সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ব্রহ্মদৈত্য মেলা

গ্রামের লোকরা বলে এই মেলা নাকি এক মাত্র তেনাদেরই মেলা। এই তেনাদের নাম নাকি আবার যখন তখন করতে নেই কাউকে। সন্ধ্যায় আর রাতে তো একদমই নয়। তাহলে তেনারা খুবই রুষ্ট হন। আর তাঁরা যদি রেগে যান তাহলে আর রক্ষে নেই কিন্তু কোনও মতেই কারুর। আর তাই তাঁকে সন্তুষ্ট রাখতেই এই বিশেষ মেলার আয়োজন। একদম ব্রহ্মদৈত্যর মেলা বলে কথা। সত্যিই এমন মেলার কথা সচরাচর শোনা যায়না কিন্তু।


সেই তাঁকে সন্তুষ্ট করে এলাকায় শান্তি আর স্বস্তি স্থাপনের জন্য এই মেলা আর তাঁর পূজো খুব দরকার। তিনি রেগে গেলেই কিন্তু মহাবিপদ ঘটবে এলাকায়। আর তাই তেনাকে সন্তুষ্ট করতে বীরভূমের ময়ূরেশ্বর থানার ঢেকা পঞ্চায়েতের ঢেকা গ্রামের এই বিরাট মাঝ মাঠে দীর্ঘ দিন ধরেই হয়ে আসছে পুরাকালের এই ব্রহ্মদৈত্যের পূজা হয়। মাঘ মাসের প্রথম দিনে হয় এই পূজা। 

আর এই পূজা উপলক্ষে মেলা বসে প্রতিবছর মাঘ মাসের পয়লা তারিখে ঢেকা গ্রামের মাঝ মাঠে। এই ব্রহ্মদৈত্যের মেলা নিয়ে বেশ জমজমাট ঢেকা গ্রাম।আশপাশের প্রায় পনেরো বিশটি গ্রামের মানুষ ভীড় করেন এই মেলা দেখতে। মাঠের চারিধারে বসে যায় নানা পসরা। বেতের বোনা ধামা কুলো থেকে শুরু করে কাঠের চেয়ার, আলমারি, আলনা, চৌকি বিক্রি হয় এই ভূতের মেলায়। তার সাথে আছে নানা রকমারি ঘর গৃহস্থালির জিনিস। যা দিয়ে সংসার এর কাজে লাগে। আর তাই সংক্রান্তির পরদিন এই ব্রহ্মদৈত্য মেলা দেখতে ভীড় জমে যায় ময়ুরেশ্বর এর ঢেকা গ্রামে। 

গল্পে আছে বহু বছর আগে এই ঢেকা গ্রামের মাঝে মাঠে একটি বিরাট বট গাছ ছিল। সেই বট গাছে বাবা ব্রহ্মদৈত্যে বাস করতেন। দিনের বেলায় গ্রামের লোকজন সেই মাঠে কেউ কেউ প্রবেশ করলেও সন্ধ্যার পর কেউ যেতে পারত না সেই মাঠের ধারে। অনেকের অনেক রকমের খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। আর তাই বাবাকে তুষ্ট রাখতেই সংক্রান্তির পরদিন এই পূজোর আয়োজন। যে পূজো ঘিরে মানুষের ভীড় উপচে পড়ে।

এই গ্রামের বাসিন্দা তপন মন্ডলের কথায় আমরা গ্রামের ঐতিহ্যকে মেনে আজও এই মেলা করে আসছি। মেলার পরিসর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বহু মানুষের ভীড় বেড়েছে এই মেলায়। অন্যদিকে এই মেলায় যিনি বংশ পরম্পরায় পূজো করে আসছেন সেই পুরোহিত দেবীপ্রসাদ মিশ্র জানালেন যে, বর্গীর আমল থেকেই এই মেলা হয়ে আসছে। তাঁর মনে আছে প্রায় তাদের পাঁচ পুরুষ এই মেলায় পূজো করে আসছেন। পাঁচশো বছর বা সাতশো বছরের এই মেলা। করোনার সময় বাদ দিলে এই মেলা প্রতিবছর হয়। যে মেলাকে আবার কেউ কেউ ভূত মেলাও বলে থাকেন।

সত্যিই গ্রামেগঞ্জে এমন কত যে মেলা ছড়িয়ে আছে তার শেষ নেই। নানা ধরনের মেলা, তার গল্পগাথা তার নানা অজানা কাহিনী লুকিয়ে আছে। তবে এই ভূত মেলা বা ব্রহ্মদৈত্য মেলা কিন্তু সত্যি সত্যিই অসাধারণ একটি মেলা। মাছ মেলার পর এই ভূত মেলা বা ব্রহ্ম দৈত্যের মেলার কথা লিখতে বসে মনে পড়ে যায় সন্ধ্যা হলেই নাকি তেনারা খুব ঘুরে বেড়ান এদিক ওদিক। ঢেকা গ্রামের মাঝমাঠে আজও সেই গাছের নিচে পয়লা মাঘ এই ব্রহ্মদৈত্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আর সেই মেলায় ভীড় করেন হাজার হাজার মানুষ।

ব্রহ্মদৈত্য মেলা - অভিজিৎ বসু।
পনেরো জানুয়ারী, দু হাজার পঁচিশ।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভোটের সকাল

ঘুম ভাঙলো বেলায় ভোটের দিনের ঘুম বলে কথা। একদম ঠিক কুম্ভকর্ণের ঘুম ভেঙে আমার বিছানায় শুয়ে এই পাশ আর ওই পাশ করা। ভোর বেলায় দু চোখে জ্বালা নিয়ে বিছানায় এলাম সারারাত বউকে ছেড়ে মোবাইলকে আঁকড়ে ধরে রাত্রি যাপন আমার। সেই রিলের নেশা, মোবাইল জুড়ে নানা রকম এর ছবির নেশায় বুঁদ আচ্ছন্ন আমি। সেই মোবাইল এর রাজ্য ছেড়ে ঘুম এর দেশে চলে যাওয়া আমার ভোর এর আলো গায়ে মেখে।  বাইরে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল। মেঘের আড়ালে সুয্যি মামা মুখ লুকিয়েছেন আজ ভোটের দিনে কিছুটা লজ্জায়। বাইরে সব কেমন চুপচাপ যেনো। মাথার ওপর হালকা করে ফ্যান চলছে। পশ্চিমের জানলা দিয়ে হাওয়া এসে গায়ে লাগছে। আমি বিছানায় শুয়ে চাদরটা মুড়ি দিয়ে এক কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম আবার। পাশের ফ্ল্যাটের ঘরে সব কলকল করে ফিরে এলো ভোট দিয়ে যেনো যুদ্ধ জয় করে ঘরে ফিরে আসা ওদের। চারদিকেই ভোট দেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে আজ।  ভোট দিয়ে ঘরে ফিরে শ্রীরামপুর এর ফোন কলকাতার সোনারপুরের এক আত্মীয়কে ভোট হয়ে গেছে তাঁর। বৃষ্টি টিপটিপ আর ঝির ঝির হচ্ছে এখানে মাঝে মাঝে। আর হ্যাঁ পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে দর্শনা ভোট দিয়ে বয় ফ্রেন্ডের বাড়ী গেছে...

ফুল্লরা আদি শক্তির পীঠস্থান

ফুল্লরা হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার লাভপুর শহরের কাছে একটি মন্দির কেন্দ্রিক জনপদ। এটি বোলপুর শান্তিনিকেতন থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি হিন্দু তীর্থস্থান ও পর্যটন কেন্দ্র।বীরভূমের এই লাভপুরের ফুল্লরা মন্দির লোকবিশ্বাস অনুসারে, ফুল্লরায় সতীর নিচের ঠোঁটটি পড়েছিল। এই মন্দিরে কোনও বিগ্রহ নেই। সিন্দুরচর্চিত কচ্ছপাকৃতি শিলাখণ্ডই দেবীর প্রতিভূ। এই মন্দিরের পাশে একটি বিরাট পুকুর আছে। কিংবদন্তি অনুসারে, রামের দুর্গাপূজার সময় হনুমান এই পুকুর থেকেই ১০৮টি পদ্ম সংগ্রহ করেছিলেন সেই ত্রেতা যুগে। ফুল্লরা ভারতের ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম বলে কথিত আছে। এই মন্দিরের ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায় সুলতান মাহমুদ গজনভির ভারত আক্রমণের সময় একদল বেদানুসারী ব্রাহ্মণ মিথিলা মতান্তরে কনৌজ থেকে বিতারিত হয়ে বঙ্গদেশের বর্মণরাজ হরি বর্মার কাছে আশ্রয় লাভ করেন। তাঁদের কয়েকজনকে দেবী ফুল্লরার পুজোর জন্য নিজের জন্মভূমি সিদ্ধলগ্রাম বা শিতলগ্রামে নিয়ে আসেন বর্মণ রাজের মহা সন্ধি বিগ্রহিক ভবদেব ভট্ট। যাতায়াত-সহ অন্যান্য অসুবিধার জন্য একসময় ওই পুজারীরা ফুল্লরা মন্দির সংলগ্ন বাকুল, ফ...

বিখ্যাত পুলিশ রিপোর্টার জয়ন্ত দা

সেই কলকাতা শহরে একটি ধর্ষণ এর ঘটনা যে বাংলার বিখ্যাত এক সাংবাদিক প্রথম কাগজে লিখে হৈচৈ ফেলে দিলেন।সেই সুজেট জর্ডান ২০১২ সালে গণধর্ষণের শিকার হন যিনি। ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২ তারিখে সন্ধ্যায়, জর্ডান পার্ক স্ট্রিটের একটি নাইটক্লাবে প্রথমবারের মতো পাঁচজন যুবকের (কাদের খান, মোঃ আলী, নাসির খান, রুমান খান এবং সুমিত বাজাজ) সাথে দেখা করে , যারা তাকে যাওয়ার সময় বাড়িতে নামিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এর কিছুক্ষণ পরেই, পাঁচজন তাকে চলন্ত গাড়িতে গণধর্ষণ করে এবং পরে কলকাতা ক্লাবের বিপরীতে এক্সাইড ক্রসিংয়ের কাছে ফেলে দেয়। ভোর ৩.৩০ টার দিকে, সে বেহালায় তার বাসভবনে একটি ট্যাক্সিতে ওঠে ।  যদিও মিডিয়া এবং পুলিশ প্রথমে ভুক্তভোগীর নাম গোপন রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল, যেমনটি ভারতে প্রচলিত , পরে তিনি জনসমক্ষে ৩৭ বছর বয়সী এবং দুই সন্তানের মা হিসেবে তার পরিচয় প্রকাশ করেন, যাতে অন্যান্য জীবিতদের কথা বলতে উৎসাহিত করা যায়। আরে এই খবর সবার প্রথম তাঁর কাগজের প্রথম পাতায় লিখে যে সাংবাদিক হৈ চৈ হুল্লোড় ফেলে দিলেন সেই বিখ্যাত দাপুটে পুলিশ রিপোর্টার জয়ন্ত মজুমদার এর কথা আজ আমার সাদা জীবনের কা...

সেই ২৪ ঘণ্টার ইন্টার্ন রোশনী

'এবার হয়েছে সন্ধ্যা। সারাদিন ভেঙেছো পাথর পাহাড়ের কোলে আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে তোমারও তো শ্রান্ত হলো মুঠি অন্যায় হবে না – নাও ছুটি বিদেশেই চলো যে কথা বলোনি আগে, এ-বছর সেই কথা বলো।'.....  শক্তি চট্টোপাধ্যায়  এই কবিতার লাইন লিখে পোস্ট করেছিল ও একদিন। সেই কতদিন আগের সেই পোস্ট ফিরে এলো হঠাৎ করেই আজ ফেসবুকের দেওয়ালে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছে যেনো কারুর জন্য। ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল সেই পোদ্দার কোর্টের ২৪ ঘণ্টার অফিসে। ইন্টার্নশিপ করতে এলো ও একঝাঁক উজ্জ্বল ছেলেমেয়ের সাথে।  সেই ওর মিষ্টি হাসি। মিষ্টি ব্যবহার। সুন্দর ঝাঁ চকচকে একটা মিডিয়ার জীবন তৈরি করতে আসা ওর। সেই ২৪ ঘণ্টার বাংলার সেই আমলে বিখ্যাত দু নম্বর চ্যানেলে কাজ শিখে সার্টিফিকেট নিয়ে কাজের দরজা খুলে রাখা। আর জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আর তার জন্য বিনা বেতনে কাজ শিখতে আসা এই নানা বাংলা মিডিয়ায় ইন্টার্নদের। আর কাজের সুত্রে যোগাযোগ হয়ে যাওয়া সেই হাউসের নানা সাংবাদিক এর সাথে।  কেমন একটা স্বপ্নের জগতে বিচরণ করা যেনো। হাত বাড়ালে স...

চেনা পথের পথিক

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ সেই সেক্টর ফাইভ এর চেনা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে বেড়ানো আমার গন্তব্যের নতুন ঠিকানা। সত্যিই কতদিন পর যে এই কলকাতা দেখলাম আমি গ্রাম থেকে এসে। সেক্টর ফাইভ এর সেই চেনা পথ, চেনা ফুটপাথ দেখলাম কত দিন পরে। সেই চেনা রাস্তা ধরে এগোলাম কত দিন পর। সেই কলেজ মোড়, ওয়েবেল মোড়, সেই চা, মুড়ি, ভাতের সারি সারি চেনা দোকান পাট লোকজন সব ঠিক আছে যে যার নিজের মতই ছুটে বেড়াচ্ছে তারা।  সেই বহু দিন অফিস করা সব চেনা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো সত্যিই কংক্রিটের এই বিশাল এক একটি বাড়ির মাঝে ঠাণ্ডা কাচ ঘেরা সুন্দর সুন্দর সব অফিস। সেখানে কাজের ব্যস্ততা অনেক। সেজে গুজে সব সুন্দর সুন্দর মানুষ জন ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা যেনো সবাই অন্য গ্রহের মানুষ ওরা। নিজেকে বড় বেমানান লাগলো আমার সেখানে। কেমন যেনো বিসদৃশ আমি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়িয়ে খুঁজতে লাগলাম আমার ইন্টারভিউ এর স্থান। প্রখর রোদের তাপে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি তবু চেনা রাস্তা পার হয়ে অচেনা অজানা জায়গায় হাজির হয়ে সেই নতুন ঠিকানার আমার বাড়ি খোঁজার নিরন্তর মরিয়া চেষ্টা। ঠিক যেনো কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মতই এদিক ওদ...