সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দাদু সরে বসবেন

প্রথমে কাকু। তারপর একটু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সরি বলেই দাদু একটু সরে বসবেন। না, মাঝখানে শুধু জেঠামশাই বলেনি আমায় এটাই যা রক্ষে আর কি। স্থান রিষড়া স্টেশন। সোমবার বিকেল পাঁচটা বাজে তখন। যিনি বলছেন মেরে কেটে তার বছর কুড়ি বয়স হবে আর যাকে বলছেন সে মেরে কেটে পঞ্চান্ন বছরের বৃদ্ধ কি বলা যায় তাকে কে জানে। সিনিয়র সিটিজেন মুভমেন্ট থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত আর কি তার এই জীবনের সাধের ফুটো নৌকা। 


আমি দাদু শুনে একটু কেমন সেই লক্ষণের বুকে শক্তিশেল লাগার মতোই থম মেরে গেলাম যেনো। একটু সরে বসে আলগোছে চোখ তুলে দেখলাম তাকে একবার। আমার মেয়ের মতোই হবে কোনো এক কোম্পানিতে কাজ করে ফিরছে দুজনে। সঙ্গে পুরুষ সঙ্গী আছে তার জন্য জায়গা রাখতেই আমায় সরে বসার আহবান জানানো মিষ্টি গলায়। আমিও সরে বসে ভাবলাম মনে মনে সত্যিই তো জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে দিন শেষ প্রায় আমার। হলুদ ছোপ ছোপ দাগ পড়া জীবনে এখন মরচে পড়ার লাল রঙের জং পড়া আস্তরণ জমতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। 

কেমন যেনো একটা এলোমেলো এলেবেলে বিন্দাস জীবনকে আঁকড়ে ধরে ধীর পায়ে এগিয়ে চলা লাল পলাশের পদাবলীর গান শুনতে শুনতে। উদ্দেশ্যহীন ভাবেই বেঁচে থাকা আর কি। তার মাঝে শুধু ওই দাদু শুনে বুকটা কেমন ফাল্গুনের হাওয়া মাখা বিকেলে কেমন মনটা হু হু করে উঠলো আমার এই বোলপুর ঘরে ফেরার সময়। এই এত দিনের গভীর সম্পর্ক, সম্পর্কের মাঝে কত না টানা পোড়েন আর হিসেব নিকেশ। সুখ আর দুঃখের ঢেউ এর ওঠা আর নামা। বুকের মাঝে প্রেম ভালোবাসা বন্ধুত্বের মাঝে বিরহ আর হিসেব নিকেশ এর কঠিন খাতায় অংক কষে যাওয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। 

সত্যিই জীবন বড়ই অদ্ভুত। জীবন বড়ই স্মৃতিকাতর। জীবন বড়ই মায়াময়। জীবন বড়ই বিচিত্র। যে গতিপথে কখনও ছুটে যাওয়া উল্কার গতিতে। যে গতিপথে মেঘলা আকাশে ভেসে যাওয়া জমাট মেঘের মতো। আবার কখনও সেই বহতা নদীর ধারে পলি জমে পানসি নৌকার ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা। সত্যিই এখন তো জীবনের এই শেষ পর্বে পলি জমা নদীপথে শুধুই ভেসে যাওয়া। ভাবলাম মনে মনে ঠিক কথাই বলেছে তাহলে আমায় দাদু বলে। আসল সত্যিই কথা বলে দিয়েছে মেয়েটি জেনে বুঝে কিম্বা না বুঝেই বা হয়তো ইচ্ছা করেই। 

প্ল্যাটফর্মের মাইকে ট্রেন আসার ঘোষণা হলো। আমি ধীর পায়ে উঠে পড়লাম ওদের পাশে বসে থাকা বেঞ্চ থেকে। ধীর পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলাম প্ল্যাটফর্মের সামনের দিকে। একবারও ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার সাহস হলো না আমার। ওই মেয়েটির মুখের দিকে। যে আমায় জানিয়ে দিলো কিসের আর এত বেশি ছুটোছুটি আর দৌড়ে বেড়ানো। এই জীবনের দিনতো শেষ প্রায়। জন্ম আর মৃত্যুর এই চরম সত্য কথাটি মনে করিয়ে দিলো আমায়। আমিও ট্রেন ধরে চলে এলাম নিজের ঘরে একা একদম একাই। মনে মনে গেয়ে উঠলাম হরি দিন তো গেলো সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে। 

দাদু সরে বসবেন - অভিজিৎ বসু।
চব্বিশ ফেব্রুয়ারী দু হাজার পঁচিশ।
ছবি নিজের মোবাইল ক্যামেরায় তোলা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ওই খানে মা পুকুর পাড়ে

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হবে বনবাসী,           কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে           থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে           থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি           ধনুক নিয়ে হাতে। .......রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টুপ টুপ বৃষ্টির দুপুরে এই কবিতার লাইন গুলো দেখে। মনে পড়ে গেলো মার কথা। বাইরে একটানা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কখনো কখনো বেশ জোরে, কোনো সময় একটু কম। মাথার মধ্যে কেমন ঝিম ঝিম করছে এই বৃষ্টির টানা আওয়াজ শুনে।  একটানা আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে একদম চুপ চুপে হয়ে গেছে। পাতার ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে নিচে।গাছের পাতাগুলোর অসময়ে স্নান করে ওদের আবার শরীর খারাপ না হয়।  জানলার ধারে সারাদিন ধরে যে পায়রা গুলো বসে থাকতো আর বক বকম করতো।...

সুসমীর ও আমি

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ আমার কলেজের বন্ধু সুসমীর এর কথা। ওর ভালো নাম সমীর ঘোষ। ওর বাড়ী শ্রীরামপুরে। আমার সাথে ওর আলাপ শ্রীরামপুর কলেজে পড়ার সময়। সেটা আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা হবে। আসলে কলেজের বেঞ্চিতে বসে ওর গলার গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি আমরা সবাই। ছেলে মেয়ে সবাই ওর গানের ভক্ত হয়ে গেলাম একদিন ওর গান শুনেই। মেয়েরা তো ওর ফ্যান হয়ে গেলো ওর গানের জন্য।  পরে আমাদের কলেজ জীবন শেষ করে আমরা এদিক ওদিক টুকটাক কাগজে লেখার জগতে দুজনেই প্রবেশ করেছি আমরা। একদিন খুব সম্ভবত বর্তমান কাগজে বিজ্ঞানের পাতায় দেখলাম সুসমীর দাস নামে এক জনের লেখা বেরিয়েছে।সেই সময় বিজ্ঞানের পাতা দেখতেন বর্তমানের রূপকুমার বসু। আমার সাথেও পড়ে রূপদার আলাপ হয়েছিল এই লেখার সূত্রেই।  মনে পড়ে প্রতি লেখায় পঞ্চাশ টাকা দিত বর্তমান‌ কাগজ সেই সময়। সমীর তখন বিজ্ঞান নিয়ে লিখছে, আকাশবাণী তে নানা অনুষ্ঠান করছে। এরপর তারা নিউজ ডেস্ক এর কাজে যোগদান করে সে। দীর্ঘ দিন তারা নিউজ এর কাজ করেছে সে। এই হলো সুসমীর এর জীবনের রেখাচিত্র।  কিন্তু আমার সাদা জীবনের এমন এক সাদা মানুষের ...

ভূত চতুর্দশীর সেই রাত

জীবনে আলো নেই, এদিকে ঘরে টুনি লাইট লাগাচ্ছি আর স্টাইল করে ছবি তুলছি। সত্যিই কত বিচিত্র আয়োজন আর বিচিত্র জীবন। ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যার আলোকজ্বল এই অমলিন, ঝাপসা, ম্রিয়মান এই ছবিটা ধরা থাকলো আমার জীবনের টাইমলাইনের ফেসবুকের পাতায় আলতো করে।  ঘরের দুয়ারে বাতি দিয়ে অন্ধকারের রাজ্যে চলে যাওয়া। আর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া আমার আত্মীয়দের পথ দেখালাম আমি। হ্যাঁ, যে পথ ধরে আমাদের ছেড়ে যাওয়া মানুষজন এসেছিলেন তাঁরা সেই মহালয়ার পুণ্য প্রভাতে। তাঁদের তর্পণ করে স্বাগত জানিছিলাম আমরা সবাই। এতদিন ধরে এই উৎসবের আনন্দে আলোকমালায় কেমন ঘুরে বেড়ালেন তাঁরা খুশি মনে। আজকের রাত তাঁদের আবার সেই ফিরে যাওয়ার রাত। যে রাতে ঘুম আসেনা কিছুতেই। যে রাতের অন্ধকারে কত কিছুই যে ঘটে যায়।   যাঁরা এতদিন এই পৃথিবীর টানে, আপনজনদের টানে পৃথিবীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই তাঁরাই আজ আমাদের ছেড়ে প্রিয়জনদের সবাইকে ছেড়ে ধীরে ধীরে চলে যাবেন দূরে,অনেক দূরে। আর আমরা তখন ঘরের দুয়ারে, উঠোনে তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে সেই তাঁদের যাত্রাপথকে সুগম করবো আলোক সজ্জা দিয়ে। এটাই হলো ভূত চতুর্দশীর সেই আল...

কুণাল ঘোষের বার্তা ও টোটো চালকের কিছু কথা

কুণাল দার সাথে কাজ করিনি আমি কোনোদিন। বাংলা সংবাদের জগতে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত সাংবাদিক আছেন। যাঁদের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে এই বাংলার মিডিয়ায়। আজ সেই কুণাল ঘোষ সংবাদ প্রতিদিন কাগজ থেকে কনসাল্টিং এডিটর পোস্ট থেকে সরে গেলেন। একদিকে তাঁর বিধায়ক হয়ে যাওয়া সরকার এর বদল হয়ে যাওয়া। আর তাই তিনি প্রতিদিন কাগজের দায়িত্ব থেকে সরে গেলেন তেমন এক বার্তা দিলেন তিনি নিজেই।  কুণাল ঘোষ এর সাথে আমার আলাপ বিশেষ নেই। সেই মহাকরণে করিডর দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের দিকে। তাঁর আগে পিছে সংবাদ মাধ্যমের কাজ করা রিপোর্টারদের ভীড় তাঁকে ঘিরে ভীড় করে আছেন আমিও দূরে আছি দাঁড়িয়ে। সেই বহু বছর আগে হাফ শার্ট পরে বিকেলের দিকে মদন মিত্রের অফিসে আসতেন। ২৪ চৌরঙ্গী রোড এর অফিসে ধর্মতলার কাছে। সান্ধ্য প্রতিদিন কাগজ পকেটে নিয়ে। রণজিৎ থাকতো সেই সময়। সেই সব দিন এর কথা মনে পড়ে যায় আজ আমার। সেই কঠিন বাম আমলে তাঁকে কাজ ছেড়ে চলে যেতে হয়নি একদমই। আর আজ সরকার বদলের সাথে সাথেই দিকে দিকে কাজ ছাড়ার হিড়িক পড়ে গেছে যে চারিদিক জুড়েই এই বাংলার মিডিয়ায়।  ইটিভির কাজের স...

রক্তাক্ত আমি

অর্থহীন, শব্দহীন,জীবনের অপমান বড়ই যন্ত্রণার। জীবনের অনুরণনে অপমানের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, শুনতে শুনতে ধীর পায়ে এগিয়ে চলা। ছিপখান ডিঙ্গি নৌকা বেয়ে নিজের মত করে অন্তরীণ হয়ে ভেসে বেড়ানো, এদিক থেকে ওদিক পানে। শঙ্খচিলের ডানায় তখন, রামধনুর সাত রঙ এর স্বপ্নের ঘুম জড়ানো ভোরের আস্তরণ। শালিকের ভেজা পায়ে, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের বাঙময় অব্যক্ত ধাক্কা। যে ধাক্কায় দ্বিখণ্ডিত হয় জীবনের অর্থ, অনর্থ, সৃষ্টি, অনাসৃষ্টি, সুখ, অসুখ,ভালোবাসা, ঘৃণা আরও কত কি।  চোখ খুলে দেখি বদলে গেছে, জীবনের উপল উপত্যকার ঢেউ খেলানো রাস্তার, সোজাসাপ্টা সেই বহু চেনা গলিপথ। যে গলিপথের চেনা রাস্তায় হাঁটতে নেমে রক্তাক্ত হই আমি বার বার। তবু রাতের আঁধার গায়ে মেখে রক্তাক্ত আমি ঘুরে, বেড়াই এদিক থেকে ওদিক। হাতড়ে খুঁজে বেড়াই রামধনুর রং মাখা ভোর। রক্তাক্ত আমি - অভিজিৎ বসু। ষোলো জুন, দু হাজার চব্বিশ।