ভোটের বাজারে ডিজিট্যাল যোদ্ধারা এখন ভোটের কারিগর। যোদ্ধা নামিয়ে বাজার দখলের প্রানান্তকর চেষ্টা সব রাজনৈতিক দলের। আসল যোদ্ধা সেই টুম্পা সোনা মার্কা বা আগমার্কা তৃণমুল আর বিজেপির কোথায়। যে যোদ্ধারা হার্মাদদের বিরুদ্ধে সত্যিই অসাধারণ যুদ্ধ করে এই রাজ্যে বিরোধী দলের শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই সব রক্তে লেখা রক্তে ভেজা রাস্তায় যোদ্ধারা একে একে হারিয়ে গেছে। আজ এই ভোটের ময়দানে তাই শুধুই নকল যোদ্ধার হুঙ্কার শোনা যায় চারিদিকে।
বহুদিনের পর হঠাৎ করেই খানাকুলের একটি লেখায় আমি একটা জায়গার নাম ভুল লিখেছি আর তাই সেটা বলতেই দেখলাম খানাকুল এর শৈলেন সিংহ দা ফোনে কল করেছেন তিনি আমায়। অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠে আমার তাঁর সাথে কথা হওয়া বহুদিনের পর। নানা কথা নানা রাজনীতির মাঠে কেমন করে এই যুদ্ধ করে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন সেই সব কথা শুনলাম আমি। সেই তৃণমূলের প্রথম দিন এর জন্মলগ্নের কথা। সেই সব দিনগুলোর কথা বলতে গেলেই এই বয়সেও এতো অসুস্থ শরীরেও কেমন তেজ প্রকাশ পায় তাঁর গলায়।
আর আমিও কেমন করে যে এই গল্প শুনতে শুনতে ভাবি সত্যিই সেই আশির দশকে কংগ্রেসের যোদ্ধা থেকে সেই তৃণমূলের যোদ্ধা হয়ে যাওয়া তাঁর ধীরে ধীরে। সেই ১৯৮৩ সালে কংগ্রেস করতে গিয়ে কত যে লড়াই করছিলেন তিনি এলাকায়। সেই আবদুল মান্নান তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় এই খানকুল থেকে সিপিএমের হাত থেকে বাঁচাতে একটা সময় যখন তাঁর জীবন বিপন্ন ছিলো সিপিএমের অত্যাচারে এই এলাকায়। এই বয়সে এসে তাঁর মনে হয় অকৃতজ্ঞ হবেন কেনো তিনি সেটা তো তিনি করতে পারবেন না একদম। যে যা করেছেন তাঁর জন্য সেটা মনে রাখা উচিত তাঁর। সেই অনিল বসু জেলা পরিষদে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে। মাত্র ১৫৪ ভোটে হেরে যান তিনি অনিল বসুর কাছে। এই বিখ্যাত অনিল বসু জেলা পরিষদে সহ সভাধিপতি হলেন। সেই সময় খুন হন পতিরাম রায় সিপিএমের। সে সব একটা দিন গেছে বটে খানাকুলের রাজনীতির। আজ এই বৃদ্ধ বয়সে সে সব কথা মনে পড়ে গেলে বেশ ভালোই লাগে তাঁর। আজকাল আর এইসব কথা কে মনে রাখে বলুন তো।
সেই আমলে তখন খানাকুল এক নম্বর পঞ্চায়েত সমিতি তখন কংগ্রেসের দখলে। চেয়ারম্যান ছিলেন ফজলুর রহমান আর ভাইস চেয়ারম্যান প্রভাতকিরন চক্রবর্তী। শৈলেনদার স্ত্রী তখন সেই পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যা ছিলেন। সেই যখন তিনি অনিল বসুর কাছে হেরে গেলেন তখন তাঁর নিজের দল এর একটি পক্ষ তেমন তাঁকে সাহায্য না করলেও সেই চুঁচুড়া শহরের রবীন মুখোপাধ্যায় তাঁকে অর্থ সাহায্য করেন ভোটে লড়ার জন্য। এমনকি দেওয়াল লেখার লোক দেয় তাঁকে। সেই সময় তিনি রামমোহন কলেজে রাজনীতি করেন কলেজের ছেলেরাও তাঁর হয়ে ভোটের প্রচার করতে নেমে পড়ে। সেই সব কথা আজও মনে পড়ে যায় তাঁর স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে।
কংগ্রেসের রাজনীতি মানেই তো সেই পুরোনো আমলের গোষ্ঠী রাজনীতি অব্যাহত সেই কবে থেকেই।সেই সময় সেলিম বলে একজন কংগ্রেস করতো কিন্তু নির্দল হয়ে দাঁড়িয়ে ১৯০০ ভোট কেটে নিলো তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও সোমেন মিত্র শৈলেনদার হয়েই কথা বলেছেন সেই সময়ে। ফরোয়ার্ড ব্লকের রতন ঘোষ দাঁড়িয়ে বেশ কিছু ভোট কেটে নেয় আর তাতেই সুবিধা হয় অনিল বসুর। আর তখন ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হতো। ব্লকে কাউন্টিং করা হত। এলাকায় ব্যাপক গণ্ডগোল হলো। তিনি পরদিন ঘর ছাড়া হলেন। সেই ঘর ছাড়ার রাজনীতি। এই সব তো ছিলো সেই আশির দশকে রাজনীতির অঙ্গ। যদিও তখন এই খানাকুলে অনেক পঞ্চায়েত কংগ্রেসের দখলে ছিল। সেই সময় পতিরাম রায় খুন হলেন।
তারপর তো তৃণমুল কংগ্রেস তৈরী হলো। প্রথম দিন থেকে তাঁর এই দলে যোগদান করা। সেই দিন এর কথা মনে পড়ে যায় আজও তাঁর। কলকাতায় সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছে। অজিত পাঁজা, আকবর আলী খোন্দকার সব পুরোনো দিনের কংগ্রেসের লোকজন হাজির সেই নতুন দল গঠনের দিন। সেই মঞ্চে হাজির ছিলেন তিনিও। কংগ্রেসের রাজনীতি ছেড়ে সোমেন মিত্র ছোড়দা কে ছেড়ে তাঁর মমতার হাত ধরা। সেই সময় হুগলী জেলার সভাপতি শ্রীরামপুর এর চেয়ারম্যান কেষ্ট মুখোপাধ্যায়। আর সেই ভোটের সময় তাঁর হাতে ব্ল্যাঙ্ক নমিনেশন পেপার দিয়ে দিলেন কেষ্ট মুখোপাধ্যায় আর দিলীপ যাদব। যে কথা আজও তিনি মনে রেখেছেন।
আর নজরুল মঞ্চে একটা সভা হয়েছিলো সেখানে উপস্থিত ছিলেন তিনি। সুব্রত বকসী সেই সময় সেই মিটিং এর যে সব দল এর পতাকা লাগানো ছিলো তা তাঁকে দিয়ে দেন। একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে দেন আটশো বা নশো টাকা দিয়ে সব তৃণমুলের ব্যবহার করা পতাকা কলকাতা থেকে এনে ১৯৯৮ সালে ভোট করেন তিনি এই খানাকুলে। যদিও তাঁর কথায় সেদিন তৃণমুল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুই সাহায্য করেননি তাঁকে। যদিও রবীন মুখোপাধ্যায়, কেষ্ট মুখোপাধ্যায়, দিলীপ যাদব, আকবর আলি খোন্দকার, তপন দাশগুপ্ত এনারা তাঁর পাশে ছিলেন সেই সময়। আর তিনি সাধারন এলাকার মানুষের সাহায্য নিয়ে ভোটে লড়েন তৃণমুলের হয়ে সেই বিজেপির সাথে জোট বেঁধে।
আজকের ডিজিট্যাল মিডিয়ার যোদ্ধা নয় একদম আসল যোদ্ধা বটে। আর সেই আজকের দিনে তৃণমুল আর বিজেপির জোট হলো। সেই তরুন সাহা বিজেপির নেতা। সেই তপন শিকদার এর আমল রাজ্যে তখন। সেই রাজনীতিতেও তখন এতো সৌজন্য কমে যায়নি। রাজনীতি করতে এসে ধান্দা করতে নেমে পড়েনি লোকজন। ইনকাম করতে এই পেশায় নেমে পড়া। সেই অসিত সিংহরায় তৃণমুলের হয়ে জিতলেন খানাকুল পঞ্চায়েত সমিতি। রাজনীতিতেও ভালো ভালো মানুষের দেখা মিলতো এই সময়ে। যদিও আজকাল একদম কমে গেছে এই ব্যাপারটি। ২০০৯ সালে মারা গেলেন যুধিষ্ঠির দলুই। সেই সময়ে তিনি বারবার বলা সত্ত্বেও সে পালাতে পারেনি তাঁকে মেরে দেয়। সেই মৃত্যু নিয়ে হৈ চৈ পড়ে যায় এলাকায়। এস পি গঙ্গেশ্বর সিং আর এস ডি পি ও অজয় নন্দা।
আর জলের আন্দোলন করতে গিয়ে মারা যায় পীযুষ চৌধুরী ক্লাস সেভেনের মেধাবী ছাত্র। মায়ের একমাত্র সন্তান সে। তার দেহ দাহ করারও সুযোগ ছিলো না। গ্রামে লোকজন নেই জ্ঞানবন্ত সিং পুলিশ তখন সব লোকজনকে তাড়া করে গ্রামছাড়া করেছে সব ওপারে বন্দর চলে গেছে। বালি চাপা দিয়ে দেওয়া হয় পীযূষ এর দেহ। সেই দেহ বের করে দাহ করা হয়। কিন্তু সেই সময়ে অজয় নন্দা একটা কাঠ গোলা থেকে কাঠ বের করে সেই হিন্দু মতে দেহ দাহ করার সুযোগ করে দেন। জানিনা এইসব কথা কোথাও লেখা আছে কি না। এই পীযুষ এর কথা। যদিও সেই আমলে তাঁর মতে পুলিশ এতো দলদাস হয়ে যায়নি। এখন যা চলে রাজ্যে।
কিশোরপুর , বলপই এর খুন এর কথা মনে পড়ে যায় তাঁর আজও। সেই উত্তাল রাজনীতি। বলপাই এর লাইব্রেরি পুড়ে যাওয়া। সে এক রাজনীতির দিন গেছে বটে এই বাংলায় এই খানাকুল এলাকায় আর এই আরামবাগ মহকুমায়। আর সেই প্রথম দিনের যোদ্ধা হয়ে একদিন এই দল তাঁকে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে হলো অনেক অপমান সহ্য করে। এটাও কম যন্ত্রণার নয়। সেই কলকাতায় একটি দিদির সভায় তিনি কিছু বলতে গেলেন আর তাঁকে বসিয়ে দেওয়া হলো। বলা হলো তিনি অনিল বসুর লোক। তাঁর হয়ে কাজ করেন এলাকায়। সেই অভিযোগে কিছুটা অপমান সহ্য করেই এই দল ছেড়ে দিলেন তিনি। সেই ২০১৩ সালের টাউন হলের সভায় বলতে গেলেন কিছু কথা। সেদিনের যোদ্ধা শৈলেন দা। আজও সেই সব কথা মনে পড়লে কেমন যেনো থমকে যান তিনি।
এরজন্য এতো কিছু করলেন সারা জীবন ধরে। যে খানকুলে দলকে প্রতিষ্ঠা করলেন সেই খানাকুলে তাঁকে বলা হলো তিনি অনিল বসুর লোক। এটা ভাবলেই আজ কেমন বুকের ভিতরটা কেমন করে ওঠে তাঁর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো জনসংযোগ যাত্রায় এখানে এসেছিলেন। সোনালী গুহ, আকবর, তপন সবাই ছিল। সেদিন তো তিনি মমতার গাড়ীতে ছিলেন। আর সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুকুল রায় আর পারভেজ এর কথা শুনে বলে দিলেন সে অনিল বসুর সাথে যোগাযোগ রেখে চলে ২০১৩ সালের ঘটনা। এরপরে তিনি সেই দিদির দল ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন বিজেপিতে। সেই ২০১৮ সালে মনোনয়ন দিতে গিয়ে এই তৃণমুলের হাতে তাড়া খেয়ে পুলিসের সহযোগিতায় বেঁচে গেলেন তিনি।
আজ অসুস্থ অবস্থায় প্রায় একঘন্টা কথা বললেন তিনি আমার সাথে। বললেন সিপিএমের রাজনৈতিক সৌজন্যে রেখে তিনি জেলা পরিষদে যখন বিরোধী রাজনীতি করছেন নেতা সেই সভাধিপতি শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর আমলে তখন এমন অবস্থা ছিলোনা। সিপিএম তাঁদের দলে সবাইকেই যোগদান করিয়ে নেয়নি। যেটা তৃণমূলে হলো সব চলে এলো দলে। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে বলেন যাঁরা এই অভিযোগ করছেন তাঁদের কোনোও মামলা নেই আমার ৩২ টি মামলা দিদি। তার মধ্যে চারটে খুনের কেসের আসামী আমি। সেই পুরোনো দিনের যোদ্ধা শৈলেন সিংহ কে আর কে মনে রাখে আজ।
ডিজিট্যাল যোদ্ধায় ভরে গেছে চারিদিক। না তৃণমুল কংগ্রেসের দল না কংগ্রেসের দল। যদিও তিনি কিন্তু এই খানাকুলে তৃণমুলের ঝান্ডা ওড়ান সবার প্রথম সেই কবে। আজ কর্পোরেট দলে এইসব তো মূল্যহীন হয়ে গেছে কবেই। তাই দল এর প্রথম দিনের যোদ্ধারা ক্রমেই দলে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন ধীরে ধীরে। শাসক দলের এখন তো আর যোদ্ধাদের দরকার নেই। দল যে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে কবেই। আর প্রয়োজন ফুরিয়েছে এই মা মাটির দলে আসল যোদ্ধাদের। এখন চাই শুধুই ডিজিট্যাল যোদ্ধা। সে তৃনমূল, বিজেপি সবার এক স্টাইল আজকের রাজনীতিতে। ভালো থাকবেন আপনি দাদা। আমার প্রণাম নেবেন আপনি।
খানাকুলের যোদ্ধা শৈলেন সিংহ - অভিজিৎ বসু।
দোসরা এপ্রিল দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন