সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সরকারী প্রেস কার্ড

শীত পড়লেই যেমন পরিযায়ী পাখিরা এসে হাজির হয়। ঠিক তেমনি করেই ডিসেম্বর মাস পড়লেই নতুন কার্ড এসে হাজির হয় সাংবাদিকদের পকেটে। সরকার স্বীকৃত সাংবাদিক এর পরিচয় বহন করা ছাপ মারা সুদৃশ্য কার্ড। নীল সাদা কার্ড থেকে অন্য স্মার্ট সুন্দর রঙের উজ্জ্বল সব কার্ড এর প্রাপ্তি ঘটে সাংবাদিকদের। আজ এই রাতের বেলায় ব্যাগের কোণে পড়ে থাকা এই দুটো পুরোনো সরকারী প্রেস অ্যাক্রিডেশন কার্ড দেখে কত কিছুই যে মনে পড়ে যায় আমার। একসময়ে বছর শেষের আগেই আমার পকেটে হাজির হতো এই নতুন কার্ড 


যদিও এই কার্ড দিয়ে সাংবাদিক এর বুকে সাহস বা বল বা শক্তি যোগানো যায়না কিছুতেই। তাদের মনে সাহস জাগিয়ে সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলে যে কাউকে হাসি মুখে প্রশ্ন করার সাহস সৃষ্টি করা যায়না কোনোভাবেই। শুধুই আমি সরকার এর স্বীকৃতি পাওয়া একজন সাংবাদিক হিসেবে গণ্য হয়েছি এটা বলা যায় মাত্র। মন্দিরে, মসজিদে, গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা সভায় কি ছাড় পাওয়া যায় এই করে দেখিয়ে জানা নেই আমার। শুধু এই মা মাটি মানুষের আমলে অবসরে অল্প কিছু টাকার পেনশন পাওয়া যায় এই যা।


আসলে পকেটে যতই সরকারি সিলমোহর মারা কার্ড থাক তাতে কি আর সরকার পক্ষ আর বিরোধী পক্ষ কেউ রেয়াত করে তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলে। তাদের পছন্দের মনের মত খবর না হলে কি আর কি পকেটে সরকারী কার্ডের ছাপ দেখে ছেড়ে দেয় না বোধহয়। হ্যাঁ, ওই দুর্গাপুজোর লাইনে একটু বিশেষ সুবিধা পেলেও পাওয়া যেতে পারে আর কি। বড়ো জোর বারাসাতের কালী, চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজোয়। তাহলে আর এই কার্ডের মাহাত্ম্য কি রইলো।
 
যে কার্ডের জন্য এত হা হুতাশ করা, পকেটে কার্ড না থাকলে দুঃখ পাওয়া, কার্ড এর সিনিয়রিটি কমে গেলে কপাল চাপড়ানো, কোনোভাবে ফ্রিল্যান্স কার্ড করে বছরে নিজের নামে পঁচিশটা লেখা জমা দিয়ে কার্ড বাঁচিয়ে রাখা এমন কতই না সুন্দর ব্যবস্থা করা আছে। তাহলে আর এই ভাবে রাতদুপুরে কার্ড নেই কার্ড নেই করে বুক চাপড়ে কান্না কেনো। পুরোনো রাম আমলের কার্ড বের করে তার ছবি তুলে আপলোড করা কেনো। 

কিছুই যখন কার্ড এর গুণ, মাহাত্ম্য নেই শুধুই সরকারী ঠাণ্ডা বাসে ওঠা আর নামা ছাড়া তাহলে আর কি জন্য এত কালি খরচ করা। ষাট বছরের জন্যে কি এখন থেকেই চিন্তা ভাবনা করে এগোনো যদি অবসর এর পরে যৎসামান্য অল্প কিছু জুটে যায় ক্ষতি কি। সে মোটা মাস মাহিনা পাওয়া লক্ষাধিক টাকার বেতন পাওয়া সাংবাদিক কিম্বা কম টাকার নুন আনতে পান্তা ফুরোনো সাংবাদিক হোক। সবার চিন্তাই কি এক তাহলে কে জানে।

তখন ইটিভির নতুন চাকরি শুরু করেছি আমি। শুনি সরকারি কার্ড এর জন্য বছর শেষে অ্যাপ্লাই করতে হয়। কিন্তু তিন বছর কাজ না করলে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা না থাকলে সরকারি কার্ড অ্যাপ্লাই করা যায়না কিছুতেই। ভয়ে ভয়ে আশীষ ঘোষ দাকে বললাম আমি। বললেন হ্যাঁ তুই চলে আয় বইমেলায় আমি সই করে দেবো। গুটি গুটি পায়ে আমি পার্কস্ট্রীটে বইমেলায় ফর্ম পূরণ করে হাজির হলাম আমাদের নিউজ এর হেড এর কাছে। সেই কালো বা নীল রঙের সোয়েটার পড়ে মুখে হাসি নিয়ে এসে আমার অ্যাক্রিডেশন এর ফর্মে সই করে দিলেন তিনি কিছু না দেখেই। 

জমা পড়ে গেলো সেই সরকারী কার্ড এর আমার অ্যাপ্লিকেশন। কি আনন্দ আমার। বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে পাবো তো কার্ড। আশীষ দা বললেন ঘোর বইমেলায় বউকে নিয়ে। বলে চলে গেলেন খুব সম্ভবত কোনো স্টলে। আমরা দুজন ঘুরে বেড়ালাম বউ মেলায়। এই ছিল আমার জেলায় কাজ করে কার্ড পাওয়ার প্রথম ধাপ এর কাহিনী। হ্যাঁ, কার্ড এলো অবশেষে। জানালাম আমি আশীষদাকে দাদা কার্ড পেলাম। নতুন কার্ড সবাইকে দেখলাম। মা, বাবা, পরিজন, আত্মীয় সবাইকে। গর্বে বুক ভরে যায় আমার। এই কার্ড দেখিয়ে ভোটের সময় ভোটের কেন্দ্রে কাজ করার অনুমতি মেলে। ভোটের সময় হলে বেশ একটা ভালো লাগে আমার। সরকারী কার্ড আছে তাহলে ইলেকশন কমিশন এর পরিচয় পত্র পেতে অসুবিধা নেই কোনও। 

এইভাবেই জেলায় একবার কার্ড হয়ে যাবার পরেই আর কোনোও‌ অসুবিধা নেই। প্রতিবছর শেষের আগেই রিনিউ করে নেওয়া। আর কি চাকরির অফিস বদলি হলে কার্ড এর জন্য কোনো অসুবিধা নেই কার্ড এর গায়ে তার হাউস এর নামটা শুধু বদলে যায় কার্ড তো থেকে যায় আর সেই সাংবাদিক এর সাংবাদিক সত্ত্বাও থেকে যায়। শুধু কোন হাউস এর কার্ড হলো সেটাই একটু নজর দিয়ে দেখতে হয়। যদিও আমার ইটিভির কাজের সুবাদে জেলায় দীর্ঘদিন কাজের সুবাদে এক কার্ড রয়ে গেছিলো। পরে যদিও কলকাতায় গেলে সেই কার্ড তার সিনিয়রিটি হারিয়ে আবার নতুন কার্ড শুরু হয়। 

জেলার কার্ড এর কাজের বয়স গণ্য হবে না কলকাতায় বদলি হয়ে এসে। যে সরকারী কার্ড আমার প্রায় দশ বা বারো বছর ধরে পেলাম সেই এক হাউসের কলকাতার অফিসের কার্ড একধাক্কায় বদলে গেলো। সরকারের নিয়মে জেলার খবর করা সরকার এর কার্ড পাওয়া সাংবাদিক এর সিনিয়রিটি কার্ডের মাহাত্ম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলো মহাকরণের অন্দরে। একযুগ ধরে পাওয়া জেলার কার্ড এর সাংবাদিক কলকাতা শহরে পা দিয়ে আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করলো। হাঁটি হাঁটি পা পা করে নতুন ক্লাস থেকে শুরু হলো তার সাংবাদিকের জীবন। সত্যিই অসাধারণ এই ব্যবস্থা। 

উপায় নেই দেখে সেটাই করতে হলো যে অকুতোভয় সাহস নিয়ে জেলা থেকে কলকাতা এলাম আমি কিছুটা যেনো নতুন কার্ড পেয়ে গুটিয়ে গেলাম আমি। যে কার্ডের বয়স মাত্র এক হলো কিন্তু বেশিদিন সেই কার্ড থাকলো না আমার। চলে গেলাম বদলি হয়ে হায়দরাবাদ। অনেক করে অনুরোধ করলাম ইটিভি নেটওয়ার্ক এর গ্রুপ এডিটর রাজেশ রায়না কে আমার কার্ডটা যদি একটু রিনিউ করে দেন তাহলে সে আবার বয়স হারিয়ে ফেলে না। মিষ্টি হাসি মুখে মধুর কন্ঠে বললেন সেটা করা যাবে না। আর মনে মনে বললেন তিনি ওই জন্যে তো এইখানে নিয়ে এসেছি আমি বদলি করে। যাতে তোমার এই ক্ষতি হয়। আমি ধীরে ধীরে কেমন ভেঙে পড়লাম। কলকাতার কার্ড আবারও নষ্ট হলো আমার গর্ভের সন্তান নষ্টের মতোই। আমি চুপ করে বসে রইলাম হায়দরাবাদ এর ন্যাশনাল ডেস্কে। 

কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে এলাম আমি কলকাতায়। অনির্বাণ চৌধুরীর হাত ধরে চব্বিশ ঘণ্টা চ্যানেলে কাজে যোগ দিলাম প্রতিদিন কাগজ ছেড়ে। আবার কার্ডের অ্যাপ্লিকেশন করা হলো। প্রথমবার কার্ড হলো না। সেই সময় বিশ্ব মজুমদার এই কার্ড দেখভালের সর্বময় কর্তা। পরের বার চব্বিশ ঘন্টার কার্ড পেলাম কলকাতার রাজপথে ঘুরে খবর করার কার্ড। অনিবার্য চৌধুরী বলেন তোর কার্ড হয়ে গেছে এইবার। এই ফোনটি পেয়ে সেদিন পোদ্দার কোর্টে বসে কি।আনন্দ যে হয়েছিল আমার। বহুদিন পর এমন আনন্দের খবর শুনলাম আমি। কার্ড পেলাম আবার সুতপা সেন সেই কার্ড এনে দিলো। ওর ব্যাগ থেকে হেসে কার্ড বের করে দিলো আবার। কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা ছেড়ে দিলাম আমি আবার কার্ড মূখ থুবড়ে পড়ল। পরে কলকাতা টিভির ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় মালিককে বললাম যদি আমার কার্ডটা করে দেওয়া হয় একটু। করে দিলেন কার্ড সেই কার্ড নবান্ন থেকে এনে দিলো দেবাশীষ সেনগুপ্ত দাড়িওলা। ভাবলাম যাক পেলাম সেই ভালোবাসার কার্ড। তারপর আর কার্ড হয়নি আর। নানা জায়গায় কাজ করেও।


আজ এই বর্ষশেষের আগে এই পুরোনো দিনের কার্ড দেখে নানা কথা মনে পড়ে যায় আমার। মনে হয় তাহলে কার্ড নেই বলে কি আমার আজ সাংবাদিক সত্তা, খবরের প্রতি ভালোবাসা, টান, দুর্বলতা, নেশা সেই পুরোনো দিনের দৌড়ে ঝাঁপিয়ে খবর করা সব কিছুই কর্পূরের মতো উবে গেছে একদম না, মনে হয়। তাহলে কি আর এই রাতের অন্ধকারে এখনও এমন করে খবরকে ভালোবেসেই খবরের দুনিয়ায় ফিরতে চাই আমি। 

তাহলে তো কার্ড নয়, কার্ডের সিনিয়রিটি নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়, সেই বুকে কার্ড থাকলেই যে শাসক দলের নেতা মন্ত্রীর সামনে গলা উঁচিয়ে প্রশ্ন করা নয়। আসল হলো একজন সাংবাদিক, একজন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি সারা জীবন ধরেই সে বেঁচে থাকে তার কাজের মধ্যে দিয়ে। সে তার পকেটে সরকারী সিলমোহর মারা প্রেস কার্ড থাক বা নাই থাক।

 রাতের অন্ধকারে আমার ব্যাগে পড়ে থাকা দুই কার্ডের গায়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে বড়ই ভালো লাগে আমার। কত স্মৃতি যে জড়িয়ে আছে এই কার্ডের গায়ে। সেই মহাকরণে সেন্ট্রাল গেট দিয়ে প্রবেশ করা বুক ফুলিয়ে, সেই বিধানসভায় পৌঁছে যাওয়া, সেই জেলায় মুখ্যমন্ত্রীর সভায় নিজের নাম লিখিয়ে কার্ড দেখিয়ে প্রেস জোনে ঢুকে পড়া, সেই কার্ড দেখিয়ে ভোটের কাজ আছে বলে বুথে ঢুকে নিজের ভোট দেওয়া। আসলে সবকিছুই যে এই ছোট্ট কার্ডের দৌলতেই। 

আজ আমার এই আঁকিবুঁকি ব্লগে সেই আমার জীবনের সব হারানোর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সেই কার্ডের কথাও লিখে ফেললাম আমি। সত্যিই জীবন বড়ই অদ্ভুত। একসময়ে বছর শেষে এই কার্ডকে নিয়েই কত উত্তেজনা শিহরণ খেলে যেতো আমার মনে আর আজ সেই মানুষটা কেমন যেনো সব কিছুকে বুকের মাঝে চেপে রেখেই হাসি মুখেই মেনে নেয়। জীবনে কোনও কিছুই নিত্য নয়, হারিয়ে যাওয়া যে জীবনের ধর্ম। আর সেই হারিয়ে যাওয়াকে মেনে নিয়েই তো জীবনে হাসি মুখে চলতে হয়। সুখ দুঃখ, ভালো মন্দ,
হাসি কান্নাকে বুকে জড়িয়ে। 

সরকারী প্রেস কার্ড - অভিজিৎ বসু।
চব্বিশ ডিসেম্বর, দু হাজার চব্বিশ।
ছবি নিজস্ব মোবাইল ফোন থেকে তোলা।

মন্তব্যসমূহ

  1. সত্যি কত আশা, প্রত্যাশা, দোলাচলে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন।সংসারের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও কেটে যায় জীবনের অনেকটা সময়, তৈরি হয় কত টানাপড়েন ,ভাল লাগা, মন্দ লাগা। লেখা জুড়ে লেখকের এই নানা অনুভব বড় মাত্রা এনে দিল।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

ভোরের গন্ধ

ভেঙে ফেলা আস্ত একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চোখের আঙিনায়, কেমন দাঁত মুখ বের করে ছন্নছাড়া হয়ে, অতীতকে সযত্নে জড়িয়ে, আঁকড়ে। বাড়ির গাড়ি বারান্দার নিচে জমে থাকা সাইকেলের চাকায়, সুতো জড়িয়ে থাকার মতো কত মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, এই পুরোনো বাড়িতে। বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে সেই জীবনের সোঁদা গন্ধ, ঘাম এর দাগ এখনো লেগে আছে এদিক ওদিক। খুঁজলে হয়তো মিলবে আরও দু চার আনার স্মৃতির অকেজো সব তামাটে পরশ পাথর। আসলে মাটি উপড়ে,স্মৃতির উত্তাপ কে মুছে দিয়ে নতুন করে বিচিত্র সব রোজগারির, অপচেষ্টা আর কি। যে লাভের, লোভের, চেষ্টার গলায় লাগাম আর পরাবে কে। দুর থেকে জানলা দিয়ে দেখি শুকনো কলাপাতার ওই ম্রিয়মান নিষ্ফলা হাসি। বট ফলের আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা, যজ্ঞি ডুমুর গাছের পাতায় পিছলে পড়া স্মৃতির নরম উত্তাপ। যে উত্তাপে আজও জারিত হই আমি অনায়াসেই প্রতিদিন সকাল হলেই। ভোরের বেলায় পাখির ডাক শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ওদের মন কেমন করা কথা শুনতে পাই না আর। বোধহয় ওরাও বুঝে গেছে তাদের গলায় লাগাম পড়েছে এবার আচমকাই। তাই পথ ভুলে তারাও আসেনা আর কিছুতেই  এদিক পানে। পশ্চিমী হাওয়া ঠেল...

ইটিভির বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

কত দিন ধরেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি। সেই কেমন হাসিখুশি জীবন নিয়েও হাজারও বড়ো অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েও কত কুল থাকা যায় সেটা আমি বিশ্বজিৎদাকে দেখে শিখলাম আর কী। সেটা সেই জঙ্গলে মাওবাদী নেতাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হোক বা তাঁদের কোনোও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক। কিম্বা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট এর অফিসে গিয়ে বিমান বসুর সাথে একান্তে কথা বলা হোক। কিম্বা অনিল বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে কথা বলা হোক। কিম্বা সেই মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বন্যাদুর্গত এলাকা আরামবাগ মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাজির হয়েছেন। খুব সম্ভবত বিশ্বজিৎ দা হাজির আকাশ বাংলা চ্যানেল থেকে সেই সময়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কথা বলছেন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একটু দূরে। রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। যাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কেউ যেতে না পারি। আমি উত্তেজিত কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে একদম নির্বিকার হাসিমুখ বিশ্বজিৎদার কথা ছাড় তো, আমাদের যেতে না দিলে আমরা কি করবো। প্রচার হবে না ওদেরই। একটু পরেই সেটা বুঝত...

কুড়ি থালা দশ টাকা আর রসিক মুলুর জীবন

নাম মুলু হাঁসদা। বাংলা ঝাড়খণ্ড সীমানার চরিচা গ্রাম পঞ্চায়েত এর চর ইচ্ছা রঘুবরপুরের বাসিন্দা মুলু। আজ মুলুর জীবন কথা। গ্রামের নামটা ভারী অদ্ভুত। চর ইচ্ছা রঘুবরপুর। যে গ্রাম অন্য পাঁচটা গ্রামের মতই।সাদামাটা এই গ্রামে দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর কর্মহীন জীবনের জলছবি সুস্পষ্ট। আর সেই গ্রামের মহিলারা নিজেদের সংসার রক্ষা করতে গাছের পাতাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাছের পাতা মুলুদের জীবনের জিয়ন কাঠি। যে জিয়ন কাঠিতে তারা ভোর হতেই পেটের টানে চলে যায় জঙ্গলে। খস খস শব্দ করে পায় হেঁটে তারা পাতা তোলে। গাছ থেকে টুপ টাপ করে ঝড়ে পড়া পাতাকে একটা একটা করে নিজের শাড়ির আঁচলে ভরে নেয়। তার পর সব পাতাকে বস্তায় ভরে ঘরে ফেরে।  ঠিক যেভাবে তারা পুকুরে নেমে শামুক গেঁড়ি আর গুগলি তোলে। যে ভাবে তাদের উদর পূর্তি হবে বলে। আর এই পাতাও যে তাদের পেট ভরায়। একটা একটা পাতাকে নিজের সন্তানের মতো আলগোছে ছুঁয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় মুলু, বলে তোরা না থাকলে কি করতাম কে জানে। মাথার ওপর শাল সেগুনের বিশাল আকারের গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর তারা চুপ করে শোনে মুলুর কথা।  একে অপ...

আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলা

আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমার এগিয়ে চলা। এলোমেলো এলেবেলে জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা। যে জীবনে আবাহন আর বিসর্জন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই কোনোদিন। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে সুখ আবার দুঃখও। যে জীবনে জড়িয়ে থাকে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া। আবার আমার এই সাদা জীবনের কালো কথা বা কালো জীবনের সাদা কথার ছোপ ছোপ দাগ। সেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা আমার। একদম নিজের মতো করেই যেখানে কারুর কাছে কোনোভাবেই তাঁর বশ্যতা মেনে নিয়ে নয় যেটা আমি পারলাম না কোনোভাবেই কোনওদিন।  তবুও জীবন যাপন তো করতেই হয় আমাদের। যে জীবনের বাঁশবনের ছায়ায় বসে দেখতে হয় বাঁশপাতার মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফিঙের নাচন। সেই ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁকে মিষ্টি রোদের নরম আলো ছায়ার খেলা। যে খেলা দেখতে আমার বেশ ভালই লাগে আজকাল। যে খেলায় কত চেনা মুখের অচেনা ছবি যে ধরা পরে যায় হঠাৎ করেই কে জানে। আমি সেই ছবির ভীড়ের মাঝে কেমন বেঁহুশ হয়ে নিজেই হারিয়ে যাই এদিক, ওদিক, সেদিক। চেনা অচেনার পথ ধরে বাঁশবনের ছায়া মেখে হারিয়ে যাওয়া সেই জীবন। যে জীবনে সাদা কালো কত কিছুই না থেকে যায় দাগ র...