সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমাদের সিদ্ধার্থ দা

আসলে সাদা জীবনের কালো কথা তো আমার সেই সবুজ মাঠের ধান ক্ষেতে ঘুরে বেড়িয়ে মানুষকে দুর থেকে চুপ করে দেখা। আর সেই দেখাকে লিখে রাখা জীবনের এই দলিল আর দস্তাবেজে। যদি কোনোদিন মনে হয় সেই মানুষটার কথা এই বৃদ্ধ বয়সে, একবার তাকে মনে করবো, দেখবো তাহলে সেটাকে দেখবো আমি। আর সেই জন্য এই কলম ধরা। আজ তেমন একজন মানুষকে উল্টে পাল্টে আমার দেখতে ইচ্ছা হলো। যাঁকে ইষ্ট নাম জপতে জপতে ভয় পেয়ে তাঁর ফোন ধরেছি একসময়।

 হ্যাঁ, এতটাই ভয়, অস্বস্তি আর দুরত্ব বজায় রেখে চলেছি আমরা একসাথে এক জায়গায় কাজ করেও দীর্ঘদিন। হয়তো আজ আর তাঁর সাথে কথা হয় না আমার একদম।  যোগাযোগ নেই তবুও সেই পুরোনো অজানা ভয়টা রয়ে গেছে আর শ্রদ্ধাও। কারণ আর কিছুই নয় তিনি নিজেই একটা বলয় তৈরি করে রাখতেন তাঁর চারপাশে। যেটা ভেদ করে তাঁর ঘরের চৌকাঠ অবধি যাওয়া যেত হয়তো খুব কষ্ট করে কিন্তু তাঁর ঘরে বা রান্নাঘরে ঢুকে বা তাঁর সেই হায়দরাবাদ এর বসার জায়গার সামনে গিয়ে হাসিঠাট্টা করা যেতো না কিছুতেই। 

এটাই হলেন আমাদের সবার সেই ভয় পাওয়া আমাদের সবার স্যার। আমাদের প্রিয় সেই সিদ্ধার্থ সরকার। আমাদের সবার সিদ্ধার্থ দা। কারুর প্রিয় ফেভারিট আবার কারুর দু চোখের চক্ষুশূল সেই সিদ্ধার্থ দা বা স্যার। হ্যাঁ, হায়দরাবাদ এর অফিসে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সহকর্মীরা তাঁকে স্যার সম্ভাষণ করেই অভ্যস্ত। কিন্তু আমার আবার স্যারটা ঠিক আসেনা, তাই তাঁকে দাদা বলেই স্বচ্ছন্দ ছিলাম আমি। যাই হোক স্যার বা দাদা যাই হোক সেই ইটিভির প্রথমে তিনি বাংলা ডেস্ক এর কাজে ছিলেন না পড়ে তিনি ধীরে সুস্থে ধাপে ধাপে ইটিভি  বাংলার নিউজ কো অর্ডিনেটর হয়ে গেলেন। আমাদের সবার সিদ্ধার্থ দা।

আমরা সব জেলার রিপোর্টার তাঁর সেই সংসারে। কলকাতার রাজপথে সেই সময় নানা বিখ্যাত সাংবাদিকের সমাহার সেই সময়। সেই পুরোনো ইটিভি ভেঙে গেলেও ভাঙা সংসারেও কেমন যেনো সাজানো গোছানো সুন্দর ভেঙে পরা পুরোনো জমিদার বাড়ীর একটা ক্ষয়িষ্ণু সংসার। যেখানে মান, অভিমান, ভালোবাসা, বকাঝকা, খবর মিস নিয়ে কৈফিয়ত তলব, অফিস এর রাজনীতি, চেয়ারম্যান মিটিং এ ডাক পাওয়া, এই সব কিছু নিয়েই আমাদের সেই ছোটো পাঁচ মিনিটের ইটিভি নিউজ আর  সন্ধ্যা সাতটা পাঁচ এর আমার বাংলা আর সেই সন্ধ্যা ছটার সময়ের কলকাতা কলকাতা আর রাত নটার খবরের কি দাপট তখনও সেই সময়। 

 যাই হোক তার থেকেও বেশি দাপট সেই সময় ইটিভির রিপোর্টারদের। জেলায়, কলকাতায় নানা জায়গায়। কোথাও ইটিভি না পৌঁছলে সাংবাদিক সম্মেলন শুরু হয় না আলিমুদ্দিন এর অফিসে। বসে থাকেন নেতারা। অপেক্ষা করেন যদিও সেসব আজ গল্প কথা। কোথায় কালীঘাটে ইটিভি পৌঁছলে বা এসেছে কি না খবর নিয়ে তারপর কথা শুরু করেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুনলে মনে হবে এসব গল্প কথা লেখার সাহস হয় কি করে। কোথাও জেলায় জেলায় বাম আমলের মুখ্যমন্ত্রী জেলায় পৌঁছে খবর দেন কোথায় আছে ইটিভির রিপোর্টার এমনই অবস্থা সেই সময়। যদিও সেটা ইটিভির ভেঙে পড়া সাম্রাজ্য বিস্তার এর লেজ এর অংশ। 

আর সেই ভেঙে পরা অবস্থায় এই হায়দরাবাদ থেকে কন্ট্রোল করা একটি বাংলা চ্যানেল। সেই চ্যানেল এর সর্বময় কর্তা ছিলেন সিদ্ধার্থ সরকার। যাঁর সাথে সেই ইটিভির শ্রষ্টা প্রাণ পুরুষ  প্রয়াত রামোজি রাও এর সম্পর্ক খুব মধুর। বেশ সুন্দর দেখতে, ঝকঝকে ইংরাজি জানা একজন সেই বাংলা বিনোদন পত্রিকা থেকে কাজ করে যাওয়া একজন মানুষ যিনি টিভি মিডিয়ার বস হয়ে গেলেন।  একদিন হায়দরাবাদ ডেস্ক থেকে কার একজনের ফোন এলো অভিজিৎ দা তোমায় একবার স্যার, ফোন করতে বললেন। ব্যস সেদিনের মত আমার মত দাপুটে খুব খারাপ একজন রিপোর্টার যার বাজারে খুব বদনাম তারও ঘুম উড়ে গেলো। কেমন যেন গুটিয়ে গিয়ে আমি বলতাম ঠিক আছে আমি ফোন করে নিচ্ছি। 

সিদ্ধার্থ সরকার দার এই অন্যকে দিয়ে ফোন করিয়ে কথা বলার জন্য কতদিন যে আমি রাতে ভয়ে ঘুমোতে পারিনি বা খেতে পারিনি কে জানে। এত ভয় বোধ হয় আমি আর কাউকে পাইনি আমার এই ইটিভি বাংলা মিডিয়ায় চাকরি করার সময়। যাই হোক হয়তো ঠিক ঘড়ি দেখে সময় দেখে ফোন করলাম তাঁকে পঞ্জিকা দেখে কিন্তু যখন শুনলাম অভিজিৎ তোমার কাল ঐ স্টোরিটা করে দিও তোমায়  মনে করিয়ে দিলাম আমি। এটা বলে দিতেন মনে হতো যেনো আমার ঘাম দিয়ে জ্বর কমলো আমার। না মনে পড়ে না আমার যে উনি আমায় সারাদিন  কাজের পর বললেন যে আজ কাজ খুব ভালো হয়েছে তোমার। এমন স্মৃতি জড়িয়ে আছে আমার মনে সেটা বোধ হয় নেই আমার স্মরণে। সে যাকগে বসরা বোধহয় জানেন প্রশয় দিলে মাথায় ওঠে সেই বিখ্যাত উক্তির কথা মনে রাখেন হয়তো। তাই তাঁরা একদম এমন কথা বলেন না বোধহয়।

 যাকগে এসব বলে আর কি হবে। তারজন্য কোনো দুঃখ অভিমান কিছুই নেই আমার। আমি কাজ করে যেতাম মনপ্রাণ দিয়ে। যেটা আমার একমাত্র কাজ ছিল চাকরি জীবনে। বসদের কাছে যাবার পথে এত বাধা বিঘ্ন ভীড় উপচে পড়তো কোনোদিন সেই তাঁর ঘর অবধি যেতে পারিনি আমি কারুর কাছেই কোনো আমলেই। আর সিদ্ধার্থ দা এমন একজন মানুষ তাঁর কাছে যাওয়া ভীড় করে তাঁর কাছ থেকে ভালো ভালো প্রশংসা শুনে ঘরে ফিরে আসা সেটাও বেশ কষ্টের ছিল। কিন্তু তবুও সেই সময়  ইটিভির ভেঙে পরা রাজত্বের সময়েও কেমন যেনো আমরা সব একসাথে মিলে মিশে কেমন নিশ্চিন্তে নিরাপদে নির্ভয়ে কাজ করতাম তাঁর নির্দেশে হাসি মুখে। কোনো দিন মনে হয়নি আমার এই কাজ চলে যাবে। কাজ থাকবে না আর। 

একটা পরিবারে বড়ো রাগী দাদার আশ্রয়ে আশ্রিত হয়ে বকাঝকা খেয়ে দিন কাটিয়ে দেওয়া। হয়তো সেই চ্যানেলটা চব্বিশ ঘণ্টা হতে পারত সেটা হলে আমাদের সবার চাকরি জীবন আরও নিরাপদ আর সুরক্ষিত রাখা যেত আজকে। সেসব তো আলাদা বিষয়। কিন্তু সেই ভেঙে পড়া সাম্রাজ্যের পতনের সময় সিদ্ধার্থ দা যেভাবে ধরে ছিলেন এই সাম্রাজ্য সেটা সত্যিই প্রশংসা করতেই হয়। সেই  ইটিভির হাত বদল হয়ে যাওয়ার সময়। আমার মনে আছে সেই ডিসেম্বর মাসের ছুটিতে হায়দরাবাদ ঘুরতে যাওয়া। মেয়ে বউকে নিয়ে। ওনার বাড়ী যাওয়া সেই যে ফ্ল্যাটে তিনি ভাড়া থাকতেন কোটাপেট বোধহয়। আমার সেই ছোটো মেয়েকে খুব ভালোবাসতেন বৌদি। সিদ্ধার্থ দা কম কথা বলেন কিন্তু বেশ খুশি হতেন তিনিও ওনার বাড়ী গেলে। আসলে সেই প্রথম যেবার আমি সুদীপ্ত সোম ডাক নাম ঢ্যাঙ্গার সাথে হায়দরাবাদ গেলাম চেয়ারম্যান মিটিং এ সেই সময়ে সিদ্ধার্থ দা এই ফ্ল্যাটে থাকতেন এই এক জায়গায়।

 যাই হোক এরপর তো সিঙ্গুরে যেদিন লাঠি চার্জ হলো সেদিন আমার বাংলা টানা সাতাশ মিনিট শুধু সিঙ্গুরের খবর দিয়ে বুলেটিন হলো। সকাল থেকেই ওবি ভ্যান এর সিঙ্গুর চলে আসা আমরা দিন রাত ঘুরে বেড়াতাম গ্রামে গ্রামে তারপর সব ছবি পাঠিয়ে দিয়ে ঘরে ফেরা এটাই ছিল রুটিন। সেই লাঠিচার্জের দিন বোধ হয় সিদ্ধার্থ সরকার দা রাতে বললেন আজ সব খবর তোমার অভিজিৎ। বেশ রাতে যেনো দামী পালঙ্কে শুয়ে ঘুম হলো  আমার শান্তির ঘুম। আসলে যারা মাঠে ময়দানে ছুটে দৌড়ে কাজ করে তারাও বোধ হয় একটু এমন প্রশংসা বসের কাছ থেকে চায় আর সেটা পেলে তাদের দৌড়ের গতি আরও বেড়ে যায়। কিন্তু সিদ্ধার্থ দা এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন না একদমই। তাই তিনি সব সময় অফিসের সবাইকে চাপে রাখতেন। কাজ ভালো করলেও যেনো আরো ভালো করে কাজ করতে পারে সেটাই করতেন তিনি এই ভাবে চাপে রেখে। 

যাকগে এত গেলো দুর থেকে দেখা সিদ্ধার্থ দা। কিন্তু এর মাঝে ওনার সাথে ম্যানেজার সুদীপ্ত দার সঙ্গে আমার সেই পুরুলিয়া যাওয়া গাড়ী করে। ওনার বাড়ী পুরুলিয়ায়। সেই পুরুলিয়ার ক্যামেরাম্যান বর্তমানে বিরাট রিপোর্টার  ইন্দ্রর সঙ্গে দেখা হওয়া । আমার শরীর খারাপ হয়ে যাওয়া বমি করা। এমন স্মৃতি আজও মনে আছে আমার। আমি পরে একদিন পুরুলিয়া থেকে পরদিন ট্রেনে ফিরলাম গাড়িতে আসতে পারলাম না আমি শরীর খারাপ এর জন্য। আমি কেমন আছি জানতে ফোন করেছিলেন তিনি সেই সময়।

এরপর আমার বদলি হলো হায়দরাবাদ সেই পানিশমেন্ট ট্রান্সফার। সেই সময় তিনিও অবসর নিয়েও কাজ করছেন অল্প অল্প। আর এফ সি তে আসেন তিনি মাঝে মাঝে। সেই এক স্টাইল গম্ভীর মুখে। কিন্তু এখন এই দ্বিতীয় পর্বে আমি অনেকটাই স্বচ্ছন্দ। ন্যাশনাল ডেস্ক এর কাজ করতে পারিনা। বুঝিনা ইংরেজি। সেই কৌশিক গিরি তখন ওনার স্নেহধন্য। আরও অনেকেই ছিলেন সেই পার্থ প্রতিম ইটিভি ভারতের, সেই বিশ্বজিৎ আরামবাগ, সেই শুভ্রাংশু, সেই প্রদীপ, সেই জটাশঙ্কর লাহিড়ী, সেই রাজেশ রায়না, সেই বিভাস, সেই জয়ন্ত, সেই তরুণ চক্রবর্তী,এরা সব কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে।

 
 একদিন খুব কষ্ট পেলাম আমি যেদিন ভোটের নামের তালিকা বের হচ্ছে তৃণমূলের কালীঘাট থেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন সেই তালিকা কে কোথায় ভোটে দাঁড়াবেন। আমি সেই সময় হায়দরাবাদ এর ন্যাশনাল ডেস্ক থেকে কলকাতার কালীঘাটেডিউটি করা এক রিপোর্টারকে ফোন করে খবর তুলছিলাম। সেই সময় চারটের সময় তিনি ডেস্কে এলেন ভাবলেন আমি গল্প করছি ফোনে। খুব বকলেন আমায় বললেন কাজে মন নেই তোমার একদম। আমি সেদিন রাতে ঘরে ফিরে আমি খুব কাঁদলাম। আমি বলতে পারিনি দাদা আমি যে কাজ করছিলাম। ফোন করে আগাম খবর তুলছিলাম আসলে রিপোর্টার এর অভ্যাস বসত এটা করে ফেলেছি আমার ন্যাশনাল ডেস্ক এ আমার পানিশমেন্ট ট্রান্সফার হলেও। যাক গে কিন্তু তারপর আবার পরে একদিন বললেন অভিজিৎ তুমি বাড়িতে এসো শনিবার বৌদি তোমার কথা বলছিলেন।

 আমি আমার সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার বিকেল হলে ভাগ্যলতা থেকে ওনার সেই নতুন ফ্ল্যাটে যেতাম। আড্ডা, গল্প, চা খাওয়া, arvসেই বিশাল কুকুর দেখে ভয় পাওয়া, সোফায় পা তুলে বসে থাকা আর সেই রাত হলেই বৌদির বলা অভিজিৎ তুমি কিন্তু ভাত খেয়ে যাবে আমি তোমার ভাত করেছি। আমার এই কথাটা শুনে বেশ ভালো লাগতো। কারণ সেদিন আর রাতে আমায় ফিরে রান্না করতে হবে না বলে। আমার হায়দরাবাদ এর দিন যাপন সিদ্ধার্থ সরকার দার সাথে আমার সেই ভয়ের জীবনের কিছুটা ভয় কমিয়ে দিল। বৌদির সাথে আমার পরিচয় ছিলই কিন্তু একটা নতুন করে সখ্যতা গড়ে উঠলো। উনি বুঝতেন আমার খিদে পেয়েছে তাই শনিবার বলতেন অভিজিৎ রাতে চলে এসো কিন্তু। সত্যিই বলছি আজ সেই দিনের কথা বৌদির কথা সিদ্ধার্থদার কথা মনে পড়ে যায়। 

ইটিভির এই পরিবার, যে পরিবার ধীরে ধীরে ভাঙতে ভাঙতে ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে শেষ হয়ে গেলো একদিন। ছন্নছাড়া হয়ে গেলাম আমরা সবাই এদিক ওদিক। কিন্তু এই হায়দরাবাদ এর পরিবার, এই কলকাতা মির্জা গালিব স্ট্রীট এর পরিবার, এই জেলার পরিবার সব কেমন যেনো একটা সুতোয় বাঁধা ছিল। আর তাই বোধহয় এতদিন এত বছর পরও কেমন সব ছবির মত মনে পড়ে যায়। সেই যেবার মির্জা গালিব স্ট্রীট এর অফিসে সিদ্ধার্থ দা এলেন সেই আমি আর জটাশঙ্কর লাহিড়ী আর সিদ্ধার্থ দা চা খেতে গেলাম অফিসের সামনের রেস্টুরেন্টে। তারপর তিন জন মিলে খাবার পর পকেট হাতড়ে আমরা দুজন মিলে জটা শঙ্কর আর আমি সেই বিল মেটালাম কি বিপদেই না পড়েছিলাম সেদিন যা আমার আজও মনে পড়ে যায়। সেই একদিন হায়দরাবাদ এ ডিউটি যাবো বলে আমি রান্না করছি উনি বাস থেকে নেমে চলে এলেন আমার ঘরে অভিজিৎ জল খাওয়াও। আমি সেই মিষ্টি আর জল দিলাম ওনাকে। উনি বেশ তৃপ্তি করে সেটা খেয়ে চলে গেলেন। যাবার সময় বললেন শনিবার যেও তুমি বৌদি যেতে বলেছে তোমায়। আসলে একটা পরিবার এর মত হয়ে গেছিলাম আমি।

 তবে উনি অনেকের জন্য অনেক কিছু করে দিলেও পরে অনেকেই তাঁকে আর ওনার ক্ষমতা চলে যাবার পর তাঁকে আর চিনতে পারেন নি। যেটা নিয়ে তিনি হয়তো কাউকে কিছু বলেন নি। কিন্তু আমার মনে হয় এটা বোধহয় তাঁকেও কিছুটা কষ্ট দিত কিন্তু সেটা আমাদের কাউকেই বুঝতে দিতেন না তিনি চুপ করে থাকতেন। যেটা তাঁর বরাবর এর অভ্যাস। সেই ইটিভির কাজ ছেড়ে দেবো আমি চলে আসবো কলকাতা। বৌদি জিজ্ঞাসা করতেন, অভিজিৎ তোমার কিছু কাজ এর খবর পেলে তুমি। আমি বলতাম চেষ্টা করছি আমি। সিদ্ধার্থ দা শুনতেন বলতেন দেখো কাজ পেলে তারপর ছেড়ো না হলে দুম করে কাজ ছেড়ে দিও না তুমি। একদম গাইড করে বড়দাদার মত বলা। তখন আর ভয় লাগতো না আমার। 

একদিন বললাম দাদা চলে যাব  ইটিভি ছেড়ে কম টাকায় একটা কাজ পেয়েছি প্রতিদিন কাগজে। উনি শুনে বললেন চালাতে পারবে তো সংসার আর মেয়ের পড়া। আমি বললাম হ্যাঁ দাদা পারতে হবে যে করে হোক। বৌদি আমি বাড়ী চলে আসবো শুনে সেই ওনার ফ্ল্যাটের পাশের সেই দোকান থেকে মেয়ের জন্য মাথার ক্লিপ ফিতে কত কিছুই কিনে দিলেন। বললেন এইগুলো নিয়ে যাও তোমার মেয়েকে দেবে। আমি ওনাদের প্রনাম করে ইটিভির সেই সাধের ভালোবাসার ঘাম রক্ত ঝরিয়ে যে চ্যানেলকে এতদিন ভালবেসে কাজ করতাম। সেই চ্যনেলকে পনেরো বছর পর ছেড়ে দিয়ে পানিশমেন্ট ট্রান্সফার এর বোঝা মাথায় নিয়ে চলে এলাম কলকাতায়। ফেলে এলাম হায়দরাবাদ এর সেই  আমার একা কাটানো জীবন। যে জীবনে সিদ্ধার্থদার সাথে নতুন করে একটা সম্পর্ক হলো দাদা আর ভাইয়ের। কেটে গেলো আমাদের সেই ভয়ের সম্পর্ক। 

শুনেছি সিদ্ধার্থ সরকার দার মেয়ে বিদেশে থাকে। উনি মাঝে মাঝে সেখানে যান মেয়ের কাছে। কলকাতায় খুব কম আসেন সল্টলেকে ওনার শালা থাকেন। আগে ফোন করে কথা হতো এখন সেটা একদম হয়না উনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না একদম। বৌদির সাথে যোগাযোগ হয় মোবাইল ফোনে। কথা হলেই মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করেন। হীরক কর এর শরীর খারাপ এর খবর শুনে আমার কাছে জানতে চান কেমন আছে হীরক কর। আমার মেয়ে কি পড়ছে সেই খবর জানতে চান বৌদি। সত্যিই বেশ ভালো লাগে এসব লিখতে আমার। 

 সেই কবে কার পুরোনো পাঁচ মিনিটের সেই  একটা চাকা ঘোরা ইটিভি, সেই কবেকার আমার বাংলার সম্পর্ক আজও কেমন অমলিন হয়ে বেঁচে আছে টিমটিম করে। আমি বুড়ো হয়ে গেলাম। সিদ্ধার্থদা আরও বুড়ো হয়ে গেছেন হয়তো। আমি আর আজ বাংলা মিডিয়াতে নেই বহুদিন। সেই এলেবেলে এলোমেলো বিন্দাস জীবন নিয়ে বেঁচে আছি আমি। তবু কেমন যেন একটা মিডিয়ার লোকদের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে বুঁদ হয়ে থাকি আমি এতদিন পরেও। 
আর তাই সেই হারিয়ে যাওয়া ইটিভির কথা, সেই ভয় পাওয়া সিদ্ধার্থ সরকারদার কথা, সেই বৌদির কথা আজও মনেপড়ে যায় আমার এই রাতদুপুরে। যা আমি তাই এই রাতে লিপিবদ্ধ করি আমার সাদা জীবনের কালো কথাতে। হয়তো কেউ পড়ে বলবেন এই  সব কথা আবার লেখার কি হলো। 

আসলে জীবনে ফেলে আসা দিন। সেই সব দিনের নানা মানুষজন। তাদের কথা সুখ দুঃখের স্মৃতিকে বুকে নিয়েই তো আমাদের বেঁচে থাকা। সেই শনিবার রাতে গল্প করে রাত বারোটা বেজে গেলে ঘরে ফেরা কোনো রকমে অটো ধরে। আর যে সিদ্ধার্থদা কোনো দিন  চাকরি করার সময় ফোন করেননি  একবার ও সেই তিনিই কেমন উদ্বিগ্ন হয়ে রাত সাড়ে বারোটায় ফোন করতেন, বলতেন তুমি ঘরে পৌঁছে গেছো অভিজিৎ। তোমার বৌদি জিজ্ঞাসা করছিলেন। আমি বলতাম হ্যাঁ দাদা, আমি অটো পেয়ে গেছি চলে এসেছি ঘরে। সত্যিই সেই রাতের উদ্বিগ্ন ফোন কতদিন যে শুনিনি আমি। 

 কতদিন যে ওনার সাথে ফোনে কথা হয় না। কতদিন যে সেই বকা খাওয়া হয় নি আর। কতদিন যে সেই বাংলা ডেস্ক এর কেউ আর  হায়দরাবাদ থেকে ফোন করে বলেনি আমায় অভিজিৎদা স্যার তোমায় ফোন করতে বললেন। সত্যিই ফেলে আসা সেই দিনগুলো বড়োই মিস করি আমি সিদ্ধার্থ দা। ভাগ্যিস আপনি সেই ঘেরা টোপে নিজেকে বন্দী করে রেখেছিলেন। তাই বোধহয় আজ এত কিছু কথা লেখার সাহস পেলাম আমি। ভুল লিখে থাকলে ক্ষমা করবেন।

আমাদের সিদ্ধার্থ দা - অভিজিৎ বসু।
আঠারো অক্টোবর দু হাজার চব্বিশ।
ছবি সৌজন্যে ফেসবুক।

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভোটের সকাল

ঘুম ভাঙলো বেলায় ভোটের দিনের ঘুম বলে কথা। একদম ঠিক কুম্ভকর্ণের ঘুম ভেঙে আমার বিছানায় শুয়ে এই পাশ আর ওই পাশ করা। ভোর বেলায় দু চোখে জ্বালা নিয়ে বিছানায় এলাম সারারাত বউকে ছেড়ে মোবাইলকে আঁকড়ে ধরে রাত্রি যাপন আমার। সেই রিলের নেশা, মোবাইল জুড়ে নানা রকম এর ছবির নেশায় বুঁদ আচ্ছন্ন আমি। সেই মোবাইল এর রাজ্য ছেড়ে ঘুম এর দেশে চলে যাওয়া আমার ভোর এর আলো গায়ে মেখে।  বাইরে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল। মেঘের আড়ালে সুয্যি মামা মুখ লুকিয়েছেন আজ ভোটের দিনে কিছুটা লজ্জায়। বাইরে সব কেমন চুপচাপ যেনো। মাথার ওপর হালকা করে ফ্যান চলছে। পশ্চিমের জানলা দিয়ে হাওয়া এসে গায়ে লাগছে। আমি বিছানায় শুয়ে চাদরটা মুড়ি দিয়ে এক কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম আবার। পাশের ফ্ল্যাটের ঘরে সব কলকল করে ফিরে এলো ভোট দিয়ে যেনো যুদ্ধ জয় করে ঘরে ফিরে আসা ওদের। চারদিকেই ভোট দেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে আজ।  ভোট দিয়ে ঘরে ফিরে শ্রীরামপুর এর ফোন কলকাতার সোনারপুরের এক আত্মীয়কে ভোট হয়ে গেছে তাঁর। বৃষ্টি টিপটিপ আর ঝির ঝির হচ্ছে এখানে মাঝে মাঝে। আর হ্যাঁ পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে দর্শনা ভোট দিয়ে বয় ফ্রেন্ডের বাড়ী গেছে...

ফুল্লরা আদি শক্তির পীঠস্থান

ফুল্লরা হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার লাভপুর শহরের কাছে একটি মন্দির কেন্দ্রিক জনপদ। এটি বোলপুর শান্তিনিকেতন থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি হিন্দু তীর্থস্থান ও পর্যটন কেন্দ্র।বীরভূমের এই লাভপুরের ফুল্লরা মন্দির লোকবিশ্বাস অনুসারে, ফুল্লরায় সতীর নিচের ঠোঁটটি পড়েছিল। এই মন্দিরে কোনও বিগ্রহ নেই। সিন্দুরচর্চিত কচ্ছপাকৃতি শিলাখণ্ডই দেবীর প্রতিভূ। এই মন্দিরের পাশে একটি বিরাট পুকুর আছে। কিংবদন্তি অনুসারে, রামের দুর্গাপূজার সময় হনুমান এই পুকুর থেকেই ১০৮টি পদ্ম সংগ্রহ করেছিলেন সেই ত্রেতা যুগে। ফুল্লরা ভারতের ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম বলে কথিত আছে। এই মন্দিরের ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায় সুলতান মাহমুদ গজনভির ভারত আক্রমণের সময় একদল বেদানুসারী ব্রাহ্মণ মিথিলা মতান্তরে কনৌজ থেকে বিতারিত হয়ে বঙ্গদেশের বর্মণরাজ হরি বর্মার কাছে আশ্রয় লাভ করেন। তাঁদের কয়েকজনকে দেবী ফুল্লরার পুজোর জন্য নিজের জন্মভূমি সিদ্ধলগ্রাম বা শিতলগ্রামে নিয়ে আসেন বর্মণ রাজের মহা সন্ধি বিগ্রহিক ভবদেব ভট্ট। যাতায়াত-সহ অন্যান্য অসুবিধার জন্য একসময় ওই পুজারীরা ফুল্লরা মন্দির সংলগ্ন বাকুল, ফ...

বিখ্যাত পুলিশ রিপোর্টার জয়ন্ত দা

সেই কলকাতা শহরে একটি ধর্ষণ এর ঘটনা যে বাংলার বিখ্যাত এক সাংবাদিক প্রথম কাগজে লিখে হৈচৈ ফেলে দিলেন।সেই সুজেট জর্ডান ২০১২ সালে গণধর্ষণের শিকার হন যিনি। ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২ তারিখে সন্ধ্যায়, জর্ডান পার্ক স্ট্রিটের একটি নাইটক্লাবে প্রথমবারের মতো পাঁচজন যুবকের (কাদের খান, মোঃ আলী, নাসির খান, রুমান খান এবং সুমিত বাজাজ) সাথে দেখা করে , যারা তাকে যাওয়ার সময় বাড়িতে নামিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এর কিছুক্ষণ পরেই, পাঁচজন তাকে চলন্ত গাড়িতে গণধর্ষণ করে এবং পরে কলকাতা ক্লাবের বিপরীতে এক্সাইড ক্রসিংয়ের কাছে ফেলে দেয়। ভোর ৩.৩০ টার দিকে, সে বেহালায় তার বাসভবনে একটি ট্যাক্সিতে ওঠে ।  যদিও মিডিয়া এবং পুলিশ প্রথমে ভুক্তভোগীর নাম গোপন রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল, যেমনটি ভারতে প্রচলিত , পরে তিনি জনসমক্ষে ৩৭ বছর বয়সী এবং দুই সন্তানের মা হিসেবে তার পরিচয় প্রকাশ করেন, যাতে অন্যান্য জীবিতদের কথা বলতে উৎসাহিত করা যায়। আরে এই খবর সবার প্রথম তাঁর কাগজের প্রথম পাতায় লিখে যে সাংবাদিক হৈ চৈ হুল্লোড় ফেলে দিলেন সেই বিখ্যাত দাপুটে পুলিশ রিপোর্টার জয়ন্ত মজুমদার এর কথা আজ আমার সাদা জীবনের কা...

সেই ২৪ ঘণ্টার ইন্টার্ন রোশনী

'এবার হয়েছে সন্ধ্যা। সারাদিন ভেঙেছো পাথর পাহাড়ের কোলে আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে তোমারও তো শ্রান্ত হলো মুঠি অন্যায় হবে না – নাও ছুটি বিদেশেই চলো যে কথা বলোনি আগে, এ-বছর সেই কথা বলো।'.....  শক্তি চট্টোপাধ্যায়  এই কবিতার লাইন লিখে পোস্ট করেছিল ও একদিন। সেই কতদিন আগের সেই পোস্ট ফিরে এলো হঠাৎ করেই আজ ফেসবুকের দেওয়ালে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছে যেনো কারুর জন্য। ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল সেই পোদ্দার কোর্টের ২৪ ঘণ্টার অফিসে। ইন্টার্নশিপ করতে এলো ও একঝাঁক উজ্জ্বল ছেলেমেয়ের সাথে।  সেই ওর মিষ্টি হাসি। মিষ্টি ব্যবহার। সুন্দর ঝাঁ চকচকে একটা মিডিয়ার জীবন তৈরি করতে আসা ওর। সেই ২৪ ঘণ্টার বাংলার সেই আমলে বিখ্যাত দু নম্বর চ্যানেলে কাজ শিখে সার্টিফিকেট নিয়ে কাজের দরজা খুলে রাখা। আর জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আর তার জন্য বিনা বেতনে কাজ শিখতে আসা এই নানা বাংলা মিডিয়ায় ইন্টার্নদের। আর কাজের সুত্রে যোগাযোগ হয়ে যাওয়া সেই হাউসের নানা সাংবাদিক এর সাথে।  কেমন একটা স্বপ্নের জগতে বিচরণ করা যেনো। হাত বাড়ালে স...

চেনা পথের পথিক

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ সেই সেক্টর ফাইভ এর চেনা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে বেড়ানো আমার গন্তব্যের নতুন ঠিকানা। সত্যিই কতদিন পর যে এই কলকাতা দেখলাম আমি গ্রাম থেকে এসে। সেক্টর ফাইভ এর সেই চেনা পথ, চেনা ফুটপাথ দেখলাম কত দিন পরে। সেই চেনা রাস্তা ধরে এগোলাম কত দিন পর। সেই কলেজ মোড়, ওয়েবেল মোড়, সেই চা, মুড়ি, ভাতের সারি সারি চেনা দোকান পাট লোকজন সব ঠিক আছে যে যার নিজের মতই ছুটে বেড়াচ্ছে তারা।  সেই বহু দিন অফিস করা সব চেনা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো সত্যিই কংক্রিটের এই বিশাল এক একটি বাড়ির মাঝে ঠাণ্ডা কাচ ঘেরা সুন্দর সুন্দর সব অফিস। সেখানে কাজের ব্যস্ততা অনেক। সেজে গুজে সব সুন্দর সুন্দর মানুষ জন ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা যেনো সবাই অন্য গ্রহের মানুষ ওরা। নিজেকে বড় বেমানান লাগলো আমার সেখানে। কেমন যেনো বিসদৃশ আমি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়িয়ে খুঁজতে লাগলাম আমার ইন্টারভিউ এর স্থান। প্রখর রোদের তাপে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি তবু চেনা রাস্তা পার হয়ে অচেনা অজানা জায়গায় হাজির হয়ে সেই নতুন ঠিকানার আমার বাড়ি খোঁজার নিরন্তর মরিয়া চেষ্টা। ঠিক যেনো কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মতই এদিক ওদ...