সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বেহাল খাতা ও আমি

রতনপল্লীর ফলপট্টির আড্ডায় আমায় নিয়ে গিয়েছিলেন মধুদা অনেক দিন আগেই এক সন্ধ্যায়। ধীরে ধীরেই মধুদার স্মৃতি ক্রমেই ঝাপসা হচ্ছে যেনো তবুও হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিও তো ঝাপটা মারে যে কোনোও সময় বৃষ্টি ভেজা পালাবদলের সন্ধ্যায়। তবু এতদিন পরেও কেমন করে যে সেই এই আড্ডার টেবিলে পড়ে এক কোণে পড়ে থাকা থাকা বেহাল খাতা, বেহাল টেবিল আর আমার বেহাল জীবন আর এই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যা সব যে মিলেমিশে একাকার হলো আমার। কে জানে সেই থপ থপ করে রাস্তা পার হওয়া সেই বুড়ো ব্যাঙের মতোই তো আমার এই বুড়ো বয়সের জীবন। আমার এলোমেলো এলেবেলে বিন্দাস সাদা জীবনের কালো কথার বেহিসেবী টোটো চালকের জীবন নিয়ে হাজির হলাম আমি বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় এই বেহাল খাতার সামনে আজ। হাজির হলাম আকাশ দেখার নেশায় সেই বুঁদ হয়ে থাকা জীবন কাটিয়ে দেওয়া সেই নিখিলেশদার ডাকে। যিনি মাটিতে পায়ে হেঁটে সাইকেল চালিয়ে দিব্যি এই বয়সেও আকাশ দেখার নেশায় আচ্ছন্ন হন বারবার। কত যে বেহাল জীবন আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় এমন।

আসলে কে আর কাকে ডাকে এই বুড়ো বয়সে ডাকে বলুন তো আজকাল। আর আমার যে ডাক পড়েনা কোথাও কোনোও জায়গায় সব জায়গায় আমি যে বাতিলের দলেই। চারদিকেই তো অর্থ স্বার্থ আর দ্বন্দ্বের প্রবল চোরাস্রোত বয় এদিক থেকে ওদিক। যে স্রোতে বেহাল হয়ে গেছে কবেই আমার এলোমেলো এলেবেলে বিন্দাস টোটো চালকের জীবন। এই সমাজের ধূলি ধূসর জীবনে আজ যে ঘাস ফুলের গন্ধ ছেড়ে শুধুই গেরুয়ার গর্বের দাপাদাপি আর লাফালাফি চোখে পড়ে সব জায়গায়। তার মাঝেই বেলাইন হয়ে আলগোছে পড়ে আছে টেবিলের ওপর এই বেহাল খাতা ১৬, কী মিস্টি নাম ওর। কী সুন্দর দেখতে ওকে। দেখলেই যে প্রেমে পড়তে ইচ্ছা হয় এই বুড়ো বয়সেও আমার আবার। গুটিকয় মানুষ বসে আছেন সেই আমার বহুদিনের চেনা দোকানের সামনে ভীড় করে। চলছে আড্ডা সুখের বাসর এই টেবিলে ওই টেবিলে। আসলে এই বাঙালি বাঙলার হারিয়ে যাওয়া অস্মিতা আর বাঙালিয়ানা বিপন্ন বলে টেবিল চাপড়ে আড্ডা মেরে বাজার গরম করে লাল চা আর দুধ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঢেঁকুর তুলে ভাতা প্রদান এর জীবন আর ভাতাহীন আনন্দহীন গেরুয়াময় জীবনের পার্থক্য ব্যাখ্যা করে আবার দেশের নয় বিশ্বের পলিটিক্সের ব্যাখ্যা মধুদার কাছ থেকে শুনে বাড়ী যান অনেকেই সাইকেল চালিয়ে বউ এর ফরমান বেশী রাত করা যাবে না যে একদম এতো আড্ডা মারা কিসের বুঝিনা বাপু। সেই সব কথাই তো সাদা কালো অক্ষরে লিপিবদ্ধ হয় এই বেহাল খাতায় বহাল তবিয়তে বছরের পর বছর ধরেই। 

আড্ডা তো নিখাদ ভালোবাসা। আড্ডা তো আমাদের জীবনের অক্সিজেন। কারুর কারুর মাথায় অবশ্য অক্সিজেন কম ঢোকে বলে এমন কথাও শোনা যায় এই বীরভূমের বোলপুরের রাস্তার আনাচে কানাচেতে। সে যাই শোনা যাক এই আড্ডা তো আমাদের মজ্জায়, রক্তে, ঘামে, মিশে আছে কবে থেকেই। সেই আড্ডার রং চটা টেবিলে বহাল তবিয়তে দশ বছর ধরে বা তার বেশী সময় ধরেই বেঁচে আছে এই বেহাল খাতার জীবন। যে খাতার পাতায় কত কিছুই যে লেখা আছে টুকটুক করে। যে খাতায় মন্দাক্রান্তা সেনের কবিতার মায়াজাল এর কথা যেমন লিপিবদ্ধ আছে ঠিক তেমনই এই খাতায় মধুদার কথার স্মৃতির উত্তাপ পাওয়া যায় আজও খুঁজলে। যে হাজিরা খাতায় নাম লিখে ফেললাম আমি আজ হাজিরা দিয়েই যা আগে কখনো করিনি কখনও আমি। সামনে ঠাণ্ডা হাওয়া মাখা বৃষ্টি ভেজা আবহাওয়া, কাদা প্যাচপ্যাচে বদলে যাওয়া ফলপট্টির সেই রাস্তা, দুধ চায়ের কাগজের কাপ, নিখিলেশদার ব্যাগ থেকে বের হওয়া ঠাণ্ডা নেতানো চপ সব আছে এই আড্ডায় নিজের মত করেই। আর সাথে আছে সেই বিখ্যাত সাংবাদিক প্রসেনজিৎ মালাকার এর সাথে বহুদিনের পর আমার দর্শন হওয়া ফের এই বোলপুরের রাস্তায় ফের। সত্যিই কত কিছুই যে বেহাল হয়েই ফিরে আসে এই একটাই জীবনে আমাদের। 

জানি আমার টোটো চালকের জীবন। সেই বেহাল অবস্থা হয়ে বেহাল দশা নিয়েই জীবন যাপন আর লোকের কাছে পাগল হয়ে ঘুরে বেড়ানো আমার সেটা নিয়ে কত যে হাসির খোরাক হতে হয় আড়ালে আবডালে এই জীবনেই। সেই একদা মিডিয়া নামক গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের হয়ে কাজ দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে আর সেই কর্পোরেট এর ছোঁয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে কোনরকমে বেঁচে থেকে মধুদার মতোই নিজের শর্তে দিন যাপন আমার আর এইসব এর মাঝেই সীমাবদ্ধ আমার এই বেহাল জীবন আজ নিখিলেশদার জন্য সন্ধান পেলো এই বেহাল খাতার। যে খাতা তো শুধুই হাজিরার একটা খাতা নয় মাত্র। যে খাতা কত কিছুই যে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে কে জানে। এই ফেলে আসা পুরোনো দিনের সেই আমার এই রতনপল্লীর ভাড়াবাড়ির জীবন, সেই মেয়ের পড়তে আসা বোলপুরে, আমার কাজ ছেড়ে কঠিন জীবন কাটিয়ে দেওয়া এই বোলপুর শহরে, সেই লক ডাউন এর স্মৃতির উত্তাপ আর সেই চেনা দোকানের সেই গরম রুটির গন্ধ আর চেনা মানুষের অচেনা হয়ে যাওয়া। একদিন আবার তার কাছেই ফিরে এলাম আমিই কত কত দিন পরে যেখানে মধুদার স্মৃতির উত্তাপ আজও পাওয়া যায় এই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় এই দোকানে হাজিরা দিয়েই। ভাগ্যিস আজ নিখিল দা ডাকলেন আমায়। না হলে যে কি মিস করতাম আমি। আমার সাদা জীবনের কালো কথায় আমার আঁকিবুঁকি ব্লগের পাতায় আজ সেই কথাই লিখে ফেললাম আমি সেই বেহাল খাতার গল্প। 


বেহাল খাতা ও আমি - অভিজিৎ বসু।
আট মে দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য নিজের মোবাইল ক্যামেরা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যা দেখি…প্রতিদিন মনে পড়ে কত… স্মৃতির পথ ধরে হাঁটি… লিখি…

কুণাল ঘোষের বার্তা ও টোটো চালকের কিছু কথা

কুণাল দার সাথে কাজ করিনি আমি কোনোদিন। বাংলা সংবাদের জগতে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত সাংবাদিক আছেন। যাঁদের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে এই বাংলার মিডিয়ায়। আজ সেই কুণাল ঘোষ সংবাদ প্রতিদিন কাগজ থেকে কনসাল্টিং এডিটর পোস্ট থেকে সরে গেলেন। একদিকে তাঁর বিধায়ক হয়ে যাওয়া সরকার এর বদল হয়ে যাওয়া। আর তাই তিনি প্রতিদিন কাগজের দায়িত্ব থেকে সরে গেলেন তেমন এক বার্তা দিলেন তিনি নিজেই।  কুণাল ঘোষ এর সাথে আমার আলাপ বিশেষ নেই। সেই মহাকরণে করিডর দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের দিকে। তাঁর আগে পিছে সংবাদ মাধ্যমের কাজ করা রিপোর্টারদের ভীড় তাঁকে ঘিরে ভীড় করে আছেন আমিও দূরে আছি দাঁড়িয়ে। সেই বহু বছর আগে হাফ শার্ট পরে বিকেলের দিকে মদন মিত্রের অফিসে আসতেন। ২৪ চৌরঙ্গী রোড এর অফিসে ধর্মতলার কাছে। সান্ধ্য প্রতিদিন কাগজ পকেটে নিয়ে। রণজিৎ থাকতো সেই সময়। সেই সব দিন এর কথা মনে পড়ে যায় আজ আমার। সেই কঠিন বাম আমলে তাঁকে কাজ ছেড়ে চলে যেতে হয়নি একদমই। আর আজ সরকার বদলের সাথে সাথেই দিকে দিকে কাজ ছাড়ার হিড়িক পড়ে গেছে যে চারিদিক জুড়েই এই বাংলার মিডিয়ায়।  ইটিভির কাজের স...

রাখী বন্ধনে বাঁধা ইতিহাস

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ রাখী বাঁধার কথা। যে রাখী বন্ধন ভাই আর বোনের সম্পর্ককে আর নিগূঢ় করে, আপন করে, নিকটের করে। আজ সেই রাখিবন্ধন উৎসব পালন হচ্ছে গোটা দেশ জুড়ে। রাখীবন্ধন ভাই ও বোনের মধ্যে প্রীতিবন্ধনের উৎসব। রাখীবন্ধন উৎসব বা রাখীপূর্ণিমা ভারতীয় উপহাদেশের একটি উৎসব। হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ ও শিখরা এই উৎসব পালন করে।এই দিন দিদি বা বোনেরা তাদের ভাই বা দাদার হাতে রাখী নামে একটি পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। এই রাখীটি ভাই বা দাদার প্রতি দিদি বা বোনের ভালবাসা ও ভাইয়ের মঙ্গলকামনা এবং দিদি বা বোনকে আজীবন রক্ষা করার ভাই বা দাদার শপথের একটা প্রতীক। সেই রাখিবন্ধন বা রক্ষাবন্ধন এর দিন আজ। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ বঙ্গভঙ্গের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই অনুষ্ঠানের পুনঃসূচনা করেছিলেন বাংলার মানুষের মনে ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এইবার সেই রাখীর উৎসবে লেগেছে রাজনীতির ছোঁয়া। নানা রং। নানা প্রতিবাদ। নানা আন্দোলন।  ভাই বোনের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসার সুতো জড়ানো রাখিতেও ...

ওই খানে মা পুকুর পাড়ে

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হবে বনবাসী,           কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে           থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে           থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি           ধনুক নিয়ে হাতে। .......রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টুপ টুপ বৃষ্টির দুপুরে এই কবিতার লাইন গুলো দেখে। মনে পড়ে গেলো মার কথা। বাইরে একটানা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কখনো কখনো বেশ জোরে, কোনো সময় একটু কম। মাথার মধ্যে কেমন ঝিম ঝিম করছে এই বৃষ্টির টানা আওয়াজ শুনে।  একটানা আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে একদম চুপ চুপে হয়ে গেছে। পাতার ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে নিচে।গাছের পাতাগুলোর অসময়ে স্নান করে ওদের আবার শরীর খারাপ না হয়।  জানলার ধারে সারাদিন ধরে যে পায়রা গুলো বসে থাকতো আর বক বকম করতো।...

বার্তালাপ এর পার্থ

ভোটের সময়ে কাউন্টিং এর দিনে একটি ছবি দেখে ফেসবুকে মন্তব্য করলাম আমি কত চেনা মুখ দেখলাম এই ভোটের বাজারে ছবিতে। আর তাতে উত্তরও এলো ওর কাছ থেকে অভিজিৎ দা কেমন আছো তুমি। আমার তো উত্তর বাঁধাই আছে। টোটো চালকের জীবন চলে যাচ্ছে এই আর কি। এই আর কী চলে যায় দিন আমার। সেই পার্থ মুখোপাধ্যায়। হুগলী জেলার কোন্নগর এর বাড়ী ওর। মাঝে মাঝেই ওকে দেখতাম সাধনদার সাথে দেখা করতে আসতো সে। সেই পটুয়া পাড়ার বাড়ীতে। চোখে হাই পাওয়ার এর চশমা পড়ে। বেশ একদম নিপাট ভালো ছেলে মিডিয়ায় কাজ না করলে ওর নিদেন পক্ষে প্রাইমারী স্কুলের হেডস্যার হতে পারতো সে।  কেনো যে এই পেশাকে ভালোবাসলো সে হঠাৎ করেই কে জানে। সেই দুরদর্শন এর কাজ, সেই পিন্টুর সাথে সিটিভিএন এর কাজ, সেই সাধন গাঙ্গুলী দার শ্রীরামপুর সমাচার এর লেখা, এইভাবেই ওর ঘুরে বেড়ানো মিডিয়ার কানা গলিতে দীর্ঘ দিন ধরেই। শুধুই সেই ভালোবাসা অন্ধ ভালবাসার জন্য জীবনের কুড়িটি বছর কে হারিয়ে ফেলা। সেই পার্থ ওর নম্বর দিলো মেসেঞ্জারে। আমিও আমার নম্বর দিলাম। কথা হলো দুজনের বহুদিনের পর। আমার মনে হলো আজকাল যেমন পাগল বলে বা উন্মাদ বলে সবাই আমায় এড়িয়...