সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আজ গৌতমের গল্প

রবিবার সকাল বেলায় হঠাৎ প্রবীরদার ফোন এলো আমার কাছে। আজকাল অবশ্য ফোন আসা একদম কমেই গেছে প্রায়। তবু ধরলাম কী ব্যাপার বললেন একজন দাঁড়িয়ে আছে তোর ফ্ল্যাটের নিচে কাগজ দেবে বলে। ওপর থেকেই ব্যাগ ফেলে দিলাম আমি। বললাম ফ্ল্যাট এর একচিলতে বারান্দা থেকে ঘাড় উঁচিয়ে সেই ঠিক কবিতার মোরগের মত ভালো আছো তুমি। বললো না বুঝতে পারছিনা একবার নীচে আসবেন। আসলে এই সব বাড়ীর বারান্দা থেকে কপিকলে বালতি ঝুলিয়ে কুয়ো থেকে জল তোলার মত ঝপ করে ব্যাগ ফেলে দেওয়া আর দরকারী জিনিস নামিয়ে দেওয়া বা তুলে নেওয়া এটাই রীতি যে এই ফ্ল্যাট কালচারের। তবু যখন বললো নামলাম আমি ওর কথা শুনেই। আরে এতো আমার চেনা মুখ। নামটা বলতেই মনে পড়ে গেলো যে সেই গৌতম। ওর ভালো নাম গৌতম দত্ত। 


সেই পল্লীডাক এর প্রেসে সেই গলিতে এসে সাইকেলটা হেলান দিয়ে রাখতো। তারপর এসে দাঁড়াতো সে চুপ করে কথা কম বলতো। আর তারপরে কাগজ বের হয়েছে জেনে কাগজ ব্যাগে পুড়ে ওর চলে যাওয়া। এই ছবিটা আমার আজও মনে আছে। পল্লীডাক কাগজ ঘুরে ঘুরে পৌঁছে দেওয়া তাঁর কাজ। কম করে ৩৩ বছর বা তার বেশী হবে এটা করছে সে। সত্তর বছরের কাগজ এটি। সেকথা কালকেই লিখেছি আমি। আজ বহুদিনের পর দেখা হোলো এই শহরে গৌতম এর সাথে আমার। মাথায় টুপি, সেই মুখে মৃদু হাসি, অনেক ঝড় ঝাপটা সামলে মেয়েকে পড়াচ্ছে সে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভূগোল বিষয় নিয়ে। স্কলার মেয়ে ওর। সেই গল্প বলতে বলতে কেমন যেনো উজ্জ্বল হলো ওর মুখ এই রবিবার এর সকালে। মেয়ের জন্য ওর গর্ব হয় বেশ। রমেশচন্দ্র গার্লস স্কুলের প্রথম স্ট্যান্ড করা ছাত্রী। পরীক্ষা দিয়ে প্রেসিডেন্সি তে চান্স পাওয়া তার মেয়ের। ভূগোল বিষয় নিয়ে পড়া। গৌতম অবশ্য খুব কম টাকা রোজগার করে সংসার চালায় এই দুর্মুল্যের বাজারে বেশ কষ্ট করে। 


সেই গৌতম এলো পল্লীডাক কাগজ আর একটি ক্যালেন্ডার দিতে। সেই জানলাম ওর কাছে এই শহরে ঘুরে ঘুরে ছোটো পত্রিকা দেওয়ার কাজ কীভাবে শুরু হলো তাঁর। বললো এক বন্ধু এই কাজ করতো সে ছেড়ে দেওয়ার সময় বললো করবে কি না সেই থেকেই শুরু এই কাগজ বিলি করা তাঁর। শহরের এলিট ক্লাসের বাড়ীতে, সরকারী অফিস এর দফতরে ঘুরে ঘুরে সাইকেল নিয়ে এই পল্লীডাক কাগজ পৌঁছে দেওয়া। এক সময়ে তো বাড়ীতে বাড়ীতে পোস্টাল এর মাধ্যমেই এই কাগজ বিলি হয়েছে। না গৌতম সাংবাদিক নয় কিন্তু খবর কে পৌঁছে দেওয়া এই কাগজকে ভালোবেসে ত্রিশ বছর ধরে এটাই বা কম কী এই সাংবাদিকতার পেশা থেকে। আমি একটু আপ্লুত হলাম। ফ্ল্যাটের নিচে দাঁড়িয়ে দুজনেই ফোনে বন্দী হলাম। যোগযোগ এর নম্বর নিলাম। আর যেটা জেনে ভালো লাগলো যে ওর মেধাবী মেয়ের এই জার্নির গল্প শুনলাম। সেই কঠিন লড়াই করে কঠোর সংগ্রাম করে ওর মেয়ের এই পড়াশোনা করা। যেটা আমার মেয়ের জন্য করতে হয়েছে একটি সময়। কতজনের সাহায্য নিয়ে ওকে পড়ানোর কথা মনে পড়ে গেলো আজ আমার ওর কথা শুনে। 

সত্যিই অসাধারণ কিন্তু গৌতম এর এই জার্নি। রবিবার এর সকালে কাগজ দেওয়ার জার্নি। আর ওর মেয়েকে নিয়ে কঠিন লড়াই করে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়া করানোর জার্নি। যে জার্নি মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে আজ। বদলে গেছে এই আমাদের ভালবাসার শহর। বদলে গেছে শহরের রাজনীতির বাতাবরণ। সেই কবেকার পল্লীডাক কাগজ আজও সত্তর বছর ধরে বের হচ্ছে এই ফ্রেডরিক নগর থেকেই সেই পঞ্চানন কর্মকারের শহর থেকেই। আর সেই কাগজ বাড়ী বাড়ী পৌঁছে দিয়ে হাসি মুখে কঠিন লড়াই করে গৌতম দত্ত ওর মেয়েকে বড়ো করছে স্বপ্ন দেখছে ঘুরে দাঁড়ানোর।

 একদিন নিশ্চয়ই ওর এই স্বপ্ন সফল হবেই। ভালো থেকো তুমি গৌতম। তোমার এই লড়াইকে আমার কুর্নিশ। আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় আমার আঁকিবুঁকি ব্লগের পাতায় সেই লড়াই করা গৌতম এর কথা সেই ওর মেয়ের কথা আর ৭০ বছরের পল্লীডাক কাগজের কথা লিখে ফেললাম আমি। সব যে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে এই শহরের ধূলি ধূসর আমাদের জীবনে। যে জীবন আজ বদলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে তবু এই বদলে যাওয়ার মাঝে উজ্জ্বল হয়ে বেঁচে থাকবে এই সব টুকরো টুকরো উজ্জ্বল কিছু স্মৃতি আর কিছু গল্প। ধন্যবাদ প্রবীরদা আমায় কাগজ আর এই ক্যালেন্ডার দেওয়ার জন্য। ভালো থাকবেন আপনি। 

আজ গৌতম এর গল্প - অভিজিৎ বসু।
উনিশ এপ্রিল দু হাজার ছাব্বিশ। 
ছবি নিজের মোবাইল ক্যামেরায় তোলা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যা দেখি…প্রতিদিন মনে পড়ে কত… স্মৃতির পথ ধরে হাঁটি… লিখি…

নতুন স্বপ্ন দেখা মৃদুল দাশগুপ্ত

বাড়ীর পাশে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আচমকা দেখা হয়ে যাওয়া তাঁর সাথে। কখনও চায়ের দোকানে। কখনও লাল পার্টির সেই এক সময়ের গমগমে সরু গলির মোড়ে চায়ের দোকানে যে লাল আজ বহু আগেই অস্তমিত সেই ফাঁকা দোকানের সামনে চায়ের ভাঁড় হাতে সস্তার সিগারেট এর ধোঁয়ায় এখনও যিনি মনে করেন বাংলা সংবাদের জায়গাটা ক্রমেই কেমন জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে দিন দিন। একটা নতুন কাগজ করলে কেমন হয়। সেই যাঁকে কলকাতা থেকে গাড়ী পাঠিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে সেই কত বছর আগে এক কাগজের বিখ্যাত কর্তা তুলে নিয়ে তাঁকে যুগান্তর এর পত্রিকায় চাকরি দিয়েছিলেন সেই অমিতাভ চৌধুরী। যিনি সেই চাকরি করে গেছেন কিন্তু একাউন্টস বিভাগে গিয়ে যে বেতন নিতে হবে মাসের শেষে সেটা না বুঝেই খবর লিখে গেছেন মনের আনন্দে মাসের পর মাস। আসলে নিশির মতই নেশায় পেয়ে বসেছে যে সেই কাঁচা বয়সে খবরের নেশা।  যে বয়স আঠারোর স্বপ্ন দেখে জীবনের সাদা কালো রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় আপন মনে আর আপন ছন্দে। সেই যিনি বলতে পারেন কাগজ তো সমষ্টিগত মানুষের ফসল। যেখানে উচ্চ নীচ পদ থাকলেও একসাথে মুড়ি খাওয়া সেই জ্যোতি বসু কে গণা বলে ডাকা বিখ্যাত সাং...

