সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আরামবাগের বন্যা

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ সেই বন্যার কথা। যে বন্যা নিয়ে কত গল্প কত সুখ দুঃখের স্মৃতিই না জড়িয়ে আছে আমার এই দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে। আসলে এই প্রকৃতির যে করাল রূপ যার কাছে মানুষ খুব অসহায়। তবু যেনো অসহায় হয়েও একে অপরকে ধরে, সাহায্য করে বেঁচে থাকার একটা মরিয়া চেষ্টা। যে বন্যার জলে তদারকিতে গিয়ে ভেসে গেলেন হুগলীর খানাকুল এক নম্বর ব্লকের বিডিও সঞ্জয় মুখার্জী। যার খোঁজ মেলেনি প্রায় দেড় দিন। গাছের ডাল ধরে কোনো ভাবে নৌকোয় আটকে বেঁচেছিলেন তিনি। সত্যিই অসাধারন এই সব গল্প কথা। 
 মোবাইলহীন জীবনে এই বন্যা দুর্গত এলাকায় খানাকুলের বিডিওকে হারিয়ে আরামবাগের মহকুমা শাসক গোপীনাথ মুখোপাধ্যায় এর তখন একরকম পাগল পাগল অবস্থা। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। একদিকে বিডিওকে খুঁজে না পাওয়া অন্য দিকে রাজনীতির সব মাতব্বর আর কুশীলবদের নানা ভাবে, নানা প্রকারের চাপ দিয়ে সুবিধা আদায় করার অপরিসীম প্রচেষ্টা। যাদের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে মাথা উঁচু করে চাকরি করা দায়। এই সব নানা ঘটনা নানা গল্প নিয়ে আজ হুগলীর বন্যার কথা।
 বন্যা মানেই তো প্রতিদিন এক নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। কখন জল বেড়ে যাবে আর কখন কমবে তার অপেক্ষায় প্রহর গোনা ঘড়ি ধরে। জলে থৈ থৈ ভালবাসার স্পর্শ নিয়ে জলে ভিজে একশা হয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। জলে ভেসে যাওয়া পরিবারদের নিয়ে তাদেরকে সঠিক ভাবে সাহায্যে করার নামে রাজনীতির ময়দানে ঘুরে বেড়ানো কিছু লোকদের মাতব্বরি আর ক্ষমতার আস্ফালন দেখা। যেখানে জলে ভেসে যাওয়া পরিবারদের সাহায্যর থেকে ক্ষমতা দেখানোই প্রধান উপজীব্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। 
পর পর দুটো বছরের বন্যার কথা আমার আজও মনে পড়ে যায় এই ভরা শ্রাবণে এত বছর পরেও। উনিশ শো নিরানব্বই ও দু হাজার সালের হুগলীর আরামবাগের এই দুটি বন্যার স্মৃতি অনেকটা ঝাপসা হয়ে গেলেও এখনো কিছুটা হলেও জেগে আছে সেই সব কথা ঠিক গঙ্গার মাঝে জেগে ওঠা ধূসর চরের মত। আসলে স্মৃতি খুব একটা বেইমানি করে না, মানুষ বেইমানি করলেও। তাই এই বন্যার জলে ভেসে যায় ঘর বাড়ি, মিশে যায় ধনী গরীব সব পরিবার মিলে মিশে এক হয়ে যায় একটু আশ্রয়ের সন্ধানে। সবাই আস্তানা নেয় এক ছাদের তলায় কোনো রকম ভেদাভেদ না রেখে গ্রামের উঁচু স্কুল বাড়ীতে।
 জলে ভেসে যাওয়া কলার ভেলা করে একটু ডাঙার সন্ধানে আমরা সবাই তখন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি।  সাংবাদিক, গ্রামবাসী সবার সাথে চুপটি করে জলে ভিজে কাতর সেই নিশ্চুপ সেই সাপও কেমন চুপটি করে কলার ভেলায় ভেসে চলেছে আমাদের সাথে সহযাত্রী হয়ে একটু আশ্রয়ের সন্ধানে। সত্যিই জীবনের বাঁচার জন্য কতই না লড়াই এই সাপে আর মানুষের কি অদ্ভুত সহাবস্থান। এই সব কথা মনে পড়লে আমার মনে হয় জীবনের এই সব নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়ে থাক। 
আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের সেই আরামবাগ যাত্রা মানেই তো একটা বিভীষিকা। হুগলীর এই মহকুমা যেনো বিছিন্ন একটা দ্বীপ এর মত। তারকেশ্বর অবধি ট্রেন পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে দৌড়ে বাস ধরে তারপর আরামবাগ যাওয়া। তারপর সেখান থেকে আমার সেই ক্যামেরাম্যান সুব্রত যশকে সঙ্গী করে ওর গাড়ি চেপে আরামবাগ, খানাকুল, গোঘাট, কামার- পুকুর ঘুরে বেড়ানো খবরের সন্ধানে। সেই বড়ো কালো বিয়ে বাড়ির ক্যামেরা আর সেই ফিতে ওলা ক্যাসেট নিয়ে। আজকের টিভি চ্যানেলে যা সেই আদ্যিকালের ডায়নোসরের যুগের সঙ্গে তুলনা হবে। বলবে ও বাবা তোমরা সেই পুরোনো আমলের সাংবাদিক সব তাই ঠিক এডজাস্ট করতে পারছ না এই জেট গতির যুগে। তাই তো তোমরা সব বাতিলের দলে।
 কিন্তু যাই হোক ছোটো বেলার ঊনিশ শো আটাত্তর সালের সেই বিখ্যাত বন্যায় তখন আমি খুব ছোট আট বছর বয়স আমার। ভোরবেলায় সব ভেসে গেছে কোনো রকমে খাটের ওপর বসে আছি মা, আমি আর বাবা। ভোর বেলায় শ্রীরামপুর থেকে সাঁতরে একমাত্র বোনের খবর নিতে আমার মেজমামা রিষড়াতে এসেছিলেন। কোনো রকমে হারিকেনের আলোয়  দেখলাম মা, মেজমামাকে স্টোভ জ্বেলে চা করে দিলো। একটু গরম চা খেয়ে ফিরে গেলেন মামা নিজের বাড়িতে।  
সেই মোবাইল হীন যুগে এমন বিপদের দিনে খবর নেবার এ ছাড়া আর কি উপায় ছিল।  সত্যিই অসাধারন এই অনুভূতির সম্পর্ক, এক অন্য ধরনের ভালোবাসা একে অপরের প্রতি। কিন্তু এই ভালবাসাই তো কত ফিকে হয়ে গেলো কিছুদিন কিছু বছর পরে। মা মারা গেলেন একবছর আগে, মেজমামাকে বললাম মা আর নেই। না, আর দৌড়ে আসতে পারল না কেউই সেদিন মামার বাড়ির। হয়তো দিন বদলের তালে সময় বদলে যায়। মানুষের সম্পর্ক ধীরে ধীরে বদলে যায়, হয়তো ভালোবাসার ভাটা পড়ে যায়। জোয়ার আসা জীবনের দিনগুলোতে কিছুটা ভাটা পড়ে যায়। আর যে ভাটায় আটকে যায় মজে যাওয়া সম্পর্কের জটিল সব বন্ধন। 
সবে তখন আমি তারকেশ্বর থেকে বাস ধরে নেমে আরামবাগ এসডিও অফিসে পৌঁছে গেলাম। দ্বারকেশ্বর, মুন্ডেশ্বরী, আর দামোদরের জলে ভেসে গেছে খানাকুল এর বিস্তীর্ণ এলাকা। ঘন ঘন টেলিফোন বাজছে এসডিও সাহেবের ঘরে। সেই ফোন নম্বর আমার আজও মনে আছে 03211 55041, মহকুমা শাসক গোপীনাথ মুখোপাধ্যায় এর তখন দম ফেলার ফুরসত নেই। কোথায় ত্রিপল কত যাবে। কত বস্তা চাল যাবে তার তদারকিতে ব্যস্ত এসডিও অফিসের কর্মীরা।
 গাছে ঘেরা অফিসে তখন চরম ব্যস্ততা। আর সেই কাজে নাক গলিয়ে আরামবাগের দাপুটে সাংসদ অনিল বসুর প্রতিনিধি মোজাম্মেল হোসেন কোন গ্রাম কত চাল ও ত্রিপল পাবে তার হিসেব করতে ব্যস্ত। মানে হলো এটাই ত্রাণ বিলিতেও লাল পার্টির নেতাদের সংকীর্ণ স্বার্থের রাজনীতি। যে রাজনীতির ময়দানে এই ভাবেই তারা কাটিয়ে দিয়েছে চৌত্রিশ বছর। এই ভাবেই তো দাপুটে সেই সাংসদ অনিল বসু গোটা দেশে হৈ চৈ ফেলে দিয়ে ছিলেন তার ভোটের ফল প্রকাশের পর।এটাই তো ছিল লাল দুর্গ আরামবাগ।
 যেখানে স্থানীয় প্রশাসন ভোটের সময় যে ভোট কেন্দ্র চিহ্নিত করে অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে সেই  চিহ্নিত কেন্দ্র বদলে যায়, উবে যায়। এটাই তো রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। সেখানে চাল আর ত্রিপল উবে যাবে নিঃসাড়ে। এই গ্রামের বদলে অন্য গ্রামে যাবে ভোট কেন্দ্র সেটাই তো স্বাভাবিক ঘটনা। রাজনীতির চাপে কত কিছুই যে ঘটে যায় কে জানে। জলের ধারায় সে সব কিছুতেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় না।
যাই হোক এসডিও সাহেবের উদ্যোগে ত্রিপল এর সেই গাড়ি করে বন্যা পরিস্থিতি দেখতে গ্রামে যাবার ব্যবস্থা হলো আমাদের। আমরা উঠে পড়লাম সেই ট্রাক্টর এর উপর। শহর ছেড়ে গ্রামের উদ্দেশে চলল ট্রাক্টর। সেই কালো ত্রিপল এর ওপর আধবসা হয়ে আমরা বেশ কয়েকজন। তার মধ্য একজন বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার অশোক মজুমদার। ছিল জেলার সাংবাদিক গৌতম বন্দোপাধ্যায়। সেই অশোক মজুমদার যিনি এখন মুখ্য মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ফটোগ্রাফার। 
কিন্তু একি অবস্থা মায়াপুর মোড়ে এসে হাজির হয়ে বুঝতে পারলাম দ্রুত গতিতে জল বাড়ছে হু হু করে। চেনা সেই মায়াপুর মোড় যেনো দ্রুত অচেনা হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আমাদের সেই ত্রিপল বোঝাই ট্রাক্টর এর গতি কমতে শুরু করলো জলের তোড়ে। কোথায় রাস্তা আর কোথায় মাঠ সব মিলে মিশে একাকার যে। এযে মুন্ডেশ্বরীর জলে সব ভেসে গিয়ে সমুদ্র হয়ে গেছে। তার মাঝেই কত জল ছাড়া হলো ডিভিসি থেকে সেটা নিয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ততা এসডিও অফিসে। ঘন ঘন ডিএম সাহেবের ফোন ধরে দুর্গাপুর থেকে ছাড়া জল এসে পৌঁছল কি না তার জবাব দিতেই মহকুমা শাসক এর গলদঘর্ম অবস্থা। 
আর আমরা তখন সেই ত্রিপল বোঝাই ট্রাক্টর এর ওপর দাঁড়িয়ে শুধু জল আর জলের ছবি দেখতে দেখতে এগোতে থাকলাম। একি দেখছি যেনো জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না সেই লাইন মনে পড়ে গেলো। ড্রাইভার এর পথ ঘাট চেনা বলে রক্ষে না হলে যে গাড়ি কোথায় আটকে যাবে কে জানে। চেনা গ্রাম, চেনা জনপদ সব জলের ধারায় বৃষ্টির ধারায় ভেসে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও সেই জলের ধারে মশারী নিয়ে বা অন্য কোনো মাছ ধরার জিনিস নিয়ে চরম আনন্দে চলছে মাছ ধরার আনন্দ। ঘর নেই, রান্নাঘর নেই, সব ভেসে গেছে কিন্তু মাছ ধরা আছে। 
সেই রাস্তার পাশ থেকে মাছ কিনে নিয়ে এসেছিলাম আমি একবার দিদির বাড়ী আরামবাগে। নিজে মাছ না খেলেও সেই মাছ নিয়ে আসার আনন্দ কিন্তু একটা আলাদা অভিজ্ঞতা ছিল। আরামবাগ গেলে আমার এই অচেনা অজানা দিদির বাড়ী কি করে যে নিজের বাড়ির মত আস্তানা হয়ে গেলো কে জানে। গ্রামের ঘর বাড়ি বন্যায় ভেসে গেলেও আমার ঘর ঠিক ছিল এই সবের মাঝেও। সারাদিন জলে ভিজে কাজ সেরে সন্ধ্যায় সেই শুক্লাদির বাড়ী এসে রাত্রি যাপন করতে বেশ মজা হতো। রিমা, দিশা, দিদি, সিমি, মেজদি, গৌতম দা  তখন বাইরে ডিউটিতে গেছেন। বন্যার জলে তখন সেই দিদির স্কুল বন্ধ। সারাদিন কাজের পর অন্য একটা অভিজ্ঞতা। যে দিদির সাথে সেই বন্যার দিনের সম্পর্ক আমার আজও রয়ে গেছে। আসলে সেই দিদির সাথে আমায় দেখা করিয়ে দিয়েছিল বর্তমান কাগজের সন্দীপন্দা। সেই গল্প অন্য একদিন।
 আজ শুধুই বন্যার কথা। এরপর সেই ট্রাক্টর থেকে নেমে গেলো ত্রিপল। রাস্তার পাশের অস্থায়ী ছাউনী তে তখন কচি একরত্তি দুধের শিশুর চিল চিৎকার। পেটের টানে। লজ্জা শরম কোনো ভাবে লুকিয়ে রাস্তার পাশে ঘর পাতা মা আড়াল করে ছেলেকে বুকের দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত। বিচিত্র সব জলের ওপর নানা রঙের ছবি। এসবের মাঝেও কে ত্রান পাবে কত পাবে সেটা নিয়ে নেতাদের নানা মাতব্বরি। সত্যিই অসাধারন এই রাজার নীতি। না হলে কি আর এই সব রাজারা এই ভাবে কাটিয়ে দিতে পারত নিজেদের স্বার্থের জীবন শুধু একটু ক্ষমতা দেখিয়ে।
কিন্তু এসবের মাঝেও ঘর দুয়ার সব ভেসে গেছে বন্যার জলে। বাড়ির পেছনে নৌকো বা ডিঙ্গি বাঁধা আছে। এই বাড়ী থেকে বেরিয়ে দূরের বাড়িতে চলে যাওয়া নির্দ্ধিধায়। খাওয়া দাওয়া করা যেনো সবাই এই বিপদের দিনে একে অপরের পরম আত্মীয় স্বজন হয়ে গেছে। এই ভাবেই জড়িয়ে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা একে অপরের সাথে। এ যেনো আমাদের শহরের ফ্ল্যাট বাড়ির শিক্ষা নয়। বিপদে পড়েছে জেনেও হাসি মুখে মুখ ঘুরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে যাওয়া নয়। গ্রামের বন্যা একের সাথে অন্যর নিগূঢ় সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেয়। যে সম্পর্কে গরীব বড়লোকের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাই মিলে একসাথে সেই সময় প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচার চেষ্টা করে। যেখানে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না। একে অপরের হাত ধরে টেনে রেখে চলতে শেখায়।
 সত্যিই অসাধারন এই বন্যার ভয়াল রূপ কেমন করে যে মানুষদের এই ভাবে একে অপরকে জড়িয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার শিক্ষা দেয় সেটাই তো জীবনের সেরা উপহার। জলে ভেসে যাওয়া মানুষগুলো কেমন করে যেনো একটু একটু করে সবাই একে অপরের পরম আত্মীয় হয়ে যায়। বোধ হয় জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে এমন শিক্ষা লাভ করে তারা। 
জীবনের সবচেয়ে এই কঠিন দিনে কেমন করে যে সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় কে জানে। আজ বহুদিন পর, সকাল বেলায় জীবনের ফেলে আসা দিনের সেই সব জলে ভেজা স্মৃতির পাতায়, জল ফড়িং উড়ে এসে বসলো বহুদিন পর। যার ডানায় বৃষ্টির ছোঁয়া লেগে আছে। কেমন চুপটি করে সে বসে আছে। যে আনমনে আমায় মনে করিয়ে দিলো নানা ঘটনা, নানা কথা।
মোবাইলহীন জীবনের মাঝেও কত গভীর ভালোবাসা যে লুকিয়ে ছিল একসময়। যার কোনও ছবি নেই আমার কাছে। কিন্তু সেই পঁচিশ বছর আগের আমার হারিয়ে যাওয়া সাংবাদিক জীবনের কিছু ছবি আজ আমায় আবার ভিজিয়ে দিল এতদিন পরেও। আঁকাবাঁকা অক্ষরে জলে ভেজা রাস্তায় আঁকিবুঁকি অক্ষরে আমার ব্লগে কিছু কথা লিখে ফেললাম আমি।
 সবটাই তো সাদা জীবনের জলে ভেজা মেঠো রাস্তার কথা। যে রাস্তায় জোনাকির আলো আছে, যে রাস্তায় গভীর ভালোবাসা আছে, একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা আছে, যে রাস্তায় সেই বেহুলা লখিন্দরের মত কলার ভেলায় ভেসে যাওয়া আছে। আজ এতদিন পর মনে হয় যদি আবার অমন করে ভেসে যেতে পারতাম আবার কি ভালই যে হতো। 

আরামবাগের বন্যা - অভিজিৎ বসু।
সাতাশে জুলাই, দু হাজার চব্বিশ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

ভোরের গন্ধ

ভেঙে ফেলা আস্ত একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চোখের আঙিনায়, কেমন দাঁত মুখ বের করে ছন্নছাড়া হয়ে, অতীতকে সযত্নে জড়িয়ে, আঁকড়ে। বাড়ির গাড়ি বারান্দার নিচে জমে থাকা সাইকেলের চাকায়, সুতো জড়িয়ে থাকার মতো কত মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, এই পুরোনো বাড়িতে। বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে সেই জীবনের সোঁদা গন্ধ, ঘাম এর দাগ এখনো লেগে আছে এদিক ওদিক। খুঁজলে হয়তো মিলবে আরও দু চার আনার স্মৃতির অকেজো সব তামাটে পরশ পাথর। আসলে মাটি উপড়ে,স্মৃতির উত্তাপ কে মুছে দিয়ে নতুন করে বিচিত্র সব রোজগারির, অপচেষ্টা আর কি। যে লাভের, লোভের, চেষ্টার গলায় লাগাম আর পরাবে কে। দুর থেকে জানলা দিয়ে দেখি শুকনো কলাপাতার ওই ম্রিয়মান নিষ্ফলা হাসি। বট ফলের আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা, যজ্ঞি ডুমুর গাছের পাতায় পিছলে পড়া স্মৃতির নরম উত্তাপ। যে উত্তাপে আজও জারিত হই আমি অনায়াসেই প্রতিদিন সকাল হলেই। ভোরের বেলায় পাখির ডাক শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ওদের মন কেমন করা কথা শুনতে পাই না আর। বোধহয় ওরাও বুঝে গেছে তাদের গলায় লাগাম পড়েছে এবার আচমকাই। তাই পথ ভুলে তারাও আসেনা আর কিছুতেই  এদিক পানে। পশ্চিমী হাওয়া ঠেল...

ইটিভির বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

কত দিন ধরেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি। সেই কেমন হাসিখুশি জীবন নিয়েও হাজারও বড়ো অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েও কত কুল থাকা যায় সেটা আমি বিশ্বজিৎদাকে দেখে শিখলাম আর কী। সেটা সেই জঙ্গলে মাওবাদী নেতাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হোক বা তাঁদের কোনোও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক। কিম্বা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট এর অফিসে গিয়ে বিমান বসুর সাথে একান্তে কথা বলা হোক। কিম্বা অনিল বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে কথা বলা হোক। কিম্বা সেই মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বন্যাদুর্গত এলাকা আরামবাগ মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাজির হয়েছেন। খুব সম্ভবত বিশ্বজিৎ দা হাজির আকাশ বাংলা চ্যানেল থেকে সেই সময়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কথা বলছেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একটু দূরে। রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। যাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কেউ যেতে না পারি। আমি উত্তেজিত কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে একদম নির্বিকার হাসিমুখ বিশ্বজিৎদার কথা ছাড় তো, আমাদের যেতে না দিলে আমরা কি করবো। প্রচার হবে না ওদেরই। একটু পরেই সেটা বুঝত...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...