সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঝুড়ি

কুমোর-পাড়ার গরুর গাড়ি-
বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি।
গাড়ি চালায় বংশীবদন,
সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন।
হাট বসেছে শুক্রবারে
বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে।
জিনিসপত্র জুটিয়ে এনে
গ্রামের মানুষ বেচে কেনে।
উচ্ছে বেগুন পটল মুলো,
বেতের বোনা ধামা কুলো,
সর্ষে ছোলা ময়দা আটা,
শীতের র‌্যাপার নক্সাকাটা।
ঝাঁঝরি করা বেড়ি হাতা,
শহর থেকে সস্তা ছাতা।
কলসি-ভরা এখো গুড়ে
মাছি যত বেড়ায় উড়ে।
খড়ের আঁটি নৌকো বেয়ে
আনলো ঘাটে চাষির মেয়ে।
অন্ধ কানাই পথের ‘পরে
গান শুনিয়ে ভিক্ষে করে।
পাড়ার ছেলে স্নানের ঘাটে
জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শুক্রবারের হাটে যাবার সৌভাগ্য আমার হয়নি কোনো দিন। কবির লেখায় বেতের বোনা ধামা কুলোও কিনতে পারিনি আমি কোনো দিন। আসলে ঝুড়ি নিয়ে কি করবো আমি সেটাই ভাবার সময় হয়নি কখনো।রান্না ঘরের কোণে অযত্নে পড়ে থাকা ঝুড়িকে উল্টে পাল্টে দেখিনি কোনোদিন আমরা কেউই মনে হয়।

আচ্ছা সেই বংশী বদনের মত যদি হওয়া যেত বেশ মজা হতো তাই না। গুড়ের হাঁড়ি কলসী নিয়ে লাঠি উঁচিয়ে হাট হাট করে এগিয়ে চলা যেত। গ্রামের মেঠো রাস্তা ধরে। ঝুড়ি ভরে বাজার নিয়ে ঘরে ফিরে বাড়ির উঠোনে সব কিছু একসাথে ঢেলে দিয়ে, সুখের সংসারে সবাইকে ডেকে বলা যেত, দেখো দেখো তোমরা সবাই কেমন বাজার এনেছি আমি আজ। 


আর বাড়ির কাকিমা, জেঠিমারা, সব যে যার কাজ ফেলে হাসি মুখে ,ঘর থেকে বেরিয়ে আসতো সবাই। তারপর দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে বলতো বাহ সত্যিই তো বাড়ির ছোটো ছেলেটা বেশ বড় হয়ে গেছে গো আমাদের। আর তারপর নিকানো উঠোনে গড়া গড়ি খেত লাল টুকটুকে টমেটো, যার রং একদম নতুন বিয়ে করা ন কাকিমার ঠোঁটের মতই সুন্দর ছিল।আর সবুজ কামরাঙ্গা আর মেথির সুন্দর গোছা। 

আসলে এই সব ভাবতে বেশ ভালোই লাগে আজকাল আমার। ছোটো ছোটো ঘর, পাশাপাশি গা ঘেঁসে থাকা। একসাথে বাস করা। এক হয়ে মিশে গিয়ে সবাই মিলে সংসারের হাল ধরা। কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাওয়া মাঝ নদীতে ঠিক একা একা নৌকা চালানো নয়। দাঁড় বাওয়া নয়। সবাই মিলে দাঁড় টানা। 


 আসলে এই জড়িয়ে ধরে বেঁচে থাকার মধ্য একটা বেশ আমোদ ফুর্তি টান ছিল একে ওপরের মধ্যে। সেই যে বছর প্রবল জ্বর হলো ছোটো কাকার, সেই বার জেঠিমা তো সারা রাত জেগে কত জল পটি দিলো ছোটো কাকার কপালে। বললো ছোটো তুই একটু ঘুমও আমি জেগে আছি। আর পাশের ঘরের নতুন বিয়ে হওয়া ন কাকিমা তো নতুন কেনা বার্লি গুলে এনে কাকাকে খাইয়ে দিল পরম যত্নে ভালোবেসে। নতুন পড়া কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিল। যে, ন কাকা অফিস যাবার সময় নতুন বউকে না দেখে অফিস বের হতো না কোনো দিন। সেই ন কাকাও কেমন দরজায় মুখ বাড়িয়ে বলে গেলো ছোটো তাড়া তাড়ি খেয়ে নে। সুস্থ হতে হবে তোকে।না হলে এসব সামলাবে কে।

 উঠোনে ছড়িয়ে পড়া বাজারের মতই ভালোবাসা জড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা ছিল সবার মধ্যে। এঘরের বিবাদ,বিপদে পাশের ঘরের মানুষ গুলো কেমন ঝাঁপিয়ে পড়ে তার সমাধান করার চেষ্টা করতো। কি করে যে সব,বদলে গেলো কে জানে। পরম মমতায় যত্নে ঝুড়ি ভরে রাখা হতো সেই সব বাজার। সেই সব দিন গুলো সত্যিই আলাদা ছিল একদম।


আমিও তাই কদিন ধরেই ভাবছিলাম,সেই ঝুড়ি নিয়ে যদি সত্যিই কোনো ভাবে এই ছোটো ঘরে ফিরতে পারি আমি একা একা‌ কেমন হয় তাহলে। যে ঘরে কাকিমা, জেঠিমা, দিদা, মামী আজ কেউই আর নেই আমার। যে ঘর ছেড়ে সবাই দূরে, বহু দূরে চলে গেছে অনেক দিন আগেই। যে ঘর বড়ো ছোটো। যে ঘরে বড়ো উঠোন নেই, দালান নেই, লাল মেঝে নেই। শ্যাওলা পড়া বাথরুম নেই।


যে ঘরের ইঞ্চি মাপা ড্রয়িং রুম , ইঞ্চি মাপা ঘর আর এক চিলতে বারান্দা আছে। মুখ বাড়িয়ে অনেক কষ্টে দুপুর বেলায় একটু রোদ এসে উঁকি মরে সেই বারা- ন্দায়। যে রোদকে গায়ে জোর করে মেখে কেমন আহা কী সুন্দর বলে আমরা তিন জন এ ওর মুখের দিকে তাকাই অপলক নয়নে। আমাদের বোবা দৃষ্টি ঘরের সুন্দর রং করা পাঁচিলের ওপর ধাক্কা মারে আচমকা। আমরা সবাই কেমন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি ইঞ্চি মাপা ঘরে একে অপরের কাছে খুব কাছে। 


যাই হোক যেমন ভাবা তেমনি কাজ। অনেক খুঁজে ঝুড়ি কিনতে বের হলাম আমি। আসলে এই ঝুড়ির মধ্যে থেকে আমি অনেক কিছু ফিরে পেতে চাইলাম। দর দাম করে ঝুড়িও পেলাম ঠিক মনের মতই। ঠিক সেই পুরোনো দালান ওলা একান্নবর্তী পরিবারের সেই ঝুড়ির মতই। মনটা বড়ো ভালো হয়ে গেলো আমার শীতের সন্ধ্যায়।আসলে পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা হলে যেমন ভালো লাগে তেমনি ভাবেই ভালো লাগলো বেশ এই ঝুড়ি কিনতে পেরে।


 সত্যিই তো ঘর ছোটো হোক, ইঞ্চি মাপা ড্রয়িং রুম হোক,আর এক চিলতে বারান্দা হোক।ঝুড়ি তো বড়ো হয়েছে আমার। আর কি চাই। বেশ দরদাম করে মনের আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঝুড়ি মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরলাম আমি শীতের সন্ধ্যায়।

বেশ ভালো মনে আনন্দে ফুর ফুরে মেজাজে ঘরে ফিরছি সস্তার ঝুড়ি কিনে মাথায় করে। আরে রাস্তায় তো মহা বিপদ ঝুড়ি মাথায় লোক দেখে রাস্তার চার পেয়েগুলো কেমন হৈ হৈ করে তেড়ে উঠলো আমায় দেখে। ওদের কথায়, আরে এ আবার কে এলো রে পাড়াতে। কেমন চেনা লোকটা কে, ওদের অচেনা লাগলো মনে হয় তাই এমন চিল চিৎকার জুড়ল ওরা। একদম রাস্তার ধারে চুপ চাপ বসে থাকা সারমেয় গুলো একযোগে দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার ওপর। আমি তো মাথায় ঝুড়ি নিয়ে বেশ ফুর ফুরে মেজাজে ফিরে আসছিলাম। সবটাই কেমন গেলো চটকে। 


একটা পুরনো দিনের টাটকা স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ফিরছিলাম আমি। সেই ভোর বেলায় মামার বাড়িতে, বজরা মামা এই ভাবে ঝুড়ি মাথায় করে ক্ষেতের ফসল তুলে এনে উঠোনে ঢেলে দিয়ে বলতো কর্তা আরো মাঠে তোলা আছে ওগুলো নিয়ে আসি মাঠ থেকে। কর্তা চুপ করে খড়ম পরে কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকতেন সাদা চাদর গায়ে দিয়ে। আর দিদা ছোটো সাদা প্লেট করে লাল সেদ্ধ আগুনে পোড়া বেল মাখা দিয়ে যেত চিনি দিয়ে। কর্তা বসে খেতেন সেটা চামচ দিয়ে একটু একটু করে। শীতের রোদ লুটো পুটি খেত উঠোনে কর্তার পয়ের সামনে। আর সেই রোদে শুয়ে লালু আড় মোড়া ভাঙতো।


 আমরা সব ভীড় করতাম বজরা মামা আর কি আনে দেখার জন্য উঠোনের মাঝে ভীড় করে দাঁড়াতাম সবাই। পুকুর থেকে জাল ফেলে বড়ো মাছ তুলে উঠোনে ঢেলে দিয়ে যেত সোনা চাচা। জ্যান্ত বড়ো মাছটা তখন শীতের নরম রোদে আছাড়ি পিছাড়ি খেত ল্যাজ ঝাপটে। কর্তা সব কিছু আসার পর দিদাকে বলতেন ওদেরকে সব দিয়ে দিও একটু করে। দিদা বলতেন এই তোরা দাঁড়িয়ে যাস সব চলে যাস না। মুড়ি তরকারি খেয়ে টিফিন করে তারপর যাস তোরা আর বাজার নিয়ে যাস ঘরের জন্য।

 কী আষ্টেপৃষ্টে, জড়িয়ে ধরে রাখা জীবন ছিল সব সেই সময়। একদম অন্যরকম ভালোবাসা লুকিয়ে রেখে, সবাই মিলে বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা ছিল। আসলে বোধ হয় জীবনের এই বড়ো-ছোটো, ধনী- দরিদ্র, উঁচু- নিচু, স্ট্যাটাস আপডেট ওলা আর স্ট্যাটাস হীন, ধান্দাবাজ স্বার্থপর আর পরোপকারী আত্ম স্বার্থহীন , শুধুই নিজের জন্য বেঁচে থাকার চেষ্টা করা আর নীরবে নিভৃতে চুপ করে দাঁড়িয়ে অন্যের কথা ভেবে আকুলি বিকুলি করা এসবের মধ্য বেশ একটা ফারাক থাকলেও গভীর গোপন ভালোবাসা লুকিয়ে আছে যে। 

যে ভালবাসা ওই কঠিন কঠোর মানুষটার কাছে আমরা দেখতাম সবাই। দাদুভাই কে প্রতিদিন দুধের বাটির শেষ সরটা আমায় দাদু দিতে ভুলতেন না তিনি কোনো দিনই। ঠিক যেমন করে বজরা মামাদের বাজার দেবার কথা মনে করিয়ে দিতেন তিনি। এটাই বোধ হয় স্বাভাবিক জীবনের নিয়ম। যে নিয়মকে ভেঙে চুরে আমরা নিজেরাই সব ইঞ্চি মাপা জীবনে ঢুকে গেছি একে একে নিজের ইচ্ছায়। 

নিজেদেরকে বদলাতে বদলাতে, ছোটো বারান্দায় এক কোণে চুপ করে একা একা চায়ের কাপ নিয়ে বসে থেকেছি আনমনে মাথার ওপর এক চিলতে আকাশকে বুকে আগলে নিয়ে। আর ভেবেছি সত্যিই কি অসাধারণ অনুভূতি আমাদের, একদম ঠিক ফিতে মাপা অনুভূতি আর ভালোবাসা যার কোনো অংশীদার নেই। শুধু একা আমি তার অংশীদার আর কেউ নয় এর ভাগীদার। 


যে অংশীদারিত্ব নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। বন্ধু মহলে, অফিস মহলে ইঞ্চি মাপা নয়, একদম ফুট,গজ মাপা গর্ব আমাদের। যে গর্বের প্রতিযোগীতায় অংশ নিয়ে একে অপরের সঙ্গে অজানা অচেনা মানুষ হয়ে লড়াই করার বৃথা চেষ্টা করা। সে বন্ধু, শত্রু, সহকর্মী, সহমর্মী যেই হোক না কেনো। 


আসলে এটাই বোধ হয় আমরা। সত্যিই তো এই ভাবেই বেঁচে থাকা কি খুব দরকার। ঝুড়ি মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরছি আমি। কনকনে ঠাণ্ডা গায়ে নিয়ে আমি হাঁটছি ঝুড়ি মাথায় করে একা একা। আশে পাশে কেউ নেই। আমার ফাঁকা ঝুড়ি যেনো ভরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পনে। ফিরে আসছে আমার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা, বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকা মায়া, মমতা আর সহমর্মিতা আর সহানুভূতির ঢেউ ধাক্কা মারছে ঝুড়ির ধারে। ঠিক সমুদ্রের তীরে নোনা ঢেউ এর মত।

একটু একটু করে ভারী হয়ে যাচ্ছে আমার খালি ঝুড়িটা। আমি হাঁটছি, আর হাঁটছি। এক দম একা একা হেঁটে চলেছি টল মল পায়ে। চিৎকার করা কুকুর গুলো কেমন করে যেনো চুপ করে গেল হঠাৎ। তাহলে ওরাও কি চিনতে পারলো অবশেষে আমায়, কে জানে, হয়তো তাই পেরেছে তাই অমন চুপ মেরে গেছে ওরা।

ওরা বোধ হয় বুঝতে পারলো আমি শুধু দু পেয়ে আত্মসর্বস্ব একটা জীবমাত্র নই। যে শুধুই ভালবাসার অভিনয় করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে নিরন্তর সারাটা জীবন,তেমন মানুষ নয় আমি। যার মাথার ঝুড়ি থেকে সবুজ কচি লাউ ডগার মত নরম ভেজা ভালোবাসা উপচে উপচে পড়ছে আমার সারা শরীরে, ছড়িয়ে পড়ছে সেই ভালোবাসার সুখস্পর্শ। 

দুলছে, দুলছে আমার হাঁটার তালে তাল মিলিয়ে তারা মাথা তুলে দুলছে। ছোটো ছোটো ভালোবাসার কনা, ভালোবাসার অনুরণন, আমার সারা শরীরে, মনে, ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। আর সেই আমি ফিরে এসেছি আমার ইঞ্চি মাপা ড্রয়িং রুমে, ইঞ্চি মাপা ঘরের ভিতরে। সেই বড়ো ঝুড়িকে মাথায় নিয়ে।

ঝুড়ি - অভিজিৎ বসু।
একুশে জানুয়ারী দু হাজার চব্বিশ।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক ও নিজের ফোনে তোলা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

ভোরের গন্ধ

ভেঙে ফেলা আস্ত একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চোখের আঙিনায়, কেমন দাঁত মুখ বের করে ছন্নছাড়া হয়ে, অতীতকে সযত্নে জড়িয়ে, আঁকড়ে। বাড়ির গাড়ি বারান্দার নিচে জমে থাকা সাইকেলের চাকায়, সুতো জড়িয়ে থাকার মতো কত মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, এই পুরোনো বাড়িতে। বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে সেই জীবনের সোঁদা গন্ধ, ঘাম এর দাগ এখনো লেগে আছে এদিক ওদিক। খুঁজলে হয়তো মিলবে আরও দু চার আনার স্মৃতির অকেজো সব তামাটে পরশ পাথর। আসলে মাটি উপড়ে,স্মৃতির উত্তাপ কে মুছে দিয়ে নতুন করে বিচিত্র সব রোজগারির, অপচেষ্টা আর কি। যে লাভের, লোভের, চেষ্টার গলায় লাগাম আর পরাবে কে। দুর থেকে জানলা দিয়ে দেখি শুকনো কলাপাতার ওই ম্রিয়মান নিষ্ফলা হাসি। বট ফলের আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা, যজ্ঞি ডুমুর গাছের পাতায় পিছলে পড়া স্মৃতির নরম উত্তাপ। যে উত্তাপে আজও জারিত হই আমি অনায়াসেই প্রতিদিন সকাল হলেই। ভোরের বেলায় পাখির ডাক শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ওদের মন কেমন করা কথা শুনতে পাই না আর। বোধহয় ওরাও বুঝে গেছে তাদের গলায় লাগাম পড়েছে এবার আচমকাই। তাই পথ ভুলে তারাও আসেনা আর কিছুতেই  এদিক পানে। পশ্চিমী হাওয়া ঠেল...

ইটিভির বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

কত দিন ধরেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি। সেই কেমন হাসিখুশি জীবন নিয়েও হাজারও বড়ো অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েও কত কুল থাকা যায় সেটা আমি বিশ্বজিৎদাকে দেখে শিখলাম আর কী। সেটা সেই জঙ্গলে মাওবাদী নেতাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হোক বা তাঁদের কোনোও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক। কিম্বা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট এর অফিসে গিয়ে বিমান বসুর সাথে একান্তে কথা বলা হোক। কিম্বা অনিল বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে কথা বলা হোক। কিম্বা সেই মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বন্যাদুর্গত এলাকা আরামবাগ মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাজির হয়েছেন। খুব সম্ভবত বিশ্বজিৎ দা হাজির আকাশ বাংলা চ্যানেল থেকে সেই সময়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কথা বলছেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একটু দূরে। রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। যাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কেউ যেতে না পারি। আমি উত্তেজিত কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে একদম নির্বিকার হাসিমুখ বিশ্বজিৎদার কথা ছাড় তো, আমাদের যেতে না দিলে আমরা কি করবো। প্রচার হবে না ওদেরই। একটু পরেই সেটা বুঝত...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...