আজ মায়ের দিন

আজ মায়ের দিন। দেখতে দেখতে দেয়ালের এই ছবিটা কেমন যেনো ধূসর হয়ে যাচ্ছে। সেই ছবিতে মা আমার আটকে আছে তিন বছর পার। মা বলে ডাকা হয়নি কতদিন আমার। মায়ের সাথে দেখাও হয় না আর আমার বহুদিন। আর কোনোদিন হবার সম্ভাবনা নেই। তবু এই ভোরবেলায় মায়ের দিন যাপন এর দিনে চারিদিকে শুধুই মায়ের সাথে ছবি দেখে আমার খুব কষ্ট হয় যে। সেই ছোটো বেলার লাঠির মার খেতাম আমি। ভাড়া বাড়ীর সামনে উঠোনে বাঁশে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে মার সেই লাল দাগ হয়ে যাওয়া আজ কিছুই নেই এই জীবনে আমার সব দাগ উবে গেছে কবেই। শুধুই সেই টালির ঘরে সেই কত বছর আগের দেওয়ালে টাঙানো একটি ছবি আছে আর কিছু ধূসর স্মৃতি। যাকে এই রাতদুপুরে কুলুঙ্গি থেকে বের করলেই দু চোখ বেয়ে জল আসে আমার এই বুড়ো বয়সেও।  কেন যে মা আমায় ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি চলে গেলো কে জানে। যে মাকে ২৪ ঘণ্টার কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে এসে চিকিৎসা করতে পারলাম না ওষুধ কিনে দিতে পারলাম না শেষকৃত্যর টাকা জোগাড় করে লোকে দিয়েছে তারপর সেই কাজ করেছি আমি। আর আজ কেন যে এমন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে আমার হৃদয় কে জানে। এতো কান্না জমে ছিল এত দিন পরেও আমার হারিয়ে যাওয়া মায়ের জন্য। যেটা ...

কুণাল ঘোষের বার্তা ও টোটো চালকের কিছু কথা

কুণাল দার সাথে কাজ করিনি আমি কোনোদিন। বাংলা সংবাদের জগতে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত সাংবাদিক আছেন। যাঁদের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে এই বাংলার মিডিয়ায়। আজ সেই কুণাল ঘোষ সংবাদ প্রতিদিন কাগজ থেকে কনসাল্টিং এডিটর পোস্ট থেকে সরে গেলেন। একদিকে তাঁর বিধায়ক হয়ে যাওয়া সরকার এর বদল হয়ে যাওয়া। আর তাই তিনি প্রতিদিন কাগজের দায়িত্ব থেকে সরে গেলেন তেমন এক বার্তা দিলেন তিনি নিজেই।  কুণাল ঘোষ এর সাথে আমার আলাপ বিশেষ নেই। সেই মহাকরণে করিডর দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের দিকে। তাঁর আগে পিছে সংবাদ মাধ্যমের কাজ করা রিপোর্টারদের ভীড় তাঁকে ঘিরে ভীড় করে আছেন আমিও দূরে আছি দাঁড়িয়ে। সেই বহু বছর আগে হাফ শার্ট পরে বিকেলের দিকে মদন মিত্রের অফিসে আসতেন। ২৪ চৌরঙ্গী রোড এর অফিসে ধর্মতলার কাছে। সান্ধ্য প্রতিদিন কাগজ পকেটে নিয়ে। রণজিৎ থাকতো সেই সময়। সেই সব দিন এর কথা মনে পড়ে যায় আজ আমার। সেই কঠিন বাম আমলে তাঁকে কাজ ছেড়ে চলে যেতে হয়নি একদমই। আর আজ সরকার বদলের সাথে সাথেই দিকে দিকে কাজ ছাড়ার হিড়িক পড়ে গেছে যে চারিদিক জুড়েই এই বাংলার মিডিয়ায়।  ইটিভির কাজের স...

মিন্টে ও আমি

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ আমি মিন্টের কথা বলতে চাই। জীবনের নানা রঙের ভালোবাসার সব উজ্জ্বল জলছবি এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে বৃষ্টির ফোঁটার মতো। কেউ বলেন সাদা জীবনের কালো কথা লেখার কি দরকার আছে কোনো। আবার কেউ বলেন যত সব ফালতু কাজ। যাকে তাকে নিয়ে লিখে ফেলার কি দরকার। কি হবে এসব কথা লিখে রেখে। সবার সব কথা, নিজের কথা, অন্যদের কাছে জানানোর কি কোনো দরকার আছে। জীবনের গভীর গোপন অনুভূতির কথা আর নানা অভিজ্ঞতা আর সম্পর্কের কথাকে বাজারে নিয়ে আসার কি খুব প্রয়োজন আছে। কেউ সমালোচনা করছেন এই লেখার। আবার কেউ কেউ বলছেন না না বেশ ভালো লাগে তো পুরোনো দিনের স্মৃতি ঝলমল লেখা পড়তে। কেউ কেউ এই লেখা পড়ে কোনো মন্তব্য করেন না মুখ বুজে চুপ করে থাকেন। আবার কেউ কেউ হাসি মুখে প্রশংসা করেন।এইভাবেই তো আমি লিখে চলেছি আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির নানা কথা আপনাদের ভালোবাসা আর মন্দ কথা শুনে। সেটা হতে পারে খারাপ হতে পারে সুখের নয় দুঃখের বিষয়। তবু তো ধরা থাকে সেই সব কথা আমার ব্লগে এই ভাবেই আঁকাবাঁকা অক্ষরে আঁকিবুঁকি ব্লগে।  আর আজ সেই আমাদের সবার কাছে অতি পরিচিত ক্যামের...