ঘুম ভাঙলো বেলায় ভোটের দিনের ঘুম বলে কথা। একদম ঠিক কুম্ভকর্ণের ঘুম ভেঙে আমার বিছানায় শুয়ে এই পাশ আর ওই পাশ করা। ভোর বেলায় দু চোখে জ্বালা নিয়ে বিছানায় এলাম সারারাত বউকে ছেড়ে মোবাইলকে আঁকড়ে ধরে রাত্রি যাপন আমার। সেই রিলের নেশা, মোবাইল জুড়ে নানা রকম এর ছবির নেশায় বুঁদ আচ্ছন্ন আমি। সেই মোবাইল এর রাজ্য ছেড়ে ঘুম এর দেশে চলে যাওয়া আমার ভোর এর আলো গায়ে মেখে।
বাইরে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল। মেঘের আড়ালে সুয্যি মামা মুখ লুকিয়েছেন আজ ভোটের দিনে কিছুটা লজ্জায়। বাইরে সব কেমন চুপচাপ যেনো। মাথার ওপর হালকা করে ফ্যান চলছে। পশ্চিমের জানলা দিয়ে হাওয়া এসে গায়ে লাগছে। আমি বিছানায় শুয়ে চাদরটা মুড়ি দিয়ে এক কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম আবার। পাশের ফ্ল্যাটের ঘরে সব কলকল করে ফিরে এলো ভোট দিয়ে যেনো যুদ্ধ জয় করে ঘরে ফিরে আসা ওদের। চারদিকেই ভোট দেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে আজ।
ভোট দিয়ে ঘরে ফিরে শ্রীরামপুর এর ফোন কলকাতার সোনারপুরের এক আত্মীয়কে ভোট হয়ে গেছে তাঁর। বৃষ্টি টিপটিপ আর ঝির ঝির হচ্ছে এখানে মাঝে মাঝে। আর হ্যাঁ পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে দর্শনা ভোট দিয়ে বয় ফ্রেন্ডের বাড়ী গেছে সকাল বেলায় ওখানেই খাওয়া দাওয়া এইসব নানা কথা জানলা গলে কানে আসছে আমার। রাস্তায় কে যেন গজগজ করে যাচ্ছে তার আজ ভোট দেওয়া হয়নি কারণ ভোট দেওয়া হয়ে গেছে যে আগেই। এত কড়াকড়ি আর চাপাচাপির মধ্য কী করে যে এমন সুন্দর শাড়ি ছাপা হয়ে যায় কে জানে।
লাইনে দাঁড়িয়ে তেমন কোনোও অসুবিধা নেই। হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে মেখে ভোট দিয়েই কেমন চোখে মুখে যুদ্ধ জয়ের হাসি মুখ আর আঙুলে দাগ লাগানো ছবি তুলে ফেসবুকে লটকে দেওয়া সবার। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের নমুনা প্রয়োগ করে জানান দেওয়া এই তো ডর নেই ভোট তো দেওয়া হল বটে আবার। বাইরে কোনোও এক ছাদের আলসেতে ঘুঘুর মন কেমন করা ডাক শুনে আমার চোখ খুলে ওকে দেখতে ইচ্ছা হয় আবার। সেই যে ছোট বেলার আমার স্কুল পূর্ণচন্দ্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই যে মাঠের ধারে ছোটবেলার স্কুলে ভোটের কেন্দ্র হতো। সেই ভোটের লাইন পড়তো এত পুলিশ আর জোয়ান জওয়ান এর দেখা মিলত না সেই সময়। সেই একটা বড় পুকুর ছিলো যে পুকুরের ধারে গোল হয়ে টেবিল পেতে বসত সব পার্টির লোকজন।
সকাল সকাল চা কচুরি আর ঝাল তরকারি খেয়ে টিফিন করে ভোটের স্লিপ দেখার টেবিল পেতে একদিন এর জন্য পাড়ায় নেতা বনে যাওয়া সব মামা, জেঠার দল তখনও পাড়ায় সমাধান এর প্রকল্প চালু হয়নি সেই সময়। আমার মেজ মামা ভোটের দিন তাঁর কী যে ব্যস্ততা বেড়ে যেতো কে জানে। বড় মামার পুলিশের ডিউটি দিতে সকাল সকাল ট্রেন ধরে কলকাতা চলে যাওয়া তাঁর। বাড়ীতে স্নান সেরে পূজো করে দিদার ভোট দিতে যাওয়া কুঁজো হয়ে সাদা শাড়ি পড়ে। দাদু গত হয়েছেন কবেই।
তখনও এমন ভোটের বাজারে এস আই এর দাপাদাপি শুনে ভয় পেয়ে দৌড় ঝাঁপ করতে হয়নি আমাদের কাউকেই। ভোট হত নিজের ছন্দে আর নিজের মত করেই। সেই স্কুলের পাশের ঘরে ভোট হত নির্বিঘ্নে যে ঘরে আমার ক্লাস থ্রি এর ক্লাস হতো। সেই রামবাবু আসতেন ইতিহাস এর পাতা উল্টে পড়া ধরতেন। দেশের সব ইতিহাস তখনও বই থেকে মুছে দেওয়া হয়নি যে। কেমন স্কুলের জানলা দিয়ে আকাশ দেখে আর কাটা ঘুড়ি দেখে, লাট্টু খেলে আর গুলি খেলে মজার ছোটো বেলা কাটত আমাদের সেই সময় তখনও এত ইংরেজি পড়ার ধুম পড়েনি পাড়ায় পাড়ায়।
মায়ের ভোট দেওয়া, বাবার ভোট দেওয়া, পাড়ার লোকদের ভোট দেওয়া। সেই বিকেল হলে ভোট শেষ হলে সেই রাতের লাগানো শিকলি খুলে নিয়ে ঘরে নিয়ে আসা কই একবারও কেউ বলেনি সেই সময় এই বাড়ীর ছেলে লাল পার্টির লোক কেনো শিকলি খুলে নিয়ে গেলো ওরা হাত এর শিকলি দিয়ে লাল পার্টির বাড়ীর ছেলে মেয়েদের মজা করে খেলতে কোনোও অসুবিধা হয়নি পাড়ায় পাড়ায়। সে নিয়ে পাড়ায় মহল্লায় ঝামেলার সৃষ্টি হয়নি তখনও। বেশ ভালই ছিলো সেই ভোটের সকাল, ভোটের দুপুর আর ভোটের বিকেল। যদিও এই আজকের দিনে ভোটের বাজারে অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে বাঙলা বাঁচাও আর বাঙালির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আমি তো নেই একদম।
সত্যিই কী সব কিছুই রক্ষা করা যায়। এপার বাংলা রক্ষা করতে পারে ওপার বাংলার ছিন্নমূল মানুষের সেই শিকড় এর টান। ঘর ছেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে চলে আসা সব মানুষজন যে আমাদেরই লোক তাঁরা। আজ এতদিন পরে এতবছর পরেও সেই শিকড় ধরে টান দেওয়া। কেন যে এমন হয় কে জানে। সেই বাপ ঠাকুর্দার জমি সেই পল্টু আর আমার বন্ধুত্ব সেই পাড়ার বাঙাল মেয়ে পর্ণার সাথে এইপার এর ছেলে সুবীর এর প্রেম। বাঙাল বাড়ি বলে বিখ্যাত সেই বাড়ীর সাথে আমাদের সম্পর্ক সব কিছুকে কী এক ধাক্কায় শিকড় উপড়ে ফেলে দেওয়া যায় কে জানে।
বাইরে একটা কাক ডাকছে আনমনে। আমি বাসি বিছানায় চুপটি করে শুয়ে আছি ঘাপটি মেরে। বাইরের হাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। ভোট এর দিনে কেন যে আমার ভোট না দিয়ে এইসব কথা মনে হয় কে জানে। সেই আমার স্কুল, সেই ছোটো বেলার স্কুল আজ উধাও হয়েছে কবেই বহুতলের চাপে পড়ে আর প্রোমোটারের দৌলতে। আর উধাও হয়েছে আমার ছোটবেলার ভোটের আবছা আবছা স্মৃতি আর ছবি। তবু সেই মিঠে ভোট মিঠে সম্পর্কও যে আজ কেমন যেন পানসেই হয়ে গেছে এই সকাল বেলায়।
সত্যিই দিন বোধহয় বদলেই গেছে সেই গাই বাছুর এর সময় ছেড়ে, সেই হাত হাতুড়ি আর কাস্তে ধানের শীষের গন্ধ ছেড়ে এই ঘাস আর পদ্মের আমলে। সেই ছোটবেলার স্মৃতি সেই আমার বুকে খড়িমাটির দাগ, সেই মামার বাড়ীর স্মৃতি, সেই পুকুরের ধার, সেই স্কুলের অন্ধকার সিঁড়ি, সেই ইতিহাস পড়ানো রাম বাবু মাস্টার মশাই, সেই স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি আমায় ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে যে এই ভোটের সকালে ফের । এই দাগ যে কোনওদিন মুছবে না কোনওদিন। ওই যে এই পক্ষ আর ওই পক্ষের লড়াই, বাংলা বাঁচানোর অঙ্গীকার সেই সব নানা কথা শুনে আজ কেমন আমার হাসি পায়। ভোটের সকালে কত কিছুই যে ফিরে পেলাম আমি আজকে এই ভোট না দিয়েও আর আমার আঙুলে সেই কালি না মেখেও।
ভোটের সকাল - অভিজিৎ বসু।
২৯ এপ্রিল দু হাজার ছাব্বিশ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন