সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রায়পুরের পাম্প অপারেটর লালু দা

আজকাল যতদিন যাচ্ছে তত আমি ধীরে ধীরে লোকের কাছ থেকে অন্তরালেই চলে যাচ্ছি কেমন। কথায় আছে না আউট অফ সাইট আউট আর আউট অফ মাইন্ড। এই দীর্ঘ দিন ধরে মিডিয়ায় কাজ করেও আমার এখন এই দশা। তবুও এর মাঝেই লালুদার মত লোকজন যে আমায় মনে রাখেন তাঁর মেয়ের বিয়ের কার্ড দিতে সেই মহম্মদ বাজারের রায়পুর গ্রাম থেকে বোলপুরে সকাল বেলায় চলে আসেন আমার ভাড়া বাড়ীতে। বারবার বলেন যে আপনি যাবেন দাদা আমার মেয়ের বিয়েতে যেতে হবেই কিন্তু আপনাকে। একদম গ্রামের সহজ সরল জীবনের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর কথা বলা আর নিমন্ত্রণ করা এটাই বেশ অবাক করে আমায়। 

লালুদার ভালো নাম যে প্রভাস বাদ্যকর তিনি যে আমার ফেসবুকের বন্ধু সেটা আমি জানতাম না এতদিন ধরে সোমা আমার ঘরের ড্রাইভার যিনি আমায় চালান তিনিই বলে দিলেন এই কথা। আসলে লালুদার সাথে আমার আলাপ হলো বীরভূমের গ্রামে গ্রামে জল জীবন মিশন এর কাজ করতে গিয়ে। সেই গ্রামে ঘুরে ঘুরে বাড়ীতে বাড়ীতে জল পৌঁছে দেওয়া। সেই জলের পাম্প চালিয়ে ঘরে ঘরে সময়ে জল পৌঁছে দেওয়া কাজ লালুদার। আর গ্রামে গ্রামে ঘরে জল না পেলেই লালুদাকে ফোনে যোগাযোগ করা গ্রামের লোকদের দাদা জল এলো না কেন এই বলে ফের ব্যস্ত করা তাঁকে। লালুদা এই মাথা থেকে ওই মাথায় জল জীবন এর জলকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হাসিমুখে কাজ করে যান খুব কম বেতনে সেই বিখ্যাত সাইকেল চালিয়ে।

রায়পুর একটি বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম। সেই মহম্মদ বাজার ব্লকের এই গ্রাম দেউচা পাচামি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়। লালুদার নখ দর্পণে গ্রামের সব বাড়ী। এক ডাকে সবাই তাঁকে চেনেন। একটি সাইকেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে বাড়িতে ঢুকে সেই জলের কাজ করা নাম ঠিকানা নিয়ে তার তালিকা প্রস্তুত করা। আর হাসিমুখে সরকার এর এই কাজে সাহায্য করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার লোকদের দাদাদের আর দিদিদের হেল্প করা এটাই লালুদার কাজ। এমন একটা চরিত্র তিনি। যিনি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিশুদ্ধ পানীয় জল বাড়ীতে পৌঁছে দিয়েই তিনি কাজ করে যান। কোনোও ক্লান্তি নেই এক ঘেয়ে এই কাজ করেও তাঁর দীর্ঘদিন ধরে। 

সেই লালুদার ছোটো মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ পেলাম আমি বোলপুরে বাস করে। আজকাল তো নিজের আত্মীয় স্বজন সব অনেকেই আর অর্থ রোজগার না করার কারণে আর কাজ করিনা বলে আগের মত যোগাযোগ রাখতেই চায়না কেউ। কেউ কেউ আবার নিজের আত্মীয় স্বজন বলেন তোমায় আর মাথা দিতে হবে না সংসারের এইসব কাজে। সত্যিই অসাধারণ লাগে এই কথা। কদিন আগেও যাঁদের কে সাহায্য করেছি আমি হঠাৎ করেই আজ কেমন এমন হয়ে গেলাম সবার কাছেই। আর সেই জায়গায় একজন জলের পাম্প চালিয়ে সংসার চালানো এক গ্রামের মেঠো মানুষ যিনি কাজে গেলেই নিজের ক্ষেতের শাক সবজি সব দেন ব্যাগে ভরে ঘরে খাবার জন্য নিয়ে যান বলে। নিজের চাষের টাটকা জিনিস বলে কথা। আর লালুদার সেই হাসিমুখে গ্রামের বাড়ীতে ঘুরে ঘুরে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া। সেই পল্লবীর কথায় ঘটাং করে মেশিন ঘুরিয়ে তাঁর জল এনে দেওয়া দাদা। এমন লোকের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পেতে ভালোই লাগে বেশ।

 

গ্রামের সহজ সরল জীবনের এই সব মানুষগুলো বেশ আপনজন হয়ে যান আমার অল্পদিনের আলাপেই। সেই ওদের ঘরের অন্দরে আর তাঁদের অন্তরে প্রবেশ করতে অসুবিধা হয়না কোনোও জায়গা পেতে আমার। সেই দিল্লী থেকে সেন্ট্রাল এর টিম আসার সময় লালুদা যে কত সাহায্য করলেন আমাদের এই কাজে। সেই গ্রামে ঘুরে ঘুরে বাড়ী ঘুরে সবার নাম বলে তালিকা প্রস্তুত করা। একদম পাড়া ধরে সবটাই মুখস্থ যে তাঁর। গ্রামের এইসব মানুষগুলো আছেন বলেই তো এই গ্রামে ঘুরে জলের সরকারী কাজ করা গেলো এতদিন ধরে। সেই লালুদা আমার বেশ কাছের জন। তাঁর মেয়ের বিয়ের কার্ড পেলাম আমি। এর থেকে বড়ো কথা আর কী হতে পারে বলুন তো এই আমার মতো একজন বাতিল হয়ে যাওয়া জীবনে। আমার সাদা জীবনের কালো কথায় আমার আঁকিবুঁকি ব্লগের পাতায় সেই গ্রামের সাধারণ মানুষ একজন পাম্প অপারেটর লালুদার কথা লিখে ফেললাম আমি আজ। ভালো থাকবেন আপনি দাদা। জীবনের এই দীর্ঘ পথে এমন কত সম্পর্ক যে ছায়া হয়ে নেমে আসে কে জানে। 

রায়পুরের পাম্প অপারেটার লালুদা - অভিজিৎ বসু।
এগারো ফেব্রুয়ারি দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কলকাতা টিভির দেবাশীষ সেনগুপ্ত

'টোটো চালক আমার কাছে নয়, তুমি খবরের কারিগর আমার এক সময়ের প্রাক্তন সহকর্মী।' আসলে এই ফেসবুকের দেওয়ালে এই লেখাটা পড়ে কেমন যেন একটু আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। বরাবর আমি এই আবেগ নিয়েই বেঁচে থাকতে ভালোবাসি সারাটা জীবন। যেটা মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র পুঁজি। হারতে হারতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা, প্রাণপণে লড়াই করে বেঁচে থাকার মজা আর সুখ আলাদা। তার অনুভূতিও আলাদা।  আর তাই আমার এই সাদা জীবনের কালো কথায় আমার আঁকিবুঁকি ব্লগের অক্ষরের জালে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা হলো আমার ওকে। শুধু ওর এই লেখাটা পড়ে। কতজনের সাথে তো কতদিন একসাথে কাজ করলাম। কতজনের সাথে তো বছরের পর বছর একসাথে পাশে বসে কাজ করলাম, কই কেউ তো বলে না তুমি আমার একদা সহকর্মী ছিলে। একসময়ে খবরের কারিগর ছিলে তুমি। যে খবর নিয়েই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলেতুমি এদিক ওদিক না তাকিয়ে। মই ধরে ওপরে ওঠার চেষ্টা না করে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিলে শুধুই খবর খবর আর খবর নিয়ে।  আর তাই খুব কম দিন একসাথে কাজ করে ওর এই লেখা দেখে মনে হলো আমার ওর কথা লিখি আজ আমি। সেই কলকাতা টিভির দেবাশীষ। সেই সদা হাস্যময় একজন বহু পুর...

ওই খানে মা পুকুর পাড়ে

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হবে বনবাসী,           কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে           থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে           থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি           ধনুক নিয়ে হাতে। .......রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টুপ টুপ বৃষ্টির দুপুরে এই কবিতার লাইন গুলো দেখে। মনে পড়ে গেলো মার কথা। বাইরে একটানা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কখনো কখনো বেশ জোরে, কোনো সময় একটু কম। মাথার মধ্যে কেমন ঝিম ঝিম করছে এই বৃষ্টির টানা আওয়াজ শুনে।  একটানা আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে একদম চুপ চুপে হয়ে গেছে। পাতার ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে নিচে।গাছের পাতাগুলোর অসময়ে স্নান করে ওদের আবার শরীর খারাপ না হয়।  জানলার ধারে সারাদিন ধরে যে পায়রা গুলো বসে থাকতো আর বক বকম করতো।...

হ্যাপি বার্থডে দাদা

দোল পূর্ণিমার দিন শেখ শাহজাহান এর জন্মদিন। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর এই প্রেমের দিনে শেখ শাহজাহান এর আবির্ভাব দিবস। বেশ ভালো ব্যাপার কিন্তু এটা। সত্যিই মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ করেই রাতে সেটা জানতে পারলাম আমি। একটু অবাক হলাম আমি সেটা জেনে। সেই শ্রীরামপুরে তারাপুকুর এলাকার কাউন্সিলর উত্তম রায় এর পরিচিত ড্রাইভার ও। একদিন আমার খুব ড্রাইভার দরকার ওকে পেলাম আমি উত্তম রায়কে ধরেই। সেই আজ থেকে পাঁচ বা ছয় বছর আগের কথা হবে সেদিন।  সেই ওর সাথে আমার আলাপ এর শুরু। তারপর তো ওই আমার গাড়ীর একমাত্র ভরসা। ওকে ছাড়া আমি অচল, আর আমার গাড়িও অচল। দিনে রাতে যেখানে যেতে হবে ওই একমাত্র আমার ভরসা। কলকাতার পঁচিশে ডিসেম্বরে পার্ক স্ট্রীট যাওয়া হোক আর সেই রাত নটায় শ্রীরামপুর থেকে বেরিয়ে রাত বারোটায় বোলপুর পৌঁছে যাওয়া হোক। মেয়ের ভর্তি, বোলপুরে বাড়ী ভাড়া নেওয়া, প্রতি সপ্তাহে গাড়ি নিয়ে বোলপুর চলে আসা শ্রীরামপুর থেকে। আবার সেই আমার মায়ের কাজে সবার প্রথম আমার রিষড়ার বাড়ীতে চলে যাওয়া দাদা এসেছি বলে। সত্যিই এমন কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা এইভাবেই কেমন জীবনের সাথে জ...

ঈদের চাঁদের আলো

ঈদের আকাশে শুধু এক ফালি চাঁদের অপেক্ষা। তারপর কত শত মানুষের মুখের, মলিন হাসি মাখা উজ্জ্বল সব আনন্দের মুখ।  ঘরে ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গোনা, সব মানুষ জন। বাজিতপুর ঘাট থেকে স্টিমারের ভোঁ ভোঁ আওয়াজ। স্টিমারের গায়ে জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখা একরাশ চাপা, নিশুতি রাতের গভীর গোপন ভালোবাসা। ঠিক যেনো জুঁই ফুলের সুবাস ছড়ায় গরম কালে, সেই ভালোবাসার ধাক্কা লাগে স্টিমারের গায়ে। জলের ওপর ছড়িয়ে পড়া চাঁদের টুকরো টুকরো আলো গায়ে মেখে, দুলে ওঠে স্টিমার। জুঁই এর গন্ধ মাখা আলোর টুকরো ভেসে যায় নদীর পাড় ধরে।  সব মিলিয়ে আজ যে আমাদের খুশীর ঈদ। এই তো কিছু দিন আগেও এই ঈদের দিন শবনম এসেছিল। যে সেমাই এর পায়েস নিয়ে হাজির হয়েছিল, সুজাতার মতই আমার টালির ঘরে। যার চোখের পানিতে ভিজে গেছিলো, উঠোন, দাওয়া সব কিছুই। কেমন যেনো সুখের পরশ পেয়ে খুশি হয়ে ছিলাম আমরা দুজনেই। আজ আর চাঁদের টুকরো আলোয়, চক চক করে না শবনমের মুখ। হাজারো চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, খুশির জোয়ার আসে না কিছুতেই, এই খুশীর দিনেও। শবনমের হাতের মুঠোয় ধরা থাকে না পায়েসের বাটি। শবনমের শুকনো বুকে মুখ লুকিয়ে খাবার...

একে তো ফাগুন মাস কী জানি কী হয়

একে তো ফাগুন মাস কি জানি কি হয়। ফাগুনের আগুনে পুড়ে মরতে মন চায় বারবার। সবুজ ধানের ক্ষেত ধরে গোল্লা ছুট এর দৌড়ে বেড়ানো। লাল পলাশের গায়ে পিছলে পড়ছে সূর্যের নরম এলোমেলো আলো। আর তার মাঝ দিয়ে ছুটে চলেছে আমার গাড়ি বোলপুর থেকে সিউড়ির পথে। বিকেল বেলায় বেরিয়ে পড়া।  সবুজ ধানের ক্ষেতে তখন ক্লান্ত সূর্যের সবুজ মোরাম বিছানো গালিচায় নরম আলোর স্পর্শ। যে আলোর স্পর্শ মেখে হলুদ আর লাল পলাশের মিষ্টি লাজুক হাসি। গাছের ডালে বসে থাকা দোয়েল, ফিঙে আর শ্যামার নাচন আর ঘুঘুর বিরহী ডাক। কাঁচ পোকার এদিক ওদিক উড়ে যাওয়া। বাড়ির মাটির উঠোনে ন্যাঙটো শিশুর ঘুরে বেড়ানো আপন মনে ধুলো পায়ে। আর ওই মন কেমন করা ঘুঘুর ডাকে মনে পড়ে যায় ফাগুন এসেছে বনে বনে।  সত্যিই আগুন মাখা এই ফাগুন। মন কেমনের ফাগুন। প্রেমের ডাক দেওয়া এই আগুনে ফাগুন। যে ফাগুন হাওয়ায় মনের মাঝে দোলা লাগে।মনে মনে গেয়ে উঠি লাগলো রে দোল। সত্যিই শীতের শেষে, চৈত্রের খাঁ খাঁ দুপুর গড়িয়ে বিকেল বেলায় বসন্তের মৃদু আঁচে পুড়ে মরতে বড্ড ভালো লাগে যে আমার। ঠিক ওই আম গাছের বউল ধরা ডালে মৌমাছির মতই গুনগুন...