আরেফুল এর স্মৃতি ধীরে ধীরে ঝাপসা হচ্ছে আমার। তবু মাঝে মাঝেই ওর কথা মনে পড়ে যায় আমার এই ভোটের বাজারে। সেই কত যে কথা হতো আমার আর ওর সেই গ্রামে সিপিএমের অত্যাচার এর খবর দিতো ও ফোন করে তখন ওর পকেটে মোবাইল ছিলো না। এদিক ওদিক থেকে ফোন ঘুরিয়ে সাহায্য করতে চাইতো গরীব মানূষকে এটাই ওর একমাত্র নেশা। আর আজ সেই মানুষটাই নেই। যে কারুর বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করতো না কোনোও সময়। আমি হিন্দু ও মুসলমান এই সব নিয়ে কিছুই ভাবনা আসতো না কারুরই। একটাই কথা ও মানুষ আর আমিও মানুষ এটাই যে শেষ কথা একমাত্র।
আরেফুল আর অভিজিৎ আমরা বেশ ভালই জুটি ছিলাম সেই পুরোনো দিনের মিডিয়া যখন খবর করতে পারতো সব সময়। সেই আরামবাগ এর অনিল বসু, বিনয় দত্ত, গোপাল কচ আর সেই বিখ্যাত মোজাম্মেল হোসেন এঁদের বাম আমলে খবর করেও রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো যেতো আমাদের। একটু আরেফুল কে গাল শুনতে হতো হয়তো পার্টি অফিস গেলে। আর আমায় বলতো আরে মমতার লোক এরা সব। আজকাল যেমন যে কোনোও ভাবেই মাথা উঁচু করে খবর করাই দায় বেশ এই বঙ্গের মিডিয়ায়। হয় এই পক্ষের লোক বলবে না হলে বলবে ওই পক্ষের দালাল। জানিনা আরেফুল আলম থাকলে আজ ওর কী অবস্হা হতো। আমি তো কোনোও ভাবেই বেঁচে আছি ও হয়তো মাথা গরম করে ফেলতো এই ঘাসফুলের আমলে।
আরেফুল কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিনতো। আমাকেও তিনি একসময়ে চিনতেন। আজকাল তো এসব গল্প কথা মনে হয় যেনো সবার কাছেই। সেই ১৯৯০ সালের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে কে আর রাস্তায় ঘুরেছে সেই সময় সিপিএমের লেঠেলবাহিনীর বিরুদ্ধে খবর করে। আরেফুল খাতা বা পকেটে নোট বুক রেখে দিত একটা। নাম ঠিকানা কে মেরেছে কবে মার খেয়েছে সব কিছু পকেটে নোটবুক দেখে বলতে পারতো সে গড়গড় করে। রিপোর্টার হিসেবে তাঁর মাটির সাথে যোগাযোগ ভালোই ছিলো। কামারপুকুর এর রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র সে। গোড়া থেকেই একটা সৎ পরিমন্ডলে আর পরোপকার করার চেষ্টা করে ওর বেঁচে থাকা বেশ বড় পরিবারের ছেলে সে। যাকগে এইসব কথা বলে আর কী হবে। তবু আজ এতোদিন পরে আরেফুল আলম ফিরে এলো একটি ফোনের মাধ্যমে হঠাৎ করেই।
অজানা নম্বর যে কোনোও নম্বর আমি সেভ করিনা একদমই। এটা আমার বদ অভ্যাস বলতে পারেন। দাদা ভালো আছেন চিনতে পারছেন আমায়। আমি মনে মনে ভাবছি কেউ তো আর ফোন করে না আমায়। দরকার নেই আর কারুর এই সমাজে আর পৃথীবিতে। সেখানে এমন একজন ভালো কথা বলে জিজ্ঞাসা করছেন দাদা চিনতে পারছেন না আমায়। ট্রু কলারে নাম দেখলাম সেই আবদুল সাকুর। কথায় কথায় মনে পড়লো হ্যাঁ, সেই দিল্লীর বাসিন্দা। আরেফুলের স্কুলের বন্ধু। সেই উচ্চপদে কর্মরত সে। দিল্লীর নয়ডার বাসিন্দা। আরামবাগে বাড়ী তাঁর। সেই তিনিই ফোনে যোগাযোগ করলেন অনেকদিন পরে।
জীবন বেশ মজার বুদবুদের মত। এই হারিয়ে যাওয়া জীবন ভেসে ওঠে হঠাৎ করেই। আবার চেনা মানুষ হঠাৎ করেই অচেনা মানুষ হয়ে যান কোনোও সময়। আর অচেনা মানুষ চেনা হয়ে ধরা দেন জীবনের মোরাম এর রাস্তায় হঠাৎ করেই। বহুদিনের পর আমার সাথে কথা হলো তাঁর আবার। আমার সাথে সেই আরেফুল এর প্রসঙ্গ উঠলো আজ আবার। সেই সব কথা মনে পড়লো আবার। ওনার কাজের কথা। আর সেই দিল্লীর মানুষের আমার শহর শ্রীরামপুরে এসে পড়া তাঁর ভাইয়ের বাড়ীতে। আর তাই আমার মত অকিঞ্চিৎকর জনের কথা মনে রেখে ফোন করলেন তিনি আমায় আজ। যেটা আমার কাছে বেশ ভালই লাগলো।
আগে তো এমন কত যে ফোন আসতো আমার কাছে সাংবাদিক এর কাজ করার সময়। আজকাল সেসব পাট চুকেবুকে গেছে যে কবেই। তবু আরেফুল এর স্মৃতি রোমন্থন করতে পারলাম আমরা দুজন এই সময়ে এটাই ভালো লাগলো দুজনের। ছবি চাইলাম তাঁর দেখিনি কোনোও সময় তাঁকে আমি। তবু কত যে আনন্দ হলো আর কথা হলো যা আত্মীয় স্বজনের সাথেও হয়না আমার আজকাল তাঁরা সবাই ব্যস্ত থাকেন বড্ড। সত্যিই আজ মনে হলো আরেফুল আলম এতদিন পরেও আমাদের দুজনকে এমন করেই একটা অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রেখেছে যেনো দুর থেকেও।
একজন খুব উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। আর একজন মানুষ হলেন একদম এলোমেলো এলেবেলে বিন্দাস জীবন এর টোটো চালক বলে ঘুরে বেড়ানো অগোছালো লোক। এই অসম দুই জন মানুষের কথা হলো কই একবার মনে হলো না তো কারুর আমি বড় আর ও ছোট সব দিক থেকেই। আরেফুল তো এইভাবে এই দর্শনে বিশ্বাস করেই জীবন কাটিয়ে দিলো ও নিজেও। আমিও তো এই ভাবেই জীবন যাপন করি। যদিও আমার আশপাশের লোকজন অবশ্য আমার এই অবস্থা দেখে হাসে তাঁরা আর ঠাট্টা করে বেশ। কিন্তু এই আবদুল সাকুর ভাই সেই সব কিছু মনে না করে শ্রীরামপুরে এসে আমায় মনে রেখে ফোন করলেন এটাই যে অনেক বড় ব্যাপার বটে।
আসলে সেই আমাদের আল্লা, ভগবান, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট, বুদ্ধদেব যাঁর কথাই বলি আমরা সবাই বোধহয় এইভাবেই হাসিমুখে একে অপরের কাছে সম্পর্ককে এইভাবেই হাসিমুখে জীবনের রাস্তায় ধরে রাখতে পারি। হ্যাঁ কেউ একটু বড় কেউ একটু ছোট। সেই সব ভুলে গিয়ে এইভাবেই আজ আরেফুল।আবার দুর থেকেই সেই ওর নিজের জীবন দর্শনের ফাঁদে আটকে দিলো এই দুই অসম মানুষকে। যে জীবন যাপন ও নিজে করতে ভালোবাসতো বেশ। সেই আবদুর আর অভিজিৎ আজ এতদিন পরেও আরেফুলকে মনে করে একে অপরের কাছে আরো বেশী করে ধরা দিলো।
ধন্যবাদ ভাই আরেফুল। আর ধন্যবাদ আবদুর ভাই আপনাকে আমায় মনে করে ফোন করার জন্য। আর আমি ক্ষমা চাইলাম চিনতে পারলাম না বলে। আমার সাদা জীবনের কালো কথায় আমার আঁকিবুঁকি ব্লগের পাতায় আজ সেই আরেফুল, আবদুর আর অভিজিৎ এর কথাই লিখে ফেললাম আমি। সত্যিই তো আজকের এই ভোটের বাজারে এতো লড়াই এর দিনে আমরা তিনজন দিব্যি সুখেই গল্প করলাম কিছু না মনে করে। ওরা আমরা, এই পক্ষ ওই পক্ষ কোনোও কিছুই মনে হলো না কারুর। এটাই যে আমার দেশ ভারতবর্ষ।
আরেফুল, আবদুল আর অভিজিৎ এর গল্প - অভিজিৎ বসু।
সতেরো এপ্রিল দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য আবদুর ভাই।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন