আজ মায়ের দিন। দেখতে দেখতে দেয়ালের এই ছবিটা কেমন যেনো ধূসর হয়ে যাচ্ছে। সেই ছবিতে মা আমার আটকে আছে তিন বছর পার। মা বলে ডাকা হয়নি কতদিন আমার। মায়ের সাথে দেখাও হয় না আর আমার বহুদিন। আর কোনোদিন হবার সম্ভাবনা নেই। তবু এই ভোরবেলায় মায়ের দিন যাপন এর দিনে চারিদিকে শুধুই মায়ের সাথে ছবি দেখে আমার খুব কষ্ট হয় যে। সেই ছোটো বেলার লাঠির মার খেতাম আমি। ভাড়া বাড়ীর সামনে উঠোনে বাঁশে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে মার সেই লাল দাগ হয়ে যাওয়া আজ কিছুই নেই এই জীবনে আমার সব দাগ উবে গেছে কবেই। শুধুই সেই টালির ঘরে সেই কত বছর আগের দেওয়ালে টাঙানো একটি ছবি আছে আর কিছু ধূসর স্মৃতি। যাকে এই রাতদুপুরে কুলুঙ্গি থেকে বের করলেই দু চোখ বেয়ে জল আসে আমার এই বুড়ো বয়সেও।
কেন যে মা আমায় ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি চলে গেলো কে জানে। যে মাকে ২৪ ঘণ্টার কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে এসে চিকিৎসা করতে পারলাম না ওষুধ কিনে দিতে পারলাম না শেষকৃত্যর টাকা জোগাড় করে লোকে দিয়েছে তারপর সেই কাজ করেছি আমি। আর আজ কেন যে এমন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে আমার হৃদয় কে জানে। এতো কান্না জমে ছিল এত দিন পরেও আমার হারিয়ে যাওয়া মায়ের জন্য। যেটা মা কোনওদিন জানতেও পারেনি যে। অভিমানী মা আমার সে কথা বলতে পারেনি কোনোদিন নিজের কষ্টের কথা। আজ এই ভোর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মায়ের জন্য এত কষ্ট জমা ছিলো বুঝতেই পারিনি আমি।
শুধুই এই একটি ছবি দেখে মনে মনে আকুল হলাম মায়ের জন্য এই বুড়ো বয়সেও এসে এই বেকার জীবনে। যে জীবনে বাবা থাকলেও দূরে সরে আছেন তিনি নিজের জগতে। মা কিন্তু শেষ সময়ে ছিলেন আমার কাছে কেনো যে সব জোর করে বাড়ী নিয়ে গেলো মাকে কে জানে। আসলে অর্থ না থাকলে জোর থাকে না এই সংসারে আর সমাজে কারুর। আজ এই সব নানা হাবিজাবি কথাই মনে পড়ে যায় আমার এই মাতৃ দিবসের দিনে। মায়ের জন্য তো আর একটা দিনে হয়না কিছুই। তবু আজ খাতায় কলমে সেই মায়ের দিন।
সেই ছোটবেলার খাটে বসে দুলে দুলে অমল দই ওয়ালা পড়ার স্মৃতির উত্তাপ নেওয়ার দিন। বারান্দায় রান্নাঘর থেকে ঘামে ভিজে নিয়ে রুটি করতে করতে চিৎকার করে বলা কী রে বাবু গলার আওয়াজ বন্ধ কেনো। আর সেই সন্ধ্যায় খিদে পেলে গরম গরম রুটির গন্ধ। সেই কয়লার উনুন সেই কষ্টের সংসার সেই আমাদের তিনজনের জুটির জীবন ভেঙে গেছে কবেই। আজ দুজনের সংসার দু জায়গায় দু ভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা আমাদের। বাবা আর ছেলের যে সংসারে মা ছিলো সেই ফেভিকলের আঠার মতো আজ সেই জুড়ে থাকা সংসার কবেই ভেঙে গেছে আর কোনোদিন জোড়া লাগবে না কিছুতেই কোনওদিন।
তবু আজ এই মায়ের জন্য বড্ড মন কেমন করে আমার। সেই কাজের জন্য ঘর ছেড়ে চলে আসা নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করা মায়ের পছন্দ না হওয়া পরে যদিও সব কিছুই ঠিক হয়ে যাওয়া এইসব তো ছিলো আমাদের জীবনে। বুটাকে ভালবাসা আর ওই বাড়ী গেলেই মেয়েকে লুকিয়ে টাকা দেওয়া হাজার কষ্টের মধ্য। সব কিছু কেমন মিলিয়ে গেল খুব দ্রুত। বুটার কাজ হলো সেটা আর জানা হলো না আমার মায়ের। বাবার সময় নেই তাই এইসব নিয়ে তাঁর কোনোও আগ্রহ নেই মাকে হারিয়ে যে বাবাকে আঁকড়ে ধরতে মন চায় আমার। সেটা কে আর বোঝে এই বুড়ো বয়সে এসে। সত্যিই মা তো মা বাবা কি আর মায়ের অভাব পূরণ করতে পারে কোনওদিন।
এই দুপুরে রিষড়ার বাড়িতে আম ধরা মায়ের সেই আম পাহারা দেওয়া কত কিছুই যে মনে পড়ে আমার। সেই টালির ঘর সেই ছোটো বেলার জীবন। সেই মাটির গন্ধ সেই কেঁচো ঘুরছে ঘরে মায়ের কষ্ট করে ঘর নিকানো সেই মায়ের ভালবাসা আর মার খাওয়া। সেই পরীক্ষায় পাশ করে কাজ শুরু করা খবরের কাগজের কাজ মাত্র পাঁচশো টাকায়। সেই ধীরে ধীরে ইটিভির কাজ পাওয়া রিপোর্টার হয়ে যাওয়া। আমার নাম ডাক হওয়া গর্ব হলেও ছেলের জন্য কোনওদিন প্রকাশ করেননি তিনি।
আর সেই কাজ ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে যাওয়া। সেই বাড়ীর দলিল নিয়ে অসুস্থ হয়ে শ্রীরামপুরে চলে আসা মায়ের বাড়ী বিক্রি হবে বলে। সেই ২৪ ঘন্টা থেকে ফোন আসা মায়ের অসুস্থ অবস্থায়। মাকে আশ্বাস দিয়ে বলা ওরা ডেকেছে যখন নিশ্চয়ই আমার কাজ হবে তুমি চিন্তা করো না একদম। সেই ২৪ এ ইন্টারভিউ দিতে যাওয়া সেই নানা জনের সাথে দেখা হওয়া আর টোটো চালকের কথা বলে আমায় জানিয়ে দিয়ে নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে বের করে দেওয়া কাজ হলো না আর। না মা আর দেখে যেতে পারেননি তিনি কাজ হলো আমার বেকার ছেলে। সত্যিই আজ আমি আমার মাকে কোথাও খুঁজে পাইনা আর। হাজার ভীড় উপচে পড়া জীবনে মা যে কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে। ভালো থেকো তুমি মা।
আজ মায়ের দিন - অভিজিৎ বসু।
দশ মে দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য নিজের তোলা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন