কিছু ছবি আর কিছু মুহূর্ত জীবনের সবচেয়ে সাদা জীবনের কালো কথাকে মনে করিয়ে দেয় আমায়। জীবনের মেঠো পথে আঁকিবুঁকি দাগ কেটে যায় সে জলছবির মতই। যে দাগ সেই দূরের আকাশে চাঁদের নরম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে গ্যালাক্সির পথ পেরিয়ে হাজার হাজার আলোকবর্ষের দূরত্ব পার করে এই ধূলিধুসর পাগলামি করা জীবনে এসে পৌঁছে যায় আচম্বিতে। আজকাল এই বসন্তের একটা অদ্ভুত মায়াময় গন্ধ বয় যেনো চারিদিকে। ওই যে কী একটা গান আছে না, ধীরে ধীরে ধীরে বয়, সে যে উতল হাওয়া। যে উতল হাওয়ায় বনানীতে যে মিস্টি গন্ধ বয় বেশ নাকে লাগে আমার এই বুড়ো বয়সেও বসন্তের উতল হাওয়া।
সত্যিই তো এই আমগাছের কাছে দাঁড়িয়ে একা একাই কেমন বিবশ হয়ে যাই আমি যেনো। সেই গাছ ভর্তি মুকুল এসেছে গাছে। যেদিন গাছ দুটো কলকাতা থেকে এই বাড়ীতে মায়ের কাছে এলো মায়ের খুশী হয়েও রাগ করা খুব। এটা অবশ্য মায়ের বরাবর এর অভ্যাস। খুশিকে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রকাশ না করা। কেনো দুটো গাছ আনা হলো একটা গাছের বদলে। কী রাগ আর সেই রাগের অন্দরে ভালবাসার চাপা প্রকাশ পেলো তাঁর কথায় কথায়। সেই গাছ দুটোর বড় হওয়া আর মায়ের আসময়ে চলে যাওয়া।
বহুদিনের পর বাড়ী যাওয়া আমার। আসলে এই ফাঁকা মা হীন বাড়ীতে যেতে আর ভালো লাগে না একদমই আমার। আজকাল তাই ঘর ছেড়ে দূরে থাকা আমার। সেই মায়াময় ভালবাসা আর দু চোখের প্রশ্রয়ে বড় হয়ে যাওয়ার স্মৃতির মাটির গন্ধ আজ কেমন পানসে লাগে আমার এতদিন পড়ে ঘরে ঢুকেই। সেই অগোছালো কাঠের চৌকি, সেই ফাঁকা ঘর। সেই শুধুই ছবি আর ছবির ভীড় চারিদিক জুড়েই তাকিয়ে আছে আমার দিকে যেনো কেউ। কার নির্বাক চাওনি আমায় গিলে খেতে চায় যেনো। আর বাড়ি গেলেই আমি এই মায়ের প্রিয় আমগাছের কাছে চলে আসি একা একাই।
কদিন আগে বৃষ্টির জলে আমের বউল ঝড়েছে অনেকটাই। আর আকাশে চাঁদের নরম ওম মেখে বউল থেকে ফল প্রকাশ গাছের ডালে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে সে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট গুটি নিয়ে। আমায় দেখছে পিটপিট করে। বাড়ীতে নতুন লোক বটে। ভজনের যেমন অবাক হয়ে প্রশ্ন করা তুই বাড়ীতে গেছিলি। কাল তো বাবা এলো তোর বাড়ীতেই। আজ আবার তোর যাওয়া। কিছুটা হলেও কানে খটকা লাগে আমার যেনো। সেই ছোট্টো মন ভালো করা ঝাঁঝালো গন্ধ মাখা গাছের চারপাশ জুড়ে একটা মায়ের মিষ্টি গন্ধ লেগে আছে যেন সেই সস্তার পাউডার এর হালকা গন্ধের মতই সেই যে আফগান স্নো এর একটা গন্ধ মায়ের কাছে পেতাম মাঝে মাঝেই।
আমগাছের শক্ত ডাল লেবু গাছের মিষ্টি পাতাকে জড়িয়ে ধরে দুজনের একসাথেই দাঁড়িয়ে থাকা আর বেড়ে ওঠা এক আকাশের তলায় ঠিক পিঠোপিঠি দুই ভাইয়ের মতই। আর দুর থেকে চাঁদের সেই দৃশ্য দেখা। সেই আকাশপথ বেয়েই তো মায়ের চলে যাওয়া এই বাড়ী থেকেই দুরে অনেক দূরের পথে একদিন। সেই দেখতে দেখতে তিনটে বছর হয়ে গেলো যে মায়ের চলে যাওয়া। সেই তুলসী তলায় বাতি পড়ে না বহুদিন। বাড়ীর জমির একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ নাকে লাগছে বারবার আমার এই ফাল্গুনের মন কেমনের সন্ধ্যায়। সেই কলতলার দেওয়ালে সবুজ শ্যাওলার ছোপ ছোপ দাগ লেগে আছে ধূসর হয়ে। এই জায়গায় বসেই মায়ের বাসন মাজা। সেই মশার উৎপাতে নীরবে মুখ বুজে কাজ করে যাওয়া। সিনেমার ছবির মত সব প্রকাশ হয়ে আমার স্মৃতির ক্যামেরায় চলে আসা।
সত্যিই তো এই আমগাছের কাছে দাঁড়িয়ে একা একাই কেমন বিবশ হয়ে যাই আমি যেনো। সেই গাছ ভর্তি মুকুল এসেছে গাছে। যেদিন গাছ দুটো কলকাতা থেকে এই বাড়ীতে মায়ের কাছে এলো মায়ের খুশী হয়েও রাগ করা খুব। এটা অবশ্য মায়ের বরাবর এর অভ্যাস। খুশিকে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রকাশ না করা। কেনো দুটো গাছ আনা হলো একটা গাছের বদলে। কী রাগ আর সেই রাগের অন্দরে ভালবাসার চাপা প্রকাশ পেলো তাঁর কথায় কথায়। সেই গাছ দুটোর বড় হওয়া আর মায়ের আসময়ে চলে যাওয়া।
সেই আমের গাছে ফল আসা আর মুকুল ধরা আর বারবার সেই মায়ের কথাই মনে পড়ে যায় আমার। সেই চাঁদের নরম এলোমেলো আলো আর আমার এলোমেলো এলেবেলে জীবন। আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার বাড়ীর সেই আম, লেবু, জবা ফুলের গন্ধ মেখে গাছের ভীড়ে সন্ধ্যায়। সেই চেনা জায়গায় নিজের জায়গায় বহুদিন বহুবছর পর। যেখানে আমার ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা। আমার মায়ের স্বপ্ন দেখা সেই আম গাছের দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। আজ আমি ছোট থেকে বড় আর বড় থেকে বুড়ো হলাম। আর সেই মায়ের প্রিয় আমগাছ সেও ডালপালা মেলে বড় হয়ে গেলো। শুধু হারিয়ে গেলো আমার মায়ের সেই শাড়ীর আঁচল এর গন্ধটাই।
দুরে আকাশ পানে তাকিয়ে দেখি চাঁদের নরম আলোর পথ ধরে মা একা একাই দুর থেকে তাকিয়ে আছেন তিনিই তো মনে হলো যেনো। সেই নক্ষত্রের পথ ধরে সেই চাঁদের আলোর রাস্তা ধরে একা একাই তিনি চলে যাচ্ছেন দূরে অনেক দূরে। সেই সব কিছু ছেড়ে আমার মায়া, তাঁর ভালোবাসার সংসার, সেই তাঁর প্রিয় আমগাছের মায়াকে ত্যাগ করে, সব ছেড়ে তাঁর চলে যাওয়া এক অচিনলোকে। আমি কেমন বোকা হয়েই একা একাই দাঁড়িয়ে রইলাম আকাশের নিচে। চাঁদের নরম আলো গায়ে মেখে আর বউলের মিষ্টি গন্ধকে বুকে ধরে। ভালো থেকো তুমি মা।
সেই বাড়ীর আম গাছ - অভিজিৎ বসু।
আঠাশ ফেব্রুয়ারি, দু হাজার ছাব্বিশ।
ছবি সৌজন্য নিজের মোবাইল ক্যামেরায় তোলা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন