সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সেই বাড়ীর আমগাছ

কিছু ছবি আর কিছু মুহূর্ত জীবনের সবচেয়ে সাদা জীবনের কালো কথাকে মনে করিয়ে দেয় আমায়। জীবনের মেঠো পথে আঁকিবুঁকি দাগ কেটে যায় সে জলছবির মতই। যে দাগ সেই দূরের আকাশে চাঁদের নরম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে গ্যালাক্সির পথ পেরিয়ে হাজার হাজার আলোকবর্ষের দূরত্ব পার করে এই ধূলিধুসর পাগলামি করা জীবনে এসে পৌঁছে যায় আচম্বিতে। আজকাল এই বসন্তের একটা অদ্ভুত মায়াময় গন্ধ বয় যেনো চারিদিকে। ওই যে কী একটা গান আছে না, ধীরে ধীরে ধীরে বয়, সে যে উতল হাওয়া। যে উতল হাওয়ায় বনানীতে যে মিস্টি গন্ধ বয় বেশ নাকে লাগে আমার এই বুড়ো বয়সেও বসন্তের উতল হাওয়া।


বহুদিনের পর বাড়ী যাওয়া আমার। আসলে এই ফাঁকা মা হীন বাড়ীতে যেতে আর ভালো লাগে না একদমই আমার। আজকাল তাই ঘর ছেড়ে দূরে থাকা আমার। সেই মায়াময় ভালবাসা আর দু চোখের প্রশ্রয়ে বড় হয়ে যাওয়ার স্মৃতির মাটির গন্ধ আজ কেমন পানসে লাগে আমার এতদিন পড়ে ঘরে ঢুকেই। সেই অগোছালো কাঠের চৌকি, সেই ফাঁকা ঘর। সেই শুধুই ছবি আর ছবির ভীড় চারিদিক জুড়েই তাকিয়ে আছে আমার দিকে যেনো কেউ। কার নির্বাক চাওনি আমায় গিলে খেতে চায় যেনো। আর বাড়ি গেলেই আমি এই মায়ের প্রিয় আমগাছের কাছে চলে আসি একা একাই।

কদিন আগে বৃষ্টির জলে আমের বউল ঝড়েছে অনেকটাই। আর আকাশে চাঁদের নরম ওম মেখে বউল থেকে ফল প্রকাশ গাছের ডালে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে সে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট গুটি নিয়ে। আমায় দেখছে পিটপিট করে। বাড়ীতে নতুন লোক বটে। ভজনের যেমন অবাক হয়ে প্রশ্ন করা তুই বাড়ীতে গেছিলি।‌ কাল তো বাবা এলো তোর বাড়ীতেই। আজ আবার তোর যাওয়া। কিছুটা হলেও কানে খটকা লাগে আমার যেনো। সেই ছোট্টো মন ভালো করা ঝাঁঝালো গন্ধ মাখা গাছের চারপাশ জুড়ে একটা মায়ের মিষ্টি গন্ধ লেগে আছে যেন সেই সস্তার পাউডার এর হালকা গন্ধের মতই সেই যে আফগান স্নো এর একটা গন্ধ মায়ের কাছে পেতাম মাঝে মাঝেই। 

আমগাছের শক্ত ডাল লেবু গাছের মিষ্টি পাতাকে জড়িয়ে ধরে দুজনের একসাথেই দাঁড়িয়ে থাকা আর বেড়ে ওঠা এক আকাশের তলায় ঠিক পিঠোপিঠি দুই ভাইয়ের মতই। আর দুর থেকে চাঁদের সেই দৃশ্য দেখা। সেই আকাশপথ বেয়েই তো মায়ের চলে যাওয়া এই বাড়ী থেকেই দুরে অনেক দূরের পথে একদিন। সেই দেখতে দেখতে তিনটে বছর হয়ে গেলো যে মায়ের চলে যাওয়া। সেই তুলসী তলায় বাতি পড়ে না বহুদিন। বাড়ীর জমির একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ নাকে লাগছে বারবার আমার এই ফাল্গুনের মন কেমনের সন্ধ্যায়। সেই কলতলার দেওয়ালে সবুজ শ্যাওলার ছোপ ছোপ দাগ লেগে আছে ধূসর হয়ে। এই জায়গায় বসেই মায়ের বাসন মাজা। সেই মশার উৎপাতে নীরবে মুখ বুজে কাজ করে যাওয়া। সিনেমার ছবির মত সব প্রকাশ হয়ে আমার স্মৃতির ক্যামেরায় চলে আসা। 


সত্যিই তো এই আমগাছের কাছে দাঁড়িয়ে একা একাই কেমন বিবশ হয়ে যাই আমি যেনো। সেই গাছ ভর্তি মুকুল এসেছে গাছে। যেদিন গাছ দুটো কলকাতা থেকে এই বাড়ীতে মায়ের কাছে এলো মায়ের খুশী হয়েও রাগ করা খুব। এটা অবশ্য মায়ের বরাবর এর অভ্যাস। খুশিকে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রকাশ না করা। কেনো দুটো গাছ আনা হলো একটা গাছের বদলে। কী রাগ আর সেই রাগের অন্দরে ভালবাসার চাপা প্রকাশ পেলো তাঁর কথায় কথায়। সেই গাছ দুটোর বড় হওয়া আর মায়ের আসময়ে চলে যাওয়া। 

সেই আমের গাছে ফল আসা আর মুকুল ধরা আর বারবার সেই মায়ের কথাই মনে পড়ে যায় আমার। সেই চাঁদের নরম এলোমেলো আলো আর আমার এলোমেলো এলেবেলে জীবন। আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার বাড়ীর সেই আম, লেবু, জবা ফুলের গন্ধ মেখে গাছের ভীড়ে সন্ধ্যায়। সেই চেনা জায়গায় নিজের জায়গায় বহুদিন বহুবছর পর। যেখানে আমার ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা। আমার মায়ের স্বপ্ন দেখা সেই আম গাছের দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। আজ আমি ছোট থেকে বড় আর বড় থেকে বুড়ো হলাম। আর সেই মায়ের প্রিয় আমগাছ সেও ডালপালা মেলে বড় হয়ে গেলো। শুধু হারিয়ে গেলো আমার মায়ের সেই শাড়ীর আঁচল এর গন্ধটাই। 

দুরে আকাশ পানে তাকিয়ে দেখি চাঁদের নরম আলোর পথ ধরে মা একা একাই দুর থেকে তাকিয়ে আছেন তিনিই তো মনে হলো যেনো। সেই নক্ষত্রের পথ ধরে সেই চাঁদের আলোর রাস্তা ধরে একা একাই তিনি চলে যাচ্ছেন দূরে অনেক দূরে। সেই সব কিছু ছেড়ে আমার মায়া, তাঁর ভালোবাসার সংসার, সেই তাঁর প্রিয় আমগাছের মায়াকে ত্যাগ করে, সব ছেড়ে তাঁর চলে যাওয়া এক অচিনলোকে। আমি কেমন বোকা হয়েই একা একাই দাঁড়িয়ে রইলাম আকাশের নিচে। চাঁদের নরম আলো গায়ে মেখে আর বউলের মিষ্টি গন্ধকে বুকে ধরে। ভালো থেকো তুমি মা। 

সেই বাড়ীর আম গাছ - অভিজিৎ বসু।
আঠাশ ফেব্রুয়ারি, দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য নিজের মোবাইল ক্যামেরায় তোলা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমাদের সবার ক্যান্টিন বৌদি

আজ সেই পোদ্দার কোর্টের ক্যান্টিন বৌদির কথা। যাঁর রান্না খেতে ভীড় জমে যেত পোদ্দার কোর্টের ২৪ ঘণ্টার অফিসে। সেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। যাঁর হাতের রান্না গরম ভাত, ডাল আর গোল গোল কড়কড়ে আলু ভাজা খেয়ে আমি অফিসে কাজ করতে শুরু করতাম নিশ্চিন্তে। সেই সকালে টিফিন আর চা থেকে শুরু করে দুপুরে নানা ভালো ভালো পদের আয়োজন করতেন তিনি। সেই বর্ষার সময় ইলিশ মাছের রকমারি পদ করে খেতে দেওয়া আমাদের ক্যান্টিন বৌদির। যদিও আমি নিরামিষ আহার করি সব সময় সারা জীবন।  আর বিকেল হলেই গরম লুচি আর আলুর দম বা আলুর তরকারি সহযোগে টিফিন খেতে দেওয়া এক প্লেট করে। সেই এডিটর থেকে অফিসের সাধারণ কর্মী সবাই ক্যান্টিন বৌদির এই রান্না খেয়ে সাধু সাধু করতে ভুলতেন না কিন্তু কেউই। কোথা থেকে এলেন কার হাত ধরে এলেন কে জানে। কিন্তু মিডিয়ার অফিসে এমন রান্নাবান্না চলছে। টেবিলে টেবিলে গরম খাবার পৌঁছে যাচ্ছে। বেশ ভালই লাগত কিন্তু আমার সেই সময়ে। বিরাটিতে বাড়ী বা ভাড়া থাকতেন সেই সময় তিনি। সেই প্রাচীন আমলে বলাই ঠিক বোধহয় পুষ্পদির হাতের রান্না খেয়ে আর টানা নয় ঘন্টা ডিউটি করেই তো আমাদের দিন কোথা থেকে যে কেটে যেতো এই পোদ...

কলকাতা টিভির নির্মাল্য জানা

কিছু বিখ্যাত সাংবাদিক এর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর আগে আমায় একটু ভাবতে হয় আর কি। থমকে দাঁড়াতে হয় একটু। কিছুটা ভয়, আর কিছুটা সেই বাংলার মুখ এর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যক্তি। যদি কিছু মনে করে সে। যতই পুরোনো দিনের চেনা সম্পর্ক হোক। সেই দূরের হায়দরাবাদ এর চেনা বা কলকাতার চেনা হোক। সেই চেনা আর অচেনা যে সব এক হয়ে যায় ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব নামক ঘেরাটোপে বন্দী এই জেলখানায়। মাঝে মাঝেই সেই জেলখানায় ওয়ার্ডেন পাগলা ঘণ্টা বাজায় আর তখন হাসিমুখে ডাক পড়ে কাঁচের ঘরে। বেশ ভালো লাগে আমার এই ঘণ্টার আওয়াজ কিন্তু। যে ঘণ্টার আওয়াজ শুনে একদিন আমিও পাঁচিল টপকে পালিয়ে যাই। সে বাদ দিন এইসব কথা।  সেই বাংলার বিখ্যাত জনপ্রিয় ২৪ ঘণ্টার ছেড়ে আসা সুন্দর অফিস। সেই চেনা পোদ্দার কোর্টের অফিসে বাঘ এর মতই ঘুরে বেড়ানো তাঁর চারিদিকে কড়া নজর দিয়ে। সব দেখতে দেখতে একটু ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে ভারী চেহারা নিয়ে। তাঁর চোখ এড়িয়ে কেউ যেনো কিছু করতে না পারে। সেই বোলপুরে করোনার সময় এক বিকেল বেলায় আমার কাছে ফোন এলো একদিন অভিজিৎ দা তোমার কপাল খুলে গেলো যে।  কি খবর কোথা...

যা দেখি…প্রতিদিন মনে পড়ে কত… স্মৃতির পথ ধরে হাঁটি… লিখি…

হারিয়ে যাওয়া চিঠি

আজ আমার সাদা জীবনের কালো কথায় শুধু চিঠি আর চিঠি। হ্যাঁ, সেই সাদা কালো অক্ষরে লেখা নানা ধরনের চিঠির কথা। খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে একদম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এই বয়সেও তিনি বেশ বুকে সাহস নিয়ে আর সহজ সরল ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে খোলা চিঠি প্রেরন করেছেন। সত্যিই এই কাজকে অসাধারণ বলতে কিন্তু লজ্জা নেই কোনও।রাজনীতির ময়দানে এই মানুষটাকে যত দেখি ততো যেনো মুগ্ধ হয়ে যাই।  এমন একটা সময়ে তিলোত্তমা খুনে দোষীদের শাস্তি চেয়ে ও জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে মুখ্য মন্ত্রীর কাছে বামফ্রন্টের এই খোলা চিঠি। জানা নেই এই ফ্রন্ট এখনও কতটা সক্রিয় হয়ে ফ্রন্টফুটে ব্যাট করতে সক্ষম এই কঠিন পিচে। তবুও সেই বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু রাহুল দ্রাবিড় বা সুনীল গাভাস্কার এর মত বাউন্সার বল সামলে পত্রবোমা ছুঁড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে। তিনি জানেন না এর ফল পাল্টা অভিঘাত কি হবে।  আসলে এই খোলা মাঠে খোলা চিঠি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করা আর অনশন করা চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ত...

রাখী বন্ধনে বাঁধা ইতিহাস

সাদা জীবনের কালো কথায় আজ রাখী বাঁধার কথা। যে রাখী বন্ধন ভাই আর বোনের সম্পর্ককে আর নিগূঢ় করে, আপন করে, নিকটের করে। আজ সেই রাখিবন্ধন উৎসব পালন হচ্ছে গোটা দেশ জুড়ে। রাখীবন্ধন ভাই ও বোনের মধ্যে প্রীতিবন্ধনের উৎসব। রাখীবন্ধন উৎসব বা রাখীপূর্ণিমা ভারতীয় উপহাদেশের একটি উৎসব। হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ ও শিখরা এই উৎসব পালন করে।এই দিন দিদি বা বোনেরা তাদের ভাই বা দাদার হাতে রাখী নামে একটি পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। এই রাখীটি ভাই বা দাদার প্রতি দিদি বা বোনের ভালবাসা ও ভাইয়ের মঙ্গলকামনা এবং দিদি বা বোনকে আজীবন রক্ষা করার ভাই বা দাদার শপথের একটা প্রতীক। সেই রাখিবন্ধন বা রক্ষাবন্ধন এর দিন আজ। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ বঙ্গভঙ্গের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই অনুষ্ঠানের পুনঃসূচনা করেছিলেন বাংলার মানুষের মনে ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এইবার সেই রাখীর উৎসবে লেগেছে রাজনীতির ছোঁয়া। নানা রং। নানা প্রতিবাদ। নানা আন্দোলন।  ভাই বোনের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসার সুতো জড়ানো রাখিতেও ...