জয়ন্তদার খবর নিতে আজ হাজির হলাম আমি সেই শান্তিসুধা গেস্ট হাউসে বহুদিন পর। সেই আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আমাদের বোলপুরে আসা এই শীতের সময়। সেই সোনাঝুড়ির ফাঁকা এলাকায় এই শান্তিসুধা গেস্ট হাউসে আলাপ হলো জয়ন্তদার সাথে আমার। তখন আমি ২৪ ঘণ্টায় কাজ করি। সেই তাঁর নম্বর নেওয়া। সেই তাঁর সাথে যোগাযোগ হয়ে যাওয়া এই জায়গায় থাকার সুবাদে। সেই কতজনের কাছে বলা এই থাকার ঠিকানা জানিয়ে আমার। বোলপুরে এলেই এই জায়গায় থাকলে ভালো ব্যবস্থা করে দেন তিনি। সেই একদম ঘরের মতই আতিথেয়তা দিয়ে নিজের করে নেওয়া। আর ঘুরে চলে যাবার পরেও সেই মানুষটার সাথে যোগাযোগ থেকে যাওয়া আমার যেটা আমার একটা বদ অভ্যাস।
মাঝে মাঝেই তাঁর সাথে আমার দূরে থাকলেও শহর থেকে যোগাযোগ হতো মোবাইল ফোনে। সেই দাদা এই দিন ঘর পাওয়া যাবে আমাদের অফিস এর লোক আসবে বলে কত যে বিরক্ত করেছি তাঁকে সময়ে অসময়ে তার ঠিক নেই। সেই ২৪ ঘণ্টার রিপোর্টার প্রসেনজিৎ মালাকার এর ক্যামেরাম্যান অমর এর আমাদের এই জায়গায় নিয়ে যাওয়া। ঘর দেখে পছন্দ হয়ে যাওয়ায় সেখানেই থেকে যাওয়া আমাদের। বেশ সুন্দর ছিমছাম ফাঁকা জায়গা। এক টুকরো জমিতে শীতের সবজি চাষ হচ্ছে। সেই ক্ষেতের পালং শাক তুলে বড়ি দিয়ে খেতে দিয়েছিলেন দুপুরের খাবারের সময় ভাত এর সঙ্গে। কী অপূর্ব স্বাদ পেলাম যে সেই রান্নায়। সেই টোটন এর সাথে আলাপ হলো সেই বার বেড়াতে এসে। সেই টোটন কোনার। সেই রান্নাঘর এর সামনে একটি খাঁচায় টিয়াপাখি ছিলো যে একমনে তাকিয়ে থাকতো আকাশের দিকে আর মাঝে মাঝেই ডেকে উঠতো সে।
সেই আমার মেয়ের তখন বয়স কম স্কুলের জীবন চলছে। এই গেস্ট হাউসের কাছে সেই সোনাঝুড়ির হাটে তখনও এত ভীড় উপচে পড়েনি। আজ বহুদিন পর হাটে গিয়ে ধীর পায়ে পৌঁছে গেলাম সেই শান্তিসুধা গেস্ট হাউসে দুপুর বেলায়। গেস্ট হাউস এর বন্ধ দরজা দেখে অপেক্ষা করলাম একটু সময়। কিন্তু কে আর কী বলবে এই ভেবে প্রবেশ করলাম সেই পুরোনো দিনের কথা মনে করেই। জয়ন্তদা আছেন বলে ডাকলাম আমি। আর এই কথা শুনে একজন এগিয়ে এলেন বললেন আপনারা। পরিচয় পর্ব শেষ হলো আমাদের। তাঁর নাম রঞ্জন দত্ত। কিন্তু শুনলাম জয়ন্ত দা আজ আর নেই এই পৃথিবীতে। তিনি সবাইকে ছেড়ে অসুস্থ হয়ে দিন যাপন করতে করতে চলে গেছেন এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে সবাইকে ছেড়ে দূরে অনেক দূরে।
জীবন আর মৃত্যু এর মাঝে তো কিছুই নেই। সেই সম্পর্ক, সেই পুরোনো স্মৃতি, সেই কত দিনের পরিচিতি, সেই আলাপ আর পরিচয়। কত কথা কত জীবন আর জীবনের সেই দিন যাপন এর সুখের কথা সব কেমন এক নিমেষে উবে গেল এই তাঁর না থাকার কথা শুনেই। বদলে গেছে এই গেস্ট হাউস এই পাঁচ বছরে অনেকটাই বদল এসেছে যে আজ। বদলে গেছে গোটা এলাকাও। যিনি বলছিলেন জয়ন্তদার কথা আমি আর কী বা তাঁকে জিজ্ঞাসা করি এই কথা শোনার পর। সেই তিনি জয়ন্তদার শেষের দিনের স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেস্ট হাউস এর গেটের কাছে দাঁড়িয়ে একা একাই। আমি চুপ করে শুনছি সেই তাঁর কথা। আচ্ছা এমন কেন অনুভূতি হল আমার আজ।
শীতের বিকেলে কেমন যেনো থমকে গেলাম আমি। কী বলি আমি তাঁকে এই সময়ে। ফেলে আসা দিন, ফেলে আসা মানুষ, ফেলে আসা জীবনের খোঁজ করতে এসে একি কথা শুনলাম আমি। এটা কেমন অভিজ্ঞতা হলো আমার। জীবন কী তাহলে এমনই হয় শুধু আমরাই এই জীবন নিয়ে আর এই জীবনের হুঙ্কার আর আস্ফালন নিয়েই বেঁচে থাকি সারাটা জীবনভোর। আর নিজেদের মধ্যে আকচা আকচি করি আর কামড়া কামড়ি করি আর একে অপরকে ঠেলে ফেলে এগিয়ে যেতে চেস্টা করি। তাহলে যাঁর সাথে কোনো সম্পর্কও ছিলো না সেই জয়ন্তদার বাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করা হয়নি কোনওদিন আমার এতদিন। শুনেছিলাম নৈহাটির দিকে তাঁর বাড়ি। সেই মুকুল রায় এর সাথে তাঁর আলাপ ছিলো বলে জানিয়েছিলেন আমায় গল্প করতে করতে আমি মিডিয়ায় কাজ করি বলে। আজ যদিও আমি কিছুই করি না ভবঘুরে জীবন যাপন আমার।
সেই সন্ধ্যায় বাউল গানের আসর বসলো এই গেস্ট হাউসে। জয়ন্তদা বলতেন মাঝে মঝেই এইবার দাদা আপনি একটা জায়গা কিনে নিন। কতদিন আর ভাড়া বাড়ীতে থাকবেন মেয়ে তখন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে জাপানী বিভাগে। আজ সেই তাঁর না থাকার কথা শুনে আমার এই সব কথাই মনে পড়ে গেল হঠাৎ করেই এতদিন পরে। সেই তাঁর নিজের কেউ ছিল না শুনলাম। বাবা মা চলে যাওয়ার পর একা হয়ে গেছিলেন তিনি একদমই। সেই তাঁর এক আদিবাসী ছেলেকে কাছে নিয়ে রাখা যে আজ নিজেও কেমন একা হয়ে গেলো এই পৃথিবীতে রক্তের সম্পর্ক হীন তাঁর এক প্রিয় মানুষকে হারিয়ে। যাঁর সাথে তাঁর সম্পর্ক নেই কিন্তু একটা অদৃশ্য বন্ধন গ্রথিত হয়েছে যে।
সত্যিই অদ্ভুত এই জীবন। যে জীবন এই ভাবেই আমাদের জড়িয়ে ধরে থাকে আর একদিন হঠাৎ করেই সব কিছুর মায়া কাটিয়ে চলে যায় দূরে অনেক দূরে। আর আমরা সেই সব চেনা মানুষজন সেই চলে যাওয়া মানুষের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকি। কত স্মৃতির রোমন্থন করি। আর মনে মনে সেই মানুষটার জন্য একটু হলেও দুঃখ অনুভব করি। ভালো থাকবেন আপনি দাদা। যেখানেই থাকুন ভালো থাকবেন। আর কোনোদিন আপনাকে ফোনে যোগাযোগ করে বলতে পারবো না আমি দাদা ঘর খালি আছে। আপনি বলবেন না দেখি দাঁড়ান একটু। তারপর বলতেন না দাদা ওই সময় সব যে ঘর ভাড়া হয়ে আছে। ভালো থাকবেন আপনি দাদা। জয়ন্তদার কোনো ছবি নেই আমার কাছে। শুধু তাঁর স্মৃতিকে আঁকড়ে তো এই জীবন নামক এক নদীতে সাঁতার কাটা। ভালো থাকবেন আপনি দাদা।
শান্তিসুধা গেস্ট হাউস ও জয়ন্ত দা - অভিজিৎ বসু।
কুড়ি ডিসেম্বর দু হাজার পঁচিশ।
ছবি সৌজন্য নিজের মোবাইল ক্যামেরায় তোলা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন