বসন্ত এসেছে সাথে ভোট আসছে। শাসক দলের ড্রপবক্স ভরছে প্রার্থী হতে আবেদন করে। পাড়ায় পাড়ায় নেতারা বেরিয়ে পড়েছেন সবাই হাসি হাসি মুখ করে হাতজোড় করে সেজে গুজে তিনি যে ভাতার লাইনে নয় ভোটের লাইনে আছেন সেটা জানাতে। কেউ রাস্তায় বেড়িয়ে পাড়া বৈঠক করে বলছেন মশা কামড়ায় তাদের মানে মশাদের তো এখানে হাতির মত শুড় যেনো, কী অবস্থা ভাবুন পরিষ্কার হয়না একদম নালা আর নর্দমা। কেউ জেল থেকে বেড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলছেন ভোটের আগে ভাতা দেওয়াটা ভালো কাজ কিন্তু কর্মসংস্থান এর দরকার আরও বেশী রাজ্যে। যদিও একসময়ে তিনিই শিল্প মন্ত্রী ছিলেন বটে আর কেউ বলছেন আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিন কিন্তু আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন ঘরে বসে থাকবেন না আপনারা বিজেপির নতুন সভাপতির গলায় এ এক অন্য কবিতার সুর যেনো।
আর এর মাঝেই বিধায়কের কাজে কতটা খুশী বলে হাতের মোবাইল ফোনে মেসেজ ভেসে ওঠে আশ্বিনের শারদ প্রাতে সেই মাঝরাতে। বিধায়কের হাসি সুন্দর মুখ। হয়তো ছবি এ আই এর তৈরী করা ছিল সেটাও। ঝকঝকে গ্রাফিক্স এর কার্ড। যাঁকে সামনে দেখলে এতটা সুন্দর ঝকঝকে তকতকে দেখায়না একদম। বেশ এই তিনটি মাস ভালো কাটবে কিন্তু আমাদের। বাসে ভোট, ট্রেনে ভোট, ট্রাম তো উঠেই গেছে কবে। পাড়ার আড্ডা নেই তবু সেখানেও ভোট। চায়ের দোকানে ভোট। বাজারে ভোট। সব জায়গায় ভোট। বসন্ত এসেছে, আমের মুকুল এর মিস্টি গন্ধ, সেই পাতাবাহার গাছের বাহারি ফুলের শোভায় সেজে উঠছে বাড়ীর দেওয়াল নানা রঙে নানা প্রতীকে। ভোট ফর শাসক, বিরোধী বা সেই লাল পার্টির দল আর হাত এর দল এর কম উপস্থিতি নিয়েই ভোট আসছে এই বঙ্গে। যে হাত একটা সময়ে দেশের শক্ত হাত ছিলো আজ সে কেমন নড়বড়ে হয়ে গেছে যেনো কবেই। কংগ্রেস মুক্ত ভারতের ডাকে।
দুর থেকে আসছে সেই মিলিটারী ফোর্স। ভারী ভারী জুতো পরে হাতে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ানো তাঁদের একমাত্র কাজ গ্রামে আর শহরে। আর সেই সত্তর বা আশি বছর পার করেও নিরন্তর চেষ্টা ভোটে লড়ার নেতা নামক বিশেষ প্রজাতির মানুষের। যাঁদের দেখা হলেই কেমন বিগলিত হয়ে রাস্তায় নুয়ে পড়তে হয় আমাদের এই গোবেচারা মানুষের। বিশেষ করে শাসক দলের জন প্রতিনিধিদের তো এই ভোটের টিকিট পাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা চলে সবার। নাম ঘোষণার আগে তাই নানা তদ্বির তদারক করা একটু কালীঘাট না হয় ক্যামাক স্ট্রিট এর অন্দরে। আগে যদিও বা মুকুল এর দরবারে দোয়া পাতা যেতো আজ সেই ব্যক্তিই নেই। খারাপ কী একটু তদ্বির তদারক আর কিছু বেশি দাদা আর দিদি দিয়ে যদি শাসক দলের টিকিট মিলে যায় তাহলে যে কেল্লা ফতে। একেবারেই ডিয়ার লটারী মিলে যাওয়া যেনো।
আসলে এই পাঁচ বছরে একবার এই গণ্ডি পার হলেই জনগণের কাছে পরীক্ষায় পাশ করলেই যে কেল্লা মাত একেবারেই। সম্মান, সেবা, জনগণের মসীহা হয়ে ওঠা, প্রশাসনের কর্তাদের নয়নের মণি হয়ে ওঠা। সাথে উপরি পাওনা সরকারি বেতন, নানা ভাতা আর কি চাই বলুন তো একটা মানুষের জীবনে। একেবারেই দুধে ভাতে থাকা বা শাঁসে জলে থাকা। পাঁচ বছর জন প্রতিনিধি হতে পারলেই কেল্লা ফতে বছর বছর পেনশন মিলবে। আর তাই সরকার পক্ষের বিধায়ক হতে ড্রপবক্সে উপচে পড়েছে নানা ধরনের বায়োডাটার ভারে। বিজেপির ড্রপবক্স একটু হাল্কা হলেও তৃণমূলের ড্রপবক্সে আর জায়গা নেই যে এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। সব কাট্যাগরির লোক জনগণের সেবা করতেই তো এই ভোটের বাজারে চলে আসা হাতজোড় করে। আমি তোমাদেরই লোক বলে। ভোট এলেই আমি তোমাদের লোক।
সব মিলিয়ে ভোট আসছে। ভাতা আসছে। ফর্ম ভরছে। প্রতিশ্রুতি আসছে। রাজ্যে ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। কর্মসংস্থান কম হচ্ছে। ভাতার আবেদন এর লাইন ঠিক করতে সকাল থেকেই পাড়ায় পাড়ায় ভীড় জমছে। এক পক্ষের কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা দিদির হয়ে গলা ফাটাচ্ছে। অন্যদিকে সব মোদীর হয়ে গান গাইছে। অল্প কিছু ফেসবুকের পর্দায় লাল পার্টির হয়ে কথা বলছেন। আর সেই হাত এর হয়ে খুব বেশী আওয়াজ নেই যে এই ভোটের ভরা বসন্ত মৌসুমেও। এটাই তো স্বাভাবিক ঘটনা এই বঙ্গের ভোট যুদ্ধে।
পরপর তিনবার ভোটে জিতে অনেকটাই কনফিডেন্ট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। তাঁদের সাথে আছে শুধুই ভান্ডার আর ভান্ডার। তাহলে আর চিন্তা কী। বাংলার বঞ্চনা, কেন্দ্রের এই বঞ্চনা, সব উন্নয়নের টাকা আটকে দেওয়া। মোদীর বিরুদ্ধে একটাই প্রতিবাদের মুখ হয়ে ওঠা দিদির সরকারের। যে সরকার মা মাটি আর মানুষের কথা বলে বারবার। যে সরকার মানুষের পাশে থাকে ৩৬৫ দিন। ভোটের সময় তাঁদের গৃহ সম্পর্ক অভিযান করতে হয় না কিছুতেই। বেশ ভালই লাগে আমার এইসব দেখে।
একদম ভোট যুদ্ধের দামামা বেজেছে। ডিজিট্যাল যোদ্ধারা সব বাজারে নেমে পড়েছেন কোমর বেঁধে। মোবাইল ফোনে চলে আসছে কার কাজে কত খুশী আপনারা বলুন। আর কেউ সেখানে মন্তব্য করছেন পাগল নাকি আমি এখানে মন্তব্য করে আমি মরি আর কী। তারমানে ডিজিট্যাল যোদ্ধারা ভীড় করলেও শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলতে সেই লাল পার্টির আমলে যে ভয় পেতে হত এই আমলেও সেই এক অবস্থা। হয়তো একটু হেরফের হবে। তাহলে কোথায় গনতন্ত্র আসলে সবটাই যে ঠুনকো খেলনা আর বাটী।
এইসব চোখে পড়ে যায় আমার রাত জেগে। দূরে কোথাও গাছের আড়ালে বসে কোকিল চিল চিৎকার করে। জানান দেয় এই রাত তোমার আমার। সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে ফেসবুকের বান্ধবীর ছবি দেখে মনে মনে কত যে কিছুই কল্পনা করি আমি এই বুড়ো বয়সেও। আর সব কিছুর মাঝে ভোট আসে ভোট যায়। এক সময়ে সাংবাদিক ছিলাম বলে মনে পড়ে আমার। কত ছোট থেকেই সেই শুনে যাওয়া বৈজ্ঞানিক রিগিং। যার জোরে গ্রামে শহরে ৩৪ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকা লালেদের। আর আজ সেই লালের ঘরে কামান দেগে ঘর ছাড়েন স্বপ্ন দেখা এক যুবক। যিনি কত টাকায় বিক্রী হলেন জিজ্ঞাসা করলে বলেন খুব বেশি নয় দু হাজার কোটি ভাবা যায়।
আর এই সব এর মাঝে কিছু কাজ হয় আর কিছু কাজ হয়না এলাকায় এলাকায়। কেউ বলেন ফেসবুকে পোস্ট করে আমি তোমাদেরই লোক। সত্যিই অসাধারণ কিন্তু এই আমাদের লোক হয়ে যাওয়া এই কটি দিনের জন্য ভোটের বাজারে। তারপর সব কেমন ধীরে ধীরেই বদলে যাওয়া স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। আর জিতে যাওয়া নেতার দিন দিন ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়ে ওঠা। আসলে কিছুই নয় ভোট যে বড় বালাই।
আজানের সুর কানে আসে আমার ভোরবেলায়। দুরে মা শীতলা মায়ের মন্দিরে ঘণ্টা বাজে। এই বাংলায় আমরা কিন্তু পাঁচ বছর অন্তর শাসক দলকে পরীক্ষায় ফেলতে জানিনা একদমই। আর তাই বোধহয় অনেক টাই নিশ্চিন্ত এই বাংলার মা মাটির আর মানুষের সরকার। যাঁরা জানেন ভাতায় আর ভান্ডারে তাঁরা যে করেই হোক ভোটের গণ্ডি এইবারেও পার হয়ে যাবেন তাঁরা। এইবারেও চতুর্থ বারের জন্য ফের মানুষের পাশে থাকার জন্যে শাসক পক্ষ তাঁরা অনেকটা বেশী বদ্ধপরিকর তাই বিরোধীদের থেকেও তাঁরা বেশী কনফিডেন্ট।
ভোট আসছে বঙ্গে - অভিজিৎ বসু।
২৫ ফেব্রুয়ারি দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য ফেসবুক।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন