নতুন বছরের সকালে এ এক অন্যরকম একটা অনুভুতি হলো আমার আজ। শ্রীরামপুর কলেজের সেই ১৯৮৯ এর কলেজের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নতুন বছরের একটি শুভেচ্ছা বার্তা দেখে আমার চোখ আটকে গেলো হঠাৎ করেই আজ ভোরবেলায়। যেখানে বিভাস প্রতিদিন গুড মর্নিং জানায়। আমি যদিও এইসব থেকে একটু দূরেই থাকি আজকাল। সেই ১৯৮৯ এর পর দেখাই হয়নি ওর সাথে। সেই ধূলি ধূসর স্মৃতির পাতায় আজ সেই একটি ছবি দেখেই মনে হলো আরে এটা অমল নয়। সেই রোগা লম্বা মজা করে জীবন যাপন করা একটি ছেলে। সেই ব্যান্ডেল লাইনে ভদ্রেশ্বর বা মানকুন্ডূতে ওর বাড়ী। সেই ক্লাস শেষ হলেই গান করতো মাঝে মাঝে একদম প্রাণবন্ত এক যুবক। সেই কমল ঢালি, কৌস্তুভ, সেই তপতী যদিও আজ আর নেই আমাদের মাঝে। সেই ব্যান্ডেল লাইনের দিক থেকে ট্রেন ধরে ওদের শ্রীরামপুর কলেজে পড়তে আসা। বায়ো সায়েন্স পড়ে কি করবো জানতাম না আমরা কেউই সে সময় পড়তে হবে বলে কলেজে পড়া। লাভ কি হবে হনার্স না পেয়ে পাশ কোর্সে ভর্তি হয়ে যাওয়া। কোনরকমে স্নাতক হয়ে নিজের পিঠে গ্রাজুয়েট ছাপ মেরে নেওয়া। তখনো কলেজে এমন রাজনীতির ছোঁয়া লেগে যায়নি।
আর সেই আমাদের স্কুল জীবন ছেড়ে সেই ইতিহাস এর পাতায় লেখা সেই বিখ্যাত উইলিয়াম কেরি সাহেবের কলেজ। সেই বায়ো সায়েন্স এর মাধ্যমে বোটানি, জুলজি আর ফিজিওলজি নিয়ে আমাদের পড়া শুরু করা। স্কুল জীবন এর গণ্ডি আর চোখ রাঙানি পেরিয়ে গঙ্গার ধারে বসে থাকা দল বেঁধে বিড়ি ফুঁকে আর দামী সিগারেট ধরিয়ে। যার যেমন আয় তার তেমন ব্যয়। সেই কত যে সুন্দর ছিলো সেই ১৯৮৯ এর কলেজের জীবন। দেখা হলো ভজন, প্রসেন, বিভাস , সমীর এর সাথে। দেখা হলো বলরাম এর সাথে। দেখা হলো সিঙ্গুরের অভিজিৎ এর সাথে সেও আজ আর নেই। সেই পিয়াস আর মৌসুমীর জুটি ভেঙেছে কবেই। আর সেই কলেজের বিখ্যাত রাজা আর ঝুমের জুটির দৃশ্য আজও মনে পড়ে যায়। একদম ঠিক এক দুজে কে লিয়ে। আরও কতজন যে ছিলো অনেকের নাম মনে পড়ে না আর। তার মাঝেই আজ এই ১৪৩৩ এর সকালে সেই ২০২৬ এর সকালে ফিরে পেলাম আমি অমল কে। জানিনা আমি এই অমল রোদ্দুর হতে চেয়েছিল কি না ওর কলেজের জীবনে। এই অমল কে দেখে ওর ঝাঁ চকচকে জীবন আর রূপ দেখে নিজেকে একটু ছোটই মনে হলো। তাতে কী বা এসে যায়। কলেজের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আর জীবনে কি এইসব দিয়ে কিছুই আটকে থাকে মনে হয়না।
ভয়ে ভয়ে ওকে জিজ্ঞাসা করলাম সেই কলেজের ১৯৮৯ এর ব্যাচ এর অমল কি। অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এলো হ্যাঁ। একদম ঠিক ধরেছি বলে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার এর মতই কতদিন পর যে বুড়ো বয়সেও শিশু হলাম আমি কে জানে। যে শৈশব হারিয়েছে কবেই আমাদের। সেই যৌবন হারিয়ে গেছে কোথায় কে জানে। সেই আমার নিজের শর্তে বেঁচে থাকা এখন সব কিছু ছেড়ে দিয়ে। সেই আমার ৩৫ বছরের মিডিয়ার জীবন। সেই কাজের জগৎ সব কিছুই ছেড়ে এখন আমার এলোমেলো এলেবেলে বিন্দাস টোটো চালকের জীবন। জানিনা আজ যে বড্ড বেশী করে স্মৃতি মেদুরতায় পেয়েছে আমায়। সেই এন ডি স্যার এর ক্লাস, সেই একে ডি, সেই পি বি কত সব নাম আজও মনে আছে যে। সেই প্রশান্ত শুর এর বউ সন্ধ্যা শুর এর ক্লাস করা আমাদের। সেই ব্যাঙ কেটে সেই হারবেরিয়াম শিট তৈরী করে। গাছের ফুল পাতা জোগাড় করে, সেই ল্যাটা মাছ কেটে। সেই ফর্মালিন এর গন্ধ শুঁকে, সেই স্নাতক হয়ে সবার এদিক ওদিক ছিটকে যাওয়া। সেই ব্যাগ কাঁধে একবার
চন্দননগর স্টেশনে দেখা হয়েছিলো সরকারি বাবু চাকরী করা কৌস্তভের সাথে। সেই বিদ্যালঙ্কার এলাকায় ওর বাড়ী ছিলো। সত্যিই এক ধাক্কায় অমল আজ আমায় একদম বেআব্রু করে দিলো যে।
অমল যে আজ আমায় অমলতাস এর হাওয়া দিয়ে আমায় দুলিয়ে দিলো। সেই কলেজের ক্যান্টিন, সেই পুরোনো সব চায়ের কাপে দুধ চা খাওয়া, সেই ঘুগনি আর রুটি খাওয়া। সেই কলেজের এস্কারসনে সবার চলে যাওয়া হৈ হৈ করে আমি অবশ্য যেতে পারিনি কোথায় জায়গাটা ভুলে গেছি কোনোও এক সমুদ্রের ধারে ওরা সবাই গেছিলো। টাকার অভাবে যাওয়া হয় নি আমার। সেই কত যে আনন্দ হলো ওদের সেটা পরে শুনলাম আমি ফিরে আসার পর। সত্যিই অসাধারণ কিন্তু সেই সব দিনগুলো। আমাদের সেই রিতেশ কে দেখলাম সেদিন জঙ্গলের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে সে হাতে দামী ক্যামেরা নিয়ে। জঙ্গলকে ভালোবেসেই তার জীবন যাপন। সত্যিই তো জীবন কাটিয়ে দেওয়া এইভাবেই। আর আজ অমলকে ফিরে পেয়ে আমার স্মৃতির পাতায় সাদা কালো দাগ পড়ে যাওয়া। যে সোমা হারিয়ে গেছে কবেই এই গঙ্গার ধারেই। সেই প্রথম জীবনের সবচেয়ে দামী উজ্জ্বল স্মৃতি আজ হিমঘরে লাশকাটা ঘরে চাপা পড়ে গেছে কবেই। ভাই অমল কেনো যে হঠাৎ করেই ফিরে এলো এই আজকের বোশেখের প্রথম সকালে কে জানে। যে সকাল আমায় উদ্বেলিত করে দিলো আবার এই বুড়ো বয়সেও। যে সকাল আমায় এই বুড়ো বয়সেও একদম বেআব্রু করে দিলো। স্মৃতির মোরাম রাস্তায় হেঁটে বেড়াতে মন্দ লাগলো না বন্ধু অমল। ভালো থাকিস তুই। বলে ফেললাম আজ এমন পুরোনো দিনের কথা। শুভ নববর্ষ। নতুন বছর ভালো কাটুক সবার। আজ সাদা জীবনের কালো কথায় আমার আঁকিবুঁকি ব্লগের পাতায় সেই হারিয়ে যাওয়া অমল এর কথা লিখে ফেললাম আমি।
ফিরে এলো অমল - অভিজিৎ বসু।
পনেরো এপ্রিল দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য অমল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন