বদলে গেছে সোনাঝুরি। বদলে গেছে খোয়াই। বদলে গেছে সেই গ্রামীণ হাটের চিহ্নও। চারিদিকে শুধুই কংক্রিটের জঙ্গল আর জঙ্গলের মাঝে শহুরে মানুষের দাপাদাপি আর শুধুই দাপাদাপি আর দোকানিদের পসরা সাজিয়ে চিৎকার। সেই নতুন কংক্রিটের রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলাম কোথায় গেলো সেই লাল মাটির রাস্তা সে তো উধাও হয়েছে কবেই পুরসভার দাপটে। একি অবস্থা হয়েছে সোনাঝরা সেই সোনাঝুরির হাট এর। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগেও তো এই অবস্থা ছিলো না এই জায়গার। কেমন একটা গা ছমছমে ভাব, সন্ধ্যায় হেঁটে বেড়িয়েছি আমরা এই পথ দিয়েই সেই রাজু টোটোর সাথে এই এলাকায়। সত্যিই এই ভাবে বদলে যেতে হয় তাকে। একদম চিনতে পারছি না যে আমি আজ। আমার চেনা খোয়াই এর একি অবস্থা হলো আজ।
সেই মাঠের মাঝে ছোট্টো শনিবার এর খোয়াই এর সাপ্তাহিক হাট দিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল একদিন। সেই এলাকার কিছু মানুষের রুজি রোজগারের ঠিকানা হলো। সেই কোর্ট দাদু, সেই রাম শ্যামের সামনে গাছ তলায় বসে থাকা শাড়ী বিক্রী করা সংহিতা দি, সেই হার দুল বিক্রি করা বাঁধন মন্ডল, সেই জয়িতাদি কিছু জন আছেন এখনও কেউ আর নেই এই আজকের ভীড় উপচে পড়া হাটে। শুধু বদলে গেছে এই সোনাঝুরি হাট। যার গন্ধ যার কৌলিন্য যার ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন আর দৃষ্টি ভঙ্গী সবটাই কেমন যেন বদলে গেছে এই সময়ে ২০২৫ এর শেষ প্রহরে এসে। যা দেখে আমার মনটা খারাপ হলো বেশ। এই জঙ্গলের টানে ফাঁকা জায়গার টানে এসে কেমন বেমক্কা বোকা বনে গেলাম আমি আজ।
হাট বসেছে শুক্রবারে বকশীগঞ্জে পদ্মাপাড়ে এই হাট তো সেটা নয়। এই হাট এর চারদিকেই শুধু মাত্র ঝাঁ চকচকে রিসর্ট আর রিসর্ট আর জীবনের স্পন্দন ধ্বনিত হয় চারিদিকে। যে স্পন্দনে আমি কিছুতেই স্পন্দিত হতে পারলাম না যে আজ। সত্যিই অসাধারণ এই বদলে যাওয়া সেই আমার প্রিয় এই জঙ্গল এর জায়গার। রাতের বেলায় এই বদলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে লজ্জা পাবে জোছনা রাতের পূর্ণিমার চাঁদও। কী যে লিখবো আমি ভেবে না পাই আর। এটা হাট না হাতিবাগান বা গড়িয়াহাট এর বাজার কে জানে। থিক থিক করছে মানুষের দল। গিজগিজ করছে শহুরে জীবনের ঢেউ। যার ধাক্কায় আমি কেমন বেসামাল হলাম যেনো। তাহলে শহর ছেড়ে এই জায়গায় এসে আমার কী লাভ হলো কে জানে। আমিও যে বেশ বেসামাল।
বছর শেষের পথে সেই ঝলমলে সব সেজে গুজে বেরিয়ে পড়েছেন নানা জন। সেই হাটের মাঝে মাদলের তালে নেচে উঠেছে শহুরে মানুষের মন। সেই এই প্রবল শীতের দুপুরে ছোটো ছোটো পোশাক পড়ে কেমন অকাতরে প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অনেকেই
যে প্রাণের পরশ পাথর এর সন্ধান পেয়ে কেমন যেন বেসামাল সব জীবন আর যৌবন তাদের। সত্যিই তো বেশ মজার বিষয়। রাত পোহালেই পৌষ মেলার আয়োজন আর তাই এই সোনাঝুড়ির রাস্তায় কম পিচের প্রলেপ পড়েছে যে এখন তাড়াহুড়ো করে। আর বোলপুরে ঘুরতে এসে মুঠো ফোনে বন্দী হচ্ছেন অনেকেই ভীড় করে।
