সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আরামবাগের বন্যা

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ সেই বন্যার কথা। যে বন্যা নিয়ে কত গল্প কত সুখ দুঃখের স্মৃতিই না জড়িয়ে আছে আমার এই দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে। আসলে এই প্রকৃতির যে করাল রূপ যার কাছে মানুষ খুব অসহায়। তবু যেনো অসহায় হয়েও একে অপরকে ধরে, সাহায্য করে বেঁচে থাকার একটা মরিয়া চেষ্টা। যে বন্যার জলে তদারকিতে গিয়ে ভেসে গেলেন হুগলীর খানাকুল এক নম্বর ব্লকের বিডিও সঞ্জয় মুখার্জী। যার খোঁজ মেলেনি প্রায় দেড় দিন। গাছের ডাল ধরে কোনো ভাবে নৌকোয় আটকে বেঁচেছিলেন তিনি। সত্যিই অসাধারন এই সব গল্প কথা। 
 মোবাইলহীন জীবনে এই বন্যা দুর্গত এলাকায় খানাকুলের বিডিওকে হারিয়ে আরামবাগের মহকুমা শাসক গোপীনাথ মুখোপাধ্যায় এর তখন একরকম পাগল পাগল অবস্থা। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। একদিকে বিডিওকে খুঁজে না পাওয়া অন্য দিকে রাজনীতির সব মাতব্বর আর কুশীলবদের নানা ভাবে, নানা প্রকারের চাপ দিয়ে সুবিধা আদায় করার অপরিসীম প্রচেষ্টা। যাদের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে মাথা উঁচু করে চাকরি করা দায়। এই সব নানা ঘটনা নানা গল্প নিয়ে আজ হুগলীর বন্যার কথা।
 বন্যা মানেই তো প্রতিদিন এক নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। কখন জল বেড়ে যাবে আর কখন কমবে তার অপেক্ষায় প্রহর গোনা ঘড়ি ধরে। জলে থৈ থৈ ভালবাসার স্পর্শ নিয়ে জলে ভিজে একশা হয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। জলে ভেসে যাওয়া পরিবারদের নিয়ে তাদেরকে সঠিক ভাবে সাহায্যে করার নামে রাজনীতির ময়দানে ঘুরে বেড়ানো কিছু লোকদের মাতব্বরি আর ক্ষমতার আস্ফালন দেখা। যেখানে জলে ভেসে যাওয়া পরিবারদের সাহায্যর থেকে ক্ষমতা দেখানোই প্রধান উপজীব্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। 
পর পর দুটো বছরের বন্যার কথা আমার আজও মনে পড়ে যায় এই ভরা শ্রাবণে এত বছর পরেও। উনিশ শো নিরানব্বই ও দু হাজার সালের হুগলীর আরামবাগের এই দুটি বন্যার স্মৃতি অনেকটা ঝাপসা হয়ে গেলেও এখনো কিছুটা হলেও জেগে আছে সেই সব কথা ঠিক গঙ্গার মাঝে জেগে ওঠা ধূসর চরের মত। আসলে স্মৃতি খুব একটা বেইমানি করে না, মানুষ বেইমানি করলেও। তাই এই বন্যার জলে ভেসে যায় ঘর বাড়ি, মিশে যায় ধনী গরীব সব পরিবার মিলে মিশে এক হয়ে যায় একটু আশ্রয়ের সন্ধানে। সবাই আস্তানা নেয় এক ছাদের তলায় কোনো রকম ভেদাভেদ না রেখে গ্রামের উঁচু স্কুল বাড়ীতে।
 জলে ভেসে যাওয়া কলার ভেলা করে একটু ডাঙার সন্ধানে আমরা সবাই তখন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি।  সাংবাদিক, গ্রামবাসী সবার সাথে চুপটি করে জলে ভিজে কাতর সেই নিশ্চুপ সেই সাপও কেমন চুপটি করে কলার ভেলায় ভেসে চলেছে আমাদের সাথে সহযাত্রী হয়ে একটু আশ্রয়ের সন্ধানে। সত্যিই জীবনের বাঁচার জন্য কতই না লড়াই এই সাপে আর মানুষের কি অদ্ভুত সহাবস্থান। এই সব কথা মনে পড়লে আমার মনে হয় জীবনের এই সব নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়ে থাক। 
আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের সেই আরামবাগ যাত্রা মানেই তো একটা বিভীষিকা। হুগলীর এই মহকুমা যেনো বিছিন্ন একটা দ্বীপ এর মত। তারকেশ্বর অবধি ট্রেন পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে দৌড়ে বাস ধরে তারপর আরামবাগ যাওয়া। তারপর সেখান থেকে আমার সেই ক্যামেরাম্যান সুব্রত যশকে সঙ্গী করে ওর গাড়ি চেপে আরামবাগ, খানাকুল, গোঘাট, কামার- পুকুর ঘুরে বেড়ানো খবরের সন্ধানে। সেই বড়ো কালো বিয়ে বাড়ির ক্যামেরা আর সেই ফিতে ওলা ক্যাসেট নিয়ে। আজকের টিভি চ্যানেলে যা সেই আদ্যিকালের ডায়নোসরের যুগের সঙ্গে তুলনা হবে। বলবে ও বাবা তোমরা সেই পুরোনো আমলের সাংবাদিক সব তাই ঠিক এডজাস্ট করতে পারছ না এই জেট গতির যুগে। তাই তো তোমরা সব বাতিলের দলে।
 কিন্তু যাই হোক ছোটো বেলার ঊনিশ শো আটাত্তর সালের সেই বিখ্যাত বন্যায় তখন আমি খুব ছোট আট বছর বয়স আমার। ভোরবেলায় সব ভেসে গেছে কোনো রকমে খাটের ওপর বসে আছি মা, আমি আর বাবা। ভোর বেলায় শ্রীরামপুর থেকে সাঁতরে একমাত্র বোনের খবর নিতে আমার মেজমামা রিষড়াতে এসেছিলেন। কোনো রকমে হারিকেনের আলোয়  দেখলাম মা, মেজমামাকে স্টোভ জ্বেলে চা করে দিলো। একটু গরম চা খেয়ে ফিরে গেলেন মামা নিজের বাড়িতে।  
সেই মোবাইল হীন যুগে এমন বিপদের দিনে খবর নেবার এ ছাড়া আর কি উপায় ছিল।  সত্যিই অসাধারন এই অনুভূতির সম্পর্ক, এক অন্য ধরনের ভালোবাসা একে অপরের প্রতি। কিন্তু এই ভালবাসাই তো কত ফিকে হয়ে গেলো কিছুদিন কিছু বছর পরে। মা মারা গেলেন একবছর আগে, মেজমামাকে বললাম মা আর নেই। না, আর দৌড়ে আসতে পারল না কেউই সেদিন মামার বাড়ির। হয়তো দিন বদলের তালে সময় বদলে যায়। মানুষের সম্পর্ক ধীরে ধীরে বদলে যায়, হয়তো ভালোবাসার ভাটা পড়ে যায়। জোয়ার আসা জীবনের দিনগুলোতে কিছুটা ভাটা পড়ে যায়। আর যে ভাটায় আটকে যায় মজে যাওয়া সম্পর্কের জটিল সব বন্ধন। 
সবে তখন আমি তারকেশ্বর থেকে বাস ধরে নেমে আরামবাগ এসডিও অফিসে পৌঁছে গেলাম। দ্বারকেশ্বর, মুন্ডেশ্বরী, আর দামোদরের জলে ভেসে গেছে খানাকুল এর বিস্তীর্ণ এলাকা। ঘন ঘন টেলিফোন বাজছে এসডিও সাহেবের ঘরে। সেই ফোন নম্বর আমার আজও মনে আছে 03211 55041, মহকুমা শাসক গোপীনাথ মুখোপাধ্যায় এর তখন দম ফেলার ফুরসত নেই। কোথায় ত্রিপল কত যাবে। কত বস্তা চাল যাবে তার তদারকিতে ব্যস্ত এসডিও অফিসের কর্মীরা।
 গাছে ঘেরা অফিসে তখন চরম ব্যস্ততা। আর সেই কাজে নাক গলিয়ে আরামবাগের দাপুটে সাংসদ অনিল বসুর প্রতিনিধি মোজাম্মেল হোসেন কোন গ্রাম কত চাল ও ত্রিপল পাবে তার হিসেব করতে ব্যস্ত। মানে হলো এটাই ত্রাণ বিলিতেও লাল পার্টির নেতাদের সংকীর্ণ স্বার্থের রাজনীতি। যে রাজনীতির ময়দানে এই ভাবেই তারা কাটিয়ে দিয়েছে চৌত্রিশ বছর। এই ভাবেই তো দাপুটে সেই সাংসদ অনিল বসু গোটা দেশে হৈ চৈ ফেলে দিয়ে ছিলেন তার ভোটের ফল প্রকাশের পর।এটাই তো ছিল লাল দুর্গ আরামবাগ।
 যেখানে স্থানীয় প্রশাসন ভোটের সময় যে ভোট কেন্দ্র চিহ্নিত করে অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে সেই  চিহ্নিত কেন্দ্র বদলে যায়, উবে যায়। এটাই তো রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। সেখানে চাল আর ত্রিপল উবে যাবে নিঃসাড়ে। এই গ্রামের বদলে অন্য গ্রামে যাবে ভোট কেন্দ্র সেটাই তো স্বাভাবিক ঘটনা। রাজনীতির চাপে কত কিছুই যে ঘটে যায় কে জানে। জলের ধারায় সে সব কিছুতেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় না।
যাই হোক এসডিও সাহেবের উদ্যোগে ত্রিপল এর সেই গাড়ি করে বন্যা পরিস্থিতি দেখতে গ্রামে যাবার ব্যবস্থা হলো আমাদের। আমরা উঠে পড়লাম সেই ট্রাক্টর এর উপর। শহর ছেড়ে গ্রামের উদ্দেশে চলল ট্রাক্টর। সেই কালো ত্রিপল এর ওপর আধবসা হয়ে আমরা বেশ কয়েকজন। তার মধ্য একজন বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার অশোক মজুমদার। ছিল জেলার সাংবাদিক গৌতম বন্দোপাধ্যায়। সেই অশোক মজুমদার যিনি এখন মুখ্য মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ফটোগ্রাফার। 
কিন্তু একি অবস্থা মায়াপুর মোড়ে এসে হাজির হয়ে বুঝতে পারলাম দ্রুত গতিতে জল বাড়ছে হু হু করে। চেনা সেই মায়াপুর মোড় যেনো দ্রুত অচেনা হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আমাদের সেই ত্রিপল বোঝাই ট্রাক্টর এর গতি কমতে শুরু করলো জলের তোড়ে। কোথায় রাস্তা আর কোথায় মাঠ সব মিলে মিশে একাকার যে। এযে মুন্ডেশ্বরীর জলে সব ভেসে গিয়ে সমুদ্র হয়ে গেছে। তার মাঝেই কত জল ছাড়া হলো ডিভিসি থেকে সেটা নিয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ততা এসডিও অফিসে। ঘন ঘন ডিএম সাহেবের ফোন ধরে দুর্গাপুর থেকে ছাড়া জল এসে পৌঁছল কি না তার জবাব দিতেই মহকুমা শাসক এর গলদঘর্ম অবস্থা। 
আর আমরা তখন সেই ত্রিপল বোঝাই ট্রাক্টর এর ওপর দাঁড়িয়ে শুধু জল আর জলের ছবি দেখতে দেখতে এগোতে থাকলাম। একি দেখছি যেনো জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না সেই লাইন মনে পড়ে গেলো। ড্রাইভার এর পথ ঘাট চেনা বলে রক্ষে না হলে যে গাড়ি কোথায় আটকে যাবে কে জানে। চেনা গ্রাম, চেনা জনপদ সব জলের ধারায় বৃষ্টির ধারায় ভেসে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও সেই জলের ধারে মশারী নিয়ে বা অন্য কোনো মাছ ধরার জিনিস নিয়ে চরম আনন্দে চলছে মাছ ধরার আনন্দ। ঘর নেই, রান্নাঘর নেই, সব ভেসে গেছে কিন্তু মাছ ধরা আছে। 
সেই রাস্তার পাশ থেকে মাছ কিনে নিয়ে এসেছিলাম আমি একবার দিদির বাড়ী আরামবাগে। নিজে মাছ না খেলেও সেই মাছ নিয়ে আসার আনন্দ কিন্তু একটা আলাদা অভিজ্ঞতা ছিল। আরামবাগ গেলে আমার এই অচেনা অজানা দিদির বাড়ী কি করে যে নিজের বাড়ির মত আস্তানা হয়ে গেলো কে জানে। গ্রামের ঘর বাড়ি বন্যায় ভেসে গেলেও আমার ঘর ঠিক ছিল এই সবের মাঝেও। সারাদিন জলে ভিজে কাজ সেরে সন্ধ্যায় সেই শুক্লাদির বাড়ী এসে রাত্রি যাপন করতে বেশ মজা হতো। রিমা, দিশা, দিদি, সিমি, মেজদি, গৌতম দা  তখন বাইরে ডিউটিতে গেছেন। বন্যার জলে তখন সেই দিদির স্কুল বন্ধ। সারাদিন কাজের পর অন্য একটা অভিজ্ঞতা। যে দিদির সাথে সেই বন্যার দিনের সম্পর্ক আমার আজও রয়ে গেছে। আসলে সেই দিদির সাথে আমায় দেখা করিয়ে দিয়েছিল বর্তমান কাগজের সন্দীপন্দা। সেই গল্প অন্য একদিন।
 আজ শুধুই বন্যার কথা। এরপর সেই ট্রাক্টর থেকে নেমে গেলো ত্রিপল। রাস্তার পাশের অস্থায়ী ছাউনী তে তখন কচি একরত্তি দুধের শিশুর চিল চিৎকার। পেটের টানে। লজ্জা শরম কোনো ভাবে লুকিয়ে রাস্তার পাশে ঘর পাতা মা আড়াল করে ছেলেকে বুকের দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত। বিচিত্র সব জলের ওপর নানা রঙের ছবি। এসবের মাঝেও কে ত্রান পাবে কত পাবে সেটা নিয়ে নেতাদের নানা মাতব্বরি। সত্যিই অসাধারন এই রাজার নীতি। না হলে কি আর এই সব রাজারা এই ভাবে কাটিয়ে দিতে পারত নিজেদের স্বার্থের জীবন শুধু একটু ক্ষমতা দেখিয়ে।
কিন্তু এসবের মাঝেও ঘর দুয়ার সব ভেসে গেছে বন্যার জলে। বাড়ির পেছনে নৌকো বা ডিঙ্গি বাঁধা আছে। এই বাড়ী থেকে বেরিয়ে দূরের বাড়িতে চলে যাওয়া নির্দ্ধিধায়। খাওয়া দাওয়া করা যেনো সবাই এই বিপদের দিনে একে অপরের পরম আত্মীয় স্বজন হয়ে গেছে। এই ভাবেই জড়িয়ে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা একে অপরের সাথে। এ যেনো আমাদের শহরের ফ্ল্যাট বাড়ির শিক্ষা নয়। বিপদে পড়েছে জেনেও হাসি মুখে মুখ ঘুরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে যাওয়া নয়। গ্রামের বন্যা একের সাথে অন্যর নিগূঢ় সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেয়। যে সম্পর্কে গরীব বড়লোকের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাই মিলে একসাথে সেই সময় প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচার চেষ্টা করে। যেখানে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না। একে অপরের হাত ধরে টেনে রেখে চলতে শেখায়।
 সত্যিই অসাধারন এই বন্যার ভয়াল রূপ কেমন করে যে মানুষদের এই ভাবে একে অপরকে জড়িয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার শিক্ষা দেয় সেটাই তো জীবনের সেরা উপহার। জলে ভেসে যাওয়া মানুষগুলো কেমন করে যেনো একটু একটু করে সবাই একে অপরের পরম আত্মীয় হয়ে যায়। বোধ হয় জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে এমন শিক্ষা লাভ করে তারা। 
জীবনের সবচেয়ে এই কঠিন দিনে কেমন করে যে সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় কে জানে। আজ বহুদিন পর, সকাল বেলায় জীবনের ফেলে আসা দিনের সেই সব জলে ভেজা স্মৃতির পাতায়, জল ফড়িং উড়ে এসে বসলো বহুদিন পর। যার ডানায় বৃষ্টির ছোঁয়া লেগে আছে। কেমন চুপটি করে সে বসে আছে। যে আনমনে আমায় মনে করিয়ে দিলো নানা ঘটনা, নানা কথা।
মোবাইলহীন জীবনের মাঝেও কত গভীর ভালোবাসা যে লুকিয়ে ছিল একসময়। যার কোনও ছবি নেই আমার কাছে। কিন্তু সেই পঁচিশ বছর আগের আমার হারিয়ে যাওয়া সাংবাদিক জীবনের কিছু ছবি আজ আমায় আবার ভিজিয়ে দিল এতদিন পরেও। আঁকাবাঁকা অক্ষরে জলে ভেজা রাস্তায় আঁকিবুঁকি অক্ষরে আমার ব্লগে কিছু কথা লিখে ফেললাম আমি।
 সবটাই তো সাদা জীবনের জলে ভেজা মেঠো রাস্তার কথা। যে রাস্তায় জোনাকির আলো আছে, যে রাস্তায় গভীর ভালোবাসা আছে, একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা আছে, যে রাস্তায় সেই বেহুলা লখিন্দরের মত কলার ভেলায় ভেসে যাওয়া আছে। আজ এতদিন পর মনে হয় যদি আবার অমন করে ভেসে যেতে পারতাম আবার কি ভালই যে হতো। 

আরামবাগের বন্যা - অভিজিৎ বসু।
সাতাশে জুলাই, দু হাজার চব্বিশ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ওই খানে মা পুকুর পাড়ে

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হবে বনবাসী,           কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে           থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে           থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি           ধনুক নিয়ে হাতে। .......রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টুপ টুপ বৃষ্টির দুপুরে এই কবিতার লাইন গুলো দেখে। মনে পড়ে গেলো মার কথা। বাইরে একটানা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কখনো কখনো বেশ জোরে, কোনো সময় একটু কম। মাথার মধ্যে কেমন ঝিম ঝিম করছে এই বৃষ্টির টানা আওয়াজ শুনে।  একটানা আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে একদম চুপ চুপে হয়ে গেছে। পাতার ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে নিচে।গাছের পাতাগুলোর অসময়ে স্নান করে ওদের আবার শরীর খারাপ না হয়।  জানলার ধারে সারাদিন ধরে যে পায়রা গুলো বসে থাকতো আর বক বকম করতো।...

সুসমীর ও আমি

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ আমার কলেজের বন্ধু সুসমীর এর কথা। ওর ভালো নাম সমীর ঘোষ। ওর বাড়ী শ্রীরামপুরে। আমার সাথে ওর আলাপ শ্রীরামপুর কলেজে পড়ার সময়। সেটা আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা হবে। আসলে কলেজের বেঞ্চিতে বসে ওর গলার গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি আমরা সবাই। ছেলে মেয়ে সবাই ওর গানের ভক্ত হয়ে গেলাম একদিন ওর গান শুনেই। মেয়েরা তো ওর ফ্যান হয়ে গেলো ওর গানের জন্য।  পরে আমাদের কলেজ জীবন শেষ করে আমরা এদিক ওদিক টুকটাক কাগজে লেখার জগতে দুজনেই প্রবেশ করেছি আমরা। একদিন খুব সম্ভবত বর্তমান কাগজে বিজ্ঞানের পাতায় দেখলাম সুসমীর দাস নামে এক জনের লেখা বেরিয়েছে।সেই সময় বিজ্ঞানের পাতা দেখতেন বর্তমানের রূপকুমার বসু। আমার সাথেও পড়ে রূপদার আলাপ হয়েছিল এই লেখার সূত্রেই।  মনে পড়ে প্রতি লেখায় পঞ্চাশ টাকা দিত বর্তমান‌ কাগজ সেই সময়। সমীর তখন বিজ্ঞান নিয়ে লিখছে, আকাশবাণী তে নানা অনুষ্ঠান করছে। এরপর তারা নিউজ ডেস্ক এর কাজে যোগদান করে সে। দীর্ঘ দিন তারা নিউজ এর কাজ করেছে সে। এই হলো সুসমীর এর জীবনের রেখাচিত্র।  কিন্তু আমার সাদা জীবনের এমন এক সাদা মানুষের ...

ভূত চতুর্দশীর সেই রাত

জীবনে আলো নেই, এদিকে ঘরে টুনি লাইট লাগাচ্ছি আর স্টাইল করে ছবি তুলছি। সত্যিই কত বিচিত্র আয়োজন আর বিচিত্র জীবন। ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যার আলোকজ্বল এই অমলিন, ঝাপসা, ম্রিয়মান এই ছবিটা ধরা থাকলো আমার জীবনের টাইমলাইনের ফেসবুকের পাতায় আলতো করে।  ঘরের দুয়ারে বাতি দিয়ে অন্ধকারের রাজ্যে চলে যাওয়া। আর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া আমার আত্মীয়দের পথ দেখালাম আমি। হ্যাঁ, যে পথ ধরে আমাদের ছেড়ে যাওয়া মানুষজন এসেছিলেন তাঁরা সেই মহালয়ার পুণ্য প্রভাতে। তাঁদের তর্পণ করে স্বাগত জানিছিলাম আমরা সবাই। এতদিন ধরে এই উৎসবের আনন্দে আলোকমালায় কেমন ঘুরে বেড়ালেন তাঁরা খুশি মনে। আজকের রাত তাঁদের আবার সেই ফিরে যাওয়ার রাত। যে রাতে ঘুম আসেনা কিছুতেই। যে রাতের অন্ধকারে কত কিছুই যে ঘটে যায়।   যাঁরা এতদিন এই পৃথিবীর টানে, আপনজনদের টানে পৃথিবীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই তাঁরাই আজ আমাদের ছেড়ে প্রিয়জনদের সবাইকে ছেড়ে ধীরে ধীরে চলে যাবেন দূরে,অনেক দূরে। আর আমরা তখন ঘরের দুয়ারে, উঠোনে তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে সেই তাঁদের যাত্রাপথকে সুগম করবো আলোক সজ্জা দিয়ে। এটাই হলো ভূত চতুর্দশীর সেই আল...

কুণাল ঘোষের বার্তা ও টোটো চালকের কিছু কথা

কুণাল দার সাথে কাজ করিনি আমি কোনোদিন। বাংলা সংবাদের জগতে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত সাংবাদিক আছেন। যাঁদের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে এই বাংলার মিডিয়ায়। আজ সেই কুণাল ঘোষ সংবাদ প্রতিদিন কাগজ থেকে কনসাল্টিং এডিটর পোস্ট থেকে সরে গেলেন। একদিকে তাঁর বিধায়ক হয়ে যাওয়া সরকার এর বদল হয়ে যাওয়া। আর তাই তিনি প্রতিদিন কাগজের দায়িত্ব থেকে সরে গেলেন তেমন এক বার্তা দিলেন তিনি নিজেই।  কুণাল ঘোষ এর সাথে আমার আলাপ বিশেষ নেই। সেই মহাকরণে করিডর দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের দিকে। তাঁর আগে পিছে সংবাদ মাধ্যমের কাজ করা রিপোর্টারদের ভীড় তাঁকে ঘিরে ভীড় করে আছেন আমিও দূরে আছি দাঁড়িয়ে। সেই বহু বছর আগে হাফ শার্ট পরে বিকেলের দিকে মদন মিত্রের অফিসে আসতেন। ২৪ চৌরঙ্গী রোড এর অফিসে ধর্মতলার কাছে। সান্ধ্য প্রতিদিন কাগজ পকেটে নিয়ে। রণজিৎ থাকতো সেই সময়। সেই সব দিন এর কথা মনে পড়ে যায় আজ আমার। সেই কঠিন বাম আমলে তাঁকে কাজ ছেড়ে চলে যেতে হয়নি একদমই। আর আজ সরকার বদলের সাথে সাথেই দিকে দিকে কাজ ছাড়ার হিড়িক পড়ে গেছে যে চারিদিক জুড়েই এই বাংলার মিডিয়ায়।  ইটিভির কাজের স...

রক্তাক্ত আমি

অর্থহীন, শব্দহীন,জীবনের অপমান বড়ই যন্ত্রণার। জীবনের অনুরণনে অপমানের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, শুনতে শুনতে ধীর পায়ে এগিয়ে চলা। ছিপখান ডিঙ্গি নৌকা বেয়ে নিজের মত করে অন্তরীণ হয়ে ভেসে বেড়ানো, এদিক থেকে ওদিক পানে। শঙ্খচিলের ডানায় তখন, রামধনুর সাত রঙ এর স্বপ্নের ঘুম জড়ানো ভোরের আস্তরণ। শালিকের ভেজা পায়ে, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের বাঙময় অব্যক্ত ধাক্কা। যে ধাক্কায় দ্বিখণ্ডিত হয় জীবনের অর্থ, অনর্থ, সৃষ্টি, অনাসৃষ্টি, সুখ, অসুখ,ভালোবাসা, ঘৃণা আরও কত কি।  চোখ খুলে দেখি বদলে গেছে, জীবনের উপল উপত্যকার ঢেউ খেলানো রাস্তার, সোজাসাপ্টা সেই বহু চেনা গলিপথ। যে গলিপথের চেনা রাস্তায় হাঁটতে নেমে রক্তাক্ত হই আমি বার বার। তবু রাতের আঁধার গায়ে মেখে রক্তাক্ত আমি ঘুরে, বেড়াই এদিক থেকে ওদিক। হাতড়ে খুঁজে বেড়াই রামধনুর রং মাখা ভোর। রক্তাক্ত আমি - অভিজিৎ বসু। ষোলো জুন, দু হাজার চব্বিশ।