাত্র নই। যে শুধুই ভালবাসার অভিনয় করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে নিরন্তর সারাটা জীবন,তেমন মানুষ নয় আমি। যার মাথার ঝুড়ি থেকে সবুজ কচি লাউ ডগার মত নরম ভেজা ভালোবাসা উপচে উপচে পড়ছে আমার সারা শরীরে, ছড়িয়ে পড়ছে সেই ভালোবাসার সুখস্পর্শ। 

দুলছে, দুলছে আমার হাঁটার তালে তাল মিলিয়ে তারা মাথা তুলে দুলছে। ছোটো ছোটো ভালোবাসার কনা, ভালোবাসার অনুরণন, আমার সারা শরীরে, মনে, ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। আর সেই আমি ফিরে এসেছি আমার ইঞ্চি মাপা ড্রয়িং রুমে, ইঞ্চি মাপা ঘরের ভিতরে। সেই বড়ো ঝুড়িকে মাথায় নিয়ে।

ঝুড়ি - অভিজিৎ বসু।
একুশে জানুয়ারী দু হাজার চব্বিশ।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক ও নিজের ফোনে তোলা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ওই খানে মা পুকুর পাড়ে

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হবে বনবাসী,           কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে           থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে           থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি           ধনুক নিয়ে হাতে। .......রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টুপ টুপ বৃষ্টির দুপুরে এই কবিতার লাইন গুলো দেখে। মনে পড়ে গেলো মার কথা। বাইরে একটানা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কখনো কখনো বেশ জোরে, কোনো সময় একটু কম। মাথার মধ্যে কেমন ঝিম ঝিম করছে এই বৃষ্টির টানা আওয়াজ শুনে।  একটানা আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে একদম চুপ চুপে হয়ে গেছে। পাতার ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে নিচে।গাছের পাতাগুলোর অসময়ে স্নান করে ওদের আবার শরীর খারাপ না হয়।  জানলার ধারে সারাদিন ধরে যে পায়রা গুলো বসে থাকতো আর বক বকম করতো।...

সুসমীর ও আমি

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ আমার কলেজের বন্ধু সুসমীর এর কথা। ওর ভালো নাম সমীর ঘোষ। ওর বাড়ী শ্রীরামপুরে। আমার সাথে ওর আলাপ শ্রীরামপুর কলেজে পড়ার সময়। সেটা আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা হবে। আসলে কলেজের বেঞ্চিতে বসে ওর গলার গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি আমরা সবাই। ছেলে মেয়ে সবাই ওর গানের ভক্ত হয়ে গেলাম একদিন ওর গান শুনেই। মেয়েরা তো ওর ফ্যান হয়ে গেলো ওর গানের জন্য।  পরে আমাদের কলেজ জীবন শেষ করে আমরা এদিক ওদিক টুকটাক কাগজে লেখার জগতে দুজনেই প্রবেশ করেছি আমরা। একদিন খুব সম্ভবত বর্তমান কাগজে বিজ্ঞানের পাতায় দেখলাম সুসমীর দাস নামে এক জনের লেখা বেরিয়েছে।সেই সময় বিজ্ঞানের পাতা দেখতেন বর্তমানের রূপকুমার বসু। আমার সাথেও পড়ে রূপদার আলাপ হয়েছিল এই লেখার সূত্রেই।  মনে পড়ে প্রতি লেখায় পঞ্চাশ টাকা দিত বর্তমান‌ কাগজ সেই সময়। সমীর তখন বিজ্ঞান নিয়ে লিখছে, আকাশবাণী তে নানা অনুষ্ঠান করছে। এরপর তারা নিউজ ডেস্ক এর কাজে যোগদান করে সে। দীর্ঘ দিন তারা নিউজ এর কাজ করেছে সে। এই হলো সুসমীর এর জীবনের রেখাচিত্র।  কিন্তু আমার সাদা জীবনের এমন এক সাদা মানুষের ...

ভূত চতুর্দশীর সেই রাত

জীবনে আলো নেই, এদিকে ঘরে টুনি লাইট লাগাচ্ছি আর স্টাইল করে ছবি তুলছি। সত্যিই কত বিচিত্র আয়োজন আর বিচিত্র জীবন। ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যার আলোকজ্বল এই অমলিন, ঝাপসা, ম্রিয়মান এই ছবিটা ধরা থাকলো আমার জীবনের টাইমলাইনের ফেসবুকের পাতায় আলতো করে।  ঘরের দুয়ারে বাতি দিয়ে অন্ধকারের রাজ্যে চলে যাওয়া। আর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া আমার আত্মীয়দের পথ দেখালাম আমি। হ্যাঁ, যে পথ ধরে আমাদের ছেড়ে যাওয়া মানুষজন এসেছিলেন তাঁরা সেই মহালয়ার পুণ্য প্রভাতে। তাঁদের তর্পণ করে স্বাগত জানিছিলাম আমরা সবাই। এতদিন ধরে এই উৎসবের আনন্দে আলোকমালায় কেমন ঘুরে বেড়ালেন তাঁরা খুশি মনে। আজকের রাত তাঁদের আবার সেই ফিরে যাওয়ার রাত। যে রাতে ঘুম আসেনা কিছুতেই। যে রাতের অন্ধকারে কত কিছুই যে ঘটে যায়।   যাঁরা এতদিন এই পৃথিবীর টানে, আপনজনদের টানে পৃথিবীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই তাঁরাই আজ আমাদের ছেড়ে প্রিয়জনদের সবাইকে ছেড়ে ধীরে ধীরে চলে যাবেন দূরে,অনেক দূরে। আর আমরা তখন ঘরের দুয়ারে, উঠোনে তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে সেই তাঁদের যাত্রাপথকে সুগম করবো আলোক সজ্জা দিয়ে। এটাই হলো ভূত চতুর্দশীর সেই আল...

কুণাল ঘোষের বার্তা ও টোটো চালকের কিছু কথা

কুণাল দার সাথে কাজ করিনি আমি কোনোদিন। বাংলা সংবাদের জগতে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত সাংবাদিক আছেন। যাঁদের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে এই বাংলার মিডিয়ায়। আজ সেই কুণাল ঘোষ সংবাদ প্রতিদিন কাগজ থেকে কনসাল্টিং এডিটর পোস্ট থেকে সরে গেলেন। একদিকে তাঁর বিধায়ক হয়ে যাওয়া সরকার এর বদল হয়ে যাওয়া। আর তাই তিনি প্রতিদিন কাগজের দায়িত্ব থেকে সরে গেলেন তেমন এক বার্তা দিলেন তিনি নিজেই।  কুণাল ঘোষ এর সাথে আমার আলাপ বিশেষ নেই। সেই মহাকরণে করিডর দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের দিকে। তাঁর আগে পিছে সংবাদ মাধ্যমের কাজ করা রিপোর্টারদের ভীড় তাঁকে ঘিরে ভীড় করে আছেন আমিও দূরে আছি দাঁড়িয়ে। সেই বহু বছর আগে হাফ শার্ট পরে বিকেলের দিকে মদন মিত্রের অফিসে আসতেন। ২৪ চৌরঙ্গী রোড এর অফিসে ধর্মতলার কাছে। সান্ধ্য প্রতিদিন কাগজ পকেটে নিয়ে। রণজিৎ থাকতো সেই সময়। সেই সব দিন এর কথা মনে পড়ে যায় আজ আমার। সেই কঠিন বাম আমলে তাঁকে কাজ ছেড়ে চলে যেতে হয়নি একদমই। আর আজ সরকার বদলের সাথে সাথেই দিকে দিকে কাজ ছাড়ার হিড়িক পড়ে গেছে যে চারিদিক জুড়েই এই বাংলার মিডিয়ায়।  ইটিভির কাজের স...

রক্তাক্ত আমি

অর্থহীন, শব্দহীন,জীবনের অপমান বড়ই যন্ত্রণার। জীবনের অনুরণনে অপমানের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, শুনতে শুনতে ধীর পায়ে এগিয়ে চলা। ছিপখান ডিঙ্গি নৌকা বেয়ে নিজের মত করে অন্তরীণ হয়ে ভেসে বেড়ানো, এদিক থেকে ওদিক পানে। শঙ্খচিলের ডানায় তখন, রামধনুর সাত রঙ এর স্বপ্নের ঘুম জড়ানো ভোরের আস্তরণ। শালিকের ভেজা পায়ে, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের বাঙময় অব্যক্ত ধাক্কা। যে ধাক্কায় দ্বিখণ্ডিত হয় জীবনের অর্থ, অনর্থ, সৃষ্টি, অনাসৃষ্টি, সুখ, অসুখ,ভালোবাসা, ঘৃণা আরও কত কি।  চোখ খুলে দেখি বদলে গেছে, জীবনের উপল উপত্যকার ঢেউ খেলানো রাস্তার, সোজাসাপ্টা সেই বহু চেনা গলিপথ। যে গলিপথের চেনা রাস্তায় হাঁটতে নেমে রক্তাক্ত হই আমি বার বার। তবু রাতের আঁধার গায়ে মেখে রক্তাক্ত আমি ঘুরে, বেড়াই এদিক থেকে ওদিক। হাতড়ে খুঁজে বেড়াই রামধনুর রং মাখা ভোর। রক্তাক্ত আমি - অভিজিৎ বসু। ষোলো জুন, দু হাজার চব্বিশ।