বেলাশেষের শুটিং হলো যেখানে সেই খোয়াই এর একি দশা হলো আজ। সেই যে পথে হাঁটতে হাঁটতে কাঁটা ফুটলো নায়িকার পায়ে আর সেই বিখ্যাত নায়ক আর নায়িকার দাঁড়িয়ে পড়া সেই লাল মাটির রাস্তায়। সেই লাল মাটির রাস্তায় আজ ইঁট ও পাটকেল এর সুন্দর মেলবন্ধন। শুধুই রাজনীতির লোকদের সামনে রেখে প্রশাসন আর পুলিশকে সামনে রেখে ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করে যাওয়া একদল মানুষের। লুটে নাও আর লুটে নাও। সেই সুন্দর মনোরম পরিবেশে শুধুই ইঁট এর উপর ইঁট গেঁথে ফেলে নিজের উপার্জন করা। ক্ষতি কী পরিবেশ নষ্ট হলেও বা ক্ষতি কী। পুলিশ, নেতা, মন্ত্রী সব আছেন তো আমাদের সাথেই তাহলে করে যাও যথেচ্ছার। কে আর কী বলবে এই অনিয়ম করলে।
আচ্ছা সেই বীরভূমের বীর ভূমিতে লাল মাটির রাস্তায় যখন লাল পতাকার মিছিল হতো সেই আমলে তো এতো কংক্রিটের জঙ্গল আর হোম স্টে নামক নতুন পাখীর কিচির মিচির শোনা যায়নি তখনও। তাহলে কী যে হলো হঠাৎ করে এই সব জায়গায়। এই বদলে যাওয়া কেনো শুধুই কী রাজনীতির ময়দানে নতুন পাখীর আগমন হোলো বলে। কে জানে হয়তো সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু এই বদলে যাওয়া হাট নিয়ে আমি বেশ দুঃখ পেলাম আজ এই শীতের দুপুরে। যে দুপুর আমায় কেমন করে যেনো উদ্বেগে ফেলে দিলো।
সেই ভিড়ের মাঝে আদিবাসী রমণীদের সাথে গানের তালে নাচ করা শহুরে সুন্দরীর হাত ধরে নাচ শেষে হাতে ওষুধ স্প্রে করে নেওয়া। আর কিছু টাকা দিয়ে ছবি তুলে পোস্ট করা সেই নাচ এর ছবি সমাজ মাধ্যমে আর নিজের স্ট্যাটাস বেড়ে যাওয়া। সত্যিই আসাধারণ কিন্তু বেশ এই সব ব্যবস্থা। সেই বেতের মোড়া বেচা আদিবাসী মহিলার মুখে বেচা কেনা হয়েছে বলে খুশির ঝিলিক। সেই ভাঁড়ে রাবরী আর দই বিক্রি করা লোকদের ব্যবসা হচ্ছে ভালোই চিনতে পেরে বললেন অনেকদিন বাদে এলেন যে আপনি।
শুধুই এলাকার মানুষ এর থেকে বহিরাগতদের ভীড় বেড়েছে এই হাটে আজ। যেন কেনার থেকে বেচার লোক খুবই বেশী। যেনো সেই গ্রামীণ হাটের মাঝে আজ শহুরে মনোরঞ্জনের পোশাক আশাকের নানা জিনিস বিক্রি হচ্ছে এই খোয়াই এর হাটে। তাহলে সেই নিজেদের হাতের জিনিস তৈরী করা সব লোকজন এর কী যে হলো আজ কে জানে। তাঁরা সব গেলেন কোথায় কে জানে হয়তো কেউ হারিয়ে গেছেন। তাঁরা সবাই এই সোনাঝুরির হাটের মতোই।
শুধুই দাঁড়িয়ে আছে ভীড় উপচে পড়া এই সোনাঝুরি হাট।, হটের ক্রেতা আর বিক্রেতা। যে হাট বসেছে না কী বাজার বসেছে কে জানে। তবুও যে খোয়াই এর এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় সেই জঙ্গলের পথে বদলে গেলো সোনাঝুড়ির সেই অতীত এর চিহ্ন। যে চিহ্নকে বুকে নিয়েই তো বেঁচে থাকা।
হারিয়ে যাওয়া সোনাঝুড়ি - অভিজিৎ বসু।
কুড়ি ডিসেম্বর দু হাজার পঁচিশ।
ছবি সৌজন্য নিজের মোবাইল ক্যামেরায় তোলা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন