কদিন আগেই শ্রীরামপুরে ক্ষেত্র শা এর মেলায় গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে সেই ছোটবেলার টিনের ভটভটি নৌকা না দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেছিলো আমার বেশ। সেকথা আমি লিখেছি আমার আগের লেখায়। হারিয়ে গেছে সেই ছোটবেলার স্মৃতি এই গলিপথে সেই ছবির কথা লিখে বেশ মন খারাপ হয়েছিলো আমার। কিন্তু আমার লেখা পড়ে সেই উত্তম বাবু, উত্তম সাহা এই ক্ষেত্র মোহন সাহা বাড়ীর একজন প্রতিনিধি মেলার অন্যতম আয়োজক তিনি সেই টিনের নৌকা দেখতে পেয়ে আমায় মোবাইল ফোনে তার ছবি তুলে পাঠিয়ে দেন। বলেন আপনার সেই টিনের নৌকো এসেছে মেলায় পাওয়া যাচ্ছে।
এই কথা শুনে আবার আমার মেলায় যাওয়া। ওনার কথা মত সেই নৌকোকে খুঁজে পাওয়া। মাটির উপর একটি গামলায় জলের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে সে আপন মনে। সেই চেনা আওয়াজ আর সেই চেনা স্মৃতির ঝাপটা গায়ে মেখে নিলাম আমি আলতো করে চাঁদনী রাতের সন্ধ্যা বেলায়। ছবি তুলে নিলাম আমি। দাম করলাম কত। দোকানদার বললেন গম্ভীর গলায় পঞ্চাশ টাকা তো বটেই। কম হবে না দাম একদম। শুনে একটু থমকে গেলাম আমি আর আমার শৈশব। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে কত আর দাম ছিলো এই টিনের ভুটভুটি নৌকোর। পাঁচ টাকা হবে কী নাকি আরও কম দাম ছিলো সেই সময়ে না সেটা আজ আর মনে নেই একদম আজ আর।
এদিক ওদিক লোকজনের ভীড়। হিন্দী গান বাজছে কানের পাশে। সেই ঠাণ্ডাই এর রোলার ঘুরছে আপনমনে আপন ছন্দে। আর সেই টিনের ভুটভুটি ঘুরে যাচ্ছে ভুল করে নিজের ফোনে ছবি তুলে নিলাম আমার আজ। সেই নীল, সবুজ নানা রঙের নৌকো রাখা আছে সেই খেলনার দোকানে। নানা জিনিসের ভীড়ে একদম অন্য ভাবে ওর ঘুরে যাওয়া। আর আমার জীবনের ঘড়ির কাঁটা পেছন ঘুরে পঞ্চাশ বছর আগে ফিরে যাওয়া এক ধাক্কায় এই বসন্তের সন্ধ্যায়।
সেই বড়মামা, মেজমামা আর ভাই মামার তিন ভাই এর মিলমিশ এর সংসার। সেই দাদু আর দিদার একমাত্র নাতি আমি। সেই আমার তখন বাড়ীতে বেশ আদর। সেই বড় কালো চৌবাচ্চায় জল ভরা হতো রাস্তার কল থেকে কালো পাইপ দিয়ে। সময় মেপে জল আসতো সেই সময়ে টালির বাড়িতে। সেই শিবরাত্রির সময় এই মেলা দেখতে গেলেই জিলিপি, গুড় কাঠি, আর খেলনা বরাদ্দ ছিলো আমার ছোটবেলায়। আর সেই সময়t থেকেই তো এই টিনের নৌকোর প্রেমে পড়া আমার। সেই ভুট ভুট আওয়াজ। সেই জলের গামলায় ঘুরে যাওয়া তার। আর আমার এই দোকানের সামনে এসেই দাঁড়িয়ে যাওয়া আবার। আজ উত্তম বাবুর দৌলতে আবার দেখতে পেলাম তাকে দীর্ঘদিনের পর।
মেলায় দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে বন্দী হয়ে নিজের ছবি তুলে তাঁকে ধন্যবাদ জানাতেই ফোন করা আমার। তিনি বললেন এই কালী মন্দিরে বসে আছেন তিনি। চলে গেলাম সেই শিব মন্দির এর পেছনে মা কালীর মন্দির বেশ জাগ্রত সেখানেই। সিঁড়িতে বসেই কথা হোলো তাঁর সাথে। এই জায়গায় শিব মন্দিরের সংস্কার এর কথা ভাবছেন তাঁরা। এই নানা জন নানা কথা বললেও রাজী হননি তিনি। এটাও তো এই শহরের একটা ঐতিহ্যও বটে। তাহলে একে ঐতিহাসিক স্থান এর গুরুত্ব দিয়ে দেখলে ক্ষতি কী আর। রাজনীতির ময়দানে এতো দড়ি টানাটানি চলে যে কে জানে। বলতে বলতেই তাঁর এই একটু আশা নিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে থাকা।
তবু তো তাঁর বাড়ীর লোকদের চেষ্টায় এতো কাজ করতে পেরেছেন তাঁরাও। সেই দখল করে থাকা লোকদের একটু সরিয়ে মেলার জায়গাকে বিস্তৃত করা। আর কী চেষ্টা তো করছেন তাঁরাও কিছুটা শহরের এই ঐতিহাসিক স্থানকে রক্ষা করতে। আমি এই শতাব্দী প্রাচীন ক্ষেত্র শা মেলার মাঠে ঠাকুর দালানের সিঁড়িতে বসে শুনছিলাম সেই সব কথা উত্তমবাবুর মুখে। সেই কৃষ্ণনগর এর লোকদের আসা এই মন্দিরের দেওয়ালে নানা ছাঁচের মূর্তি করা আর রং করে অন্য একমাত্রা দেওয়া সেই দেওয়ালের মূর্তিদের। একটা পুরা কালের সেই ইতিহাসকে দেওয়ালে ধরে রাখার চেষ্টা করা। এই মেলার সময় রং করে ফিরিয়ে আনা হয় তাঁদের রূপ।
আমি বেশ মন্ত্রমুগ্ধ হয়েই শুনছিলাম তাঁর কথা।
সেই নৌকোর প্রেমে পরে শৈশবকে দেখতে এসে সেই ইতিহাসকে খুঁজে পাওয়া আমার এই বুড়ো বয়সে। মা কালীকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম মেলা ছেড়ে। সেই হারিয়ে যাওয়া টিনের নৌকোকে সঙ্গে নিয়ে। পকেটে যদিও পঞ্চাশ টাকার রেস্ত না থাকায় সেই নৌকো আর কেনা হয়নি আমার। তবু তো এই নৌকো দর্শন হলো আমার এই প্রিয় মেলায়। যে মেলা মানে তো মিলন। আজ সেই শৈশব, কৈশোর, যৌবন আর বার্ধক্য যে আজ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেলো আবার ফের এতদিন এতবছর পরেও। ধীর পায়ে মেলা ছেড়ে ঘরে ফিরে এলাম আবার। সেই রাস্তায় তখন ঝাঁ চকচকে দোকান, শপিং মল, অলোর ঝলকানি আর সব কিছু কে এড়িয়ে আমার সেই টিনের নৌকোকে বুকে নিয়ে ঘরে ফেরা সেই আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশব। সেই ছোট্টো গামলায় ওর ঘুরে যাওয়া ঠিক এই জীবনের মতই শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়া।
টিনের নৌকো দর্শন - অভিজিৎ বসু।
আটাশ ফেব্রুয়ারি দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য নিজের মোবাইল ক্যামেরা।
টিনের ভুটভুটি নৌকোর গল্প বড় মন কেমন করে দিল। ছোটবেলার সেই নৌকা পরে কত খুঁজেছি মেয়ের জন্য। রথের মেলায় বাবা কিনে দিয়েছিল সেই আশ্চর্য নৌকা। মেয়ের জন্য তেল দিয়ে চলা টিনের ভুটভুটি কত খুঁজেছি, আর পাই নি । এদিকে মেয়ে শৈশব অবস্থা কাটিয়ে টিন এজ। এই লেখা ফিরিয়ে দিল আমার ছোটবেলার সকাল।
উত্তরমুছুন