সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রতনপল্লীর আড্ডায় আমরা

রতনপল্লীর আড্ডায় নিখিলদার আমন্ত্রণে হাজির হলাম আমি বহুদিন পর। সেই চেনা রতনপল্লীর মাঠ অচেনা হয়েছে অনেক আগেই। আমার সেই আমলকী গাছের বন্ধুত্ব আর সেই পুরোনো দিনের বন্ধু হারিয়ে গেছে কবেই এই কুয়াশা মাখা পথের আড়ালে ওই চেনা মাঠের ধারেই। হালকা শীতের আমেজ গায়ে মেখে আমার সেই চেনা জায়গায় আবার ফিরে যাওয়া আর স্মৃতির সরণী বেয়ে পথ চলা। সেই চেনা রতনপল্লীর গন্ধ পেতে। সত্যিই শান্তিনিকেতনে আমার মেয়ের পড়তে এসে এই রতনপল্লীর ভাড়া বাড়ীতেই বাস করা প্রথম আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে। 

কিন্তু একি দেখছি আমি সেই উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে চারিদিক জুড়ে শুধুই বাণিজ্য আর বাণিজ্য চলছে যে। চারিদিকে হৈ চৈ হুল্লোড় পড়ে গেছে আর আলোর রোশনাই আর ফোন পের টুকটাক মৃদু আওয়াজ। এদিক ওদিক ঝাঁ চকচকে জীবন এর সন্ধানে সুখী দাম্পত্য জীবনের ঘুরতে এসে মেঠো আস্তানা নয় একদম ফাইভ স্টার আস্তানা গড়ে ওঠা এই মেঠো জায়গায়। সত্যিই অসাধারণ কিন্তু এই বদলে যাওয়া জীবন আর জীবনের নানা স্বাদের সুলুক সন্ধান পাওয়া এই জায়গায়। যা দেখতে দেখতে কেমন যেনো লাগলো আমার এই শীতের সন্ধ্যায়। সেই নিখিলদার সাথে দেখা হলো এক বই এর দোকানে সিঁড়ি বেয়ে উঠে সাথে আরও অনেক সঙ্গী আর সঙ্গিনীর সাথে নিখিলদার আমার সাথে আলাপ করিয়ে দেওয়া আজ।

 
সেখান থেকে এক নতুন চায়ের আড্ডার জায়গায় এলাম আমরা রেনেসাঁ নাম যার। ফাঁকা মাঠে হিম গায়ে মেখে বাঁশের বেঞ্চে বসে পুরোনো দিনের স্বাদ পেতে রেনেসাঁর এই আড্ডা কিন্তু মন্দ নয় একদমই। সেই কালোর চায়ের দোকান, অন্ধকার মায়াময় পথ, সেই ফাঁকা রাস্তায় হেঁটে চলে যাওয়া, সেই ত্রয়ী নামের চেনা দোকান, সেই জীবন এর দেখা পাওয়াই ভার এই এখন। সব যে গ্রাস করছে ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পনে আমাদের সবার অগোচরে অজান্তেই। তার মাঝে দুই কন্যার কাহিনী আর সুখের বন্ধুত্ব দেখে বেশ ভালোই লাগলো আমার এই মাঘের সন্ধ্যায়। আজকাল এই যান্ত্রিক যুগে বন্ধুত্বও যে যান্ত্রিক আর কেজো হয়ে গেছে কবেই। 

আসলে আজকাল এই চেনা মানুষের হঠাৎ করেই অচেনা হয়ে যাওয়া। সেই চেনা জায়গার হঠাৎ করেই বদলে যাওয়া দেখে কেমন যেনো ভয় ভয় করে বেশ এই বুড়ো বয়সে এসে আমার আজকাল। যদিও এই নিখিলদার আড্ডায় বেশ কয়েকজন এর সাথে আলাপ হলো বন্ধুত্ব হলো অল্প সময়ে। সেই দুজনের একসাথে মিলে মিশে একসাথে থাকা জুটি বেঁধে তাঁদের সাথে পড়া করা ছাত্রী তাঁদের সাথে আলাপ হলো। একজন বিষ্ণুপুর একজন বেহালার দুই কন্যা তারা। সেই জুটি বেঁধে তাদের জোট বেঁধে থাকা দেখে ভালই লাগে বেশ এই চেনা আর অচেনার যুগে এই পাওয়াই বা কম কী বলুন তো এই রতনপল্লীর রাতের আড্ডায়। 

রাত বাড়ছে ঠান্ডা বাড়ছে শীতের আমেজ গায়ে মেখে বেলুন ফাটিয়ে জন্মদিন পালন হলো রতনপল্লীর এই আড্ডায় যা দেখে মনে মনে ভাবলাম যাক খারাপ কী এটা। কেক কাটা হলো নরম কেকের স্বাদ পাওয়া হলো। সত্যিই এই জীবন বড় মায়ার। যে জীবনে জন্মদিন আর মৃত্যুদিন হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলে ঠিক সেই বেহালা আর বিষ্ণুপুরের দুই কন্যার বন্ধুত্বের মতই। 

এই রতনপল্লীর বদলে যাওয়া জীবন হলেও সেই রাস্তার পাশে লিট্টি চোখার দোকান দশ টাকার লিট্টি খেয়ে ঘরে ফেরা আমাদের। যে লিট্টি নিয়ে রাজনীতির ময়দানে এতো হইচই পড়ে গেছে আজকাল। জানা নেই রবি ঠাকুরের আমলে সেই লিট্টি আর মোমোর স্বাদ জুটেছে কি না এই 'শান্তির' জায়গায়। সেই জীবক নামের দোকানের গায়ে ঘাস ফুলের পতাকার ঠাণ্ডা কুয়াশা মেখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকা। সেই দূরে কাঁচঘরের গায়ে ঠান্ডার প্রলেপ লেগে যাওয়া। আর রবি ঠাকুরের দেশে এই রতন কুঠির পাশের মাঠ সেই রতনপল্লীর ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া। শুধু আমিই নিজেই নিজেকে বদলে নিতে পারলাম না এই বুড়ো বয়সেও। সবাই ভাল থাকুন আপনারা। 

রতনপল্লীর আড্ডায় আমরা - অভিজিৎ বসু।
দশ ফেব্রুয়ারী দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য নিজের মোবাইল ক্যামেরায় তোলা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কলকাতা টিভির দেবাশীষ সেনগুপ্ত

'টোটো চালক আমার কাছে নয়, তুমি খবরের কারিগর আমার এক সময়ের প্রাক্তন সহকর্মী।' আসলে এই ফেসবুকের দেওয়ালে এই লেখাটা পড়ে কেমন যেন একটু আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। বরাবর আমি এই আবেগ নিয়েই বেঁচে থাকতে ভালোবাসি সারাটা জীবন। যেটা মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র পুঁজি। হারতে হারতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা, প্রাণপণে লড়াই করে বেঁচে থাকার মজা আর সুখ আলাদা। তার অনুভূতিও আলাদা।  আর তাই আমার এই সাদা জীবনের কালো কথায় আমার আঁকিবুঁকি ব্লগের অক্ষরের জালে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা হলো আমার ওকে। শুধু ওর এই লেখাটা পড়ে। কতজনের সাথে তো কতদিন একসাথে কাজ করলাম। কতজনের সাথে তো বছরের পর বছর একসাথে পাশে বসে কাজ করলাম, কই কেউ তো বলে না তুমি আমার একদা সহকর্মী ছিলে। একসময়ে খবরের কারিগর ছিলে তুমি। যে খবর নিয়েই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলেতুমি এদিক ওদিক না তাকিয়ে। মই ধরে ওপরে ওঠার চেষ্টা না করে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিলে শুধুই খবর খবর আর খবর নিয়ে।  আর তাই খুব কম দিন একসাথে কাজ করে ওর এই লেখা দেখে মনে হলো আমার ওর কথা লিখি আজ আমি। সেই কলকাতা টিভির দেবাশীষ। সেই সদা হাস্যময় একজন বহু পুর...

ওই খানে মা পুকুর পাড়ে

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হবে বনবাসী,           কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে           থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে           থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি           ধনুক নিয়ে হাতে। .......রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টুপ টুপ বৃষ্টির দুপুরে এই কবিতার লাইন গুলো দেখে। মনে পড়ে গেলো মার কথা। বাইরে একটানা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কখনো কখনো বেশ জোরে, কোনো সময় একটু কম। মাথার মধ্যে কেমন ঝিম ঝিম করছে এই বৃষ্টির টানা আওয়াজ শুনে।  একটানা আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে একদম চুপ চুপে হয়ে গেছে। পাতার ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে নিচে।গাছের পাতাগুলোর অসময়ে স্নান করে ওদের আবার শরীর খারাপ না হয়।  জানলার ধারে সারাদিন ধরে যে পায়রা গুলো বসে থাকতো আর বক বকম করতো।...

হ্যাপি বার্থডে দাদা

দোল পূর্ণিমার দিন শেখ শাহজাহান এর জন্মদিন। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর এই প্রেমের দিনে শেখ শাহজাহান এর আবির্ভাব দিবস। বেশ ভালো ব্যাপার কিন্তু এটা। সত্যিই মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ করেই রাতে সেটা জানতে পারলাম আমি। একটু অবাক হলাম আমি সেটা জেনে। সেই শ্রীরামপুরে তারাপুকুর এলাকার কাউন্সিলর উত্তম রায় এর পরিচিত ড্রাইভার ও। একদিন আমার খুব ড্রাইভার দরকার ওকে পেলাম আমি উত্তম রায়কে ধরেই। সেই আজ থেকে পাঁচ বা ছয় বছর আগের কথা হবে সেদিন।  সেই ওর সাথে আমার আলাপ এর শুরু। তারপর তো ওই আমার গাড়ীর একমাত্র ভরসা। ওকে ছাড়া আমি অচল, আর আমার গাড়িও অচল। দিনে রাতে যেখানে যেতে হবে ওই একমাত্র আমার ভরসা। কলকাতার পঁচিশে ডিসেম্বরে পার্ক স্ট্রীট যাওয়া হোক আর সেই রাত নটায় শ্রীরামপুর থেকে বেরিয়ে রাত বারোটায় বোলপুর পৌঁছে যাওয়া হোক। মেয়ের ভর্তি, বোলপুরে বাড়ী ভাড়া নেওয়া, প্রতি সপ্তাহে গাড়ি নিয়ে বোলপুর চলে আসা শ্রীরামপুর থেকে। আবার সেই আমার মায়ের কাজে সবার প্রথম আমার রিষড়ার বাড়ীতে চলে যাওয়া দাদা এসেছি বলে। সত্যিই এমন কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা এইভাবেই কেমন জীবনের সাথে জ...

ঈদের চাঁদের আলো

ঈদের আকাশে শুধু এক ফালি চাঁদের অপেক্ষা। তারপর কত শত মানুষের মুখের, মলিন হাসি মাখা উজ্জ্বল সব আনন্দের মুখ।  ঘরে ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গোনা, সব মানুষ জন। বাজিতপুর ঘাট থেকে স্টিমারের ভোঁ ভোঁ আওয়াজ। স্টিমারের গায়ে জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখা একরাশ চাপা, নিশুতি রাতের গভীর গোপন ভালোবাসা। ঠিক যেনো জুঁই ফুলের সুবাস ছড়ায় গরম কালে, সেই ভালোবাসার ধাক্কা লাগে স্টিমারের গায়ে। জলের ওপর ছড়িয়ে পড়া চাঁদের টুকরো টুকরো আলো গায়ে মেখে, দুলে ওঠে স্টিমার। জুঁই এর গন্ধ মাখা আলোর টুকরো ভেসে যায় নদীর পাড় ধরে।  সব মিলিয়ে আজ যে আমাদের খুশীর ঈদ। এই তো কিছু দিন আগেও এই ঈদের দিন শবনম এসেছিল। যে সেমাই এর পায়েস নিয়ে হাজির হয়েছিল, সুজাতার মতই আমার টালির ঘরে। যার চোখের পানিতে ভিজে গেছিলো, উঠোন, দাওয়া সব কিছুই। কেমন যেনো সুখের পরশ পেয়ে খুশি হয়ে ছিলাম আমরা দুজনেই। আজ আর চাঁদের টুকরো আলোয়, চক চক করে না শবনমের মুখ। হাজারো চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, খুশির জোয়ার আসে না কিছুতেই, এই খুশীর দিনেও। শবনমের হাতের মুঠোয় ধরা থাকে না পায়েসের বাটি। শবনমের শুকনো বুকে মুখ লুকিয়ে খাবার...

একে তো ফাগুন মাস কী জানি কী হয়

একে তো ফাগুন মাস কি জানি কি হয়। ফাগুনের আগুনে পুড়ে মরতে মন চায় বারবার। সবুজ ধানের ক্ষেত ধরে গোল্লা ছুট এর দৌড়ে বেড়ানো। লাল পলাশের গায়ে পিছলে পড়ছে সূর্যের নরম এলোমেলো আলো। আর তার মাঝ দিয়ে ছুটে চলেছে আমার গাড়ি বোলপুর থেকে সিউড়ির পথে। বিকেল বেলায় বেরিয়ে পড়া।  সবুজ ধানের ক্ষেতে তখন ক্লান্ত সূর্যের সবুজ মোরাম বিছানো গালিচায় নরম আলোর স্পর্শ। যে আলোর স্পর্শ মেখে হলুদ আর লাল পলাশের মিষ্টি লাজুক হাসি। গাছের ডালে বসে থাকা দোয়েল, ফিঙে আর শ্যামার নাচন আর ঘুঘুর বিরহী ডাক। কাঁচ পোকার এদিক ওদিক উড়ে যাওয়া। বাড়ির মাটির উঠোনে ন্যাঙটো শিশুর ঘুরে বেড়ানো আপন মনে ধুলো পায়ে। আর ওই মন কেমন করা ঘুঘুর ডাকে মনে পড়ে যায় ফাগুন এসেছে বনে বনে।  সত্যিই আগুন মাখা এই ফাগুন। মন কেমনের ফাগুন। প্রেমের ডাক দেওয়া এই আগুনে ফাগুন। যে ফাগুন হাওয়ায় মনের মাঝে দোলা লাগে।মনে মনে গেয়ে উঠি লাগলো রে দোল। সত্যিই শীতের শেষে, চৈত্রের খাঁ খাঁ দুপুর গড়িয়ে বিকেল বেলায় বসন্তের মৃদু আঁচে পুড়ে মরতে বড্ড ভালো লাগে যে আমার। ঠিক ওই আম গাছের বউল ধরা ডালে মৌমাছির মতই গুনগুন...