দুজনের একজনকে চেনা যাচ্ছে আর একজনকে কিছুতেই চেনা যাচ্ছে না একদম অনেক চেষ্টা করেও। বিবর্ণ ঝাপসা দুজনের ছবি তাঁদের গলায় মালা ফুলের দেওয়া। সেই পিসি আর বল্লভদার চেনা মিস্টি জুটি। আজ যে বল্লভদার মৃত্যুদিন। সেই ছোটবেলায় আমায় পড়াতে আসতো যিনি বীণা পিসি আমাদের পাড়ায় থাকতেন সেই বুলার দিদি। সেই আহিরীটোলা থেকে টিউশন সেরে সংসার বাঁচাতে পিসির দৌড়ে বেড়ানো এদিক ওদিক সেদিক ছোটো ছোটো ভাইবোনদের জন্য। আর পিসির মায়ের ঠোঙা করে বড় মেয়ের সেই দোকানে দোকানে ঘুরে বিক্রি করা। রাতে একা একা আমার মা শুতে পারবে না বাবা বাইরে কাজে পিসির সেই গভীর রাতে এসে দরজায় টক টক করা প্রতিদিন। আর সেই শীত পড়লেই টমেটোর চাটনি নিয়ে কাপে করে আমাদের খেতে দেওয়া পিসির সেই রাতের বেলায় এসে বলা বৌদি বাপি খুব ভালো বাসে ওকে দেবেন আপনি ওকে। এখনও মুখে লেগে আছে যে আজও সেই টমেটোর চাটনির স্বাদ।
আজ সেই পিসি মানে বীণাপিসি আর বল্লভদার সহজ সরল জুটির কথা জীবনের কথা। আমার সাদা জীবনের কালো কথায় আমার আঁকিবুঁকি ব্লগের পাতায় তাঁদের কথা। সেই দুজনের কষ্টের সংসার। সেই জল কাদা পেরিয়ে প্রতি মাসের ২৩ তারিখ সৎসঙ্গ হওয়া পিসীর বাড়ী জল এর জন্য পদ্মপুকুর এলাকায় লোকজনের না যাওয়া। আর সেই প্যান্ট গুটিয়ে জল পেরিয়ে ঘুরে বেড়ানো বল্লভদার এই বাড়ী ওই বাড়ী। সেই ছোটো বেলায় শরীর খারাপ হলেই তাঁর কাছে ছুটে যাওয়া আমাদের সবারই। আর রাত বিরেতে কপালে ঠেকিয়ে জল পড়ে দিয়ে কেমন করে যে সুস্থ করে দেওয়া আমাদের তাঁর সেটা কী করে কে জানে। এমন সেই কপালে হাত ঠেকিয়ে বলা সব ঠিক হয়ে যাবে বৌদি একদম চিন্তা করবেন না আপনি। বুটার জন্য যে কতবার তিনি এইভাবেই মন্ত্র পড়ে জল দিয়েছেন আমায়।
সেই জল থৈ থৈ ঘর। সেই পিসির ঠাকুরের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে যে কোনোও কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে কষ্টের সংসার বাঁচিয়ে রাখা আর ঠাকুরকে যে কোনোও সময় যে কোনোও কাজে বিশ্বাস নিয়ে অর্থ দিয়ে ঠাকুরের কাজে যোগান দেওয়া। আর একটা সময় এই ভাঙা বাড়ীর এই চেহারা ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া। সেই বেড়ার ঘরে আজ সুন্দর দেয়াল সুন্দর রং এর প্রলেপ পড়েছে। উজ্জ্বল আলোর রোশনাই। শুধু নেই বীণা পিসি আর বল্লভ দা। মানু ওদের একমাত্র ছেলে। বাবার মৃত্যুকে স্মরণ করেই আজ সৎসঙ্গ দেওয়া ওর। যার ছবি দেখে এইসব কথাই মনে পড়ে গেলো আমার। সেই ওদের যৌথ পরিবার। কত জনের সংসার সেই সংসারে পিসির সবার জন্য করে যাওয়া মুখ বুজে চুপ করে। জীবনের মোরাম পথে এমন কিছু কিছু মানুষ থেকে যান। যাঁদের কথা ভুলে গেলেও আবার মনে পড়লে মনে হয় এই মানূষকে ভুলে গেলাম কী করে আমি। সত্যিই তো এইসব মানুষ গুলো তো আমার জীবনের আশপাশে জড়িয়ে ছিলো। যাঁদের সাহায্য নিয়ে আমরা বেঁচে ছিলাম সেই ছোটবেলায়।
সেই পিসীর অতি সাধারণ চেহারা। সেই দুজনের একসাথে মিলে মিশে বাস করা। আর মানু ওদের একমাত্র সন্তান যে ছেলের জন্য পিসির বেশ চিন্তা ছিলো ছোটো থেকেই। আজ সেই ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে অনেকটাই। আজ সেই বল্লভদার কথা লিখতে বসে এই সব নানা কথাই আমার মনে পড়ে যায় আমার। জীবনের এই দীর্ঘ পথে এমন সব বিশ্বাসী মানুষজন এর সন্ধান পেয়ে মনে হয় আমি তো বিশ্বাসী হতেই পারলাম না কিছুতেই এই বুড়ো বয়সেও। সেই শুধুই বিনা জিজ্ঞাসায় বিশ্বাস করে যাওয়া তাঁকে। আর নিজের জীবনকে সঁপে দিয়ে বেঁচে থাকা এর থেকে বড় আর কী হতে পারে বলুন তো। ধর্ম, অর্থ,কাম, মোক্ষের সেই ঠিকানা ভুলে চরম দারিদ্র্যকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে শুধুই ঠাকুরকে নিয়েই বেঁচে থাকা। আর আজ এই সৎসঙ্গের ভীড় এর ছবি দেখে মনে মনে কেমন লাগে আমার। সেই ২৩ তারিখ এলেই পিসির টেনশন শুরু হয়ে যাওয়া লোক হবে তো বারবার একে ওকে তাকে বলা আর সেই ছাপা অনুজ্জ্বল শাড়ী পড়ে জলে ডোবা রাস্তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা। সত্যিই আজ সেই পিসির মুখটার কথা মনে পড়ে গেল আমার।
সেই কোন্নগর মন্দিরের গোপীবল্লভ সাহা, কেষ্ট চ্যাটার্জী, হারান দাস, মৃণাল কান্তি রায়, সুতৃপ্তি মিস্টির দোকানের মন্মথ দা, হরিপদ কর, নীরেন চৌধুরী আরও কতজন যে ছিলেন সেই সময়ে। সেই মগরা মন্দিরের লক্ষ্মী নারায়ণ দত্ত এইসব মানুষদের থেকেই তো আমাদের সবার সেই ধর্মের রাজ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করা। যাঁদের কে দেখেই এই ধর্ম আর অধর্মের পাঠ এর শিক্ষা নেওয়া তাঁদের কাছ থেকেই। আজ সেই ধর্মীয় শিক্ষার আলো গেছিলো বলেই হয়তো আজও অধর্ম করতে গেলেই মনের মাঝে নিজের বিবেকের দংশন হয় আজ। ধর্ম তো এটাই জীবনে একটা গভীর সু বোধ এর জন্ম দেওয়া নিজের অন্তরে। আর একজন উচ্চ মার্গের মানুষকে গুরু পদে বরণ করে নিজের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলা। এর থেকে বেশী কিছুই নয়।
সেই সময় অবশ্য এত দড়ি টানাটানি ছিলোনা এই ধর্মের রাজ্যেও। সেই ক্ষমতার রাশ কার হাতে থাকবে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে নাম এর তালিকা করে দেওঘর দৌড়তে হয়নি কাউকেই। শুধুই বিশ্বাস ভক্তি আর কর্মের জোয়ারে এগিয়ে গেছে এই সংঘ অতি দ্রুত গতিতে। আজ তো কেমন ডিপি ওয়ার্ক এর নামে কেমন কর্পোরেট ছোঁয়া লেগেছে যেনো এই মন্দিরের আঙিনায়। যাকগে যখন যেমন তখন তেমন আমার এই ছবি দেখে বল্লভদার আর বীণা পিসির কথা মনে পড়ে গেলো আজ। প্রণাম জানাই আমার দুজনকেই। একজন যিনি আমার ছোটবেলার প্রাইভেট শিক্ষক আর অন্যজন হলেন নানা বিপদে আমাদের উদ্ধার করা একজন ঠাকুর বিশ্বাসী মানুষ। দুজনেই যে ঠাকুরকে ভরসা করেই কাটিয়ে দিলেন নিজেদের সারাটা জীবন। ভালো থাকুন আপনারা আমার প্রণাম নেবেন।
বল্লভ দা ও বীণা পিসির গল্প - অভিজিৎ বসু।
বারো ফেব্রুয়ারি দু হাজার ছাব্বিশ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন