সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আজ শুধুই অ আ ই ঈ

আজ তো ভাষাকে ভালোবাসার একটা দিন। আজ শুধু ভাষাকে ভালোবেসে তাকে বুকে আগলে রাখার একটা দিন। যে দিনটা শুধুই বাংলা ভাষার জন্য বরাদ্দ গোটা একটা দিন। যে দিন আব্দুল আর জব্বার এরা সেই তাদের প্রাণের ভাষাকে ভালোবেসেই শহীদ হলো বুকের রক্ত দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করলো। আজ সেই ভাষা দিবসের দিনে সাত সকালেই মনে পড়ে যায় আমার সেই ছোটো বেলার কথা। সেই কালো স্লেট আর সাদা পেন্সিলে লেখা অ, আ, ই, আর ঈ। যে ছোটো ছোট বর্ণ আজ আমার জীবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা ভাবেই নানা রূপে। যাকে ভালোবেসে বড়ো হওয়া আমার। সেই ছোটো বেলায় ভয় পেয়ে 'মা' বলে আঁতকে ওঠা। আমার বর্ণপরিচয় তো এই ভাষার হাত ধরেই। যে বর্ণপরিচয় আজও আমাদের রক্তে, মজ্জায়, শিরায়, উপশিরায় আর ধমনীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আজও বেঁচে আছে। 

সেই ভাষার চর্যায় যার পথ চলা শুরু। সেই পথের দু'পাশে ছড়িয়ে আছে হলুদ সবুজ সর্ষে ক্ষেতের মতই পদাবলীর মিষ্টি মধুর সুর। আর কীর্তনের মাতাল করা কণ্ঠ। আর সেই পাঁচালির চেনা ছন্দ। যে ছন্দ আমাদের মুগ্ধ করে। যে ছন্দ আমাদের সবাইকে আবিল করে দেয় বারবার। এই রবিঠাকুর, লালন, অতুল প্রসাদের গান আমাদের হৃদয়ে বাজে এই বসন্তের বাতাস গায়ে মেখে। মাইকেল, জীবনানন্দ, সুনীল, শক্তির কবিতা আমাদের মননে। আমাদের ভাষার এই চলার পথে নানা চড়াই আর উতরায়। এই ভাষা সয়েছে নানা বর্গি আক্রমণ; খান সেনাদের অত্যাচার। তাঁর বুকের উপর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে তৈরি হয়েছে দুই রাষ্ট্র। ভারত - বাংলাদেশ। ফেব্রুয়ারির ২১ তা বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষার কোনও দেশ নেই, যেমন নেই ভালোবাসার।

১৯৯৯ -এ এই দিনটিকে স্মরণে রেখে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি। বিশ্বের পঞ্চম বহুল ব্যবহৃত এই ভাষা। বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যায় এই বাংলা ভাষায়। গোটা পৃথিবীতে দু’টি দেশের জাতীয় সঙ্গীত এই ভাষায়। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের গর্ব। তবুও ‘আমরা বাংলা গিয়েছি ভুলি’। সত্যিই অসাধারণ এই ক্ষয়িষ্ণু ভাষার ভেঙে পড়া আজ এই ইতিহাস। ইউনেস্কোর হিসেব অনুযায়ী, ১০ হাজারের এর কম মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষার বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গত ৬০ বছরে প্রায় ২৫০ ভারতীয় ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় ২৫০০ ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার বিপদ সম্মুখীন। যার মধ্যে এমন কিছু ভাষা আছে যাতে কথা বলে হয়তো আর জনা তিরিশেক মানুষ। রোজের জীবনে যে ভাষায় অভ্যস্ত সেই ভাষায় শিক্ষার সুযোগ নেই বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষের। ভয় হয়, বড্ড ভয়...। এই প্রাণের বাংলা ভাষা নিয়ে ভয় হয়, বড্ড ভয় হয় যে আজও। 

পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, বাঁকুড়ার আর হুগলীর ওই ছেলেটার ভাষা শুনে হাসি। মুর্শিদাবাদ, কোচবিহার, দিনাজপুরের মেয়েটার কথা শুনে আড়ালে আবডালে মজা। আচ্ছা, এভাবেই কি? না....। আমার ভাষা উন্নাসিকতার নয়। 'যিখানে মাটি লালে লাল', এ ভাষা গড়াগড়ি খায় সেখানে। এ ভাষা মাঝি, মাল্লার ভাষা। এ ভাষা বাউল - ফকিরের ভাষা। এ ভাষার শিকড় লুকিয়ে পাহাড়ে, জঙ্গলে, বনে, বাদাড়ে, নদীতে, পুকুরে, মাঠে, ঘাটে সর্বত্র। ছোটবেলায় লেখায় ভুল করলে বকা খেয়েছি। আজও বকা-ধমক খায়। ভুল লিখি, আর শিখি। এভাবেই যেন এগিয়ে চলে। থমকে যেন না যায়। আমার বর্ণমালা যেন দুখিনী না হয়.....। আজ বাংলা ভাষার দিবসে ভাষাকে ভালোবেসে আরও গভীর রূপে একটু আঁকড়ে ধরা। আর মনে মনে বলা

'বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে 
অন্ধ বাউলের একতারা বাজে
উদার গৈরিক মাঠে, খোলা পথে, 
উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে; 
নদীও নর্তকী হয়'


আজ শুধুই অ আ ই ঈ- অভিজিৎ বসু।
একুশে ফেব্রুয়ারী দু হাজার পঁচিশ।




মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বেহাল খাতা ও আমি

রতনপল্লীর ফলপট্টির আড্ডায় আমায় নিয়ে গিয়েছিলেন মধুদা অনেক দিন আগেই এক সন্ধ্যায়। ধীরে ধীরেই মধুদার স্মৃতি ক্রমেই ঝাপসা হচ্ছে যেনো তবুও হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিও তো ঝাপটা মারে যে কোনোও সময় বৃষ্টি ভেজা পালাবদলের সন্ধ্যায়। তবু এতদিন পরেও কেমন করে যে সেই এই আড্ডার টেবিলে পড়ে এক কোণে পড়ে থাকা থাকা বেহাল খাতা, বেহাল টেবিল আর আমার বেহাল জীবন আর এই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যা সব যে মিলেমিশে একাকার হলো আমার। কে জানে সেই থপ থপ করে রাস্তা পার হওয়া সেই বুড়ো ব্যাঙের মতোই তো আমার এই বুড়ো বয়সের জীবন। আমার এলোমেলো এলেবেলে বিন্দাস সাদা জীবনের কালো কথার বেহিসেবী টোটো চালকের জীবন নিয়ে হাজির হলাম আমি বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় এই বেহাল খাতার সামনে আজ। হাজির হলাম আকাশ দেখার নেশায় সেই বুঁদ হয়ে থাকা জীবন কাটিয়ে দেওয়া সেই নিখিলেশদার ডাকে। যিনি মাটিতে পায়ে হেঁটে সাইকেল চালিয়ে দিব্যি এই বয়সেও আকাশ দেখার নেশায় আচ্ছন্ন হন বারবার। কত যে বেহাল জীবন আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় এমন। আসলে কে আর কাকে ডাকে এই বুড়ো বয়সে ডাকে বলুন তো আজকাল। আর আমার যে ডাক পড়েনা কোথাও কোনোও জায়গায় সব জায়গায় আমি যে বা...

ওই খানে মা পুকুর পাড়ে

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে হোথায় হবে বনবাসী,           কেউ কোত্থাও নেই। ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে, শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে           থাকব দুজনেই। বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে- আসবে না কেউ তোমার কাছে, দিনরাত্তির কোমর বেঁধে           থাকব পাহারাতে। রাক্ষসেরা ঝোপে-ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে, দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি           ধনুক নিয়ে হাতে। .......রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টুপ টুপ বৃষ্টির দুপুরে এই কবিতার লাইন গুলো দেখে। মনে পড়ে গেলো মার কথা। বাইরে একটানা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কখনো কখনো বেশ জোরে, কোনো সময় একটু কম। মাথার মধ্যে কেমন ঝিম ঝিম করছে এই বৃষ্টির টানা আওয়াজ শুনে।  একটানা আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে একদম চুপ চুপে হয়ে গেছে। পাতার ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে নিচে।গাছের পাতাগুলোর অসময়ে স্নান করে ওদের আবার শরীর খারাপ না হয়।  জানলার ধারে সারাদিন ধরে যে পায়রা গুলো বসে থাকতো আর বক বকম করতো।...

বদলে যাওয়ার তালিকায় সবাই

ভেবেছিলাম আট থেকে আশির এই নিজেকে বদলে নেওয়ার দলে ও নাম লেখাবে না একদম কিছুতেই। গুরুগম্ভীর আর সেই অর্থপূর্ণ ভাব বিনিময় করে বেঁচে থাকা আর উচ্চপদে কর্মরত এই ব্যক্তি কী আর নিজেকে খোলস ছেড়ে বদলে নেবে হঠাৎ করেই। কেমন দেখতে লাগে এই নতুন চেহারায় ,সেটা দেখার বাসনা হবে তাঁর। কিন্তু না আমি দেখলাম এই বদলে নেওয়ার আর নিজেকে একটু উল্টেপাল্টে দেখে নেবার লোভ বড়ো ছোঁয়াচে। ঠিক বসন্তের বাতাসে উড়ে বেড়ানো পলাশের শুকনো হাসির মতই।   জানি আমায় কেউ কেউ বলবেন আবার ওকে নিয়ে লেখা। এই লেখা কত নম্বর ভাই। এই ছবি দেখে আর লেখার কি দরকার বাবা তোমার। তিনকাল গিয়ে এককাল ঠেকেছে তোমার। ওকে তেল দিয়ে আর লাভ নেই,চাকরির আশা নেই আর কোনোও তোমার। যেমন আছো তুমি তেমনি থাকো বাবা এই টোটো চালকের বেশ ধরে ঘুরে বেড়িয়ে এই এলোমেলো এলেবেলে বিন্দাস জীবন নিয়ে। আর কতবার এই মুর্শিদাবাদের ভেঙে পড়া সাম্রাজ্যের এক ব্যক্তিকে নিয়ে বার বার লিখবে আর তাঁকে প্রজেক্ট করবে তুমি এইবার তো থামো বাবা। একটু এই শেষ বেলায় হিসেব করে মেপে পা ফেলো মাঠে। না হলে যে গর্তে পড়ে বেঘোরে হাত পা ভাঙবে তোমার। আমি মনে মনে এই সব শুনে অস্ফুটে ...

বসন্তের মল্লিকা

মন কেমন করা ভোরে ঘুম জড়ানো চোখে, তোমার মুখে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে লেগে আছে মল্লিকার  প্রস্ফুটিত রূপ। তোমার পুরু ওষ্ঠের কালো তিলের হাতছানি এড়াতে প্রাণপনে লড়াই করি আমি দিন ভোর। ঠিক যেমন করে কাক-কোকিলের লড়াই বাঁধে নিম গাছের মাথায় দুপুর বেলায়। যে মুখের মায়ায় আমি লুটায়ে পড়ি বার বার তোমার মল্লিকা বনে। হাজার বছর বছর ধরে অপেক্ষা করি আমি শুধু তোমারই জন্য। যে অপেক্ষার দিন, রাত, ঘন্টা, প্রহর গুনি আমি  সব সময়। রাতের অন্ধকারে মাথার ওপর ব্যবিলনের ঘড়ির ঘড় ঘড়ে আওয়াজ। দুলকি চালে চলা সিলিং ফ্যানের মাথা দুলিয়ে ঘুরে যাওয়া। হালকা হাওয়ায় উড়ে যায় পাখির পালক, উড়ে যায় বসন্তের প্রলাপ বকা বিধুর আঁধার মাখা মন। যে মনের মণিকোঠায় আজও অমলিন সেই মায়াময় হাসি, সেই কালো তিলের স্পর্শ। সেই ভেজা ঠোঁটের মন কেমন করা কুহু কুহু ডাক। আমি চুপটি করে বসে থাকি একা রাতের অন্ধকারে জানলার গারদ ধরে। গারদের ঠাণ্ডা লোহার রডে চিবুক ঠেকিয়ে বসে থাকি শুধু তোমারই জন্য। ঠাণ্ডা হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যায় বসন্তের প্রলাপ বকা ভোর।  যে ভোর বেলায় মল্লিকার গন্ধে মাতাল হয় আমার সারা শরীর, মন। বসন্তের মল্...

ভূত ধরার অভিযান ও রাজনীতি

ভূতের ভবিষ্যৎ এর পর এখন ভোটের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তায় আছে শাসক দল তৃণমূল। যদিও এতে আমার মনে হয় ভূতেরাও বেশ বিরক্ত হয়ে পড়েছে একটু। বেশ সুখেই দিন কাটছিল তাঁদের হঠাৎ করেই কেনো যে এই ভূত ধরার অভিযান শুরু হলো রাজ্যে জুড়ে কে জানে। তবে না দিদির নির্দেশ বলে কথা। ভূত ধরতে তাই সকলের নেমে পড়া মাঠে ময়দানে। দলের ছোটো , বড়ো, মেজো, সেজো, এমনকি কোলের বাচ্চারও জরুরী ভিত্তিতে ভূত ধরার অভিযানে অংশ গ্রহণ করা।  জেলায় জেলায় এখন ভূত ধরার কাজ চলছে জোর কদমে। তবে শুধু ভূত ধরলেই হবে না কত ভূত ধরা হলো। কেমন ধরনের ভূত ধরা হলো তার হিসেব পেশ করতে হবে সপ্তাহে সপ্তাহে দলীয় কার্যালয়ে। মামদো না শাকচুন্নি তারা। শুধু হিসেব পেশ করলেই হবে না ভূত ধরার কাজে সত্যিই পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়, জেলায় জেলায়, লোক রাস্তায় সব বাড়িতে বাড়িতে গেছে কি না তার ছবিও প্রকাশ করতে হবে। সেই ছবি আপলোড করে জানাতে হবে, হ্যাঁ ভূত ধরার অভিযানে তাঁরা সামিল হয়েছেন সত্যিই সত্যিই। কেউ ফাঁকি মারেনি একদম কাজে। কেউ কাজ না করে ঘরে বসে থাকলেই সে কিন্তু বাদ পড়ে যাবে। একদম কড়া নির্দেশ দলের নেত্রীর।  ক...